Fast Fiction

আমার জন্য খোঁড়া গর্তেই ও পড়ল

ছাড়পত্রের গোলাপি স্লিপটা রুবাইয়ার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কামরুল ভাই লোডিং বেয়ের মুখেই উঁচু করে ধরল। “এই চালান যাবে না। রিলিজ ব্লক আছে—নামের পাশে রেকর্ডেড।” কাঁধে বস্তা তোলা দুই শ্রমিক মাঝপথে থেমে গেল, ট্রলি ঠেলা ছেলেটা চাকা কাত করে দাঁড় করাল, আর সাতখানার বাঁধাকপি-ভর্তি খাঁচা বৃষ্টির আর্দ্র গন্ধে ভিজে থেকে গেল বেয়ের ধারে।

রুবাইয়ার ডান হাতের তালুতে ফোনের চাপা আলো জ্বলছিল, আঙুলের নিচে ঘাম জমে স্ক্রিন পিচ্ছিল। সে জানত আজকের এই মাল ছাড়তে না পারলে বিকেলের হিসাব থেকে তার মজুরি কাটা যাবে, আর খালাতো ভাইয়ের ঔষধের টাকাও আটকে যাবে। তবু কামরুল ভাই যেভাবে স্লিপটা সবাইকে দেখাচ্ছে, তাতে ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে উঠল অপমানটা—যেন সে নিজেই চুরি করতে এসে ধরা পড়েছে। ডক অফিসের পাশে প্লাস্টিক চেয়ারের কোণে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপটা পড়ে ছিল, উপরে পাতলা সর উঠে রিং বানিয়েছে; শিফট বদলের ভিড়ে কেউ তা সরানোরও সময় পায়নি।

“আমার নামে ব্লক কেন?” রুবাইয়া গলা নিচু রেখেই বলল।

কামরুল ভাই গা ঝাড়া হাসি দিল। “তুমি না বুঝে কাজ করো, এই জন্য। কার মাল কাকে দিতে হয়, সেটা আমি দেখব। আর—” সে একটু জোরে ঘুরে দাঁড়াল, যাতে রিসিভিং ক্লার্ক হাবিবও শুনতে পায়, “যার সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা বেশি, তারে বেশি বিশ্বাস করা যায় না। বাইরে কথা আছে।”

শ্রমিকদের চোখ সরাসরি রুবাইয়ার মুখে উঠল না, কিন্তু থেমে থাকা হাতগুলোই যথেষ্ট ছিল। ঢাকা শহরের এই কৃষি সরবরাহ গুদামে কেউ কারও সংসারের খবর পুরো জানে না, তবু কে কার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব গিয়েছিল, কোথায় না হয়ে ফিরেছে, কোন মেয়ের নাম কার সঙ্গে ফিসফিসে উঠে—এইসব খবর ট্রলির চাকায় লেগে এক বেয় থেকে আরেক বেয় ঘোরে। কামরুল ভাই সেটাই টেনে এনে কাজের খাতার ওপর ফেলে দিল।

এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিন দেখে সে গলার স্বর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে ফেলল, “জ্বি, মুনা খালা… না না, আমি আছি… আপনার কথাই তো দেখছি।” কথাটা সে আড়াল করে বলল না; উল্টো রুবাইয়ার পাশ কাটিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “খালা, আপনি চিন্তা করবেন না। মেয়েটারে আমি সীমা বুঝাইতেছি। কাজের জায়গা আছে, মান-ইজ্জতের জায়গা আছে।”

রুবাইয়ার ঘাড়ের পেছনের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। মুনা খালা শুধু কামরুল ভাইয়ের আত্মীয় না, তার মায়েরও দূর-সম্পর্কের চেনা। গত রমজানে একবার কথায় কথায় ইঙ্গিত উঠেছিল—কামরুল ভাই নাকি রুবাইয়াকে পছন্দ করে। রুবাইয়া সোজা না বলেছিল। তারপর থেকে কামরুল ভাইয়ের সৌজন্য পাতলা, নির্দেশ কঠিন, আর হিসাব-খাতায় তার ভুল হঠাৎ বেশি দেখা দিতে শুরু করেছে।

হাবিব সতর্ক গলায় বলল, “ভাই, লাইন জ্যাম হচ্ছে। খুলনার ট্রাকও ঢুকছে। ব্লক থাকলে সিস্টেম নোট লাগবে।”

“লাগাও,” কামরুল ভাই বলল, “আর এই চালানের সই মিলাও এখনই। আমি দেখি ও কী করে।” সে গোলাপি স্লিপটার নিচে নিজের কলম ঠুসে দিল। “জরুরি সিগনেচার চেক। লাইভ লগে তুলো।”

রুবাইয়া তখনই বুঝল, লোকটা এক ধাপ বেশি চলে গেছে। সাধারণ ব্লকে মাল দাঁড়ায়, কিন্তু লাইভ সিগনেচার চেক উঠলে যার নির্দেশে চেক খোলে, সেই নির্দেশদাতার নামও লগে পড়ে। আর পুরোনো নিয়ম—যেটা সে নীরবে শিখেছে রাতের শিফটে ফাইল ধরাধরি করতে করতে—যদি চেক চলাকালে দেখা যায় ব্লক ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে দেওয়া, তাহলে নির্দেশদাতার নিজস্ব ছাড়ক্ষমতা সাময়িক স্থগিত হয়, যতক্ষণ না উপরের অনুমোদন আসে। এ নিয়ম কাগজে আছে, কিন্তু কেউ ডকের ভিড়ে নিজে পা দিয়ে ফাঁদে না পড়লে তা মনে আনে না।

সে কিছু বলল না। শুধু স্লিপটা ফেরত চাইতে হাত বাড়াল না।

হাবিব ইতস্তত করছিল। কামরুল ভাই নিজেই তার কাঁধের ওপর ঝুঁকে রেডিও তুলে নিল। “রিসিভিং লেন থ্রি, জরুরি সিগনেচার ভেরিফিকেশন। ব্লকড রিলিজ, অপারেটর রুবাইয়া। ইনিশিয়েট বাই কামরুল হাসান, বেয় সুপারভিশন।”

রেডিওতে স্ট্যাটিক ছড়িয়ে গেল। তারপর ওপাশ থেকে গলা এল, “ইনিশিয়েটর নাম বললেন? রিপিট।”

কামরুল ভাই বিরক্ত স্বরে আবার বলল, “কামরুল হাসান। আমার অথরিটি আছে। দ্রুত করুন।”

শব্দটা বেরোতেই যেন বেয়ের বাতাস একটু কষে বসল। হাবিবের চোখ একবার রুবাইয়ার দিকে গেল। রুবাইয়া এবার শান্ত স্বরে বলল, “রিপিটের দরকার নেই। নাম উঠেছে।”

কামরুল ভাই তার দিকে তাকাল, প্রথমবারের মতো বিরক্তির ভেতর সামান্য সতর্কতা ফুটে উঠল। “তুমি চুপ থাকো।”

রেডিওতে আরও দুই সেকেন্ড ভাঙাচোরা শব্দ, তারপর স্পষ্ট নির্দেশ: “ইনিশিয়েটর কামরুল হাসান হলে রেস্ট্রিকশন কোড চেক হবে। সব লেন হোল্ড। সংশ্লিষ্ট ইনিশিয়েটরের স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক ছাড়পত্র কাউন্টারে ধরে রাখুন। কেউ বে ছাড়বে না।”

ঠিক তখনই পেছন থেকে শওকত ট্রলি ঠেলে বেরোচ্ছিল, তার ট্রলির ওপর সাদা পলিথিনে মোড়া বেগুনের কার্টন। কামরুল ভাই এক ঝটকায় ঘুরে উঠল, “ওইটা বের করো! ওইটা আমার সই করা, ওটা যাবে।”

হাবিব হাত তুলে শওকতকে থামাল। “রেডিও হোল্ড দিয়েছে।”

“আমি বলছি যাবে!” কামরুল ভাই প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। “আমার সই করা ডিসপ্যাচ আটকাবে কে?”

রেডিও এবার আরেক গলায় সাড়া দিল, সম্ভবত নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে, “যে ইনিশিয়েটর লাইভ চেক খুলেছেন, তার সই-করা সব ছাড়পত্র হোল্ডে যাবে, স্যার। ইন্টারফিয়ারেন্স রেকর্ডেড। শাটার নামাবেন না, লেন বন্ধ রাখুন।”

বৃষ্টির আগের বাতাসে টিনের চাল কেঁপে উঠল। বেয়ের মুখে একে একে ট্রলি জমে গেল, বাঁশের খাঁচা ঠোকাঠুকি করে দাঁড়াল, আর বড় শাটারের চেইন আধাআধি নামানো অবস্থায় দুলতে লাগল। যে শ্রমিকেরা একটু আগে রুবাইয়ার দিকে তাকাতে কুণ্ঠা বোধ করছিল, তারা এখন কামরুল ভাইয়ের নির্দেশ শুনেও হাত সরাচ্ছে না। কারণ এখানে মুখের চেয়ে রেডিও লগ ভারী। আর লগে তার নাম এখন আটকে গেছে।

কামরুল ভাই এক পা এগিয়ে এসে রুবাইয়ার একেবারে সামনে দাঁড়াল। “তুমি আগে থেকেই জানতা?”

রুবাইয়া মাথা তুলল। তার শিফট-শেষের শক্ত হয়ে থাকা কাঁধ, ভেজা ওড়নার ধারে জমে থাকা ধুলো, আর চোখের তলায় ঘুমহীন কালচে ছাপ—সবকিছু মিলিয়ে তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, দুর্বল না। “আপনি তো নিজেই খুললেন,” সে বলল। “আমি শুধু থামিনি।”

হাবিব কাউন্টারের নিচ থেকে আরেকটা ফাইল তুলল। তাতে কামরুল ভাইয়ের সই করা সকালের ছাড়পত্র গুঁজে রাখা। খুলনা, মানিকগঞ্জ, সাভার—তিনটা গাড়ির কপি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ড্রাইভারদের মুখ বদলে গেল; তাদের ভাড়া প্রতি ঘন্টায় বাড়ে, দেরি মানে টাকা। এই প্রথম কামরুল ভাইয়ের চাপ শুধু রুবাইয়ার গায়ে নেই, তার নিজের সইয়ের গায়েও পড়ল।

কামরুল ভাই দ্রুত হাত বাড়াল, “ফাইলটা দাও।”

হাবিব ফাইল বুকে চেপে ধরল না, আবার দিলও না। সে নিয়মমতো মাঝখানে রেখে বলল, “উপর থেকে কল কনফার্ম না আসা পর্যন্ত কাউকে কিছু দেওয়ার নাই।”

কামরুল ভাই ফোন বের করল, কাকে যেন ধরার জন্য পরপর দুইবার চাপল। এবার স্ক্রিনের আলো আর নিচু না, হাত কাঁপায় সেটা মুখে পড়ছে। মুনা খালার কল আবার ঢুকতেই সে সরে গিয়ে নিচু গলায় বলতে চাইল, কিন্তু রেডিওর আরেকটা ভোঁ ভোঁ শব্দ তার কথা ঢেকে দিল। “কন্ট্রোল টু বে থ্রি—ইনিশিয়েটর ইন্টারফিয়ারেন্স কনফার্মড। কামরুল হাসানের রিলিজ ক্ষমতা সাময়িক স্থগিত। সংশ্লিষ্ট সব স্লিপ রিসিভিং কাউন্টারে জমা নিন।”

শওকত ট্রলির হাতল ছাড়ল না, কিন্তু তার ভঙ্গি পাল্টে গেল; একটু আগে যে লোক কামরুল ভাইয়ের হুকুমেই গেট খুলত, সে এখন দাঁড়িয়ে আছে হাবিবের চোখের ইশারার অপেক্ষায়। এটুকুই যথেষ্ট। ক্ষমতা কাগজে নামলে শরীরের ভঙ্গি বদলে যায় আগে।

কামরুল ভাই গর্জে উঠল, “এটা ভুল! ওর নামে ব্লক ছিল—আমি চেক চেয়েছি। এতে আমার অথরিটি কেন যাবে?”

কেউ তাকে উত্তর দিল না। কারণ উত্তর রেডিও দিয়েই হয়ে গেছে। বেয়ের ওপর দিয়ে তখন কাঁচা মরিচের ঝাঁঝ, ডিজেলের ধোঁয়া আর ভেজা কার্টনের গন্ধ একসঙ্গে উঠছে। কার্টনের কোণা ছিঁড়ে সাদা প্যাকেজিং কুঁচি মেঝেতে পড়ে আছে, ট্রলির চাকায় পিষে আরও ছড়িয়ে যাচ্ছে। আটকে থাকা লেনের ভিড়ে কামরুল ভাইয়ের গলা বড় হচ্ছে, অথচ তার আদেশের জায়গা ছোট।

হাবিব এবার গোলাপি স্লিপটা রুবাইয়ার দিকে এগিয়ে দিল না। নিয়মমতো মাঝখানে রাখল। “এটার কী হবে?”

এই জায়গাটাই কামরুল ভাই বোধহয় ভাবেনি। সে দ্রুত বলল, “অনানুষ্ঠানিকভাবে ছাড়ো। ব্লক আমি তুলছি। স্লিপ দাও।”

রুবাইয়া হাত বাড়িয়ে স্লিপটা নিল। কাগজে তার নামের পাশে কালো কালি দিয়ে ব্লক চিহ্ন, নিচে কামরুল ভাইয়ের তড়িঘড়ি সই, আর উপরে লাল রাবারস্ট্যাম্পের চাপা দাগ। সে একবারও কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়ল না; যেন বহুবার এমন স্লিপ হাতে নিয়েছে। তারপর খুব ধীরে, সবার চোখের সামনে, সে কাউন্টারের ওপর রাখা কামরুল ভাইয়ের ফাইলের দিকে স্লিপটা ঠেলে দিল—এমনভাবে যে গোলাপি কাগজ গিয়ে তার সই-করা ছাড়পত্রগুলোর ওপর চেপে বসল।

“না,” রুবাইয়া বলল, গলা ঠান্ডা, পরিষ্কার। “রেকর্ড খোলা আছে। অনানুষ্ঠানিক কিছু হবে না। আপনার সই যেখানে আটকে আছে, এইটাও সেখানেই থাকুক।”

কামরুল ভাই হাত বাড়িয়ে কাগজটা টেনে নিতে গেল, কিন্তু হাবিব তার আগেই ফাইলটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। স্লিপ, সই, স্ট্যাম্প—সব একসঙ্গে এখন কাউন্টারের হেফাজতে। কামরুল ভাইয়ের আঙুল খালি কাঠের ধার ঘষে থেমে গেল। তার পরের কথাটা বেরোতে গিয়ে আর আদেশের মতো শোনাল না। “রুবাইয়া, তুমি—”

সে বাকিটা শেষ করতে পারল না, কারণ রেডিওতে হাবিব নিজের লগ পড়তে শুরু করেছে: “সময় চারটা বেয়াল্লিশ। ইনিশিয়েটর হস্তক্ষেপ রেকর্ডের পর সাময়িক স্থগিতাদেশ কার্যকর। সংশ্লিষ্ট স্লিপ জমা।”

এই কয়েকটা শব্দেই কামরুল ভাইয়ের বেয়ের ওপর ধার করা দাপট ভেঙে গেল। তার পেছনে জমে থাকা ট্রলির সারি আর ড্রাইভারদের অস্থির মুখগুলো এখন তাকে পাশ কাটিয়ে নিয়মের দিকেই তাকিয়ে আছে। রুবাইয়া আর কিছু বলল না। বলার দরকারও ছিল না। সে নিজের খালি হাত দুটো ওড়নায় মুছে নিল, কাউন্টারের ধারে পড়ে থাকা ঠান্ডা চায়ের কাপটাকে কনুইয়ের হালকা ধাক্কায় সোজা করল, তারপর ঘুরে দাঁড়াল।

বেয়ের মুখ দিয়ে বেরোতে বেরোতে তার স্যান্ডেলের তলায় প্যাকেজিংয়ের সাদা কুঁচি কচমচ করে উঠল। বাইরে আবহাওয়ার কিনারায় হালকা বাতাস উঠেছে; একমুঠো কনফেটির মতো ছেঁড়া পলিথিনকুচি একসঙ্গে সরে গিয়ে এক্সিট গাটারের জলে পাক খেল, তারপর হঠাৎ উল্টো হাওয়ায় ফিরে বেয়ের ভেতর, কামরুল ভাইয়ের দিকেই উড়ে গেল।