Fast Fiction

লাইনটা আমার জন্যই ভাঙল

“এইদিকে না, ওদিকে দাঁড়ান—মেহমানদের প্রথম লাইন আলাদা,” গেটের স্বেচ্ছাসেবক লাল ফিতার পাশে হাত বাড়িয়ে মেহরিনকে সরে দিল, আর ঠিক সেই ফাঁক দিয়েই নাবিলা ভাবি নীল শাড়ির কুঁচি তুলে ভেতরের পথ ধরল। উঠানের প্রবেশরিংয়ে সবার চোখের সামনে ব্যাপারটা এমনভাবে হলো যেন মেহরিন ভুল করে ভুল দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

মেহরিনের হাতে ছোট খাবারের বাক্সটা ঠান্ডা হয়ে গেছে; অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা এসেছে বলে নিজের জন্য তোলা পরোটাও খাওয়া হয়নি। কব্জির ব্যাগে পুরোনো যাতায়াত কার্ডের ঘষা ধরা কিনারা আঙুলে লাগছিল। কাঁধে সারা দিনের কাজের শক্তভাব, শাড়ির নিচে পা ফুলে থাকা ক্লান্তি—এসবের চেয়ে বেশি কষ্ট দিল যে খালা, ফুফাতো আপা, এমনকি রাশেদের কৃষি ঋণ প্রকল্পের দু-একজন পরিচিত সহকর্মীও দেখল তাকে প্লাস্টিক চেয়ারের কোণে অপেক্ষার মানুষের মতো রেখে নাবিলাকে “আগে আগে” করে নেওয়া হচ্ছে।

নাবিলা ভাবি ঘাড় কাত করে মিষ্টি গলায় বলল, “ও তো বাইরের দিকের পরিচিত। আগে ঘরের লোক ঢুকুক, পরে ও আসবে।” তারপর গেটের ছেলেটাকে এমন ভঙ্গিতে বলল, যেন আয়োজনের কর্তৃত্ব তারই, “ফটোগ্রাফার দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদের পাশে এখন ভিড় করবেন না কেউ।”

মেহরিন এক সেকেন্ডও প্রতিবাদ করল না। সে খাবারের বাক্সটা চেয়ারের ওপর রাখল, নিজের শালটা কাঁধে ঠিক করে সোজা দাঁড়াল, তারপর গেটের ভেতর ঢোকার বদলে এক পা সরিয়ে লাল ফিতার একেবারে ধার ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়াল—যেখানে দাঁড়ালে সবাইকে পাশ কাটিয়ে যেতে হলে তাকিয়েই যেতে হয়। সে নিচু গলায় শুধু বলল, “আমি ভিড় করতে আসিনি। আমাকে যেখানে রাখছেন, সবাই যেন সেটা দেখেই রাখে।”

কথাটা খুব আস্তে বলা, কিন্তু শোনার মতো জায়গায় বলা। নাবিলা ভাবির চোখে তিরের মতো কিছু ঝলকে উঠল। আশেপাশের দুই খালা কথা থামিয়ে তাকালেন। প্রথম ফাটলটা সেখানেই পড়ল—কারণ অপমান চুপচাপ গিলে নেওয়ার বদলে মেহরিন সরে গিয়ে অদৃশ্য হয়নি; সে অপমানটাকে সবার চোখের সামনে স্থির করে দিল।

ঢাকার এই পুরনো কম্পাউন্ডবাড়ির উঠান বিয়ের আলোয় গরম হয়ে আছে। এক পাশে কাবাবের ধোঁয়া, এক পাশে ফুলের খিলান, মাঝখানে লাল ফিতা টেনে দুই দিক করা—একদিকে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোক, অন্যদিকে বাকিরা। রাশেদের পরিবার এই রেখাটা খুব যত্নে টেনেছে। কে কতটা আপন, কে কাকে কী নামে ডাকে, কে কার সঙ্গে ভেতরের সিঁড়ি বেয়ে উঠবে—এসবের হিসাব এখানে থালার মেনুর মতোই প্রকাশ্য।

নাবিলা ভাবি সেই হিসাবটাই চালাচ্ছিল। সে মেহরিনের দিকে না তাকিয়েই একের পর এক নির্দেশ দিতে লাগল, “চটি এখানে নয়, ওখানে। ছবির সামনে দাঁড়াবেন না। আর মেহরিন, তুমি চাইলে পরে উপরে গিয়ে ভাবিদের সঙ্গে বসতে পারো।” ‘তুমি’ শব্দে যে অবজ্ঞা, তা ‘মেহরিন আপা’ না বলার চেয়েও ধারালো। তার পাশে দাঁড়ানো দুই চাচি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নিলেন সম্পর্কের সীমারেখা কোথায় টানা হচ্ছে।

মেহরিন এবার বলল, “আমি কারও ভাবিদের সঙ্গে বসতে আসিনি।” তার গলা উঁচু হয়নি, কিন্তু কথাটা এমন সোজা বেরোল যে প্লেট হাতে এক কাজিন হাঁটার গতি কমিয়ে দিল। নাবিলা ভাবি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল, “তা হলে অপেক্ষা করো। রাশেদ খুব ব্যস্ত।”

ব্যস্ত—এই শব্দটা মেহরিনের বুকের ভেতর শুকনো কাঁটার মতো বসল। তিন মাস আগে পর্যন্ত রাশেদের সমস্ত ব্যস্ততার ভেতর সে ছিল। কৃষি ঋণ প্রকল্পের মাঠঘাটের কাগজ গুছিয়ে দেওয়া, জরুরি রাতে ফোন ধরা, হাসপাতালে রাশেদের মাকে নিয়ে যাওয়া—এসব সময়ে নাবিলা ভাবি ছিল না। এখন বিয়ের উঠানে, বড়দের চোখের সামনে, সে ‘বাইরের দিকের পরিচিত’।

উঠানের ভেতর থেকে একজন আয়োজক ছেলে দ্রুত বেরিয়ে এলো—সাদা পাঞ্জাবি, গলায় কার্ড ঝোলানো। “রাশেদ ভাই কোথায়?” জিজ্ঞেস করতেই নাবিলা ভাবি হাত তুলে বলল, “এই দিকে, এই দিকে। আগে আমাকে নিন, কনের খালারা অপেক্ষা করছে।” ছেলেটা তার দিকেই ঘুরেছিল; তারপর চোখ মেহরিনের ওপর পড়তেই থামল। যেন কারও নাম তার মাথায় মিলল। “আপনি মেহরিন আপা?”

প্রশ্নটার সঙ্গে সঙ্গে নাবিলা ভাবির চোয়াল শক্ত হলো। মেহরিন শুধু তাকাল। ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীর ঘুরিয়ে ফিতার খোলা অংশ ওর দিকে টেনে দিল। “রাশেদ ভাই বলেছেন, আপনি এলে আমাকে যেন সরাসরি ভেতরে নিয়ে যেতে বলি। এইদিকে আসেন।” সে এমনভাবে এক কদম সামনে এসে দাঁড়াল যে নাবিলা ভাবির পথে থাকা সুবিধাজনক ফাঁকটা বন্ধ হয়ে গেল, আর মেহরিনের জন্য নতুন পথ খুলে গেল।

এক মুহূর্তে উঠানের গতি টলে গেল। লাল ফিতার পাশে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবক নিজের হাত নামিয়ে নিল। নাবিলা ভাবি কৃত্রিম হাসি চেপে বলল, “ওহ, ওটা পরে হবে। আগে ঘরের লোক—”

“রাশেদ ভাই বলেছেন এখনই,” আয়োজক ছেলেটা এবার একটু জোরে বলল, যাতে আশেপাশে শোনা যায়। তার কণ্ঠে নিজেরও দায় আছে; ভুল মানুষকে আগে ধরলে পরে তাকে জবাব দিতে হবে। সে মেহরিনের দিকে হাত বাড়িয়ে পথ দেখাল, “আপা, সাবধানে, সিঁড়ির ধাপ ভেজা।”

প্রথমবার মেহরিনকে কেউ এই উঠানে আগে যাওয়ার লোকের মতো সামলে নিল—ফিতার ধারে দাঁড় করিয়ে রাখার মানুষ নয়, পথ খুলে দেওয়ার মানুষ। সে হাঁটল, কিন্তু নাবিলা ভাবি সেখানেই শেষ করল না।

ভেতরের দালানের সামনে পৌঁছাতেই নাবিলা ভাবি দ্রুত এগিয়ে এসে দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল। এখন আর শুধু গেট না, ঘরের মুখ। এখান থেকে কনের ঘরে যাওয়ার সিঁড়ি ওঠে। ওপরে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখগুলো ঝুঁকে নিচে তাকাচ্ছে। নাবিলা ভাবি হাসিমুখেই বলল, “একটু দাঁড়াও। খালারা বলেছেন, আগে আমি রাশেদের পাশে গিয়ে সালাম করে নেই। পরে সবাই যাবে। বাইরে থেকে এসে তো নিয়ম বোঝা যায় না।”

বাইরে থেকে। শব্দটা এবার ইচ্ছে করেই ছুঁড়ে দিল সে।

মেহরিন থামল। আয়োজক ছেলেটাও থামল, কিন্তু সরে গেল না। ঠিক তখনই দালানের ভেতর থেকে রাশেদ বেরিয়ে এল। গায়ে অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবি, মুখে বিয়ের দিনের চাপে টান, তবু চোখ সোজা এসে মেহরিনের গায়ে আটকাল। তার মা’য়ের এক দূর সম্পর্কের খালা পাশে ছিলেন; নাবিলা ভাবি তৎক্ষণাৎ তাঁর দিকে ঘুরে বলল, “দেখলেন তো? আগে ভেতরের মেয়েরা ঢুকবে। আমি নিচ্ছি।”

রাশেদ একবার খালার দিকে, একবার নাবিলা ভাবির দিকে তাকাল। সবার সামনেই এতদিন সে চুপ থেকেছে—যে চুপকে সবাই সম্মতি ভেবেছে। উঠানের বাতাসে মেহরিন অনুভব করল, আর একবার যদি তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে এই সম্পর্ককে পরে যেভাবেই বলা হোক, আজকের দৃশ্যটাই সত্যি হয়ে থাকবে।

নাবিলা ভাবি এগিয়ে এসে মেহরিনের কনুই ছোঁয়ার মতো করতেই মেহরিন এক ধাপ পেছায়নি। বরং সে স্পষ্ট গলায় বলল, “আমাকে বারবার সরাবেন না। যার ঘরে ঢোকা নিয়ে এত বিচার, সে নিজেই বলুক আমি কোথায় দাঁড়াব।”

শব্দগুলো উঠানে ছড়িয়ে পড়তেই রাশেদের মুখের টান পাল্টে গেল। এবার আর কারও আড়ালে না থেকে সে সোজা সামনে এল। নাবিলা ভাবি তাড়াতাড়ি বলল, “রাশেদ, আগে আমাকে নিয়ে চলো। সবাই দেখছে।”

“দেখুক,” রাশেদ বলল। তারপর গেটের ছেলেটা, আয়োজক, খালা, সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ানো আত্মীয়স্বজন—সবাইকে শোনানোর মতো স্পষ্ট স্বরে ডাকল, “মেহরিন, তুমি আমার সঙ্গে আগে ঢুকবে।”

নাবিলা ভাবির মুখের হাসিটা তখনও ঝুলে ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। রাশেদ থামেনি। সে সোজা বলল, “এই ঘরে আজ যাকে আমার পাশে প্রথমে দাঁড় করাব, সে মেহরিন। কারও অপেক্ষার জায়গায় ওকে আর রাখা হবে না।” তারপর পাশের স্বেচ্ছাসেবকের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল, “ফিতা খুলুন। ও আমার ডান পাশে থাকবে। এরপর বাকিরা।”

এবার আঘাতটা পুরো ঘরে পড়ল। যে লাল ফিতাটা এতক্ষণ শ্রেণি, ঘনিষ্ঠতা, অনুমতি—সবকিছুর রেখা ছিল, সেটাই সবার সামনে নতুন করে ধরা হলো। স্বেচ্ছাসেবক তাড়াহুড়োয় গিঁট টানতে গিয়ে ভুল করল; নাবিলা ভাবির সামনে থাকা অংশটা আটকে রইল, আর মেহরিনের দিকে থাকা অংশ আলগা হয়ে গেল। পথটা সোজা তার সামনে খুলে গেল, অন্য দিকটা ভাঁজ খেয়ে বন্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

নাবিলা ভাবি এবার কাঁপা গলায় বলল, “এভাবে? বড়দের সামনে? আমি তো শুধু—”

“আপনি লাইন ঠিক করছিলেন,” মেহরিন তাকে থামিয়ে দিল। আজ প্রথম তার গলা শীতল আর পরিষ্কার। “এবার আমি বলছি—আমাকে অপেক্ষায় রাখার লাইনটা এখানেই শেষ।” সে রাশেদের দিকে না তাকিয়েই কথাটা বলল, যাতে কথাটার মালিকানা তারই থাকে।

খালা অস্বস্তিতে গলার হার ছুঁয়ে দাঁড়ালেন। সিঁড়ির মাথায় থাকা দুই কাজিন দ্রুত সরে জায়গা করে দিল। রাশেদের কৃষি প্রকল্পের যে সহকর্মী একটু আগে তাকিয়ে ছিল, সে এবার চোখ নামিয়ে নিল—কারণ দৃশ্যটা বদলে গেছে, আর বদলটা কেউ ব্যাখ্যা করে দেয়নি; চোখের সামনে ঘটেছে।

রাশেদ তার ডান হাতটা একেবারে প্রকাশ্যে বাড়িয়ে রাখল, কিন্তু ধরবে কি না সে সিদ্ধান্ত মেহরিনের জন্য ছেড়ে দিল। মেহরিন এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হাত ধরল না; বরং তার কব্জির ওপর হালকা স্পর্শ রেখে সামনে পা বাড়াল। সেই ছোট্ট অস্বীকৃতিটুকুই ছিল শেষ গিঁট—সে রাশেদের সঙ্গে যাচ্ছে, কিন্তু তোলা হচ্ছে না; নিজের পায়ে উঠছে।

নাবিলা ভাবি তড়িঘড়ি পাশে ঢোকার জন্য এগোতেই স্বেচ্ছাসেবক, এবার একেবারে নিয়মমতো, হাত তুলে থামাল। “একটু অপেক্ষা করেন, আপা। আগে এদিকটা।” তার স্বর বিনীত, কিন্তু আর ধার করা নয়। কর্তৃত্বের জায়গা বদলে গেছে।

মেহরিন সিঁড়ির মুখের সেই অগ্রাধিকার বাঁকে পৌঁছে থামল মাত্র একবার। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বাক্সটা কেউ পেছন থেকে তুলে এনে তার হাতে দিতে চাইল; সে না নিয়ে বলল, “ওটা ওখানেই থাক।” তারপর নিজের শালটা কাঁধে টেনে ঠিক করে রাশেদের সমান্তরালে ভেতরের পথে ঢুকল। বাঁকের লাল ফিতেটা ইতিমধ্যে নতুন গিঁটে টান পড়েছে—নাবিলা ভাবির দিক থেকে বেঁকে সরে গিয়ে মেহরিনের পাশের পথটুকু একেবারে ফাঁকা রেখে।