Fast Fiction

হেসেছিল আগে, ডাকা হলো ওকেই

ফাইলের বান্ডিলটা মেহরিনের হাঁটুর ওপর আছড়ে ফেলে রুবাইয়ার ভাবি বলল, “এইগুলো সিরিয়াল ধরে বসাও, কিন্তু বেঞ্চের সামনে দাঁড়াইবা না—রোগীর লোকজন ভাববে তুমি এখানের স্টাফ।”

ঢাকার সেই বেসরকারি ক্লিনিকের নিচতলার করিডরে টিউবলাইটের ভনভন শব্দ, সিলিং ফ্যানের ঢিলা পাখার কাঁপুনি, আর ঘাম-ওষুধ-মলমের মিশ্র গন্ধে বাতাস ভারী। জানালার সামনে তিনটা লোহার বেঞ্চ। একটায় কুঁজো হয়ে বসে আছে এক বৃদ্ধা, আরেকটায় শিশু কোলে মা, তৃতীয়টায় আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা নিয়ে আসা লোকজন। সেই ভিড়ের মাঝখানে মেহরিনকে সবাই এমনভাবে দেখে যেন সে বেঞ্চের সঙ্গে জোড়া লাগানো কোনো বাড়তি কাঠের টুকরো—উঠে পানি দেবে, কাগজ গুছাবে, দরকার হলে দৌড়ে ফটোকপি আনবে, কিন্তু মুখ তুলে জানালায় কথা বলার অধিকার নেই।

মেহরিন কথা না বলে ফাইলগুলো দ্রুত সাজাতে লাগল। লাল, নীল, সবুজ কভারের ফাঁকে ফাঁকে প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষা-রশিদ, ভর্তি-ফর্ম। কোন রোগী আগে এসেছে, কার কৃষি ব্যাংকের স্বাস্থ্যঋণের কাগজ এখনই লাগবে, কার রিপোর্ট ভেতরে গেছে—সব তার মাথায়। তার গলায় ঝুলছে পুরোনো ল্যানইয়ার্ডে বাঁধা একটা ভাঁজ পড়া পরিচয়কার্ড; তিন মাস আগে অস্থায়ী কাজে ঢোকার সময় দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর নবায়ন হয়নি। তবু সকালের শিফট থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় সব দৌড় সে-ই দেয়। রুবাইয়ার ভাবির দেবর শাওনের কথাতেই এসেছিল—“একটু কাজ শিখে নাও, পরে সুযোগ হলে স্থায়ী করব।” এখন সেই সুযোগ কথার চেয়ে নিচু হয়ে গেছে।

জানালার ভেতর থেকে রেজিস্টার-খাতার ওপর হাত ছুঁড়ে এক কণ্ঠ চেঁচাল, “আরে, আজকের ভর্তি-তালিকা কই?” রুবাইয়ার ভাবি সঙ্গে সঙ্গে ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল, “মেহরিন, তাড়াতাড়ি দাও। দাঁড়ায়া আছ কেন?” মেহরিন খাতা এগিয়ে দিল। ভেতরের ক্লার্ক সেটা নিয়ে উল্টে দেখেই থেমে গেল। “এত গুলায় নাম আলাদা কালি দিয়ে কে ঠিক করল?” “আমি,” মেহরিন বলল, শান্ত গলায়। ক্লার্ক আবার তাকাল। “হুম। না হলে দুজন ডুপ্লিকেট ঢুকে যেত।” শব্দটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু বেঞ্চে বসা দু-তিনজন মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। রুবাইয়ার ভাবির ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। এটাই ছিল প্রথম ফাটল—ঘরে সবাই জানল, কাজে যার হাত, সে কেবল দৌড়ের মেয়ে না।

ফাটল ঢাকতে সে আরও জোরে খেল। সামনে থেকে এক রোগীর ছেলে উঠে এসে মেহরিনের দিকে কাগজ বাড়াতেই রুবাইয়ার ভাবি তার কবজি চেপে ধরল। “ওরে দিও না। ও শুধু বাইরে বসে। কাগজ আমার হাতে দাও।” তারপর মেহরিনের দিকে কড়া গলায়, যাতে বেঞ্চ, দারোয়ান, জানালার ভেতরের লোক—সবাই শুনতে পায়, “তুমি একটু পিছনে যাও। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলে সবাইকে সামনে আনতে হয় না। স্টুলটাও ছাড়ো, আমার খালাতো ননদের মেয়ে বসবে।”

স্টুলটা মেহরিনের পায়ের নিচ থেকে টেনে নেওয়া হলো। লোহার পায়ের ঘর্ষণে করিডরের মেঝে আঁচড় খেল। সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু নুয়ে না। কাঁধে সারাদিনের ক্লান্তির শক্ত ভাঁজ, হাতার কাছে ঘামের শুকনো দাগ, তবু মুখে কোনো মিনতি নেই। বৃদ্ধা রোগী চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন; শিশুকোলের মা ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে চাইল। অপমানটা এবার শুধু দুজন মানুষের মাঝে থাকল না—লাইন দেখে ফেলল।

মেহরিন ধীরে বলল, “স্টুল লাগলে নিন। ভর্তি-ফর্মের নীল কপি কিন্তু ভেতরে দেন নাই।” রুবাইয়ার ভাবি তাচ্ছিল্যভরা হেসে উঠল। “আমারে শিখাইবা? তুমি আগে বুঝো, কোথায় তোমার জায়গা।”

যেন কথা শেষ না হতেই বিপদ তৈরি হলো। করিডরের অন্য মাথা থেকে স্ট্রেচার ঠেলে দুজন ওয়ার্ডবয় দৌড়ে এল। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের এক গর্ভবতী নারী, মুখ কাগজের মতো সাদা, ঠোঁট নীলচে। সঙ্গে হাঁপাতে হাঁপাতে এক বৃদ্ধ লোক—“রক্ত পড়তেছে, আপা, আগে নেন, প্লিজ!” জানালার ভেতরের ক্লার্ক ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “জরুরি ভর্তি, নাম-ঠিকানা, রক্তের গ্রুপ, আগের রিপোর্ট—সব লাগবে। কে নিচ্ছে?”

রুবাইয়ার ভাবি স্ট্রেচারের মাথার দিকে গিয়ে দাঁড়াল বটে, কিন্তু বৃদ্ধ লোকটা কাঁপা হাতে যে ফাইল বাড়াল, সে সেটা উল্টো করে ধরে রইল। “এই কাগজে নাম একরকম, এইটায় আরেকরকম কেন?” বৃদ্ধ লোক হাঁপিয়ে বলল, “ডাকনাম-ভালো নাম, আপা...” “না, এভাবে হবে না। ঠিক করে আনেন।”

স্ট্রেচার থেমে গেল। ভেতরের ডাক্তার দরজা ফাঁক করে বলল, “ফরমালিটি দ্রুত করেন। কেস অপেক্ষা করবে না।” রুবাইয়ার ভাবি একবার জানালার দিকে, একবার বৃদ্ধ লোকের দিকে তাকিয়ে কেমন বিহ্বল। এই আটকে যাওয়া মুহূর্তে সবাই একইদিকে তাকাল—মেহরিনের দিকে। কারণ ফাইলটা তার হাত ছুঁয়ে গেছে মাত্র এক মিনিট আগে।

বেঞ্চের বৃদ্ধা প্রথমে বললেন, “এই মেয়েটাই তো একটু আগে রঙ দিয়া নাম মিলাইল। ওরে দিতে দেন।” সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ান, যে এতক্ষণ দরজার পাশে চাবির গোছা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল, এগিয়ে এসে বলল, “ভাইজান, সকালেও ডায়ালাইসিস রোগীর কাগজ এ-ই মেলাইছিল। ভুল ধরছিল।” ভেতরের ক্লার্ক জানালা থেকে গলা বাড়িয়ে, আর লুকোবার জায়গা না রেখে, যোগ করল, “হ্যাঁ, স্যার, আজকের তালিকা না হলে ও-ই ঠিক করছিল। কাগজটা ওকে দিন, সময় নষ্ট করবেন না।”

একটার পর একটা কথা। একই করিডরে, একই চাপের মধ্যে। পুরোনো পড়াটা ভেঙে গেল। রুবাইয়ার ভাবির মুখের রঙ বদলে গেল; চোখের কোণে টান উঠল। তবু সে হাত ছাড়ল না। উল্টো নিচু গলায় মেহরিনকে ডেকে কাছে আনতে চাইল, যেন হঠাৎ সব আগের নিয়মে ফিরিয়ে নিতে পারে। “এই, কাছে আয়। আমার পাশে দাঁড়ায়া যা বলি, তাই করবি। বেশি সামনে যাবি না।”

মেহরিন এগোল, কিন্তু তার পাশে নয়—সরাসরি স্ট্রেচারের কাছে। বৃদ্ধ লোকের হাত থেকে ফাইল নিল, দাঁড়িয়েই পাতাগুলো ছড়িয়ে দেখল। “এখানে নাম ‘সাবিহা আক্তার’, জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘সাবিহা খাতুন’। স্বামীর নাম একই। ফোন নম্বরও একই। আগের আলট্রাসনো রিপোর্টে বয়স আটাশ—এই ফর্মেও আটাশ। রক্তের গ্রুপ বি পজিটিভ, নিচে লেখা আছে।” সে বৃদ্ধ লোকের দিকে তাকাল, “আপনি বাবা?” “হ, মা।” “সই করতে পারবেন?” বৃদ্ধ লোক মাথা নাড়তেই মেহরিন জানালার ভেতর ফর্ম ঠেলে দিল। “জরুরি ভর্তি। নাম একীভূত করে নিন, প্রধান নাম ‘সাবিহা আক্তার খাতুন’ দিন।”

এই পর্যন্ত এসেই রুবাইয়ার ভাবি শেষ চেষ্টা করল। গলা শক্ত করে বলল, “তুমি কাগজ ধরতে পার, সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। জানালায় কাকে কীভাবে নিতে হবে, সেটা আমি বলব। বুঝছ?” তার কণ্ঠে সেই ধার ছিল, যা এতদিন অন্যদের সামনে মেহরিনকে নরম করে দিত। আজও সে সেই ধারেই কেটেছে ভেবেছিল।

কিন্তু ডাক্তার দরজার ভেতর থেকে এবার আর ধৈর্য ধরল না। “কে নিচ্ছেন? আমি রোগী নিয়ে ভেতরে যাচ্ছি। এখনই এন্ট্রি না হলে পরে ঝামেলা আপনারা সামলাবেন।” করিডর জমে গেল। বেঞ্চের লোকজন উঠে দাঁড়াতে পারছে না, বসেও থাকতে পারছে না। রুবাইয়ার ভাবির হাতে ফাইল নেই, জানালার ক্লার্ক অপেক্ষা করছে, স্ট্রেচার আটকে আছে, আর জরুরি সিদ্ধান্ত ছাড়া পরের কেউ এগোবে না। লাইন থমকে গেছে—কার কথা শুনে দরজা খুলবে, সেইটুকুই এখন মর্যাদা।

রুবাইয়ার ভাবি এবার কৌশল পাল্টাল। একটু নিচু স্বরে, প্রায় কানে কানে, “মেহরিন, এখন নাটক কইরো না। কাজটা করে দাও, পরে কথা বলব। যা বলি, আমার নামেই চালাও।” এই প্রথম তার গলায় অনুনয়ের কাঁটা শোনা গেল। এতদিনের ধার এক মুহূর্তে ভোঁতা হয়ে গেছে। শাওনও কখন যে সিঁড়ি থেকে নেমে করিডরের মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে, বোঝা গেল না। সে একবার ভাবির দিকে, একবার মেহরিনের দিকে তাকিয়ে থেমে আছে। পরিবারের মুখ রক্ষা, ক্লিনিকের নিয়ম, অপেক্ষমাণ লোকের চোখ—সব একসঙ্গে আটকে গেছে।

মেহরিন ফাইলটা বুকে চেপে না ধরে, খোলা রেখেই জানালার কাউন্টারে রাখল। তারপর হাত বাড়িয়ে রেজিস্টার-খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিল। এই একখানা টানায় দৃশ্য বদলে গেল। রুবাইয়ার ভাবির আঙুল খাতার কিনারা ছুঁয়েও ধরতে পারল না। ভাঁজ পড়া ল্যানইয়ার্ডটা মেহরিনের গলায় একটু দুলে থেমে গেল।

সে স্পষ্ট গলায় বলল, “সবাই শুনেন—এই জরুরি ভর্তি আমি নিচ্ছি। রুবাইয়ার ভাবি বাইরে বসা লোকজন সামলাবেন। জানালার এই পাশের নাম, ক্রম আর কাগজের মিল আমি বলব।” কেউ তাকে থামানোর আগেই সে ভেতরের ক্লার্ককে বলল, “সাবিহা আক্তার খাতুন, বয়স আটাশ, স্বামী রাশেদ মিয়া, ঠিকানা কেরানীগঞ্জ। জরুরি। আগে এন্ট্রি।” তারপর বৃদ্ধ লোকের দিকে, “এখানে সই দেন।” দারোয়ানকে, “ভেতরের করিডর ফাঁকা করেন।” শিশুকোলের মাকে, “আপনি একটু ডান দিকে যান, স্ট্রেচার উঠবে।” সব আদেশ ছোট, ঠান্ডা, একদম কাজের।

রুবাইয়ার ভাবি চেঁচিয়ে উঠতে গেল, “তুমি কে—” মেহরিন তার কথা কেটে দিল। “আমি যে কাগজ মেলাই, ভুল ধরি, ভর্তি নাম তুলি—আজ থেকে সেটা লুকিয়ে না। এই জানালার বাইরে ভর্তি-ডেস্কের দায়িত্বে মেহরিন। যদি কারও আপত্তি থাকে, এখনই ডাক্তারকে বলেন রোগী থামিয়ে রাখতে।” শেষ বাক্যটা সে কারও দিকে আলাদা করে নয়, পুরো করিডরকে শুনিয়ে বলল। এই এক লাইনেই পক্ষ বেছে নিতে হলো সবাইকে। রোগী আটকে রাখার দায় নেবে কে?

ডাক্তার দরজা ঠেলে বলল, “এন্ট্রি হয়েছে? ভেতরে আনুন।” ভেতরের ক্লার্ক তাড়াহুড়ো করে নাম লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করল, “ডেস্কের নামে কার সাইন যাবে?” রুবাইয়ার ভাবির মুখ থেকে তখন আর শব্দ বেরোচ্ছে না। শাওন এক পা এগিয়েও থেমে গেল। মেহরিন রেজিস্টারের নিচের সাদা ঘরে নিজের নাম লিখল—মেহরিন সুলতানা। অক্ষরগুলো কাঁপল না। তারপর পাশের দেয়ালে ঝোলানো ছোট নোটিশ-ওয়ালের দিকে গেল, যেখানে কাগজের টুকরো, ডিউটি-তালিকা, টিকার সময়, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকের নাম পিনে আটকানো থাকে। সেখান থেকে পুরোনো কাগজে লেখা “রুবাইয়া—বহিঃভর্তি সহায়তা” খুলে নিয়ে উল্টো পাশে ফেলে দিল। ড্রয়ার থেকে কালো মার্কার টেনে বের করে মোটা অক্ষরে লিখল—“মেহরিন সুলতানা—ভর্তি গ্রহণ”—এবং সেটা জানালার পাশের নোটিশ-ওয়ালে পিন করে আটকে দিল।

তারপর রুবাইয়ার ভাবির দিকে না তাকিয়েই বলল, “চাবিটা দিন। জানালার পাশের ফাইল-আলমারিরটা। দেরি কইরা ফেরত দিছেন অনেক।” চাবির গোছা থেকে ছোট পিতলের চাবিটা আলাদা করে সে নিজের তালুতে নিল, আলমারিতে লাগাল, খুলে নতুন ফর্ম বের করল। নোটিশ-ওয়ালের টিউবলাইটের সাদা ঝাপসা আলোয় পিনে ধরা কাগজটা স্থির হয়ে রইল— মেহরিন সুলতানা—ভর্তি গ্রহণ।