Fast Fiction

দামটা সেখানেই তার কাছ থেকে উঠল

ফর্কলিফটের দাঁত প্যালেটের নিচে ঢুকতেই রাশেদ ভাই হাঁক ছুঁড়ে দিল, “ওই তিনটা ক্রেটও মিতুর নামে দাও। ডিসপ্যাচে লিখে রাখো—দেরি হলে দায়ও ওর।”

লোডিং বেয়ের টিনের ছাদে ভোরের গরম তখনই জমে উঠছিল। ধুলো-মাখা প্যালেট, সারি ধরা স্পেয়ার পার্টস, পচা তেলের গন্ধ, আর গেটের পাশে ঝুলে থাকা বলার্ড চেইন—সবকিছু আগেই ভারী ছিল; রাশেদের ওই এক লাইনে যেন আরও নিচে নেমে গেল। মিতুর হাতে তখনও আগের চালানের সই-করা কাগজ, কনুইয়ে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বক্স ঠেকানো, ফোনের স্ক্রিনের আলো মুঠোর ভেতর নিচু করে ধরা। রাত থেকে সে হিসাব মিলিয়েছে, শাওনের ছুটি কভার করেছে, ড্রাইভার বদলের ঝামেলা সামলেছে। তবু রেজিস্টারের ওপর রাশেদ ভাই নিজের কলম ঠুকে বলল, “কামাল স্যার নাম দেখে বুঝবেন। কে কাজ ধরেছে, কে পারে।”

গেটকিপার নঈম রেজিস্টার টেনে নিল। “স্যার, এই তিনটা তো চট্টগ্রাম রুটের। মিতু আপার আজ খুলনা আর মানিকগঞ্জ—”

“আমি যা বলি, তাই লিখো।” রাশেদের গলায় এমন সওয়ালহীন মালিকানা, যেন কোম্পানিটা তার বাপের। “আর একটা কথা, কামাল স্যার আসলে কেউ মুখ খুলবা না। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলে বেশি বাড়লে ভালো হবে না।”

কথাটা শুনে লোডাররা মুখ নামালেও কান নামাল না। এই ব্যাকলেনে কে কার খালাতো, কার শ্বশুরবাড়ির পরিচিত, কার সঙ্গে ঈদের দাওয়াতে দেখা হয়—এসবও কার্টনের ওজনের মতোই গোনা হয়। মিতু একবার শুধু মাথা তুলল। রাশেদ ভাইয়ের বোনের বাড়িতে সে দুইবার গিয়েছে, রাশেদের খালাও তাকে চেনে; সেই চেনাজানাটাই লোকটা আজ অপমানের দড়ি বানিয়ে ব্যবহার করছে।

সে কিছু বলল না। কাগজটা নিল, চোখ বোলাল। চট্টগ্রাম রুটের তিন ক্রেটের গায়ে লাল স্টিকার: “রিটার্ন চেক—সিলেট শাখা হয়ে পুনঃবিতরণ।” নিচে ছোট হরফে পুরনো গেট-কোড কাটা, নতুন কোড হাতে লেখা। এই হাতে লেখা বদলটাই খোঁচা দিল। কারণ সিলেট হয়ে গেলে সেটা উত্তর লেনের ভোরের ট্রাকে যায়, দক্ষিণ বেয়ের নয়। ভুল নামে ডিসপ্যাচ পড়লে গেটে আটকে যাবে, আর যার নামে থাকবে, দেরির দায়ও তার ঘাড়ে।

প্রথম ফাঁকটা চোখে পড়তেই মিতু ঠান্ডা গলায় বলল, “নঈম ভাই, নতুন গেট-কোড কে লিখছে?”

নঈম ইতস্তত করল। “রাতের শেষে কাগজ আসে। আমি তো যা পাই...”

রাশেদ ভাই কেটে দিল, “তোমার কাজ প্রশ্ন করা না, মিতু। কাজ ধরো।”

সে আরেকবার স্টিকার ছুঁয়ে দেখল। হাতের কালি একেবারে শুকায়নি। মানে বদলটা এই ভোরেই হয়েছে। পুরনো পথ মুছে নতুন নাম চাপানো—এখানেই কামড় আছে। রেজিস্টারের পাতায় নিজের নামের পাশে ওই তিন ক্রেট বসে গেলে পরে গেটের সফট কপি, কাগজের কপি, সব জায়গায় দায় তার। কিন্তু রুট মিলবে না। সিস্টেম তখন কাউকে না কাউকে ফেরত ঠেলে দেবে।

মিতু খুব আস্তে খাবারের বক্সটা ভাঙা ওজন মাপার টেবিলে রাখল। “আচ্ছা,” বলল সে, “আমি ধরছি। কিন্তু লেবেল যেটা আছে, সেটা পড়েই ধরব।”

রাশেদ ভাই হাসল। “তুমি পড়ে কাজ করবা, আর আমরা বসে দেখব? বেশি চালাকি লাগবে না।”

ঠিক তখনই অফিস ভবনের ছোট লিফটটা নিচে নামল। ধাতব দরজার মলিন আয়নায় আঙুলের পুরনো দাগ, তাড়াহুড়ো করে মোছা রেখা। সেখান থেকে নেমে এল শাওন, চোখ ফোলা, চুল এলোমেলো। ছুটিতে থাকার কথা ছিল; কিন্তু রাশেদ ভাই ফোনে ডেকে এনেছে। শাওন নামতেই রাশেদ উচ্চস্বরে বলল, “এই যে, বদলি লোকও আনছি। পরে কেউ বলবে না একা ছিল।”

বদলি লোক। কথাটা লোকজনের সামনে খুব সচেতনভাবেই ছোড়া। যেন মিতু কাজ ধরে রাখতে না পারলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে সরিয়ে অন্যকে বসানো হবে। শাওন মিতুর দিকে তাকিয়ে বোঝাল, সে বুঝেছে ফাঁদ আছে, কিন্তু দাঁড়াবার সাহস নেই।

রাশেদ ভাই হাতে আরেকটা স্লিপ ধরাল শাওনের দিকে। “এই ক্ষতিগ্রস্ত সিড-ড্রিলের ক্রেটটা মিতুর চালানের সঙ্গে দেবে। বের হবার সময় বলবা, ও দেরি করেছে বলে এখন একসাথে ছাড়তে হচ্ছে।”

মিতুর পিঠের মাংসপেশি শক্ত হয়ে গেল। ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেট মানে ফেরত, জরিমানা, ব্যাখ্যা। আর সেটা তার ঠিকঠাক চালানের সঙ্গে বেঁধে দিলে দোষও একই প্যাকেটে যাবে। লোডিং বেয়ের হাওয়ায় গরম লোহা আর অন্যায়ের গন্ধ একসাথে উঠল।

সে সোজা শাওনের হাত থেকে স্লিপটা নিল। সেখানে কাস্টমার কোড কাটা, তার নিচে রাশেদের সই। কিন্তু ডেলিভারি সময়ের ঘরে ফাঁকা। ইচ্ছে করেই ফাঁকা। দেরি যার নামে বসানো হবে, সময়ও তার ঘাড়ে চাপানো যাবে।

মিতু এবার প্রথমবারের মতো জোরে বলল, “সময় না লিখে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য আমি ছাড়ব না।”

রাশেদ ভাই সামনে এগিয়ে এল। “তুমি ছাড়বা না? তুমি?”

“হ্যাঁ। লেবেল যেটা, সময় যেটা, সেটাই।”

পাশের লোডার জলিল কার্টের হাতল চেপে থেমে গেল। নঈম রেজিস্টার উল্টাতে উল্টাতে চোখ নামিয়ে রাখল, কিন্তু পাতাটা আর এগোল না। ছোট্ট একটা থামা হলো—কেউ কিছু ঘোষণা করল না, তবু পরিষ্কার বোঝা গেল, সিস্টেমে একটা দাঁত আছে।

রাশেদ ভাই সেটা টের পেয়েও হাসল। “ঠিক আছে। সময় লাগবে? আমি সময়ও লিখে দিচ্ছি। তারপর দেখা যাবে, কার নামে কী যায়।”

সে নিজের পকেট থেকে মোটা কলম বের করে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেটের স্লিপে সময় লিখল—“০৮:৪০”—আর নিচে আবার সই দিল। তারপর নঈমকে বলল, “সব একসাথে দক্ষিণ গেট। মিতুর রিলিজ।”

এটাই ছিল তার বাড়তি ধাক্কা। দক্ষিণ গেট মানে খুলনা-মানিকগঞ্জের লেন। সেখানে সিলেট-রিটার্ন আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি যন্ত্রাংশের ক্রেট ঢুকলে গেট মিলবে না, জট বাঁধবে, দায় নামের ঘরে পড়ে থাকবে। আর লোকজন দেখবে—মিতু আটকে গেছে।

বেয়ের ভেতর একসঙ্গে তিনটা জিনিস নড়ল। জলিল ফর্কলিফট তুলে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেটটাকে অন্য দুই ক্রেটের পাশে আনল। শাওন অনিচ্ছায় হ্যান্ড স্ক্যানার ধরল। নঈম দক্ষিণ গেটের টোকেন বই খুলল। সাজানো হাতবদল। ফাঁদটা পরে বানানো নয়, চোখের সামনে বাঁধা হচ্ছে।

মিতু এগিয়ে গিয়ে স্ক্যানারের স্ক্রিনে তাকাল। প্রথম ক্রেট—দক্ষিণ গেট অস্বীকৃত। দ্বিতীয়—“উত্তর লেন পুনঃনির্দেশ।” তৃতীয়—“পরীক্ষা সাপেক্ষে।” শাওনের বুড়ো আঙুল কাঁপল। সে ফিসফিস করে বলল, “আপা, এটা গেলে গেটে ফিরায়া দিবে।”

রাশেদ ভাই ততক্ষণে জোরে বলছে, যেন শুধু মিতুকে নয়, বেয়ের সব কানে ঢোকাতে চায়, “ফিরায়া দিলে মিতু সামলাবে। আজ ও-ই দায়িত্বে।”

মিতু স্ক্যানারের শব্দ শুনে এক পা সরে দাঁড়াল। “স্ক্রিনে যা উঠছে, সেটাই পড়ো শাওন।”

“চুপ,” রাশেদ কেটে দিল। “রিলিজ দাও।”

শাওন মুখ তুলে রাশেদের দিকে, তারপর মিতুর দিকে তাকাল। সেই দোলাটুকুই যথেষ্ট ছিল। সবাই দেখল—কোন নির্দেশ কাগজে, কোনটা মুখে। আর কোথায় মিলছে না।

ঠিক তখন কামাল স্যার বেয়ের দিকের কাঁচঘেরা অফিস থেকে বের হলেন। মিতুর বুক ধক করে উঠল; স্বস্তিতে নয়, বরং কারণ রাশেদ ভাই এখন আরও নাটক করবে। কামাল স্যার কোম্পানির অপারেশনস প্রধান, বয়সে বড়, চুপচাপ মানুষ। তার সঙ্গে রাশেদের শ্বশুরবাড়ির পরিচয় আছে বলে সবাই জানে। এই জানাশোনার আড়ালেই রাশেদ এতদূর যায়।

রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে গলা চড়াল, “স্যার, আমি তো সব সাজায়া দিলাম। এখন মিতু রিলিজ আটকে রাখছে। দেরি হলে ক্লায়েন্ট—”

মিতু ওর কথা শেষ করতে দিল না। সে শাওনের হাত থেকে স্ক্যানার নিয়ে স্ক্রিনটা কামাল স্যারের দিকে ফেরাল না; কারও সামনে প্রমাণ নেড়ে দেখাল না। শুধু নিজের সামনে পড়ে শোনাল, “এক নম্বর—উত্তর লেন পুনঃনির্দেশ। দুই নম্বর—দক্ষিণ গেট অস্বীকৃত। তিন নম্বর—পরীক্ষা সাপেক্ষে। আর এই ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেটের সময় লিখেছেন রাশেদ ভাই নিজে, ০৮:৪০।”

কামাল স্যার থামলেন। তার চোখ আগে কাগজে গেল, তারপর রাশেদের কলমধরা হাতে। নঈম বুক সোজা করল। জলিল ফর্কলিফট নামিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল, যেন ভুল বোঝাবুঝি নয়, অপেক্ষা চলছে।

রাশেদ ভাই এবার আরও জোরে খেলল। “স্যার, আমি বলছি সব দক্ষিণ গেটেই ছাড়েন। আজকে এভাবেই যাবে। আমি বলছি। আমার রুট কমিট করা আছে।”

কথাটা বলে সে নিজেই নিজের পা ফাঁসির ফাঁদে দিল। “আমার রুট কমিট করা আছে”—সামনের সবাই শুনল। অর্থাৎ সে মুখে শুধু চাপ দিচ্ছে না, নিজের নামে পথ বেঁধেও দিচ্ছে।

মিতু কাগজ তুলে নিল। এতে তিন জায়গায় সই—রাশেদের, নঈমের প্রাথমিক চিহ্ন, আর খালি থাকা রিলিজ অংশ। এটাই শেষ জায়গা। এখানে যে যা পড়ে লিখবে, গেট তাই মানবে। সে কাগজের ওপর আঙুল রাখল, যেন ওজন মাপছে।

রাশেদ হাঁক দিল, “লিখো—দক্ষিণ গেট। এখনই। সামনে দাঁড়ায়া আছ কেন?”

কামাল স্যার কিছু বললেন না। এই না-বলা কখনও কখনও বেয়ের সবচেয়ে ভারী শব্দ। কারণ এখন যার হাতে রিলিজ, সিদ্ধান্ত তার।

মিতু খুব স্থির গলায় বলল, “ডিসপ্যাচে যেটা সই করা আছে, আমি সেটাই পড়ে লিখব। লেবেল বদলায়া নাম চাপানো জিনিস দক্ষিণ গেটে ছাড়া যাবে না।”

রাশেদ এগিয়ে এল, যেন কাগজটা ছিনিয়ে নেবে। “তুমি আমার অর্ডার অমান্য করতেছ?”

মিতু কলম তুলল, খালি ঘরে লিখল: “উত্তর লেন পুনঃনির্দেশ—সংশোধিত ট্রাকে ছাড়পত্র।” তারপর রিলিজ অংশে নিজের সই দিল, আর ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেটের পাশে বড় করে লিখল, “পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত।”

শব্দটা খুব ছোট—কলমের খসখস। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পুরো বেয়ের ভারসাম্য বদলে গেল।

নঈম টোকেন বই বন্ধ করে উত্তর লেনের গেট-ট্যাগ টেনে নিল। “উত্তর লেন!” সে ডেকে উঠল, আর স্বরটা রাশেদের দিকে নয়, নিয়মের দিকে। জলিল ফর্কলিফট ঘুরিয়ে দিল; দাঁতের ওপর থাকা দুই রিটার্ন ক্রেট এবার দক্ষিণ গেটের মুখ ছেড়ে ডানে কাটল। ক্ষতিগ্রস্ত সিড-ড্রিলের ক্রেট আলাদা হয়ে বেয়ের হলুদ রেখার ভেতর নামিয়ে রাখা হলো। শাওন এক পা পিছিয়ে গিয়ে নতুন ট্রাকের নম্বর পড়তে লাগল।

রাশেদ ভাই যেন বুঝতেই পারল না, এত দ্রুত মাটি সরে যেতে পারে। “থামাও!” সে চেঁচাল। “আমি বলছি থামাও! এই ট্রাক যাবে না!”

কেউ থামাল না। কারণ এখন থামাতে হলে লিখিত রিলিজ কাটতে হবে, আর সেটা তার নিজের সই-করা কাগজের বিরুদ্ধে যাবে। কামাল স্যার তখন ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেটটার কোণার ভাঙা সিল দেখে বললেন, “এটা পরীক্ষা ছাড়া বের হবে না।” এক লাইনের বেশি নয়, কিন্তু যথেষ্ট। বেয়ের পুরোনো কেন্দ্র সরে গেল।

রাশেদ এবার মরিয়া হয়ে শেষ চাপে গেল। “নঈম, দক্ষিণ গেট খোলো। আমার ট্রাক আগে ছাড়ো। আমি বলছি!”

নঈম তার দিকে তাকিয়ে রইল না-তাকানোর মতো করে। “দক্ষিণ গেটের রিলিজ তো নাই, স্যার।”

এই ‘স্যার’ শব্দটায় আগের মতো নতি ছিল না; ছিল দূরত্ব। রাশেদ সামনে দৌড়ে দক্ষিণ গেটের দিকে গেল, যেন গিয়ে নিজেই ট্রাক চালিয়ে বের করবে। কিন্তু ততক্ষণে ভুল পথে দাঁড় করানো তার ট্রাকের সামনে বেয়ের ভেতর থেকে অন্য চালান ঢুকে পড়েছে। উত্তর লেনের জন্য ঘোরানো ক্রেট নিয়ে ফর্কলিফট কাট মেরে বেরোচ্ছে, পথ সরু হয়ে গেছে। লোডাররা আর তার চিৎকারের দিক নয়, রিলিজ কাগজের দিক দেখে নড়ছে।

মিতু এবার একেবারে শেষ কাজটা করল। গেটের পাশে ঝুলে থাকা বলার্ড চেইন সে খুলে হাতে নিল, দক্ষিণ ড্রপঅফ টার্নের দুই খুঁটির মাঝে টেনে আনল। নঈম ইতিমধ্যে ভুল রুটের ট্রাকটাকে ব্যাক করতে বলেছে; কিন্তু সামনের ঘোরে জায়গা নেই। মিতু কোনো দিকে না তাকিয়ে চেইনটা হুকে বসিয়ে টান দিল।

ডিসপ্যাচ উত্তর লেনের দিকে ঘুরে গেল, আর দক্ষিণ ড্রপঅফ টার্নে বলার্ড চেইনটা হঠাৎ সোজা হয়ে রাশেদের পথের সামনে টন করে আটকে গেল।