Fast Fiction

নামটা ওপরে উঠতেই মুখ পুড়ল

“না, এই লাইন না। ওদিকে দাঁড়াও,” সাবিহা খালা হাত বাড়িয়ে নওশীনের কনুই চেপে ধরলেন, যেন তিনি অতিথি নন, ভুল করে ভেতরে ঢুকে পড়া কেউ। সিঁড়ির প্রথম ল্যান্ডিংয়ে লাল দড়ি টানা, একপাশে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ, অন্যপাশে ক্লিনিকের কর্মীরা। নওশীনের হাতে কাগজে মোড়া খামটা শুকনো শব্দ করল। কাঁধের ব্যাগে পুরনো বাস-কার্ডের ক্ষয়ে যাওয়া ধার খোঁচা দিচ্ছিল। নিচে ফার্মেসির কাচে আলো পড়ে ঝলক মারছে, ওপরে দোয়া শুরুর মাইকে কোরআন তিলাওয়াত ভাসছে।

নওশীন কনুই ছাড়িয়ে নিল। খুব আস্তে। “আমাকে কে কোথায় দাঁড়াতে হবে, সেটা অন্তত জোরে বলুন খালা। সবাই শুনুক।”

কথাটা বলতেই চারপাশে চোখ উঠল। কাজিনদের বউরা থামল, ফুলের ট্রে হাতে এক আয়া সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে গেল। এ ক্লিনিকের জন্য নওশীন দুই বছর ছুটেছে—ব্যাংক, কাগজ, লাইসেন্স, যন্ত্রপাতির তালিকা—আর আজ উদ্বোধনের দোয়ায় তাকে রাখা হয়েছে পিছনের অপেক্ষার লাইনে। রিফাত নিচের ধাপে দাঁড়িয়ে মোবাইল চেপে আছে, মুখে সেই পুরনো শান্ত ভাব, যেটা দিয়ে সে সব ঝামেলা পরে মিটিয়ে দিতে চায়।

সাবিহা খালা মুখ নামিয়ে মিঠে গলায় বললেন, “সবাই সব জানে না মা। নিয়ম আছে। আগে ঘরের মেয়েরা, তারপর বাইরের লোকজন। তুমি ওখানে থাকো।”

“বাইরের?” নওশীন জিজ্ঞেস করল।

খালা এবার আরও উঁচু গলায় বললেন, “রিফাতের সঙ্গে তোমার যা-ই থাক, এখনো তো কিছু হয়নি। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে মানে এই না যে সামনে উঠে যাবে। অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলা আছে।”

তার পরেই অপমানটা আরও খোলাখুলি হল। সোহাগের কলেজপড়ুয়া মেয়ে, যে জীবনে এই ক্লিনিকের ফাইল ছুঁয়েও দেখেনি, তাকে দড়ি সরিয়ে ওপরে পাঠানো হল। তারপর এক দূরসম্পর্কের ভাশুরের স্ত্রী। তারপর সাবিহা খালার পার্লারের পরিচিত এক মহিলা, শুধু “বিশেষ অতিথি” বলে। নওশীনকে বলা হল, “একটু সাইডে যান, পথ আটকে রাখবেন না।” সিঁড়ির বাঁকে সে সরে দাঁড়াতেই দুজন কর্মী ট্রে নিয়ে তার গা ঘেঁষে উঠে গেল। ওপরে যাওয়ার রাস্তা যেন চোখের সামনে দিয়েই বন্ধ করা হচ্ছে।

রিফাত তখন এগিয়ে এল। “নওশীন, প্লিজ, এখন না। অনুষ্ঠানটা শেষ হোক। খালার মাথায় অনেক চাপ।”

নওশীন তার দিকে তাকাল না। “চাপ কার মাথায়, সেটা আমি জানি। প্রশ্ন হচ্ছে, কার শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে উনি নিয়ম পড়ছেন।”

রিফাত নিচু স্বরে বলল, “তুমি এটা বড় করো না। মামা হান্নান অসুস্থ, আজকের দিনটা—”

“হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে তোমার মামা হান্নান আমার হাত ধরে কী বলেছিলেন, মনে আছে?” এবার নওশীন তাকাল। “বলেছিলেন, ‘এই জমিটা আমি কিনেছি, ক্লিনিকটা তুই দাঁড় করাস, রিফাত পরে বুঝবে।’ সেই রাতেও তুমি বলেছিলে, ‘এখন না।’”

রিফাতের মুখ একটু শক্ত হল। সে চারদিকে তাকাল—কারা শুনছে, কারা না। এই তাকানোটা নওশীনের চেনা। কথা নয়, মুখ বাঁচানো।

দোয়া শেষে মূল অতিথিদের ওপরে উঠতে হবে। ল্যান্ডিংয়ে ভিড় জমে ঘন হয়ে গেল। ধাতব রেলিংয়ে হাতের ঘাম, লিফটের আয়নায় পুরনো মোছার দাগ, কারও পারফিউম, কারও গরম শরীর, কারও ফিসফাস। ঠিক তখনই ক্লিনিকের সমন্বয়ক জয়া নিচ থেকে উঠে এল, হাতে নামছাপা কার্ডের বাক্স। “সাবিহা আপা, সামনে বসার কার্ডগুলো—”

সাবিহা খালা ঝট করে বাক্স নিলেন। “আমি দিচ্ছি। ডা. রেহানার পাশে রিফাত, তারপর আমি, তারপর—”

“তারপর?” নওশীন বলল।

খালা এবার তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে কার্ড সাজাতে লাগলেন। “নওশীন, তুমি নিচে রেজিস্ট্রেশন টেবিলে বসো। মেয়েমানুষের হাতে লিখতে সুন্দর হয়। অতিথিদের নাম লিখে নাও।”

এটাই ছিল দ্বিতীয় ধাক্কা—শুধু পিছনে রাখা নয়, তাকে কাজের মেয়ে বানিয়ে নাম লেখানোর টেবিলে নামিয়ে দেওয়া। জয়ার চোখ কেঁপে উঠল; সে জানে রেজিস্ট্রেশন টেবিল দুপুরেই গুটিয়ে গেছে। তবু কিছু বলল না। কারণ সাবিহা খালার গলায় আজ মালিকানার জোর।

নওশীন খামের ভাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে একটা চাবির রিং বের করল। তিনটা চাবি, একটা কালো ট্যাগ, তাতে লেখা— “৩য় তলা, প্রশাসনিক কক্ষ।” সে জয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। “এটা নিন।”

জয়া হতচকিত। “এটা তো—”

“হ্যাঁ,” নওশীন বলল, এবার গলাটা এত পরিষ্কার যে ওপরে দাঁড়ানো দুজন ডাক্তারও মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন, “প্রশাসনিক কক্ষের মূল চাবি। রিফাতকে দিইনি। সাবিহা খালাকেও না। কারণ যেদিন হান্নান মামা আইসিইউর বাইরে বসে কাগজে সই করছিলেন, সেদিন তিনি বলেছিলেন—উদ্বোধনের দিন পর্যন্ত সব হিসাব আমার হাতে থাকবে।”

সাবিহা খালা হেসে উঠলেন, কিন্তু হাসিতে কাঁপুনি ছিল। “এইসব নাটক এখন? কার সামনে? কাগজপত্র মানে কি ক্লিনিকের মালিক হয়ে গেছ?”

“না,” নওশীন বলল, “মালিকানা কাগজে থাকে। আজকের শৃঙ্খলা থাকে কার হাতে দরজা, কার হাতে তালিকা, আর কার নামে আসন ছাপা হয় তাতে।”

জয়া এবার বাক্স খুলে কার্ড খুঁজছিল। হাত কাঁপছে। নওশীন সরাসরি বলল, “জয়া, সামনের সারির কার্ডে ‘নওশীন আক্তার, প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি-নিযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক’ কোথায়?”

ল্যান্ডিংয়ে যেন সবার দাঁড়াবার ভঙ্গি বদলে গেল। “প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি” শব্দ দুটো গিয়ে ধাক্কা খেল ধাতব রেলিং, কাঁচের দরজা, ফিসফাসের ভিড়ের সঙ্গে। রিফাত তাড়াতাড়ি বলল, “এটা ভাষার ভুল। ট্রাস্টি বোর্ড এখনো পূর্ণ হয়নি—”

“পূর্ণ হয়নি,” নওশীন মাথা নাড়ল, “কিন্তু নিযুক্তি হয়েছে।”

সে খাম থেকে আরেকটা কাগজ বের করল। কাগজটা নরম নয়, শক্ত সরকারি স্ট্যাম্পপেপার, বারবার ভাঁজ খোলা-বন্ধে কিনারা সাদা হয়ে গেছে। কাগজ খোলার শুকনো শব্দে এক মুহূর্তে আশপাশের সব ছোটখাটো আওয়াজ আলাদা হয়ে গেল—উপরে মাইকের গুনগুন, নিচে প্রেসার মেশিনের বিপ, কারও চুড়ির ঠোকাঠুকি। নওশীন কাগজটা জয়ার হাতে দিল। “জোরে পড়ুন। শেষ লাইটা।”

জয়া থেমে থেমে পড়ল, “কৃষি জমি বিক্রয়লব্ধ অর্থে স্থাপিত ‘হান্নান কেয়ার ক্লিনিক’-এর উদ্বোধন-পূর্ব আর্থিক তত্ত্বাবধান ও অনুষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের দায়িত্ব... নওশীন আক্তারকে অর্পণ করা হলো... হান্নান উদ্দিন।”

“কৃষি জমি” কথাটায় দুই গ্রাম থেকে আসা চাচাদের মুখ টনকে উঠল। তারা জানে সেই জমি কীভাবে বিক্রি হয়েছিল। সবাই জানে হান্নান মামার ছেলেরা টাকা দিতে দেরি করেছিল। সবাই এটাও জানে, তখন ঢাকা শহরে দালাল, ঠিকাদার, ব্যাংকের ফাইলের পেছনে ছোটাছুটি করেছে একমাত্র নওশীন।

সাবিহা খালা এবার সত্যিই এগিয়ে এলেন। “জয়া, ওই কাগজ আমাকে দাও। পুরনো খসড়া নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে নাটক হবে না। আর নওশীন, তুমি সীমা ছাড়াচ্ছ।”

নওশীন সরল না। সিঁড়ির সেই সরু বাঁকে দুজন মানুষ মুখোমুখি। একপাশে যারা উপরে উঠতে চায়, অন্যপাশে যারা নিচে নামতে পারছে না। থমকে থাকা চলাচলেই হঠাৎ বোঝা গেল কারা কাকে থামিয়ে রেখেছে। নওশীন শান্ত গলায় বলল, “সীমা আজ আপনি টেনেছেন, খালা। আমি শুধু দড়িটা যেখানে থাকা উচিত, সেখানে ফিরিয়ে দেব।”

উপরে ভিআইপি তলায় ওঠার মুখে যে লাল দড়ি টানা, তার মাথাটা পিতলের খুঁটির সঙ্গে আটকানো। জয়া কার্ডের বাক্স বুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে। রিফাত এবার তাড়াতাড়ি উঠে এসে বলল, “দেখো, আমি সামনে তোমার নাম রাখছি। এইটুকু তো—”

“তুমি রাখবে?” নওশীন তাকাল। “যেটা আমার হাতে ন্যস্ত, সেটা তুমি দয়া করে দেবে?”

রিফাত থেমে গেল। ওই থামাটাই ছিল তার প্রথম হার। নিচে দাঁড়ানো এক নার্স, হাতে ওষুধের ট্রে, ফাঁক পেতে সরে গেল। জয়া খুব ধীরে কার্ডের বাক্সটা নওশীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। এটা ছিল দ্বিতীয় সরে দাঁড়ানো।

সাবিহা খালা তবু হাল ছাড়লেন না। তিনি দ্রুত নিজের নামের কার্ডটা তুলে সামনে ধরলেন। “আমি বড় বোন। অতিথি বরণ আমি করব। আমার পর রিফাত। এটাই থাকবে।”

নওশীন কার্ডটা তার হাত থেকে কেড়ে নিল না। শুধু বাক্স থেকে নিজের কার্ডটা বের করে সামনে থাকা খালি স্ট্যান্ডে গুঁজে দিল। সাদা কার্ডে কালো অক্ষর। পরিষ্কার। পড়ার মতো। তারপর সাবিহা খালার কার্ডটা নিয়ে এক ধাপ পেছনের স্ট্যান্ডে রেখে দিল। তার পর রিফাতেরটা আরও পেছনে। তিনটে কার্ডের দূরত্ব খুব কম, অথচ এই কম দূরত্বেই পুরো সম্পর্কের মানচিত্র বদলে গেল।

“জয়া,” নওশীন বলল, “লাইন খুলুন। প্রথমে ডা. রেহানা, তারপর আমি। তারপর দোয়া কমিটির বয়োজ্যেষ্ঠরা। এরপর পরিবার।”

সাবিহা খালা হাত বাড়িয়ে দড়ি ধরতে গেলেন। “কেউ দড়ি ছাড়বে না—”

নওশীন তখনই পিতলের মাথা থেকে লাল দড়ির ক্লিপ খুলে নিজের পাশে থাকা খুঁটিতে লাগিয়ে দিল। এক টানেই প্রবেশপথের মুখ বদলে গেল। যে সরু ফাঁক দিয়ে এতক্ষণ সবাই সাবিহা খালার কাঁধ ঘেঁষে উঠছিল, সেটি বন্ধ। নতুন খোলা পথ নওশীনের পাশে, সরাসরি সিঁড়ির মাথার সামনের আসনের দিকে। দড়ি বদলানোর ছোট্ট শব্দটা আশ্চর্য রকম নির্মম শোনাল।

সামনের ডাক্তার রেহানা, যিনি এতক্ষণ কাকে অনুসরণ করবেন বুঝে দাঁড়িয়েছিলেন, এবার আর কারও মুখ দেখলেন না। তিনি নওশীনের খোলা পথেই পা বাড়ালেন। তাঁর পেছনে জুতা সরার শব্দ, ট্রের কাঁচের টুং, এক বৃদ্ধ চাচার কাশি চাপা পড়া। সাবিহা খালা দড়ির ভুল পাশে আটকে রইলেন; সামনে যাওয়ার জন্য এখন তাকে নওশীনের ডাকা ক্রম মানতে হবে। তার মুখের রঙ বদলে গেল, কিন্তু গলা আর আগের জোর পেল না।

রিফাত খুব নিচু স্বরে বলল, “নওশীন, এভাবে করো না।”

নওশীন তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “তুমি পরে ক্ষমা চাইতে পারো, ব্যাখ্যা দিতে পারো, সংসার বাঁচানোর কথা বলতে পারো। কিন্তু অগ্রাধিকার আমি এখন ঠিক করব। আজকের দিনটা আর কারও মুখ বাঁচানোর জন্য না।”

সে জয়ার হাত থেকে তালিকাটা নিল, একবার চোখ বুলিয়ে নামগুলো মিলিয়ে নিল, তারপর ঠান্ডা স্বরে পরের নির্দেশ দিল, “সাবিহা খালা, আপনি পরিবার অংশের শুরুতে থাকবেন। ‘সামনে’ না। ‘শুরুতে’। শব্দের পার্থক্য মনে রাখবেন।”

তারপর নওশীন নিজেই সিঁড়ির মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, এক হাতে তালিকা, অন্য হাতে লাল দড়ির মাথা। সামনের জায়গাটা খুলে দিয়ে সে প্রথম নাম ডাকল, “ডা. রেহানা। এখন।”

ডা. রেহানা পেরিয়ে যেতেই নওশীন নিজের কার্ডের পাশে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বার বলল, “নওশীন আক্তার।”

সে নিজের জন্য পথ রাখল, কারও দয়া নয়। পা তুলেই ল্যান্ডিংয়ের শেষ ধাপ পেরোল। তারপর পেছনের ভিড়ের দিকে না ঘুরে, খুঁটির গায়ে আটকানো ক্লিপ খুলে দড়িটা পুরোটা নতুন মুখে সরিয়ে দিল, যাতে লাইনের মাথা তার দিকেই স্থির হয়। লাল দড়িটা সিঁড়ির মাথায় দুলে উঠে একবার প্রশস্ত হয়ে গেল।