ঘরটা তার দিকেই ঘুরে গেল
“এইদিকে না, ওদিকে। গিফট টেবিলের পাশেই দাঁড়ান,” সামিয়া ভাবি হাত বাড়িয়ে মেহরিনের পথ আটকে দিলেন, যেন সে ভুল করে ভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকে পড়া কেউ। “ভিতরের উঠানে কনের ঘনিষ্ঠরা থাকবে। আপনি বরং বাক্সগুলো ধরেন।”
ঢাকার বনানীর কমিউনিটি সেন্টারের খোলা প্রবেশ-আঙিনায় তখন গাড়ির হর্ন, আতরের গন্ধ, ফুলের ঝাড় আর আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার গুঞ্জন একসঙ্গে পাক খাচ্ছে। মেহরিনের হাতে ছোট একটা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বক্স ছিল—দুপুরে হাসপাতালে ডিউটি থেকে বের হয়ে খাওয়ার সময় পায়নি। সাদা-ধূসর শাড়ির কাঁধে সারাদিনের ভাঁজ, পায়ের পাতায় শিফট-শেষের শক্ত হয়ে থাকা ব্যথা। সে এক পা ভেতরে দিয়েছিল, ঠিক তখনই সামিয়া ভাবি এমন স্বরে থামালেন, যেন সবাই শুনে রাখে—এই মেয়েটা ভেতরের কেউ নয়।
দুই খালা কানের দুল নাড়তে নাড়তে তাকালেন। গেটের পাশে দাঁড়ানো ছেলেরা ফুলের তোরণ বেঁধে হাত থামিয়ে তাকাল। মেহরিন থেমে গেল বটে, কিন্তু সরে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়াল না। সে ধীরে খাবারের বক্সটা পাশের রেলিংয়ে রাখল, তারপর যে কার্টনে রজনীগন্ধা এসেছে তার ওপর থেকে ভাঁজ করা অতিথি-তালিকার বোর্ড পড়ে যেতে দেখে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল। বোর্ডটা না ধরলে সোজা কাদায় পড়ত। সামিয়া ভাবির মুখে এক মুহূর্তের জন্য টান খেল—পুরনো আত্মবিশ্বাসে চিড়টা সেখানেই দেখা গেল।
“ধরেছেন তো? এখন ওটা ওখানে দিন,” সামিয়া ভাবি তৎক্ষণাৎ স্বর কষালেন, “আর এই উপহারের খামগুলো হিসাব টেবিলে নিয়ে যান। তন্ময়, দেখো তো, কেউ যেন এদিকে-ওদিকে না ঘোরে।”
তন্ময়, বরপক্ষের চাচাতো ভাই, মেহরিনের দিকে এমনভাবে হাসল যেন দয়া করছে। “ভাবি, উনি কি অফিসের কেউ?”
“অফিসও না, ঘরেরও না,” সামিয়া ভাবি নিচু গলায় বললেন, কিন্তু এত নিচু নয় যে শোনা যাবে না। “পরিচিত আছে, তাই ডাকা হয়েছে। সবাইকে না বুঝে যেখানে-সেখানে দাঁড়ালে তো চলবে না।”
মেহরিন বোর্ডটা তুলে সোজা দাঁড় করিয়ে দিল। সোনালি অক্ষরে লেখা নামগুলোর নিচে রাশেদ সাহেবের পরিবারের তালিকা। তারপর খামের ঝুড়িটা হাতে নিল। ওই মুহূর্তে সে যদি মুখ খোলত, শুনতে ইচ্ছুক লোক থাকত না; সবাই এমন ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকে যেখানে সাহস নয়, নিরাপদ দিকটাই বেছে নেয়। তাই সে কোনো প্রতিবাদ করল না। শুধু হিসাব টেবিলের দিকে যাওয়ার বদলে ঝুড়ি নিয়ে ঠিক গেটের ভেতরের রিংয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেখানে যারাই ঢুকছে, তাকে পাশ কাটিয়ে ঢুকতে হচ্ছে। এইটুকু অনড়তাই সামিয়া ভাবির পছন্দ হলো না।
“আপনাকে কি বলেছি?” সামিয়া ভাবি এবার এগিয়ে এসে ঝুড়ির ওপর হাত চাপা দিলেন। “কাজ দিলে কাজ করবেন। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে দেখানোর কিছু নেই। ভিতরের নামডাকওয়ালা লোকজন আসছে।”
“নামডাকওয়ালা?” পাশের এক ফুফাতো বোন হেসে ফেলল, আবার মুখ চাপল।
সামিয়া ভাবি সুযোগ পেলেন। “হ্যাঁ, সবাই তো আর এক না। কারো দাঁড়াবার জায়গা সামনে, কারো পেছনে। আর কারো কাজ হচ্ছে অতিথির জুতো-স্যান্ডেল ঠিক রাখা, কারো খাম দেখা। বুঝে চলতে হয়।”
একজন ছেলেকে ডেকে তিনি সত্যিই একটা নীল পলিথিনের ঝুড়ি আনালেন। “এইটা নিন। জুতোর টোকেনগুলো এই টেবিলে রাখবেন। ভেতরের সিঁড়ির সামনে যেন ভিড় না হয়।” তারপর গলা উঁচু করে যোগ করলেন, “যারা ঘরের নয়, তারা যদি অন্তত কাজে লাগে, সেটাও ভালো।”
হাওয়ায় লজ্জার তাপ উঠল। কাছের বয়স্কা এক খালা মেহরিনকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারো ফোনের স্ক্রিনের আলো হাতের তালুতে নীচু হয়ে জ্বলল—কারো কাছে খবর পাঠানো হচ্ছে। মেহরিন নীল ঝুড়িটা নিল, কিন্তু জুতোর টেবিলে না গিয়ে সেটাকে হিসাব টেবিলের পাশে রেখে দিল। তারপর সবার সামনে বলল, খুব জোরে নয়, এমন স্বরে যাতে শুনতে চাইলে এড়ানো না যায়, “কার নির্দেশে আমি জুতো দেখব, ভাবি?”
সামিয়া ভাবি থমকালেন। “কি?”
মেহরিন এবার সরাসরি তাকাল। “কার নির্দেশে? আপনি কি এই বাড়ির প্রবেশ-তালিকা দেখছেন, না নিজের মতো মানুষ সরাচ্ছেন? বলুন—এই দরজার ভেতরে কে দাঁড়াবে, সেটা ঠিক করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
এক সেকেন্ডের জন্য রিংটা নড়ে উঠল। যে খালা একটু আগে মুখ ফিরিয়েছিলেন, এবার তাকালেন। তন্ময়ের মুখের হাসিটা শুকিয়ে গেল। সামিয়া ভাবির ধারালো ভঙ্গির নিচে যে ধার করা জোর আছে, সেটা প্রথমবার খোলা বাতাসে এসে পড়ল।
“বাহ,” সামিয়া ভাবি ঠোঁট বাঁকালেন, “অধিকার নিয়ে কথা! তুমি কি জানো আজ কী অনুষ্ঠান? এখানে আমাদের মান-সম্মান আছে। সবাই দেখে। তুমি যদি সম্পর্কের সীমা না বোঝো, বুঝিয়ে দিতে হবে।”
“সীমা বোঝার জন্যই জিজ্ঞেস করছি,” মেহরিন উত্তর দিল। “আমি কোথায় দাঁড়াব, সেটা আপনি বলছেন। ভালো। এখন বলেন—আপনার নাম কি এই বোর্ডে আছে, যে আপনি অন্যের জায়গা কেটে দিচ্ছেন?”
গেস্ট তালিকার বোর্ডটা তাদের মাঝখানে দাঁড়ানো ছিল। সোনালি অক্ষর চকচক করছিল। সামিয়া ভাবি একবার বোর্ডের দিকে তাকিয়ে, একবার চারদিকে তাকালেন। কথাটা এমন ছিল না যা তিনি ধমক দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবেন। কারণ প্রশ্নটার উত্তর যার হাতে, সে তখনও আসেনি।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার ভোঁতা শব্দ হলো। প্রবেশ-আঙিনার আলো এক পাশে হেলে গেল। লোকজন নিজে থেকেই ফাঁক করল। রাশেদ সাহেব ঢুকলেন—উঁচু কাঁধ, ধবধবে পাঞ্জাবি, চোখে ক্লান্তি; সারাদিনের কৃষি-ব্যবসার ফোন সামলাতে সামলাতে এসে দাঁড়িয়েছেন, তবু তাকে দেখলে বোঝা যায় এই আয়োজনের কেন্দ্র কোথায়। পেছনে দুইজন কর্মচারী, আর সঙ্গে তন্ময়ের বাবা। রাশেদ সাহেবের চোখ প্রথমে তোরণ, তারপর হিসাব টেবিল, তারপর নীল জুতোর ঝুড়ি ছুঁয়ে গিয়ে এসে থামল মেহরিনের হাতে ধরা অতিথি-তালিকার বোর্ডে।
“এখানে এইটা কেন?” তাঁর কণ্ঠস্বর খুব উঁচু ছিল না, কিন্তু রিংয়ের সব কথা কেটে দিল।
সামিয়া ভাবি তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গেলেন। “আরে, কিছু না। লোকজন বেশি, একটু গুছাচ্ছিলাম। ওকে বাইরে কাজ দিয়েছি—”
“বাইরে কাজ?” রাশেদ সাহেব চোখ না সরিয়েই বললেন। “কাকে?”
সামিয়া ভাবি এই প্রথম নাম উচ্চারণে দ্বিধা করলেন। “মেহরিনকে। মানে, ও তো... পরিচিত। ভেতরে ভিড় হচ্ছিল—”
রাশেদ সাহেব এবার মেহরিনের দিকে সোজা তাকালেন। তার হাতে বোর্ড, পাশে নীল ঝুড়ি, রেলিংয়ে রাখা ঠান্ডা খাবারের বক্স, শাড়ির কাঁধে লম্বা দিনের চাপা কুঁচকানো ভাঁজ—পুরো দৃশ্য একসঙ্গে দেখে তাঁর চোয়াল শক্ত হলো। “কে তাকে জুতোর টেবিলে পাঠিয়েছে?”
কেউ উত্তর দিল না। সামিয়া ভাবি ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন, “আমি ভেবেছি, বাইরে দাঁড়ানো ভালো। সবাই তো চেনে না। অনুষ্ঠানে একটু সীমা—”
“সীমা?” রাশেদ সাহেব এক পা এগিয়ে এলেন। “সীমা ঠিক করবে কে, সামিয়া? তুমি?”
আঙিনার বাতাস এবার ভারী নয়, ধারালো হয়ে উঠল। সামিয়া ভাবি বলতে গিয়ে আটকে গেলেন, “আমি তো ঘরের মান—”
“ঘরের মান তুমি রক্ষা করো, ঠিক আছে,” রাশেদ সাহেব কেটে দিলেন। “কিন্তু ঘরের মানুষ কে, সেটা ঘোষণা করার অধিকার তুমি কবে পেলে?”
তন্ময় নিচু হয়ে নীল ঝুড়িটা সরে দিতে গেল, যেন বস্তু পাল্টালে দৃশ্যও পাল্টাবে। রাশেদ সাহেব তাকে থামালেন না; থামালেন সামিয়া ভাবিকে, যখন তিনি এগিয়ে এসে ফিসফিস স্বরে কিছু বলতে চাইলেন। “না, আস্তে না। সবার সামনেই বলো। তুমি তাকে কোথায় দাঁড় করাতে চেয়েছিলে?”
সামিয়া ভাবির গলায় প্রথমবার ভাঙন শোনা গেল। “গেটের পাশে। উপহারের খাম, জুতো... মানে, বাইরের কাজ।”
“আর ভেতরে?” রাশেদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
কেউ নড়ল না। ভেতরের লবির কাঁচে বাইরে দাঁড়ানো মানুষের প্রতিবিম্ব লেগে ছিল, আঙুলের পুরনো দাগ-ধরা ঝাপসা রেখা নিয়ে।
মেহরিন তখনও বোর্ডটা ধরে ছিল। তার হাত কাঁপছিল না। সে আরেক ধাপ এগিয়ে এসে স্পষ্ট স্বরে বলল, “আপনিই বলুন, রাশেদ সাহেব। এই দরজার ভেতরে আপনার পাশে, পরিবারের রেজিস্টারের কাছে দাঁড়ানোর অধিকার কার?”
প্রশ্নটা এবার সরাসরি পৌঁছে গেল মূল কেন্দ্রে। এড়িয়ে যাওয়ার রাস্তা রইল না। আঙিনার সব মুখ একসঙ্গে তাঁর দিকে ঘুরল—খালা, খালু, কাজের ছেলে, ফুলওয়ালা, সামিয়া ভাবি, তন্ময়। এই মুহূর্তে তিনি যা বলবেন, সেটাই তালিকা, সেটাই সম্পর্ক, সেটাই ভিতর-বাইরের রেখা।
রাশেদ সাহেব মেহরিনের হাত থেকে বোর্ডটা নিলেন না; বরং হিসাব টেবিলের ওপর রাখা মোটা রেজিস্টারখানা টেনে নিজের দিকে আনলেন। তারপর সবার সামনে সেটা খুলে ভেতরের পাতায় আঙুল রেখে বললেন, “এই রেজিস্টার আজ আমার পাশেই থাকবে। আর এটা মেহরিন সামলাবে।”
সামিয়া ভাবি যেন শুনেও বুঝতে পারলেন না। “কি বললেন?”
রাশেদ সাহেব এবার ফিরলেন না তাঁর দিকে; তিনি এমনভাবে বললেন, যেন ঘোষণাটা দেওয়ালের ফুল, লাইট, কাঁচ—সব কিছুর গায়ে লেগে থাকে। “শুনে রাখো। মেহরিন বাইরে দাঁড়ানোর কেউ না। এই বাড়ির অতিথি-তালিকায় ওকে আলাদা করে লেখারও দরকার হয় না। আজ থেকে যেখানে আমি দাঁড়াব, প্রবেশের লাইনে ও আমার পাশেই দাঁড়াবে। খাম, রেজিস্টার, ভেতরের অভ্যর্থনা—সব ও দেখবে। যে ক'জনের আপত্তি আছে, তারা এখনই আমাকে বলবে।”
দৃশ্যটা থেমে গেল, কিন্তু থেমে থেকেও নিষ্ঠুরভাবে এগোল। তন্ময়ের হাত থেকে নীল ঝুড়ি পড়ে ধাতব শব্দ করল। সামিয়া ভাবির মুখের রং সরে গেল। একটু আগে যে দুই খালা তাকে গেটের বাইরের মেয়ে ভেবেছিলেন, তারা এবার নিজেদের শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে এক পা সরলেন, যেন মেহরিনের পথ ফাঁকা করা ছাড়া ভদ্রতা বাঁচবে না। কর্মচারীদের একজন তাড়াতাড়ি হিসাব টেবিল পরিষ্কার করতে শুরু করল।
সামিয়া ভাবি শেষ চেষ্টা করলেন। “আপনি রাগ করে বলছেন। মানুষ কী ভাববে? আত্মীয়স্বজনের সামনে—”
“মানুষ কী ভাববে, সেটা এখন খুব স্পষ্ট,” রাশেদ সাহেব বললেন। “তুমি ভুল জায়গায় মান বাঁচাতে গিয়েছিলে।”
মেহরিন ধীরে নীল ঝুড়িটা তুলে সামিয়া ভাবির দিকে বাড়িয়ে দিল। “এটা আপনি রাখুন। বাইরে দাঁড়ানো কে, সেটা আজ সবাই দেখে নিল।” তারপর সে রেজিস্টারটা দুই হাতে তুলে নিয়ে হিসাব টেবিল থেকে সরিয়ে প্রবেশ-রেখার ভেতর, রাশেদ সাহেবের ডান পাশে রেখে দাঁড়াল। “খালা, খামগুলো এখানে দিন,” সে সামনের সারির এক বয়স্কা মহিলাকে বলল, “ভিতরের তালিকায় নাম দেখে নেব।”
একজন ফটোগ্রাফার ঠিক তখন লবির দিক থেকে দৌড়ে এসে ক্যামেরা তোলে, কারণ সে বুঝে গেছে কোথায় দাঁড়ালে ছবিটা আসল হবে। কাঁচের লবির দরজায় সামিয়া ভাবির অবয়ব বাইরে কেটে থাকে, আর মেহরিন রেজিস্টারের ওপর হাত রেখে বলে, “পরেরজন আসুন”—সেই মুহূর্তেই সাদা ফ্ল্যাশ কাঁচে লেগে পুরো দৃশ্যটাকে এক ঝলক দগ্ধ করে দেয়।