সবার সামনে গাড়ির ডাক দিল সে
সাব্বির ভাই মেহরীনের হাত থেকে সাদা নাম-কার্ডটা টেনে নিয়ে বলল, “এটা তোমার হাতে কেন? গাড়ির ডাক আমি দেব। তুমি গিফট ব্যাগগুলো ধরো।”
পার্কিং পিকআপ লেনের মাথায় তিনটা মাইক্রোবাস, একটা কালো এসইউভি, আর হেডলাইটে আধা-ধোয়া ধুলোর পরত। হলঘর থেকে পুরস্কার পেয়ে নামা কৃষি-উদ্যোক্তারা, স্পনসরদের লোকজন, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ—সবাই দাঁড়িয়ে। মেহরীনের আঙুলে তখনও কাগজের ধার কেটে যাওয়া জ্বালা। তার ব্যাগের চেইনের ফাঁকে বহুবার ভাঁজ-খোলা এক রসিদ উঁকি দিচ্ছে; বিকেলের নিজের ভাড়ার টাকা বাঁচাতে সে বাসে এসেছে, আর এই অনুষ্ঠানটা দাঁড় করাতে দুপুর থেকে দৌড়েছে একা। তবু সাব্বির ভাই এমনভাবে কার্ডটা তুলল, যেন ওটা তার কাছ থেকে ভুলে পড়ে থাকা কোনো জিনিস।
মেহরীন হাত বাড়িয়ে বলল, “কার্ডটা আমার কাছে ছিল কারণ ড্রপ-তালিকা আমি করেছি।”
“তালিকা করেছ তো কী হয়েছে?” সাব্বির ভাই এমন গলায় বলল, যেন তাকে না শুনলেও চলে। “তুমি স্টাফ। সামনে দাঁড়িয়ে নাম ডাকবে না। রিমা খালার সামনে একটু শিখে কথা বলো।”
খালার নামটা ইচ্ছে করেই জোরে বলা। একটু দূরে রিমা খালা দুজন আপার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন; শাড়ির কুচির ভেতর থেকে ফোন বের করতে করতে তাকালেন। সেই তাকানোতেই অপমানটা ধারালো হল—কাজে দরকার, মানে নেই। মেহরীন ঠান্ডা মুখে বলল, “গাড়ি ভুল হলে অতিথিরাই আগে দেখবে, খালা না।”
সাব্বির ভাই হেসে উঠল, “দেখছো? এই জন্যই ওকে সামনে আনা যায় না। বেশি জানলে মানুষ নিজের জায়গা ভুলে যায়।” তারপর ড্রাইভার জসিমকে হাত তুলে ইশারা করল, “এসইউভিতে আগে ফয়সাল ভাই আর খালাদের বসান। ও”—মেহরীনের দিকে থুতনির ইশারা—“পেছনের মাইক্রোবাসে যাবে, বাক্সপত্র দেখে।”
চারপাশের চোখগুলো দ্রুত হিসাব কষে নিল। কার সঙ্গে কে যাবে, কার নাম আগে, কার সিট সামনে—এই শহরে এসবেরও মানে আছে। ফয়সাল, যে এই প্রকল্পের মাঠ-সমন্বয়ক আর গত ছয় মাসে রাত জেগে মেহরীনের সঙ্গে কৃষি-মেলাগুলো সামলেছে, সে কপাল কুঁচকে এক পা এগোল। সাব্বির ভাই তার আগেই বলল, “ফয়সাল, তুমি এসইউভিতে। ওখানেই তোমার জায়গা।”
মেহরীনের গলায় রাগ ওঠেনি; সেটাই আরও বিপজ্জনক দেখাল। “জসিম ভাই,” সে ড্রাইভারের দিকে তাকাল, “আপনার কাছে রুট-কপি আছে?”
সাব্বির ভাই কার্ডটা নিজের বুকে ঠেকিয়ে হেসে বলল, “ড্রাইভারকে জেরা করার দরকার নাই। গাড়ির চাবি কি তোমার কাছে? নাকি পেট্রলও তুমি ভরো?”
প্রথম ফাটলটা তখনই পড়ল। জসিম সাব্বির ভাইয়ের দিকে না তাকিয়ে বলল, “রুট-কপি ম্যাডামের কাছেই ছিল। আমাগোকে উনিই দেয় সবসময়।” কথাটা ছোট, কিন্তু হেডলাইটের আলোয় দাঁড়ানো তিনজন অতিথি মুখ ঘুরিয়ে মেহরীনের দিকে তাকাল। সাব্বির ভাই সঙ্গে সঙ্গে কাশি চেপে গলা কড়া করল, “আজ আমি আছি। সবাই নিজের কাজ করবে।”
মেহরীন আর তর্ক করল না। সে ব্যাগ থেকে নিজের পুরোনো প্রবেশ-কার্ডটা বের করল; ধারে ধারে ঘষে মসৃণ হয়ে যাওয়া প্লাস্টিক। বুড়ো আঙুল দিয়ে একবার চেপে ধরে সে ঘুরে হলের কাচের দরজার দিকে তাকাল। উপরের লিফট-লবির ধাতব আয়নায় পুরোনো হাতের দাগ, মোছার রেখা। ওখানেই একটু আগে অনুষ্ঠান শেষ হতেই স্পনসর বোর্ডের লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “গাড়ি কোথায় দাঁড় করানো?” কারণ সবাই জানত, এই বেরোনোর অগোছালো শেষটুকু সে-ই সামলায়। এখন সেই জানাটাকে সাব্বির ভাই মুখের ওপর মুছে দিতে চাইছে।
সে গলা উঁচু না করেই ডাকল, “যাদের গাজীপুর রুট, হাত তুলবেন?”
এক সেকেন্ড। তারপর লেনের ডানদিক থেকে দুজন উদ্যোক্তা বললেন, “আমরা।” আরেকজন বললেন, “আমার সঙ্গে আমার মা আছেন।” একজন বৃদ্ধ চাচা লাঠি ঠুকলেন, “আমাদেরও ওইদিক।”
সাব্বির ভাই চেঁচিয়ে উঠল, “আমি কি বলিনি—”
মেহরীন তার কথার ওপরই আরেকটা ডাক ছুড়ে দিল, এবার আরও স্পষ্ট, “যাদের উত্তরার আগে নামতে হবে, মাইক্রোবাস এক। যাদের বনানী-গুলশান, এসইউভি না—মাইক্রোবাস দুই। ফয়সাল, তোমার তালিকায় কে কে ছিল বলো।”
ফয়সাল যেন এতক্ষণ এই সুযোগটার অপেক্ষায় ছিল। সে পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজ খুলে বলল, “বনানী-গুলশান একসঙ্গে চারজন। খালারা ধানমন্ডি। উদ্যোক্তা নাসিম স্যার গাজীপুর রুটে—”
“আমি ডাকব!” সাব্বির ভাই হাত তুলে সামনে এল, কিন্তু তখন ডানদিকের ভিড় থেকে এক মহিলা উদ্যোক্তা বললেন, “না, মেয়েটাই ঠিক বলছে। আমার দোকান বনানীতে, আমি আগেই ওকে বলেছি।” আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলেন, “আমাদের নামও ও-ই নিয়েছে।”
কথা-উত্তরের পর কথা-উত্তর। যেন ভিড়ের কিনার থেকে মেহরীনের ডাকে সাড়া ফিরে আসছে। “আমি গাজীপুর।” “আমার মা হাঁটতে পারেন না।” “রিমা আপা ধানমন্ডি, এসইউভি ঘুরে গেলে দেরি হবে।” জসিম দরজা খুলে দাঁড়িয়ে গেল, কিন্তু কার দিকে তাকাবে বুঝতে না পেরে তার চোখ এখন মেহরীনের মুখে। সাব্বির ভাইয়ের কণ্ঠে প্রথমবারের মতো জোরের বদলে তাড়া শোনা গেল, “এইভাবে রাস্তার মধ্যে মেলা বসিয়ো না।”
রিমা খালা এবার এগিয়ে এলেন। তার মুখে সোজা বিরক্তি। “সাব্বির, তুমি অনুষ্ঠান মঞ্চ সামলাও, বেরোনোর বন্দোবস্তে বারবার গোলমাল করো কেন? গতবারও দুইজন অতিথি ভুল গাড়িতে গিয়েছিল।” পাশে দাঁড়ানো এক আত্মীয়া নিচু গলায় আরেকজনকে বললেন, “মেহরীন না থাকলে এরা কিছু পারে না।” এত আস্তে বলা, তবু সাব্বির ভাই শুনে ফেলল।
সাব্বির ভাই দ্রুত পরিস্থিতি বাঁচাতে কার্ডটা আবার সামনে তুলে ধরল। “ঠিক আছে, আমি তো ওর কাজই সহজ করছিলাম। এই নাও, ধরো। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি না করে আমার সঙ্গে মিলিয়ে—”
“আমার সঙ্গে?” মেহরীন এবার এক পা এগিয়ে গেল। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা নড়ে রসিদের কোণা বেরিয়ে পড়ল। “বিকেল থেকে অতিথিদের নাম, রুট, বয়স্ক কারা, কার সঙ্গে মা আছেন—সব আমি লিখেছি। আপনি এখন সবার সামনে আমাকে গিফট ব্যাগ ধরিয়ে পেছনের গাড়িতে পাঠাবেন, তারপর বলবেন ‘মিলিয়ে’?”
সাব্বির ভাইয়ের চোয়াল শক্ত হল। “তুমি কথা বাড়াচ্ছ।”
“আপনি জায়গা কমাচ্ছেন।” মেহরীন বলল, আর সেই স্বর এত ঠান্ডা যে পাশের দুই ড্রাইভারও থেমে শুনল।
ঠিক তখন ফয়সাল ভেতরের দরজা দিয়ে ছোটে এল। তার হাতে একটা শক্ত বোর্ডে আটকানো পড়ার মতো বড় কার্ড—উপরে স্পনসর লোগো, নিচে মোটা অক্ষরে লেখা: “অতিথি পরিবহন সমন্বয় — মেহরীন ইসলাম।” সে সবার সামনে এসে কার্ডটা মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। “এটা ভেতরের রেজিস্টার টেবিলে পড়ে ছিল। চেয়ারম্যান স্যার খুঁজছিলেন। উনি বলেছেন, ‘যার নাম আছে, গাড়ির ডাক সে-ই দেবে।’”
কার্ডটা আলোয় উঠতেই সাব্বির ভাইয়ের হাতে ধরা ছোট সাদা কার্ডটা হঠাৎ খেলনা হয়ে গেল। বড় কার্ডের প্লাস্টিক কভারে আলো পড়ে লেখা স্পষ্ট দেখা যায়। রিমা খালা নিজের চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে পড়লেন। পাশ থেকে এক উদ্যোক্তা মহিলা একেবারে কাছে এসে বললেন, “নাম তো পরিষ্কার লেখা।” আর দরজার ভেতর থেকে দুজন স্বেচ্ছাসেবক এগিয়ে এসে স্বভাবগত ভঙ্গিতে মেহরীনের ডান-বাঁ পাশে দাঁড়াল, যেন জায়গাটা ওর।
মেহরীন কার্ডটা হাতে নিল। প্লাস্টিকের প্রান্তটা তার পুরোনো প্রবেশ-কার্ডের ঘষা ধারের মতো মসৃণ নয়; নতুন, শক্ত, পড়ার মতো। সে সেটাকে বুকের কাছে না এনে কাঁধসমান উঁচু করে ধরল, যাতে লেনের মাথা থেকে পেছনের গাড়ি পর্যন্ত সবাই দেখতে পায়। হঠাৎ এই সামান্য ওঠানামাতেই দাঁড়ানোর নিয়ম বদলে গেল—যারা এতক্ষণ কৌতূহলী ছিল, তারা এখন অপেক্ষায়।
সাব্বির ভাই তাড়াতাড়ি বলল, “আচ্ছা, নাম তো আছে। আমি পাশে থেকে দেখি—”
“পাশে থেকে না,” মেহরীন থামিয়ে দিল। “এখন সবাই শুনবেন।”
তার গলায় মাইক নেই, তবু শব্দ সোজা গিয়ে গাড়ির কাঁচে লাগল। “গাজীপুর রুট—মাইক্রোবাস এক। নাসিম স্যার, আপনার মা আগে উঠবেন। জসিম ভাই, দরজা নিচু করে ধরুন। ধানমন্ডি—রিমা খালা আর আপারা এসইউভিতে। বনানী-গুলশান—মাইক্রোবাস দুই, ফয়সাল আপনারা ওদিকটা দেখুন। আর কেউ কারও সিট বদলাবে না আমার ডাক ছাড়া।”
শেষ কথাটাই চড়ের মতো পড়ল। “আমার ডাক ছাড়া।”
সাব্বির ভাই হেসে নরম করার চেষ্টা করল, “এত কড়া হওয়ার দরকার কী? আমি তো—”
মেহরীন তার দিকে ফিরল না। কার্ডটা এখনও ওপরে। “ফয়সাল, সাব্বির ভাইকে গিফট ব্যাগগুলো ধরিয়ে দাও। উনি যেহেতু এতক্ষণ ধরে ওই কাজটাই ঠিক মনে করছিলেন।”
দুই পাশে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবকের একজন সত্যিই ব্যাগের গুচ্ছটা সাব্বির ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিল। ব্যাগগুলো চকচকে কাগজের, ভারী, ফিতে জড়ানো। একসঙ্গে এতগুলো ধরতে গিয়ে তার কবজি নুয়ে গেল। সেই নুয়ে যাওয়া কেউ এড়াতে পারল না। রিমা খালা ইতিমধ্যে এসইউভির দিকে হাঁটছেন; তিনি সাব্বির ভাইকে না ডেকে বললেন, “মেহরীন, আমার বোনের হাঁটু খারাপ, আগে ওকে তোলো।” নির্দেশ কার দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ রইল না।
সাব্বির ভাই এবার সামনে এসে নিচু গলায়, কিন্তু সবার শোনার মতো বলল, “মেহরীন, এইসব নাটক বাদ দাও। লোকজন আছে।”
“লোকজন আছে বলেই।” মেহরীন প্রথমবার তার দিকে তাকাল। চোখে কোনো আগুন নেই, শুধু হিসাব মিটে যাওয়ার মতো কঠোরতা। “আমাকে পেছনের গাড়িতে পাঠানোর কথা আপনি সবার সামনে বলেছেন। এখন সবার সামনেই শুনুন—গাড়ির ডাক আজ আমার। নামও আমার। যাত্রার ক্রমও আমি বলব। আপনি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়ান, নইলে সেগুলোও ভুল গাড়িতে যাবে।”
লেনের বাতাসে এক মুহূর্তে অনেক ছোট ছোট শব্দ আলাদা হয়ে উঠল—মাইক্রোবাসের স্লাইডিং দরজা খোলার ধাতব ঘর্ষণ, বৃদ্ধ চাচার লাঠির টোকা, কাগজের ব্যাগের ফিতে টান খাওয়ার খসখস। সাব্বির ভাইয়ের মুখে সেই আত্মবিশ্বাসী হাসি আর নেই; ঠোঁট দুটো শুকনো। সে ব্যাগ নামাতে যাবে কি না বুঝতে না পেরে দুই হাত একটু ওপরে রেখেছিল, তারপর নিচে নামাল না, আবার পুরোপুরি তুলতেও পারল না।
মেহরীন কার্ডটা আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরল। “জসিম ভাই, গাজীপুর রুট ছাড়ুন আগে।”
মাইক্রোবাস এক ধীরে সামনে গড়াল। লেনের ফাঁক খুলে গেল, পেছনের রাস্তা সোজা দেখা যাচ্ছে। মেহরীনের হাতে উঁচু করা পড়ার মতো কার্ড, আর সামনে দাঁড়ানো দুটো হাত—একটা ব্যাগের ফিতে-জড়ানো, একটা খালি—ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল।