Fast Fiction

ঘরটাই শেষমেশ ওদের ছাড়ল

“ওই মাইক্রোফোনটা ধরো না,” রওশন আপা হাত বাড়িয়ে মেহরীনের কবজি ঠেকিয়ে দিলেন, যেন উঠানের মাঝখানের টেবিল আর ফুল-ঝোলানো ফটক একসঙ্গে তাঁর বাপের সম্পত্তি। “তুমি পিছনে থাকো। অতিথি রিসিভ করবে সজীব। সামনে মুখ লাগে, হিসাবের মেয়ে না।”

ঢাকার মোহাম্মদপুরের ভাড়া-বাড়ির এই লম্বা উঠান আজ ব্র্যান্ড লঞ্চের নামে মিনি-মেলা। এক পাশে প্যান্ডেল, এক পাশে বড় ডেগে পোলাও, মাঝখানে রঙিন ব্যানারের নিচে কৃষি-পণ্যের বোতল সাজানো। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা, ডিলার, দুইজন মসজিদের মোতাওয়াল্লি, পাশের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রতিনিধি—সবাই দাঁড়িয়ে দেখে ফেলল, রওশন আপা কীভাবে মেহরীনের হাত থেকে অতিথি-তালিকার খাতা কেড়ে সজীবের দিকে দিলেন। সজীব নতুন পাঞ্জাবি পরে হাসল, যেন গত আট মাসের রাতজাগা অর্ডার, বিক্রির লাইভ, প্যাকেজিং, ফেরত সামলানো—সব তারই কৃতিত্ব। মেহরীনের আঙুলে তখনও বাসকার্ডের ঘষা-খাওয়া ধার, আর ব্যাগের ভেতর বাড়ির চাবির গোছা—দুপুরে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, সময় পায়নি।

“খালা নাসিমা আসলে আমারে ডাকবা,” মেহরীন শুধু এতটুকু বলল।

রওশন আপা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, “তোমারে কে ডাকবে, সেটাও আমি ঠিক করব। ভেতরে গিয়ে বাক্স খুলে রাখো।”

এই অপমানের মধ্যে সবচেয়ে কষ্টের ছিল কথা কেড়ে নেওয়া নয়; ছিল এই যে, এই ব্যবসাটা দাঁড় করাতে প্রথম ফোন বিক্রি করেছিল মেহরীন, আর আজ আত্মীয়দের সামনে সে যেন শুধু মজুর। তবু সে তর্ক করল না। খাতা না পেয়ে সে এক ঝটকায় পেছনের টেবিল থেকে প্যাকেট-কাটার ছুরি তুলে নিল, বাক্সের সিল ছাড়তে ছাড়তে চোখ তুলে উঠানের ফটকের দিকে দেখল—দুজন জেলা-ডিলার ঢুকছে, আর সজীব তাদের নামই চিনতে পারছে না।

“আপনি কুমিল্লার মতিউর ভাই?” মেহরীন বাক্স কাটতে কাটতেই বলে উঠল। “আর আপনি ফরিদপুরের রশিদ চাচা। সারের ডিলারের সঙ্গে আসছেন।”

দুজনেই সজীবের পাশ কাটিয়ে তার দিকে তাকাল। সজীবের মুখের হাসি আধখাওয়া লুচির মতো ভেঙে পড়ল। ফটকের কাছে দাঁড়ানো এক বিক্রয়কর্মী খাতা হাতে নিয়ে সজীবের বদলে মেহরীনের দিকে এক পা বাড়াল, তারপর রওশন আপার কড়া চোখে থেমে গেল। এটাই ছিল প্রথম ফাটল—ছোট, কিন্তু সবাই দেখল।

পাঁচ মিনিটও গেল না, বিপদ খুলে পড়ল একেবারে সবার সামনে। লাইভ শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু পণ্য রাখার কাঁচের শেলফের নিচে লাগানো প্লাগ বোর্ডে স্পার্ক করে আলো নিভে গেল। রিং লাইট বন্ধ, টেবিলের ওপর রাখা ছোট পাম্প মেশিন থেমে গেল, আর রান্নাঘর দিক থেকে কেউ চেঁচাল, “ফ্রিজও অফ!”

সজীব মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে হকচকিয়ে শুধু বলল, “এই… এইটা আবার কেন?” রওশন আপা অতিথিদের দিকে হাসি টানতে গিয়ে আরও কদাকার হয়ে উঠলেন। “কোনো সমস্যা না, ছোটখাটো…”

মেহরীন ইতিমধ্যে হাঁটু গেড়ে টেবিলের নিচে। তার কামিজের হাতায় দিনের পরিশ্রমের ভাঁজ, কাঁধে শিফট শেষে জমে থাকা কাঠিন্য। সে একবারেই বুঝল—একই লাইনে রিং লাইট, ফ্রিজ আর পাম্প ধরানো হয়েছে। “ওই বড় মাল্টিপ্লাগটা খুলেন,” সে না তাকিয়েই বলল।

“তুমি না বললেই না?” রওশন আপা ফোঁস করে উঠলেন।

“খুলেন,” মেহরীন এবার মাথা তুলল না, শুধু হাত বাড়িয়ে বলল, “নইলে আরও দুই মিনিটে এমসিবি পড়বে।”

কেউ রওশন আপার কথা শুনল না। রান্নাঘরের ছেলেটা দৌড়ে এসে মাল্টিপ্লাগ খুলে দিল। মেহরীন পাম্পের লাইন আলাদা করল, ফ্রিজ অন্য সকেটে নিল, রিং লাইট বন্ধ রেখে শুধু ছোট বাল্ব জ্বালাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গলার ঘাম হাতার ডগায় মুছে বলল, “এখন লাইভ না, আগে রেকর্ডেড অংশ চালান। পাম্প পরে ধরবেন।”

একজন ডিলার সামনে ঝুঁকে বোতল হাতে নিয়ে বললেন, “এই মেয়েটা জানে। ওকে জিজ্ঞেস করেন।”

রওশন আপা যেন শুনতেই পেলেন না। তিনি মাইকে ঘোষণা দিলেন, “সজীব সব দেখতেছে। একটু টেকনিক্যাল ঝামেলা।”

কিন্তু উঠানের মাঝখানে বাতাস বদলাল। দুই বিক্রয়কর্মী নিজে থেকেই পণ্যের কার্টন টেনে মেহরীনের টেবিলের দিকে আনল। এক বৃদ্ধা খালা, নাসিমা খালা, চশমা নামিয়ে বললেন, “মাইয়া, কোনটা আগে সাজামু?” তাঁর কণ্ঠে ‘মাইয়া’ শব্দে আদেশ কম, ভরসা বেশি। সজীবের চারপাশের গোল ভেঙে একেকটা কাঁধ, একেক জোড়া পা দিক বদলাতে লাগল। যে কাজের ছেলে এতক্ষণ সজীবকে ‘ভাই’ বলে ঘুরছিল, সে মেহরীনের দিকে বোতলের ট্রে বাড়িয়ে দাঁড়াল। ফটকের কাছের রেজিস্টার টেবিলটাও টেনে আনা হল তার পাশে।

সজীব তখন মরিয়া হয়ে এক ডিলারের নাম ভুল উচ্চারণ করে বসল। লোকটা ভুরু কুঁচকে বলল, “আমার অর্ডার কার সঙ্গে হয়, আপনি জানেন?” উত্তর দেওয়ার আগেই সে সোজা মেহরীনের দিকে ঘুরে গেল। এইবার আর কেউ থামল না; পুরো উঠানের চোখে কে ‘সামনের মুখ’, সেটা নড়ে উঠল।

রওশন আপা খুব দ্রুত বুঝে ফেললেন, বিপদ কোথায়। তিনি হাসিমুখে মেহরীনের কাছে এসে কনুই চেপে ধরলেন, এমনভাবে যেন স্নেহ করছেন। “এইদিকে আয়, ভেতরে আয়। অতিথির সামনে অত বাড়াবাড়ি লাগবে না। তোর কাজের কথা আমি নিজেই বলব।”

মেহরীন কনুই টেনে নিল। “এখন কেন ভেতরে যাব?”

“কারণ সব কথা সবার সামনে বলতে হয় না,” রওশন আপা খুব নিচু গলায় বললেন, কিন্তু আশপাশের তিনজন শুনে ফেলল। “তুই থাক, আমি মাইকে বলে দিচ্ছি—তুইও একটু সাহায্য করছিস। ব্যস। পরে হিসাব মিটায়া দেব।”

‘সাহায্য করছিস’। শব্দদুটো মেহরীনের ভেতরে ধাতব কিছু ঘষে দিল। যে ব্যবসার পণ্যের অনুপাত, ডেলিভারির পথ, লাইভে কোন প্রশ্ন এলে কী উত্তর দিতে হয়—সব তার মাথায়, সেটার পরিচয় এখন লুকিয়ে পেছনে দেওয়া ‘সাহায্য’? রওশন আপা আবার হাত বাড়ালেন, এইবার আরও প্রকাশ্যে, যেন তাকে উঠানের দাগ কেটে দেওয়া সীমানার ওপারে ঠেলে দেবেন। “চল।”

মেহরীন ব্যাগ খুলে চাবির গোছা বের করল। পুরনো নীল ট্যাগ লাগানো, দেরিতে ফেরত দেওয়া চাবি। সে রওশন আপার তালুতে সেটা ঠুসে দিল। টুং শব্দে চাবি লেগে উঠল মাইক্রোফোন-স্ট্যান্ডে। আশেপাশের মুখগুলো একসঙ্গে ঘুরে এল।

“বাড়ির চাবি নেন,” মেহরীন স্পষ্ট স্বরে বলল। “যতক্ষণ আমার কাজ লুকিয়ে রাখতে বলেন, ততক্ষণ আমি আর আপনার ভেতরের মানুষ না।”

রওশন আপার মুখ টনটনে টান পড়ে গেল। তিনি তাড়াতাড়ি হাসি এনে বললেন, “আহা, নাটক করিস না। মাইকটা ধর, দুটো কথা বল—আমরা তোদেরই মানুষ।”

এই দেরি-করা ছাড়, এই হঠাৎ ‘আমরা’—এটাই ছিল শেষ ভুল। উঠানের মাঝখানে টেবিলের পাশে রাখা তারহীন মাইকটা তখনই সজীবের হাত থেকে খানিক নিচে নেমে এসেছে; সজীব বোঝে না কাকে দেবে। নাসিমা খালা বললেন, “মাইক্রোফোনটা মেহরীনরে দাও। যার জানা, তার মুখে শোনা যাক।”

এক বিক্রয়কর্মী সত্যি সত্যি মাইক তুলে মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। সজীব ধরে রাখতে চাইল, কিন্তু লোকটা তার আঙুলের ওপর দিয়ে সরিয়ে নিল। এই ছোট্ট টানাটানিই সজীবের মুখে আসল ক্ষতি ফুটিয়ে দিল—লালচে কান, শুকনো ঠোঁট, চোখের তাড়াহুড়ো। রওশন আপা এবার আর আদেশের সুর পেলেন না, পেলেন হুড়োহুড়ি। “মেহরীন, পরে বলিস। এখন অনুষ্ঠানটা শেষ হোক।”

মেহরীন মাইক নিল। উঠানের মাঝখানে খোলা বৃত্তটা যেন একটু বড় হল। সামনের সারির চেয়ারে বসা দুই বৃদ্ধ সোজা হয়ে বসলেন। রান্নাঘরের পথ থেকে কাজের মেয়েরা দরজার ফাঁকে থামল। ফটকের পাশে দাঁড়ানো ডিলাররা পা বদলে তার দিকে মুখ করল। সে কোনো ভূমিকা দিল না।

“সবার সামনে একবার পরিষ্কার করি,” মেহরীন বলল। “এই ব্র্যান্ডের ফর্মুলা, দাম, ডিলারের হিসাব, লাইভে বিক্রির স্ক্রিপ্ট—সব আমি করেছি। সজীব না।”

উঠানের হাওয়া এবার সত্যি থামল না; বরং মানুষ নড়ল। সামনের টেবিলের বোতল ধরতে গিয়ে সজীবের হাত কেঁপে একটা বোতল কাত হয়ে পড়ে গেল, হলুদ তরল টেবিলক্লথে ছড়িয়ে তার পায়ের পাঞ্জাবিতে দাগ ফেলল। দৃশ্যটা এত স্পষ্ট যে কোনো কথাই দরকার হল না।

মেহরীন মাইক নামাল না। “আমি হিসাবের মেয়ে না; আমি এই ব্যবসার চালানোর লোক। কে কোন জেলায় মাল পাবে, কোন প্রশ্নে কী উত্তর যাবে, আজকের উদ্বোধনে কোন অফার উঠবে—শেষ সিদ্ধান্ত আমার। আর আজ থেকে আমার কাজকে ‘সাহায্য’ বলে পেছনে ঢোকানোর অধিকার কারও নেই।”

রওশন আপা তেড়ে উঠতে গিয়ে থেমে গেলেন, কারণ নাসিমা খালা উঠে দাঁড়িয়ে সোজা মেহরীনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। খালা বললেন না কিছু, শুধু নিজের ওড়নার কোণা দিয়ে টেবিলের ছড়ানো তেল মুছে দিতে দিতে সজীবকে একবার এমন চোখে দেখলেন, যাতে বসার জায়গাটাই ছোট হয়ে গেল। দুই বিক্রয়কর্মী রেজিস্টার খাতা তুলে মেহরীনের সামনে রাখল। ডিলার মতিউর ভাই উচ্চস্বরে বললেন, “তাহলে অর্ডার এই আপার কাছে দেব।” আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে বোতলের কার্টন তার পায়ের কাছে রাখল।

সজীব মরিয়া হয়ে বলল, “আমি তো শুধু—”

“তুই চুপ থাক,” রওশন আপা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, কিন্তু সেই ঝাঁঝে আর কর্তৃত্ব নেই, কেবল ভাঙা মুখ বাঁচানোর শব্দ। তারপর একেবারে উল্টো সুরে, “মেহরীন, ঠিক আছে, তুই-ই বল। কিন্তু এসব কথার কী দরকার ছিল?”

মেহরীন তার দিকে তাকাল, তারপর পুরো উঠানের দিকে। “দরকার ছিল কারণ আপনারা সবাই আজ যার মুখে ব্যবসার কথা শুনতে এসেছেন, তাকে ফটকে দাঁড় করিয়ে চুপ করানো হচ্ছিল। এখন আর না।”

এই এক বাক্যে ঘর পুরো পড়ে গেল অন্যদিকে। চেয়ার ঘষার শব্দ হল, কিন্তু পেছনে সরে নয়—সামনে আসতে। এক বৃদ্ধ প্রতিনিধি বললেন, “বইন, দামের কথাটা বলেন।” রান্নাঘর থেকে কেউ চা-ট্রে নিয়ে সোজা মেহরীনের টেবিলের দিকে এল। সজীবকে পাশ কাটিয়ে। রওশন আপা একবার মাইকের দিকে, একবার খাতার দিকে, একবার মানুষের মুখের দিকে তাকালেন; কোথাও তাঁর জন্য পুরনো জায়গা রইল না। তিনি আবার হাত বাড়িয়ে মেহরীনের কাঁধ ছুঁতে চাইলেন, এইবার অনুরোধের ভঙ্গিতে।

মেহরীন অল্প সরে গেল। “স্পর্শ করবেন না। কাজের কথা লাগলে সবার সামনে বলবেন।”

তারপর সে খাতা খুলে প্রথম ডিলারের নাম লিখল, অর্ডারের সংখ্যা জিজ্ঞেস করল, অফারের শর্ত বলল। কথাগুলো আর ঘোষণা নয়, আদেশ নয়—চলার নিয়ম। আর মানুষজন সেই নিয়ম মেনে তার দিকে ঝুঁকতে লাগল। মাইকের শব্দ, চায়ের কাপের টুং, নাম লেখার খসখস—সব মিলিয়ে উঠানের পুরনো ভারসাম্য ভেঙে নতুন সারি বসে গেল। রওশন আপা দাঁড়িয়ে রইলেন মাঝখানে, যেন নিজেরই আয়োজনে অতিথি।

অর্ডারের প্রথম পর্ব শেষ হতেই মেহরীন মাইকটা টেবিলে রাখল। আর কোনো ব্যাখ্যা নয়। সে নীল ট্যাগ-ছাড়া হাতটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া বাসকার্ড ছুঁয়ে নিল, তারপর ঘুরে উঠানের পাশের সরু গলির মুখে হাঁটা দিল। পেছনে খোলা বৃত্তটা তার জন্য জায়গা করে দিয়েছে।

গলির মোড়ে পৌঁছে সে না ঘুরেই বলল, “চাবি ফেরত দিয়েছি। আমার নামে কথা লাগলে সামনে বলবেন।”

“মেহরীন আপা—” “মেহরীন, এক মিনিট—” “আপা, অর্ডার খাতাটা—”

ডাকগুলো পেছনের উঠান থেকে গলির দেওয়ালে লেগে ফিরে এল, একটার সঙ্গে আরেকটা ধাক্কা খেয়ে। মেহরীন চাবিহীন হাতটা আঁচলের পাশে রেখে সাইড লেনের বাঁক ঘুরে গেল।