Fast Fiction

সামনের সারি সে-ই নিল #2

“রাইসা, সামনে না। ওই ব্যাজটা খুলে পেছনে দাঁড়াও—তুমি শুধু খাম ধরাবে।”

সাবিহা আপা কাউন্টারের ওপর থেকে রাইসার নাম-লেখা কার্ডটা টেনে নিয়ে নিজের ভাগনি মেহরীনকে গলায় ঝুলিয়ে দিল। লাইনের প্রথম দিকের দুই খালাম্মা চোখ তুলে দেখল, তারপর এমন ভঙ্গি করল যেন এটা স্বাভাবিক। রাইসার ডান কাঁধের ওপর সারা দিনের দৌড়ঝাঁপের ভাঁজ জমে আছে, সাদা পাঞ্জাবির হাতায় হালকা ধুলো, তবু গেস্ট-লিস্টের মোটা ফাইলটা তারই হাতে ছিল। সে ফাইলটা নামাতে গিয়েও নামাল না।

“তালিকাটা আমি ধরব,” রাইসা বলল, গলা নিচু, শুকনো।

“তুমি ধরলে সমস্যা হয়,” সাবিহা আপা হাসল, সেই হাসি আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে বেশি জোরে বাজে। “এটা ঘরের অনুষ্ঠান। বাইরের লোককে সামনে বসালে মানায়?”

কাউন্টারের একপাশে প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণে তার পানির বোতল, টেপ, খাম, আর দেরিতে ফেরত পাওয়া স্টোররুমের চাবি পড়ে। ওটাই ছিল তার জায়গা—দাঁড়িয়ে থাকা, পৌঁছে দেওয়া, কিন্তু নাম ডাকার অধিকার নেই। ঢাকা শহরের বড় কমিউনিটি সেন্টারের কাঁচঘেরা লবিতে এটাই যথেষ্ট অপমান, কারণ আজকের বিয়ের রিসেপশনের অর্ধেক ব্যবস্থা রাইসাই দাঁড় করিয়েছে; তবু সামনে তার মুখ নয়, অন্য কারও সাজানো হাসি।

রাইসা এক পা সরে গেল, কিন্তু ফাইলটা ছাড়ল না। এটাই প্রথম ফাটল। লাইনে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক বললেন, “মেয়েটা যদি তালিকা জানে, ওকেই বসান না?” সাবিহা আপা তৎক্ষণাৎ ঘুরে, গলায় মিষ্টি মেখে বলল, “চাচা, মেয়েরা অনেকেই কাজ করে, কিন্তু সবার তো আবার আত্মীয়-পরিচয় বোঝা হয় না।”

শব্দগুলো কাচের দেয়ালে ঠুকে ফিরে এল। রাইসা ধীরে ফাইলটা কাউন্টারে রাখল, ঠিক মেহরীনের সামনে নয়—মাঝখানে। “তাহলে ভুল হলে আমি ধরব না,” সে বলল।

সাবিহা আপা ভুরু তুলল। “তোমাকে যা বলা হচ্ছে, তাই করো।”

তার আগেই ভিড় ঘন হয়ে এল। ফুলমালা হাতে এক বয়স্ক দম্পতি, সঙ্গে দুজন যুবক। তারা কুমিল্লা থেকে এসেছে, কনের বড় খালুর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ। মেহরীন তালিকায় চোখ বুলিয়ে নাম খুঁজে পেল না। একবার ইংরেজি বানান, একবার বাংলা উচ্চারণ—দুটোই গুলিয়ে ফেলল। পিছন থেকে কেউ বলল, “এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, ভেতরে আসর শুরু হয়ে যাবে।” আরেকজন ফিসফিস করল, “এইসব আধা-জানা মেয়েদের বসায় কেন?”

রাইসা ফাইলের ভেতরের ট্যাব চেনে। সবুজ ট্যাব—বরপক্ষ। নীল—কনেপক্ষ। লাল দাগ—বিশেষ অতিথি। সে এগিয়ে এসে সবুজ ট্যাব ছুঁতেই সাবিহা আপা তার কব্জি চেপে ধরল।

“বলেছি না, না। তুমি খাম দাও।”

“ওরা বরপক্ষের কৃষি ব্যাংকের আজিজ সাহেবের আত্মীয়। নাম আলাদা পাতায়,” রাইসা ঠাণ্ডা গলায় বলল।

“তুমি জানো মানেই সত্যি না।” সাবিহা আপা এবার জোরে বলল, যেন লাইনকে শুনিয়ে। “অনেক সময় স্টাফরা বেশি জেনে ফেললে এটাই হয়।”

বয়স্ক ভদ্রলোকের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “আমাদের ভুল ডাকা হয়েছে নাকি?” তাঁর স্ত্রী শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে আছেন। দূরে হলঘর থেকে গানের বেস ভেসে আসছে, কিন্তু লবির সামনে গতি থেমে গেল। যারা ভেতরে যাওয়ার কথা ছিল, তারা দাঁড়িয়ে। যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা দেখতে শুরু করেছে।

তখনই তানভীর এল। বরপক্ষের কাজিন, আর ইভেন্টের টাকা-পয়সার দিকটা রাইসার সঙ্গে সে-ই মিলিয়ে এসেছে গত তিন সপ্তাহ। তার কপালে ঘাম, হাতে ফোন, মুখে তাড়া। “কী হচ্ছে?”

সাবিহা আপা জবাব দিল, “কিছু না। স্টাফরা একটু বেশি কথা বলছে।”

রাইসা তার দিকে তাকাল না। “সবুজ ট্যাবের শেষে হাতে লেখা সংযোজন আছে,” সে বলল, “আজিজ সাহেবের নামের নিচে।”

“তুমি চুপ থাকবে?” সাবিহা আপা এবার ফাইলটা নিজের দিকে টানল। পাতাগুলো সরে শুকনো কাগজের খসখস শব্দ উঠল। তানভীরের চোখ সেই শব্দে গিয়ে থামল। রাইসা এক মুহূর্তে বুঝল—সে নিজে না বললে আজও তাকে পেছনের মেয়ে বানিয়ে রাখা হবে।

সে বাঁ হাত বাড়িয়ে ফাইলের শেষ ভাঁজটা তুলে ধরল। সাদা পাতার কোণায় সোনালি কলমে লেখা নোট, রাইসারই করা, কিন্তু তার ওপর কালো কালি দিয়ে টিক মেরেছিল তানভীর আগের রাতে: “আজিজ সাহেব—বরের খালার পক্ষ, ৬ জন, সরাসরি প্রবেশ। কাউন্টারে বিলম্ব নয়।” নিচে তানভীরের ছোট স্বাক্ষর।

এটা আড়ালে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন শরীর ঠেসে মানুষ দাঁড়িয়ে। তানভীর নিজেই ঝুঁকে পড়ে পড়ল, তারপর জোরে বলল, “এখানে তো লেখা আছে। সরাসরি প্রবেশ।”

শব্দটা লাইনের ওপর দিয়ে চলে গেল। বয়স্ক ভদ্রলোকের ছেলে ফাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে এতক্ষণ আমাদের কেন আটকালেন?” মেহরীন হাত সরিয়ে নিল, যেন কাগজটা গরম।

সাবিহা আপা সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিতে চাইল। “আরে, নোট থাকতেই পারে। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত তো—”

“রাইসার করা নোট,” তানভীর কেটে দিল, “আমি টিক দিয়েছি। এই প্রবেশ ও-ই ঠিক করেছে।”

এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। ঠিক পেছনে দাঁড়ানো দুই খালাম্মার একজন এবার সরাসরি রাইসার দিকে ঘুরে বললেন, “মা, তাহলে আমাদের ছেলেদের নামটাও তুমি দেখো তো?” আরেকজন কাউন্টারের ওপরে খাম না রেখে তালিকার দিকে এগিয়ে দিলেন আমন্ত্রণপত্র। কে প্রশ্ন করবে, তা বদলে গেল।

সাবিহা আপা হাসি চেপে বলল, “ও কাজ জানে, সেটা তো আমি বলিই। কিন্তু সামনে বসা আর তালিকা সাজানো এক জিনিস না। রাইসা, তুমি দাঁড়িয়েই দেখে দাও।”

রাইসা এবার প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণ থেকে নিজের কলম তুলে নিল। তারপর স্টোররুমের দেরিতে ফেরত পাওয়া চাবিটা কাউন্টারে রাখল, ঠক করে শব্দ হল। “স্টোরের চাবি নিন,” সে বলল, “পেছনের দৌড়ঝাঁপও অন্য কাউকে দিন।”

তানভীর তাকাল। তার মুখে এবার সেই পরিচিত দ্রুত হিসাব নেই; একরকম থেমে যাওয়া আছে। রাইসা ফাইলটা টেনে নিজের সামনে আনল। লাইনও সেটার সঙ্গে এক চুল এগিয়ে এল।

“পরের নাম?” রাইসা বলল।

এক মুহূর্ত। তারপর মেহরীন নিজেই সরে দাঁড়াল, পুরোপুরি না, কিন্তু এতটাই যে কাউন্টারের মাঝখানের ফাঁক রাইসার দিকে খুলে গেল। এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে, কোটের কলার ঠিক করতে করতে, আমন্ত্রণপত্র এগিয়ে দিল। “নানুর নাম আছে—হামিদা খাতুন।”

রাইসা পাতায় চোখ বুলিয়ে বলল, “কনেপক্ষ, নীল ট্যাব। তিনজন। বাম করিডর দিয়ে যান।”

লোকটা আর সাবিহা আপার দিকে তাকাল না। সোজা ভেতরে ঢুকে গেল।

এরপর একের পর এক নাম আসতে লাগল। “সালাহউদ্দিন সাহেব?”—“লাল দাগ, সামনের সারি।” “শরীফা খালা?”—“হুইলচেয়ার, র‍্যাম্প খুলুন।” “বরের অফিসের পক্ষ?”—“ডান পাশ, রেজিস্টার করে ঢুকুন।” প্রতিটা উত্তরের পরে কাউন্টারের গতি খুলে যাচ্ছে, আটকে থাকা জমাট মানুষ সরে যাচ্ছে। সাবিহা আপা মাঝেমধ্যে কিছু বলতে গেলেই কেউ না কেউ রাইসাকেই দেখে। কে বসে নেই, তাও আর mattered করছে না; কে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, সেটা স্পষ্ট।

সাবিহা আপা শেষ চেষ্টা করল যখন কনের এক দূরসম্পর্কের চাচা এসে বললেন তাঁর সঙ্গে আরও চারজন আছে। তালিকায় দুজন। সাবিহা আপা দ্রুত বলে উঠল, “যাক, ঢুকিয়ে দাও। আমাদের মানুষ।”

রাইসা পাতাটা উল্টে তার ওপরের নীল মার্কার দাগে আঙুল রাখল। “না। অতিরিক্ত চারজনের জন্য আলাদা অনুমতি লাগবে।”

চাচা কেশে বললেন, “আমি কার কে, জানো?”

“জানি,” রাইসা বলল, এবার গলা উঁচু না করেই সবার শোনার মতো পরিষ্কার, “কনের মামাতো চাচা। তালিকায় দুজন। এর বেশি হলে যিনি এই তালিকার দায় নিয়েছেন, তিনি সবার সামনে বলবেন—কাদের আটকে রেখে আপনাদের ঢোকাবেন।”

লাইন একসাথে স্থির হল না; বরং একটু কাত হয়ে তাকাল। এই প্রশ্নের উত্তর মুখে আনাই ব্যয়বহুল। সাবিহা আপা তাড়াতাড়ি বলল, “এইসব কথা এখানে—”

“এখানেই,” রাইসা কেটে দিল। সে ফাইল বন্ধ করল না, খোলা রাখল, যেন সিদ্ধান্তও খোলা। “আজ থেকে এই কাউন্টারে নাম আমি পড়ব, প্রবেশ আমি বলব। যার আপত্তি আছে, তিনি নিজের নামে নতুন তালিকা পড়ে শুনান—সবার সামনে।”

চাচার সঙ্গের চারজনের একজন পিছিয়ে গেল। সাবিহা আপার ঠোঁট শুকিয়ে উঠল; সে পানির বোতল ধরতে গিয়ে ভুল করে খামের স্তূপে হাত লাগাল, দু-একটা খাম মেঝেতে পড়ে গেল। এটাই দৃশ্যমান ক্ষতি—হাতের জিনিস হাতেই থাকল না। তানভীর এক পা পাশে সরে দাঁড়াল, কাউন্টারের মাঝখানের জায়গাটা পুরোপুরি রাইসার জন্য ফাঁকা করে।

ঠিক তখনই শেষ ঝামেলাটা এল। এক মহিলা, দামি জামদানির আঁচল কাঁধে গোঁজা, সঙ্গে ক্যামেরাম্যান আর দুজন তরুণী। তিনি বললেন, “আমার নাম কেন তালিকায় নেই? আমি কনের মায়ের বান্ধবী। আমাকে কে আটকাল?”

সাবিহা আপা তৎক্ষণাৎ সুযোগ নিল। “দেখলে? এটাই বলছিলাম। এত বড় অতিথিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে!”

মহিলা আরও জোরে বললেন, “আমার বসার জায়গা সামনে। ফোন করে জেনে নিন।”

রাইসা পাতাগুলো উল্টোল না। বরং কাউন্টারের নিচ থেকে খয়েরি খামে মোড়ানো সংযোজন-তালিকাটা বের করল। শুকনো কাগজের সেই চেনা শব্দ উঠল। “আপনার নাম?”

মহিলা বললেন। রাইসা খামের ভাঁজ খুলে ভিতরের সাদা কাগজটা বের করল। উপরে কনের মায়ের হাতের লেখা—“শেষ মুহূর্তের সংযোজন, শুধুমাত্র যাদের নাম এখানে।” নিচে পাঁচটা নাম। মহিলার নাম নেই। কিন্তু ঠিক তার নিচে আরেকটা লাইন: “শবনম নাসরীন—শুধু একা প্রবেশ, সঙ্গে মিডিয়া নয়।”

ক্যামেরাম্যান থমকে গেল। দুই তরুণী একে অন্যের দিকে তাকাল। মহিলা বললেন, “এটা কে লিখেছে?”

রাইসা কাগজটা উঁচু করে ধরল, যেন একবারেই পড়া যায়। “কনের মা। আর কাউন্টারে এই সিদ্ধান্ত আমি কার্যকর করব। শবনম নাসরীন, আপনি একা ঢুকবেন। ক্যামেরা আর সঙ্গে যারা আছেন, তারা বাইরে অপেক্ষা করবেন। পরের নাম।”

সাবিহা আপা চিৎকারের মতো গলায় বলল, “রাইসা!”

রাইসা তার দিকে না তাকিয়েই যোগ করল, “আর সাবিহা আপা, এই লাইনে কে ঢুকবে, কে আটকে থাকবে—এখন থেকে সেটা আপনি ঘোষণা করবেন না। আপনি চাইলে খাম গুনে দিন।”

লবির কাঁচে তখন হলঘরের দিক থেকে আসা আলো নড়ছিল। ক্যামেরাম্যান, অভ্যাসবশত, শট নিতে গিয়ে ফ্ল্যাশ ছুড়ে দিল। সাদা আলো কাঁচে আঘাত করে ছিটকে উঠল; একপাশে ভেতরে যাওয়া পথ খোলা, অন্য পাশে থমকে থাকা কয়েকজনের ছায়া কেটে দুই ভাগ হয়ে রইল।