Fast Fiction

ভাঙনেও আমরা আলাদা হইনি

মেহরাব দৌড়ে গিয়ে গরম ডালের হাঁড়িটা ঈশার হাত থেকে কেড়ে নিল, তারপর নিজের হাত পুড়িয়ে হলেও সিঙ্কের নিচে নামিয়ে রাখল। হাঁড়ির ধার বেয়ে ডাল ছলকে নওশীন আপার মেঝেতে পড়ে গেছে, সাদা টাইলসে হলুদ দাগ ছড়িয়ে। ঈশা এক পা পিছিয়ে দরজার খাঁজে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, মুখ কাগজের মতো ফ্যাকাসে। ডাইনিং টেবিলে খালাম্মার সামনে ইফতারের বেঁচে থাকা ঠান্ডা খাবারের বক্স খোলা, কেউ আর তাতে হাত দেয়নি।

“তুমি ধরলে কেন?” নওশীন আপার গলা রান্নাঘর কাঁপিয়ে উঠল। “কে বলছে তোমাকে ভেতরে ঢুকতে?”

মেহরাব জবাব দিল না। গ্যাসের চুলা বন্ধ করে ভেজা কাপড় টেনে নিল, ঈশার স্যান্ডেলের তলায় ছড়ানো ডাল মুছতে হাঁটু গেড়ে বসল। তার গলায় ঝুলে থাকা পুরনো, ভাঁজপড়া কলেজ-কার্ডের ফিতা ঘামে ভিজে গিয়ে গলার সঙ্গে লেগে আছে। নিচতলার ভাড়া ঘরে থাকে বলে এ বাড়ির কারও সামনে বসারও অধিকার নেই—এ কথা সে অনেকবার বুঝেছে। তবু ডালটা যদি ঈশার পায়ে পড়ত?

খালাম্মা টেবিলের মাথা থেকে তাকিয়ে বললেন, “ঈশা, তুই সরে আয়। মেয়েমানুষের রান্নাঘরে ছেলেপেলেকে ঢোকাতে কে বলেছে?”

ঈশা ঠোঁট খুলল, আবার বন্ধ করল। তার ডান হাতের কবজি লাল হয়ে উঠেছে, কিন্তু সে সেই হাতটা আঁচলের নিচে লুকিয়ে ফেলল। মেহরাব সেটা দেখল, আর দেখেও এমন ভান করল যেন দেখেনি। সে শুধু বলল, “মেঝে পিচ্ছিল। আগে মুছে নিই।”

নওশীন আপা এগিয়ে এসে তার হাত থেকে কাপড়টা টেনে নিলেন, তারপর আবার সবার সামনে সেই কাপড়ই মেহরাবের দিকে ছুড়ে দিলেন। “যেহেতু তুমি এত দায়িত্বশীল, সব পরিষ্কার করবে। আর আজ থেকে ছাদের ট্যাংকির চাবিও তোমার কাছে থাকবে না।”

তিনি আলমারির পাশে ঝোলানো ছোট কীবোর্ড থেকে লোহার চাবিটা খুলে নিলেন। ওই চাবি দিয়ে মেহরাব ভোরে মোটর চালিয়ে বাড়ির পানির লাইন ভরিয়ে দিত, বিনিময়ে নিচতলার ছোট ঘরের ভাড়া খানিকটা কমে। কৃষি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, টিউশনির টাকা আর এই ছাড় মিলিয়ে তার ঢাকা টিকে থাকা। নওশীন আপা চাবিটা ঈশার দিকে বাড়িয়ে দিলেন, তারপর মনে পড়ায় খালাম্মার হাতে দিলেন। “এখন থেকে বাড়ির জিনিস বাড়ির লোক সামলাবে।”

এই অপমানের মুহূর্তেও মেহরাব কাপড়টা তুলে নিল। নিচু হয়ে ডাল মুছতে মুছতে সে শুধু টের পেল ঈশা নড়ছে না। দরজার খাঁজে তার থেমে থাকা শরীরটা যেন আটকে গেছে। এ বাড়িতে ঈশা নওশীন আপার ছোট বোন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কিন্তু নিজের ঘর থেকেও যেন অনুমতি নিয়ে শ্বাস নেয়। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা প্রচুর; কোথাও কী চোখ পড়ল, কার কী কথা উঠল—এই নিয়েই সব দরজা খোলে বন্ধ হয়।

খালাম্মা চাবিটা নিজের আঁচলে বেঁধে বললেন, “মেহরাব, তোমার সীমা জানা দরকার। ভাড়া থাকো, পড়াশোনা করো, সেটুকু থাকো। বাড়ির মেয়েদের গায়ে গিয়ে লাগা লাগবে না।”

মেহরাবের কাঁধ শক্ত হয়ে উঠল। সে মাথা তুলল না। “গায়ে যাইনি, হাঁড়ি ধরেছি।”

নওশীন আপা হেসে উঠলেন, সেই হাসিতে ধন্যবাদ নেই, শুধু খোঁচা। “কথা শিখেছ দেখছি। কাল থেকে সকালে মোটরও চালাতে হবে না। দরকার হলে অন্য লোক নেব।”

ঈশা তখনই প্রথম নড়ল। দরজার খাঁজ থেকে সরে এসে সিঙ্কের পাশে রাখা অন্য একটা শুকনো কাপড় তুলে নিল। কেউ কিছু বোঝার আগেই সে হাঁটু গেড়ে মেহরাবের মুছতে থাকা দাগের পাশে আরেকটা দাগ মুছতে শুরু করল। তার লুকিয়ে রাখা লাল কবজি এবার খালাম্মার চোখেও পড়ে গেল।

“ঈশা!” নওশীন আপার গলা ধারালো। “উঠে দাঁড়াও।”

ঈশা মাথা তুলল না। “ডাল আমার হাত থেকে পড়েছে।”

রান্নাঘরটা ছোট; দুটি মানুষ পাশাপাশি বসে মেঝে মুছলে কাঁধে কাঁধ লাগে। মেহরাব হাত থামিয়ে ফেলেছিল, ঈশা থামেনি। সে নিচু গলায় বলল, “তুমি ওই দিকটা মুছো। এখানে দাগ বসে যাবে।”

এটাই প্রথম পক্ষ নেওয়া—না বলে, না বুঝিয়ে, সবার সামনে। মেহরাবের বুকের ভেতর শক্ত কিছু ঢিলে হয়ে গেল, আবার সঙ্গে সঙ্গে টের পেল ঝুঁকিটাও। খালাম্মা চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। নওশীন আপার মুখে অবিশ্বাসের লালচে ছায়া।

“বেশ,” নওশীন আপা বললেন, “তাহলে আজকের বাসন, রান্নাঘর, আর ছাদের ট্যাংকির চারপাশ পরিষ্কার—দুজনেই করবে। ঈশা, পরে কেঁদে এসে বলবে না যে তোমাকে জোর করা হয়েছে।”

ঈশা এবার উঠে দাঁড়াল, কিন্তু পিছু হটল না। “কাঁদলে নিজের জন্য কাঁদব।”

এক মুহূর্তের জন্য খালাম্মার হাতে বাঁধা চাবির গোছা টুং করে উঠল। সেই ছোট্ট শব্দে মেহরাব বুঝল, শাস্তিটা শুধু কাজের নয়; আজ তাকে দরজার বাইরে ঠেলে রাখার সঙ্গে ঈশাকেও শিখিয়ে দেওয়া হবে কোথায় দাঁড়াতে হয়।

মাগরিবের পর বাড়িটা আরও ভরে উঠল। এক ফুপাতো ভাই এসেছে, পাশের ফ্ল্যাটের চাচিও ঢুঁ মেরে গেছে। টেবিলে চা, প্লেটে সিঙ্গারা, কিন্তু রান্নাঘরের সিঙ্কে থালা জমে পাহাড়। নওশীন আপা গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ইশারা করে কাজ বণ্টন করছেন। “ঈশা, অতিথিদের চা দাও। মেহরাব, পেছনের বারান্দার ড্রেনও ধুয়ে দিও—সকাল থেকে নোংরা।”

সকাল থেকে নোংরা নয়; ডাল পড়েছে আজ সন্ধ্যায়। তবু কথাটা এমনভাবে বলা হলো যেন এই নোংরা তারই চরিত্র থেকে বেরিয়েছে। মেহরাব বারান্দায় বালতি ভরছে, আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে আত্মীয়স্বজনের হালকা গলা—“ভাড়াটে ছেলে তো? কলেজে পড়ে? কৃষি না কী?” কেউ আবার ফিসফিসিয়ে, “এমন ছেলেদের দূরত্বে রাখা ভালো।”

ঈশা ট্রেতে চা নিয়ে যাচ্ছিল। মাঝপথে থেমে, সবার চোখের আড়ালে, সে একবার বারান্দার দিকে তাকাল। সেই তাকানোতে লজ্জা ছিল না; ছিল রাগে আটকে রাখা নিঃশ্বাস। মেহরাব চোখ নামিয়ে নিল। এ বাড়িতে কেউ কারও দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও তার মানে বানিয়ে ফেলা যায়।

কিছু পরে খালাম্মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “মেহরাব, এই নাও ঘরের চাবি। রাত বারোটার আগে ফিরতে হবে। আর ছাদে উঠবে না।” তিনি চাবিটা এমনভাবে বাড়িয়ে দিলেন যেন ফেরত নয়, দান করছেন। দেরিতে ফেরত পাওয়া এই চাবির ঠান্ডা ধাতু মেহরাবের তালুতে লেগেই অপমানের মতো লাগল।

সে চাবি নিয়ে পকেটে রাখতেই ঈশা ট্রে নামিয়ে বলল, “ছাদে কাপড় আছে। নামাবে কে?”

“আমি,” নওশীন আপা সঙ্গে সঙ্গে বললেন। “যার যেখানে থাকা উচিত, সেখানে থাকবে।”

ঈশা উত্তর করল না। কিন্তু দশ মিনিট পর, অতিথিরা যখন টেবিলে উচ্চস্বরে আলোচনা করছে কে কোথায় চাকরি পেল, তখন সে চুপচাপ বারান্দায় এসে মেহরাবের পাশে দাঁড়াল। সিঙ্ক থেকে ভরা ছোট বালতিটা সে তার হাত থেকে নিয়ে বলল, “এটা আমি ঢালি। তুমি ব্রাশ দাও।” নওশীন আপা দরজার ভেতর থেকেই দেখতে পাচ্ছেন—এ জেনেই।

মেহরাব ফিসফিস করে বলল, “থাক। তোমার জন্য খারাপ হবে।”

ঈশা ড্রেনের কালচে মুখে পানি ঢালতে ঢালতে বলল, “খারাপ তো হয়েই গেছে।”

এই একটুকু বাক্যও যেন বেশি। তবু তাতে কী স্পষ্ট হয়ে গেল—সে আর নিরপেক্ষ নেই। ড্রেনের গন্ধ, ভিজে সিমেন্ট, বারান্দার জং ধরা গ্রিল—সবকিছুর মাঝখানে তারা একই নোংরা কাজের দুপাশে দাঁড়িয়ে। ভেতর থেকে ফুপাতো ভাইয়ের হাসি থেমে গেল; তারপর নওশীন আপার স্যান্ডেলের ঠকঠক শব্দ।

“ঈশা, ভেতরে যাও।” এবার গলায় শুধু রাগ নয়, ভয়ও। “মানুষ দেখছে।”

ঈশা বালতিটা নামিয়ে রাখল, কিন্তু সরল না। “দেখুক।”

এই ‘দেখুক’ ঘোষণার মতো বড় কিছু নয়, কিন্তু এই বাড়ির বাতাসে সেটাই অসভ্য সাহস। খালাম্মা এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়ালেন; তাঁর দাঁড়ানোর সেই ছোট্ট বিরতি, সেই চৌকাঠ-অবরোধ, মেহরাবের কাছে বহুবার দেখা। আজ সেটা তাদের দুজনের জন্য। “ঈশা, ভেতরে। মেহরাব, তুমি নিচে যাও। ড্রেন কাল ধোয়া হবে।”

আলাদা হয়ে গেলে সবাই বাঁচে। এটাই ছিল সহজ রাস্তা। মেহরাব ব্রাশটা নামিয়ে রেখে সরে যেতে পারত। ঈশাও ভেতরে গেলে তারই মান বাঁচত। কিন্তু ঈশা আগে নড়ল না, তাই মেহরাবও নড়ল না। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “ড্রেন কাল হলে গন্ধ হবে। আজই শেষ করি।”

নওশীন আপা এবার প্রকাশ্য অপমান বেছে নিলেন। “তোমার এত দরদ থাকলে নিজের ভাড়া বাড়াও আগে। কাজের বদলে সহানুভূতি দেখিয়ে এই বাড়িতে উঠতে পারবে ভাবছ?”

মেহরাবের মুখ শুকিয়ে গেল, কিন্তু সে অনুনয় করল না। শুধু ব্রাশটা আবার হাতে তুলল। “আমি উঠতে চাইনি। কাজটা আধা করে রাখলে কাল আরও নোংরা হবে।”

ঈশা তখন সিঙ্কের পাশে রাখা বড় নীল বালতির দিকে হাত বাড়াল। ওই বালতি ছাদের ট্যাংকির পানি নামাতে ব্যবহার হয়; ভারী, দুইজন না ধরলে সিঁড়ির মোড়ে দুলে পড়ে। নওশীন আপা ঝট করে এগিয়ে এসে বালতিটা তার হাত থেকে সরিয়ে নিলেন। “এটা তুমি ধরবে না। মেহরাব নিচে নেমে যাক। বাকিটা আমি দেখছি।”

এই ‘আমি দেখছি’ মানে কাজ নয়, আলাদা করা। খালাম্মা তৎক্ষণাৎ সমর্থন দিলেন। “হ্যাঁ, মেয়ের নাম আছে। ছেলেটাকে দূরে রাখো।”

মেহরাব তখনই সরে যেতে পারত। পকেটে দেরিতে ফেরত পাওয়া চাবি, গলায় ভেজা কার্ড, সারাদিনের ক্লান্তি—সব তাকে সরে যেতে বলছিল। সে এক পা পিছিয়েও গেল। তারপর তার চোখ পড়ল ঈশার কবজিতে, ডালের ছ্যাঁকার লাল রেখা এখন আরও গাঢ়। আর দেখল, ঈশা মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও হাত দুটো মুঠো হয়ে আছে—যেন আবারও নিজের দোষ নিজের কাঁধে নিতে প্রস্তুত।

নওশীন আপা বালতিটা দরজার এপাশে টেনে এনে বললেন, “এই পর্যন্ত। মেহরাব, তুমি যাও। ঈশা, তুমি ভেতরে।”

মেহরাব এবারই সীমা টানল। সে এগিয়ে এসে বালতির এক পাশের হাতল ধরে ফেলল। “আধা কাজ রেখে যাচ্ছি না।”

এক সেকেন্ড। শুধু এক সেকেন্ড সবাই ভাবল, ঈশা হয়তো হাত সরিয়ে নেবে, মান বাঁচাবে, পথ খুলে দেবে। সে তা করল না। নওশীন আপার আঙুলের নিচ থেকে নিজের হাত ঢুকিয়ে বালতির অন্য হাতলটা ধরল। তার গলায় কাঁপন ছিল, কিন্তু কথায় না। “আমিও না।”

বালতির পানি দুলে উঠে নীল প্লাস্টিকের গায়ে চাপড় মারল। দরজার সামনে তিনজনের হাত একসঙ্গে লেগে গেল, তারপর নওশীন আপা প্রথমে ছাড়লেন—ইচ্ছায় নয়, কারণ বালতি এখন টানাটানিতে উল্টে গেলে সবার সামনেই আবার নোংরা হবে। খালাম্মা “ঈশা!” বলে উঠলেন, কিন্তু ডাকটা আর আদেশের মতো শোনাল না; বরং ভিড়ের সামনে পিছলে যাওয়া মান-সম্মানের মতো।

মেহরাব বালতির ওজন নিজের দিকে টেনে নিল না। সে যদি টেনে নিত, আবার কাজটা একতরফা হয়ে যেত। বরং সিঁড়ির মুখের দিকে শরীর ঘুরিয়ে শুধু বলল, “ধরো।”

ঈশা হাত শক্ত করল। তারা একসঙ্গে বালতি তুলল। ভারে দুজনের কাঁধ একসঙ্গে নিচু হলো, পানির ধাক্কায় বালতি আবার দুলল, কিন্তু আর কেউ তাদের মাঝখানে হাত ঢোকাতে পারল না। ভেতর ঘর থেকে ফুপাতো ভাই আধখাওয়া সিঙ্গারা হাতে উঠে দাঁড়িয়েছিল; আবার বসে পড়ল। নওশীন আপা সরে গেলেন, কিন্তু রাস্তা করে দেওয়ার ভদ্রতা দেখালেন না। তাদের শরীর দিয়েই পাশ কাটিয়ে যেতে হলো—এইটুকুই যথেষ্ট।

সিঁড়ির প্রথম মোড়টা সবচেয়ে খারাপ। ভেজা সিমেন্ট, পুরোনো রড বেরোনো দেওয়াল, নিচে নামলে বাঁদিকে অন্ধকার। মেহরাব আগে থেকে জানে কোথায় পা ফেলতে হয়। তবু আজ সে একা নয়। বালতির মুখ থেকে পানি ছলাৎ করে পড়ে সিঁড়িতে লম্বা রেখা টেনে দিল। ঈশা পিছলে যাচ্ছিল; মেহরাব কবজি নয়, হাতলের কাছ ঘেঁষে নিজের কনুই এগিয়ে দিল, যেন ছুঁয়ে না গিয়েও ঠেকা দেওয়া যায়।

নিচতলার দিকে নামতে নামতে ওপর থেকে খালাম্মার গলা ভেসে এল, “এইসব ভালো দেখায় না।” কেউ উত্তর দিল না। কারণ উত্তরটা সিঁড়ির মাঝখানেই দেখা যাচ্ছে—দুইজন মানুষ আলাদা আলাদা দোষ বইতে রাজি নয়।

দ্বিতীয় মোড়ে এসে মেহরাব থামল। শ্বাস ভারী, তালুতে প্লাস্টিকের ধার কেটে বসছে। নিচে তার ভাড়া ঘরের দরজা আধখোলা; ভেতরে খাটের পাশে পড়ে আছে দুপুরের না-খাওয়া খাবারের বক্স। এতক্ষণে ডাল জমে গিয়ে ওপরে চামড়া পড়ে গেছে নিশ্চয়। উপরে এখনও অনেক কাজ বাকি—ড্রেন, সিঙ্ক, বারান্দা। কিছুই শেষ হয়নি।

সে বালতি নামিয়ে মাঝসিঁড়িতে রাখল না; দুহাতে হাতল ধরে মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় স্থির করে দাঁড়াল, যেন ওজনটা হঠাৎ কাউকে একা না চাপে। তারপর খুব আস্তে বলল, “ছাড়লে পড়বে।”

ঈশা কিছু বলল না। শুধু নিজের হাতও হাতলে রেখে দিল, তার লাল কবজি নীল প্লাস্টিকের ধারে ঠেকে আছে। সিঁড়ির সরু জানালা দিয়ে ঢাকার ধুলোমাখা রাতের আলো এসে বালতির পানিতে কেঁপে উঠল। দুজনের হাতের টানে হাতল দুটো একটু একটু দুলছিল; তারপর সেই দোলাও থেমে গেল।