রেখা পুড়ল, তবু ভাঙল না
“ওই দিক দিয়ে না,” দরজার ফ্রেমে হাত রেখে সাফওয়ান মেহরাবকে থামাল, যেন ঘরের ভেতর নয়, তার শ্বাসও ঢোকা নিষেধ। “বাইরের বারান্দা দিয়ে যাও। মামারা বসে আছে।”
হাতে মেহরাবের ভাঁজ-খোলা বিলের কাগজ, গলায় পুরোনো ল্যানিয়ার্ডে ঝুলে থাকা মলিন পরিচয়পত্র, কাঁধে বাজারের ব্যাগ। তাসনিয়া খালার বাড়িতে সে ভাড়াটে না, আবার অতিথিও না—আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা ধরে উঠোনপেরোনো এক লোক, যে থাকছে কারণ কৃষি সরঞ্জামের হিসাবের অস্থায়ী কাজটা না ধরতে পারলে গ্রামে ফেরার ভাড়া জুটবে না। ভেতরে ডাইনিং টেবিলে প্লেটের শব্দ, খালার গলা, নাহিদার হাসি। শুধু তার জন্যই সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে রেখেছে, শরীরের সমান সমান্তরাল এক সীমানা।
মেহরাব বলল, “চা নামিয়ে দিই, খালা বলেছেন।”
“আমি নেব।” সাফওয়ান ব্যাগটা হাতে নিতে গিয়ে তার আঙুল ছুঁয়ে ফেলতে ফেলতে থামল, তারপর আরও কড়া গলায় বলল, “সব কাজ করতে হবে না। যে কাজ বলা হয়, শুধু ওইটাই করো।”
কথাটা শুনে ভেতর থেকে রিদওয়ান হেসে উঠল, “গ্রামের ছেলেরা একবার ঘর চিনে ফেললে সবখানেই ঢুকে পড়ে।” হাসির ভিতরে যে অবজ্ঞা, সেটা সস্তা প্লাস্টিকের জগের মতো টং করে বাজল। মেহরাব সরে যেতে চাইল। তখনই সাফওয়ান ব্যাগটা টেনে নিজের দিকে নিল, এমনভাবে যে দুইজনের মাঝখানের ফাঁক হঠাৎ খুব কমে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে সে পাশ কেটে দাঁড়িয়ে পথ খুলে দিল—বারান্দার সরু রাস্তা, ভিতরের ঘর নয়।
এ অন্যায়, কিন্তু তবু এই ছুঁইছুঁই টানটাই প্রথমে চোখে লাগে। মেহরাব সেটা মুখে আনে না। মাথা নিচু করে বারান্দা দিয়ে যায়। ভিতরে আলো, বাইরে ধুলো, টিনের চালের গরম। তার পেছনে দরজা লাগেনি—কিন্তু বন্ধের মতোই শোনাল।
ঢাকার ওই মহল্লায় সন্ধ্যা নামলে বাড়িগুলো আরও কাছাকাছি সরে আসে। তাসনিয়া খালার তিনতলা বাড়ির নিচে কৃষি যন্ত্রপাতির ছোট গুদামঘর, ওপরতলায় বাসা। হিসাবের খাতা, ডেলিভারির রসিদ, চালানের কপি সব শেষে উঠে আসে ডাইনিং টেবিলে। খালা বলে, “মেহরাবের হাতের লেখা পরিষ্কার, কাজে লাগে।” আবার লোক আসলে বলে, “ছেলেটা ক’দিন আছে, নিজের মতো থাকে।” এই দুই কথার মাঝখানে ঝুলেই তার দিন কাটে।
সেদিন রাতের খাওয়া বসার সময় দ্বিতীয়বার সীমানাটা কষা হল। নাহিদা চেয়ার টেনে বলল, “ভাইয়া, এখানে বসুন।” মেহরাব বসার আগেই সাফওয়ান পানি ভরা জগ নামিয়ে চেয়ারটা সরিয়ে দিল। “ওখানে না। হিসাবের খাতা ভিজবে। তুমি ওদিকে, সাইড স্টুলে বসো।”
সাইড স্টুল রান্নাঘরের মুখে, যেখানে কাজের মেয়েও বসে না। তাসনিয়া খালা তাকিয়ে ছিলেন, কিছু বললেন না। মেহরাব স্টুলে বসতেই তার সামনে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে পাতলা আস্তরণ, নিচে গোল দাগ। নাহিদা অস্বস্তিতে ভাত বাড়তে গিয়ে হাত থামাল। রিদওয়ান নিচু গলায় বলল, “শৃঙ্খলা থাকলে সবার সুবিধা।” সাফওয়ানের মুখে তখন সেই একই নিরাসক্তি—যেন সে কাউকে ছোট করছে না, শুধু ঘর চালাচ্ছে।
খাওয়া শেষে মেহরাব থালা তুলতে উঠেছিল। রান্নাঘরের দরজায় সাফওয়ান আবার এসে দাঁড়াল। “এগুলো রাখো। ওপরে স্টোররুমের চাবি কই?”
“খালার টেবিলে।”
“না, এখন থেকে আমার কাছে থাকবে।”
কথাটা সবার সামনে। অথচ মিনিট দশেক পর, সিঁড়ির মোড়ে, কেউ না থাকতেই সাফওয়ান নিচু গলায় বলল, “ওই খাতাগুলো আজ রাতে নিচে রেখো না। রিদওয়ান তার বন্ধুর কোম্পানির কোটেশন ঢোকাতে চাইছে। তুমি যা লিখেছ, সেটা বদলাবে।”
মেহরাব থমকে গেল। “তাহলে সবার সামনে—”
“আমি যা বলছি, করো।” সাফওয়ান চোখ তুলল না। চাবিটা আঙুলের ডগায় ঝুলছিল, কিন্তু দেয়নি। “আর তোমার ঘরের দরজা ভেজিয়ে ঘুমিও। নিচতলায় লোক উঠানামা করবে।”
এ কেমন অপমান, যে একই মানুষ জনসমক্ষে সরে দেয়, একলা পেলে আড়ালও করে? মেহরাব উত্তর দিল না। তবু রাতে খাতা নিচে রাখল না।
পরদিন দুপুরে গুদামঘরের সামনে ডেলিভারির লোক এলো। বড় কার্টনের মুখ কেটে ভেতরের যন্ত্রাংশ মিলিয়ে দেখা দরকার। মেহরাব নিচু হয়ে খোলা কার্টনের পাশ থেকে চালান তুলছিল, ঠিক তখন ওপরে থেকে রিদওয়ান ডাকল, “এইটা আগে ধরো।” সে ঘুরতেই কার্টনের ভারী ঢাকনা মাথার দিকে নেমে এল। পাশ থেকে এক হাত এসে ঢাকনাটা চেপে ধরল—সাফওয়ান। ঠাণ্ডা গলায় বলল, “দেখে কাজ করো না? মাথা ফেটে গেলে হাসপাতালে নিয়ে ঘুরবে কে?”
শুনতে ধমক। কিন্তু ঢাকনার ধারটা নিজের কবজিতে কেটে নিয়েও সে হাত সরাল না। রক্তের সরু দাগ দেখা গেল। রিদওয়ান ইতস্তত করে বলল, “আমি তো দেখিনি...” সাফওয়ান তখন মেহরাবের দিকে তাকালই না, শুধু বলল, “তুমি উপরে যাও। এইখানে ভিড় কোরো না।”
উপরে গিয়ে মেহরাব দেখল, তার ঘরের সামনে ছোট টেবিলে ভাঁজ করা এক টুকরো ওষুধের পাতা আর তুলা রাখা। কেউ রেখে গেছে। নাম নেই, ডাক নেই। তবু কে রেখেছে, বোঝা যায়।
সেই রাতেই মধ্যরাতের দিকে বিদ্যুৎ গিয়েছিল, পরে এলো। সিঁড়ির পাশের করিডরে ক্ষীণ বাতির গুঞ্জন, দেয়ালে লম্বা ছায়া। মেহরাব নিচে নামছিল পানির বোতল নিতে। মোড় ঘুরতেই সামনে সাফওয়ান। খুব কাছে নয়, তবু এতটাই কাছে যে পেছোতে হলে সিঁড়ির ধাপে শব্দ হবে।
“তুমি কাল থেকে আর আসবে না,” সাফওয়ান বলল।
মেহরাবের বুক শক্ত হয়ে গেল। “কাজটা গেছে?”
“আমি বলেছি, আসবে না।”
“কারণ?”
“কারণ এই বাড়িতে সবাই সব দেখে। যা দেখে না, সেটাও বানিয়ে নেয়।”
মেহরাব হেসে ফেলল, তেতো হেসে। “তাহলে সোজা বলেন। আমি বোঝাই সমস্যা।”
সে পাশ কাটিয়ে নামতে যাচ্ছিল। ঠিক তখন সাফওয়ানের হাত এসে তার কবজি আটকে দিল। শক্ত না, কিন্তু ছাড়ার মতোও না। করিডরের বাতির গুঞ্জন কানের কাছে ঘুরছিল। মেহরাব তাকিয়ে রইল। সাফওয়ানের আঙুলের নিচে তার নাড়ি ধকধক করছে, আর সাফওয়ানও সেটা নিশ্চয়ই টের পাচ্ছে। এক শ্বাস, আরেক শ্বাস। অসম্ভব ছোট্ট এক মুহূর্ত, অথচ ততক্ষণে সবকিছু বদলে গেছে—ধমক, তাচ্ছিল্য, দূরত্ব—সব মিথ্যে হতে শুরু করেছে।
নিচতলা থেকে কারও স্যান্ডেলের শব্দ উঠতেই সাফওয়ান হাত ছেড়ে দিল। এত দ্রুত সরল যেন কিছুই হয়নি। শুধু বলল, “উপরে যাও।”
মেহরাব গেল, কিন্তু ঘুমাল না।
সকালে সে ঠিক করল, আর থাকবে না। যে কাজের জন্য এমন অবস্থা, সেটা থাকুক। তাসনিয়া খালা ফজরের পর আবার ঘুমিয়েছেন, ঘর চুপচাপ। মেহরাব নিজের ছোট ব্যাগ গুছিয়ে নিল। ল্যানিয়ার্ড খুলে ভাঁজ করে রাখল। তারপর নিচে নেমে হিসাবের টেবিলের পাশে দাঁড়াল, একবার শেষবারের মতো খাতা দেখে যাবে বলে।
খাতার ওপর নতুন রসিদ, পুরোনো চালানের নীচে অর্ধেক ভাঁজ করা একটা কাগজ বেরিয়ে ছিল। টেনে তুলতেই সে চিনল—তার গত মাসের বেতন অগ্রিম দেওয়ার দোকানের রসিদ। সে তো টাকা হাতে পায়নি। রসিদের পেছনে সাফওয়ানের হাতের লেখা, ছোট, চাপা: “মেহরাব—বাসা/খাবার কাটা যাবে না। নিচতলার কাজে পূর্ণ মজুরি।” পাশে গুদামের অতিরিক্ত চাবির নম্বর, আর নতুন এন্ট্রিতে রিদওয়ানের নাম কেটে তার নাম বসানো। কালির দাগ শুকনো, কিন্তু একদিনের না।
মেহরাব স্থির দাঁড়িয়ে রইল। এতদিন যে অপমানগুলো খোলা ছিল, তাদের ভেতরে এই গোপন সেলাই কে করে গেছে, এখন সে হাতের লেখা দিয়ে প্রমাণ হয়ে টেবিলে পড়ে আছে। পেছন থেকে তাসনিয়া খালার ঘুমঘুম গলা এল, “মেহরাব, খাতাটা পেয়েছিস? সাফওয়ান বলছিল নিচের হিসাব তুই দেখবি এখন থেকে। রিদওয়ানের হাতে গরমিল।”
“এখন থেকে?” মেহরাব ঘুরল না।
“হ্যাঁ রে। ছেলেটা কাল রাতেই সব গুছিয়ে রেখেছে। তোকে যেন কেউ বিরক্ত না করে।”
খালা আবার ভেতরে চলে গেলেন। মেহরাবের হাতে কাগজ কুঁচকে গেল না; বরং আরও সোজা হল। কষ্টটা কমল না, উল্টো ধারালো হল। এত যদি করেই থাকে, তবে সামনে সামনে এত অপমান কেন? কার জন্য এই অভিনয়? ঘরটার জন্য? আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার জন্য? নাকি নিজের জন্য?
সকাল গড়িয়ে দুপুর। মেহরাব চলে যাওয়ার জন্যই ব্যাগ কাঁধে নিল। তবু যাওয়ার আগে সে চাবিটা টেবিলে রাখল, খাতাটা বন্ধ করল, অর্ধভাঁজ রসিদটা পকেটে ঢোকাল না—খোলাই রেখে দিল। যে সত্য লুকিয়ে ছিল, সেটা আড়াল করে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে হল না।
সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ উঠতেই সাফওয়ান নিচ থেকে উঠছিল। হাতে ফোন, কপালে টান। চোখ পড়তেই থেমে গেল। তারপর প্রথমেই বলল, “তুমি যাচ্ছ কোথায়?”
“যেখানে গেলে কারও নিয়ম নষ্ট হবে না।” মেহরাব সোজা দাঁড়িয়ে রইল। “চাবি টেবিলে।”
সাফওয়ানের গলা শক্ত হল। “তোমাকে চাবি ফেরত দিতে বলিনি।”
“আপনি অনেক কিছুই বলেননি।” মেহরাব এক ধাপ ওপরে উঠল। তাদের মাঝে সিঁড়ির রেলিং, বদ্ধ বাতাস, দুপুরের কাটা আলো। “সবার সামনে যা বলেন, সেটা আর ভেতরে যা করেন—দুটার একটা বেছে নেন।”
সাফওয়ানও উঠল, দ্রুত। “নিচে খালা আছেন।”
“তাই তো।” মেহরাব মুখ ফিরিয়ে সিঁড়ির মোড়ের দিকে হাঁটল, যেখানে ল্যান্ডিং-এর পাশে বড় আয়নাটা ঝুলে। আয়নার সামনেই উপরের করিডরের মুখ—এই বাড়ির সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁক; যে এখানে থামে, তাকে দুদিক থেকেই দেখা যেতে পারে। মেহরাব জানত। তবু সে সেদিকেই গেল।
পেছন থেকে সাফওয়ানের পায়ের শব্দ এল। তারপর, আয়নার রেখার ঠিক আগে, তার কবজিতে আবার সেই হাত। এবার আরও তাড়াহুড়া, আরও প্রকাশ্য ঝুঁকি নিয়ে। “ওইদিকে যেও না,” সাফওয়ান ফিসফিস করে বলল, কিন্তু ফিসফিসানিতেও আদেশের ধার। “এখন না।”
মেহরাব ফিরে তাকাল। এত কাছে যে সাফওয়ানের শ্বাসে চায়ের গন্ধ, অনিদ্রার শুষ্কতা। নিচতলা থেকে থালার ঠোকাঠুকি, কারও কাশি, দূরে আজানের ভাঙা ধ্বনি। এই ঘরে, এই আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার ভেতর, এইটুকু দাঁড়িয়েই সব শেষ হয়ে যেতে পারে। অথবা শুরু।
সাফওয়ানের হাত তার কবজিতে। পথ বন্ধ। ফাঁক খুব কম। আর এক ধাপ নিলে শরীর ছুঁয়ে যাবে।
মেহরাব নিচু গলায় বলল, “ছাড়ুন।”
সাফওয়ান ছাড়ল না। শুধু বলল, “তুমি গেলে নিচের কাজ আমি কাউকে দেব না।”
“দয়া করছেন?”
“না।”
“তাহলে?”
সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত হল। উত্তর এল না। কিন্তু হাতের চাপ বদলাল—ধরার জন্য না, থামানোর জন্য। সেই থামানোতেই মেহরাব হঠাৎ বুঝল, এতদিন সে শুধু সাফওয়ানের ভয়ের ভাষা শুনেছে; আজ প্রথমবার তার ব্যতিক্রম দেখছে। সামাজিক দামে কেনা, তবু সত্যি।
মেহরাব সামনে ঝুঁকতে পারত। আয়নার রেখা পেরিয়ে, এই আটকানো কবজির ভেতর দিয়ে এক ধাপ নিলেই সব ভেঙে যেত। সেই সম্ভাবনা দুজনের মাঝখানে ঝুলে রইল, জ্বলন্ত তারের মতো। নিচে কারও গলার শব্দ ভেসে উঠল, “সাফওয়ান?”
এইবার সিদ্ধান্তটা মেহরাব নিল। সে আর এক ধাপও এগোল না। ধীরে, স্পষ্টভাবে নিজের কবজি সাফওয়ানের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল না—বরং হাতটা যেখানে আছে, সেখানে এক নিঃশ্বাস সময় রেখে দিল, যেন থামানোটা অস্বীকার করছে না। তারপর সে নিজের শরীর সোজা করল, আয়নার রেখা থেকে আধা হাত দূরে দাঁড়িয়ে গেল। বলল, খুব আস্তে, “তাহলে রেখাই থাক।”
এর বেশি কিছু নয়। না নাম, না প্রতিশ্রুতি, না ছোঁয়া। শুধু সোজা দাঁড়িয়ে থাকা, নিজের জায়গা নিজে ঠিক করে নেওয়া। ব্যাগটা সে কাঁধে রেখেই দিল, নামাল না। আবারও এক ধাপ নেওয়ার অধিকার ছিল; সে নিল না।
সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর আয়নায় কাটা আলো এসে পড়েছিল। পাশাপাশি নয়, মুখোমুখি নয়—এক তির্যক দূরত্বে তাদের শ্বাস গিয়ে কাচে জমল। কুয়াশার মতো সাদা দাগ এক মুহূর্ত ধরে রইল, তারপর ঠাণ্ডা বাতাসে ঝাপসা রেখাটা ভাঙল না, শুধু আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগল।