Fast Fiction

আসল স্কিল উঠতেই সব চুপ

নাইরা থেমে গেল আইল-ধারের মনিটর ওয়েজের পাশে, কারণ তার কালো কাপড়ে ঢাকা কনসোলের ওপর ইতিমধ্যেই রিদওয়ানের হাত। মাইকে ঘোষণাও হয়ে গেছে—“টিম লিড, রিদওয়ান হোসেন।” সামনে প্রথম সারিতে শাওন স্যার, দুজন স্পনসর, আর তুলি খালা বসে আছেন; তুলি খালার পাশে মাহিরা, গালে ঈদের পরের মতো সাজের হালকা ঝিলিক, কিন্তু চোখে সেই চেনা সতর্কতা—আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা যখন দুই পরিবারে গড়ায়, তখন কার নাম মাইকে ওঠে, সেটাও খবর হয়। নাইরার হাতে ভাঁজ-খোলা হতে হতে নরম হয়ে যাওয়া একটা রসিদ; গতরাতে নিজে কেনা সেন্সর-কেবলের টাকা। তার বুড়ো আঙুলে পুরোনো কলমের কালি-দাগ। কনসোলটা সে বানিয়েছে, রাত জেগে কৃষি-সেচের লাইভ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সে দাঁড় করিয়েছে, আর আজ তার জন্য রাখা স্টুলটাও তুলে নিয়ে রিদওয়ানের পাশে রাখা হয়েছে আরেকজন ভলান্টিয়ারের জন্য।

রিদওয়ান পিছন ফিরে তাকে দেখে এমন ভঙ্গিতে হাসল, যেন সে দেরি করা ল্যাব-সহকারী। “তুমি সাইডে থাকো, নাইরা। প্রশ্ন এলে ডেটা-লগ নিয়ে বলবা। লাইভ চালানোটা আমি নেব।”

নাইরা স্টেজের ধাপে ওঠেনি। আইল-ধারের সরু ফাঁকে দাঁড়িয়েই দেখল, কনসোলের ডানপাশে তার লাগানো সুরক্ষা-কী খুলে অন্য জায়গায় ঢোকানো। সে এক সেকেন্ডের জন্য দরজার চৌকাঠে থামা মানুষের মতো থেমে রইল, তারপর নিচু গলায় বলল, “তৃতীয় চ্যানেলের মাটির আর্দ্রতা সেন্সরটা ড্রিফট করছে। বেইসলাইন না ক্যালিব্রেট করে পাম্প তুললে দক্ষিণ ব্লকে ওভারফিড যাবে।”

রিদওয়ান মাইক্রোফোনের বাইরে মুখ না ঘুরিয়েই বলল, “রিহার্সালেই ক্লিয়ার হয়েছে।”

“রিহার্সালে ওই সেন্সর বদলাওনি,” নাইরা বলল।

শাওন স্যার সামনের সারি থেকে বিরক্ত গলায় হাত নাড়লেন। “এখন বাধা দিও না। সময় কম।”

প্রথম পুরস্কারটা তখনই এল, ছোট কিন্তু ধারালো। কনসোলের উপরের লাইভ ম্যাপের দক্ষিণ ব্লক একবার হলুদ ঝিলিক দিয়ে উঠল। নাইরা আইল থেকে না উঠেই বলল, “দেখছেন? ড্রিফট শুরু।”

রিদওয়ান তাড়াতাড়ি একটা স্লাইডার ঠেলে দিল। হলুদ লাল হয়ে উঠল, তারপর পাশের ডিজিটাল গেজে চাপ কেঁপে উঠল। সামনের সারিতে বসা একজন স্পনসর সামান্য উঠে বসলেন। কিন্তু শাওন স্যার আবার মাইকের দিকে ঝুঁকে হেসে বললেন, “লাইভ সিস্টেমে মাইনর ফ্লাকচুয়েশন থাকে। টিম প্রস্তুত।”

টিম। শব্দটা এমন সহজে বেরোল যে যেন নাইরা কাঠের স্ট্যান্ড। তুলি খালা পাশ ফিরলেন না, তবু তার আঙুলের চুড়ি একবার ঠুক করে লাগল। মাহিরা শুধু একবার চোখ তুলল; সেই চোখে প্রশ্ন নেই, আছে হিসাব—আজ এখানে যা হবে, সন্ধ্যায় ডাইনিং টেবিলে তা অন্য রূপ নেবে।

ডেমো শুরু হলো। বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে—ঢাকার বাইরে পরীক্ষামূলক কৃষি-প্লটে চার ব্লকের পানি সরবরাহ, মাটির আর্দ্রতা, চাপ, আর স্বয়ংক্রিয় ভাল্‌ভ। রিদওয়ান গলায় চকচকে আত্মবিশ্বাস ঝুলিয়ে বলছে, “এই অ্যালগরিদম শুষ্ক প্লটে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়।” সে বলার সময় হাতে হাতা গুটিয়ে নিয়েছে, যেন শ্রমও তার। নাইরার বুকের ভেতর কিছু শক্ত হয়ে থাকল। সে জানে কোন লাইনে সিদ্ধান্ত হয়, কোন থ্রেশহোল্ডে পাম্প নামে, কোন ভুলে পাইপ ফেটে যেতে পারে—কারণ সেই ভুলগুলো সে রাত দুটায় নিজে ধরে ঠিক করেছে।

জাজ প্যানেলের একজন বললেন, “ঠিক আছে, এখন লাইভ রেসপন্স দেখান। উত্তর ব্লকে আর্দ্রতা কমছে—সিস্টেম কী করে?”

রিদওয়ান কমান্ড দিল। পর্দায় উত্তর ব্লকের ভাল্‌ভ খোলার বদলে দক্ষিণ ব্লকের চাপ বাড়ল। সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পাশের স্বচ্ছ পাইপে পানি দপদপ করে উঠল, তারপর কাঁপল। হলের মধ্যে শুকনো কাগজ মচমচে আওয়াজের মতো চাপা গুঞ্জন ছড়াল। রিদওয়ান আবার কমান্ড দিল। এবার পুরো ম্যাপ তিন সেকেন্ডের জন্য জমে গেল।

“হ্যাং করেছে কেন?” সামনের সারি থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল।

রিদওয়ান হেসে বলল, “নেটওয়ার্ক—”

“অফলাইন লুপ,” নাইরা আইল থেকে বলল। “নেটওয়ার্ক না। তোমার ফেইলওভার ভুল পোর্টে গেছে।”

রিদওয়ান এবার ঘুরে তাকাল। সেই প্রথম তার মুখে হালকা ফাঁটল দেখা গেল। “তুমি চুপ থাকবে?”

কিন্তু তার কণ্ঠের ওপরেই স্টেজের পাইপে চাপ বাড়ল, একজোড়া ক্ল্যাম্প ককিয়ে উঠল, আর লাইভ ম্যাপে লাল সতর্কতা নেচে উঠল। ভলান্টিয়ার ছেলেটা যে স্টুলে বসেছিল, সে নিজেই পিছিয়ে গেল। স্পনসরদের একজন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “সিস্টেম বন্ধ করুন।”

রিদওয়ানের আঙুল কনসোলের ওপর থমকালো। বন্ধ করার সিকোয়েন্স সে মুখস্থ করেনি—কারণ সেটি শো-পিস অংশ ছিল না। নাইরা আর অনুমতি চাইল না। আইল থেকে উঠে সোজা স্টেজে গেল। রিদওয়ান হাত বাড়িয়ে কনসোল ঢাকতে চাইল, “নাইরা, নষ্ট কোরো না—”

নাইরা তার কব্জি সরিয়ে সুরক্ষা-কী টেনে বের করল, নিজের পকেট থেকে পুরোনো নীল টেপ জড়ানো আসল কী ঢুকিয়ে এক টানে ঘুরিয়ে দিল। পর্দা কালো হলো না; বরং ডানদিকে জরুরি মানচিত্র খুলে গেল। সে একসাথে তিনটা কাজ করল—দক্ষিণ ব্লকের পাম্প ম্যানুয়াল কেটে দিল, ফেইলওভার রুট বামপাশের টগলে ফিরিয়ে আনল, আর নিচের ছোট নক ঘুরিয়ে চাপ নামাল। স্বচ্ছ পাইপের কাঁপুনি ধীরে থেমে গেল। তিন সেকেন্ড। চার। লাল আলো কমে হলুদ, হলুদ থেকে সবুজ।

হলটা এমনভাবে স্থির হলো যেন কেউ গরম ভাতে হঠাৎ ঢাকনা দিয়ে দিয়েছে। প্রথমে সামনের সারির চোখ ফিরল, তারপর পাশের আইল ধরে দাঁড়ানো ছাত্রদের মাথা। রিদওয়ান এখনও মাইকের পাশে দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার জায়গা ফাঁকা। মাইকের মুখ তার দিকে, ক্ষমতা আর নেই।

জাজ প্যানেলের বয়স্কা মহিলা চশমা নামিয়ে বললেন, “এটা কে করল?”

নাইরা কনসোল থেকে হাত না সরিয়ে বলল, “আমি।”

রিদওয়ান তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল। “ম্যাম, আমরা একই টিম। ডিজাইন আমার—ও অপারেশনাল—”

“ভুল,” নাইরা বলল, চোখ না তুলে। “ফেইলওভার টেবিল, জরুরি কাট-সিকোয়েন্স, সেন্সর ফিল্টার—সব আমি লিখেছি। আপনি চাইলে এখনই আরেকটা লাইভ কেস দিন।”

শাওন স্যার তখন উঠে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু তার স্বর আগের মতো শক্ত না। “এইভাবে পাবলিকলি—”

স্পনসরের লোকটা তাকে থামিয়ে দিল। “পাবলিক ডেমোতেই তো বোঝা যাচ্ছে।”

তুলি খালা এবার পুরো শরীর ঘুরিয়ে তাকালেন। মাহিরার ঠোঁট শক্ত, কিন্তু চোখ সরে নেই নাইরার হাত থেকে। সামাজিক দূরত্বের যে পর্দা এতদিন ছিল, সেটার সুতো তখন সামনেই ছিঁড়ছে—কার নাম ঘরে গেলে সম্মান বাড়বে, কার নাম গেলে ব্যাখ্যা দিতে হবে, হিসাব বদলাচ্ছে।

রিদওয়ান মরিয়া গলায় বলল, “আমি তো কনসেপ্ট দিয়েছি। ও টেকনিক্যাল—”

“স্টুলটা সরাও,” জাজ প্যানেলের মহিলা বললেন ভলান্টিয়ারকে। “ওই কনসোলে এখন যে বসে কাজ করছে, জায়গাটা তার।”

ভলান্টিয়ার ছেলেটা তৎক্ষণাৎ স্টুলটা রিদওয়ানের দিক থেকে টেনে এনে নাইরার পেছনে রাখল। ক্ষুদ্র শব্দ, কিন্তু ধার ছিল। সামনে বসা কয়েকজন ছাত্র ফিসফিস থামিয়ে দিল। রিদওয়ান এক পা পিছোল; যেন মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও আইলে সরে গেছে।

মাহিরা তখনই উঠে দাঁড়াল। সে সামনের সারির চেয়ার ছেড়ে এক ধাপ আইলের দিকে এল—খুব ছোট, কিন্তু দেখা যায়। তুলি খালা তার ওড়নার প্রান্ত টেনে নিলেন, যেন আচমকা বেশি কাছে চলে আসা আটকান, আবার নিজের চোখও ফেরালেন না। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার জায়গায় এমন ছোট নড়াচড়াও ঘোষণা।

জাজ বললেন, “শেষ সিদ্ধান্তের আগে একটা আনরিহার্সড চ্যালেঞ্জ। এখনই। কোনো স্লাইড না, কোনো ব্যাখ্যা না। উত্তরের ব্লকে সেন্সর ড্রপ, পূর্বে চাপ কম, আর পশ্চিমে আকস্মিক চাহিদা—একসাথে সামলান। যিনি পারবেন, সিস্টেমের মালিকানা নিয়ে আর প্রশ্ন থাকবে না।”

রিদওয়ান দ্রুত বলল, “ম্যাম, আমরা দুজন মিলে—”

“না,” জাজ বললেন। “একজন।”

মাইকের সামনে বাতাস শুকিয়ে গেল। রিদওয়ান দাঁত চেপে বলল, “আমি করতে পারি।”

নাইরা তখন স্টুলে বসল না। দাঁড়িয়েই দুহাতে কনসোল ধরল। “চ্যালেঞ্জ দিন।”

শাওন স্যার কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। স্পনসরের লোক নোটপ্যাড খুললেন। সামনে কোথাও একটা পাতলা কাগজ মচমচ করে ভাঁজ হলো—সম্ভবত তুলি খালার ব্যাগে রাখা কোনো বিল, অথবা কারও রেজিস্ট্রেশন স্লিপ। শব্দটা অকারণে বড় শোনাল।

বড় পর্দায় একসাথে তিনটা সতর্কতা জ্বলে উঠল। উত্তর ব্লকের সেন্সর ড্রপ মানে ডেটা অন্ধ; পূর্বের চাপ কম মানে সরবরাহ ঝুঁকিতে; পশ্চিমে আকস্মিক চাহিদা মানে যদি সে ভুল অগ্রাধিকার দেয়, পুরো নেটওয়ার্ক দুলে উঠবে। রিদওয়ান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু বলার জায়গা পাচ্ছিল না। তবু শেষ চেষ্টা করল, “ও আগে থেকেই জানত—”

নাইরা প্রথমেই চোখ নয়, কান ব্যবহার করল। কনসোলের ভেতরের ক্ষীণ রিলের টিকটিকিতে সে ডানপাশের সেকেন্ডারি পাম্পের বিলম্ব ধরল। সে আঙুলের ডগায় পশ্চিমের লোড অর্ধেক নামাল, একসাথে উত্তর ব্লককে অনুমান-চালিত মোডে পাঠাল—ডেটা না এলে পূর্বের কাছাকাছি আর্দ্রতার ছায়া ধরে কাজ করবে—আর বাঁ হাত দিয়ে নিচের সিলভার টগল টেনে সেকেন্ডারি পাম্প জাগাল। বড় পর্দায় লাইনগুলো একবার কেঁপে নতুন রুট নিল।

“চাপ পড়ে যাবে,” রিদওয়ান হুঙ্কার ছাড়ল।

পড়ল না। বরং পূর্ব ব্লকের গেজ ধীরে উঠতে লাগল। নাইরা সেখানে থামেনি। সে নিচু হয়ে কনসোলের বামপাশের সার্ভিস ঢাকনা খুলে ভেতরের আলগা জ্যাক চেপে বসিয়ে দিল—যেটা রিদওয়ান রিহার্সালের সময় কখনও ছোঁয়নি, ছুঁলেও চিনত না। পর্দায় উত্তর ব্লকের মৃত সেন্সর চিহ্নটা ধূসর থেকে কমলা, তারপর স্থির হলুদে ফিরল। ডেটা পুরো না, কিন্তু যথেষ্ট। সে সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমের লোড আবার বাড়াল, তবে সরাসরি নয়—দুই ধাপে, যেন ক্ষুধার্ত জমিকে একসাথে ডুবিয়ে না দেয়।

সামনের সারি থেকে একটি গভীর শ্বাসের শব্দ এল। কেউ চাপা স্বরে বলল, “এই অংশটা তো স্লাইডে ছিল না।” স্পনসরের লোকটা এবার বসা ছেড়ে পুরো সামনে ঝুঁকে পড়েছে। শাওন স্যারের মুখের কর্তৃত্ব জ্যাম লেগে যাওয়া দরজার মতো আধখোলা। রিদওয়ান মাইকের স্ট্যান্ড ধরেছিল; হাতের গাঁট সাদা। সে বলল, “এগুলো টিমের—”

নাইরা এবার প্রথমবার মাথা তুলল। “তাহলে লাইভে তুমি কেন থেমে গিয়েছিলে?”

বাক্যটা ছোট। মাইক্রোফোনে নয়। তবু হলের মাঝখান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল। রিদওয়ানের মুখে উত্তর ওঠেনি। তার বদলে পর্দায় পশ্চিম ব্লক সবুজে ফিরল, তারপর পূর্ব, তারপর উত্তর। চারটা ব্লকই স্থির। স্বচ্ছ পাইপে পানির চলা এখন সমান, অহংকারহীন।

জাজ প্যানেলের মহিলা বললেন, “সবচেয়ে কঠিন সিকোয়েন্সটা বাকি। জরুরি ওভাররাইড ছাড়া পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভারসাম্যে নিন। হাতে ধরে রাখলে হবে না।”

এটাই ফাঁদ। হাতে বাঁচানো এক জিনিস, সিস্টেমকে নিজে দাঁড় করানো আরেক। রিদওয়ান সোজা হয়ে উঠল, যেন আবার সুযোগ পেল। “আমি—”

নাইরা তার আগেই কনসোলের মাঝের লাল ঢাকনাওয়ালা সুইচটা তুলে দিল। হলের অনেকেই নিশ্বাস চেপে রাখল; ওই ঢাকনা ওঠা মানেই সিস্টেমকে পরীক্ষার সত্যিকারের মুখে ছাড়া। সে দ্রুত তিনটি মান লিখল—উত্তরে অনিশ্চয়তার সহনসীমা, পূর্বে চাপ-পুনরুদ্ধারের সীমা, পশ্চিমে চাহিদা-স্মুথিং। তারপর নিজে হাতে দেওয়া সব অস্থায়ী সমর্থন একে একে ছাড়ল। শেষটায় আঙুল থামল প্রধান ঘূর্ণি-চাকায়।

রিদওয়ান প্রায় ঝাঁপিয়ে বলল, “এটা কোরো না, ক্র্যাশ করবে—”

নাইরা চাকা ঘুরিয়ে দিল।

এক মুহূর্তে বড় পর্দার সব লাইন মুক্ত হলো। নীল স্রোত চারদিকে ছুটল, চাপের গ্রাফ একবার নিচে ডুবে উঠে দাঁড়াল, আর উত্তর ব্লকের হলুদ চিহ্ন দুলে ধীরে সবুজে এসে থামল। কোথাও বিস্ফোরক নাটক নেই—শুধু নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, যেটা সবচেয়ে নির্মম, কারণ সেখানে অজুহাতের জায়গা থাকে না। মঞ্চের পাশে ছোট ডেমো-ট্যাংকের পানির পৃষ্ঠ কেঁপে থিতিয়ে গেল। স্বচ্ছ পাইপে কোনো দপদপানি নেই। কনসোলের লাল সতর্কতাগুলো নিভে আছে।

রিদওয়ানের হাত মাইকের স্ট্যান্ড থেকে সরে গেল। সে বলল, “ম্যাম, আমার প্রেজেন্টেশন—”

“নামুন,” স্পনসরের লোকটা বলল, এবার মাইক্রোফোন ছাড়াই। “যে তৈরি করেছে, সে চালিয়েছে। যথেষ্ট।”

কথাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইল ধরে দাঁড়ানো দুইজন ভলান্টিয়ার নিজে থেকেই রিদওয়ানের জন্য রাখা পাশের ডকুমেন্ট-ফোল্ডার সরিয়ে নিল। সামনের সারিতে তুলি খালা খুব আস্তে ওড়না গুছালেন, কিন্তু তার মুখের রেখা বদলে গেছে; যে লোককে নিয়ে ঘরে গর্ব করে কথা বলা যায়, তার চেহারা এখন অন্য। মাহিরা আর এক ধাপ এগিয়ে আইলের কিনারায় এসে দাঁড়াল। নাইরার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁট কাঁপল না; মাথা সামান্য নত হলো, যেমন কেউ প্রকাশ্যে পছন্দ লুকিয়ে না রেখে মর্যাদা দেয়।

নাইরা কোনো দিকে তাকাল না। সে শুধু কনসোলের সবশেষ চেক করল—অটো লুপ স্থির, চাপ সমান, চার ব্লক সবুজ। তারপর প্রধান সুইচের পাশে হাত রেখে নিঃশ্বাস ছাড়ল। স্টেজের নিচের মনিটর ওয়েজের ধার ঘেঁষে তার নিশ্বাস মাইকের মৃত ঝিরঝিরির সঙ্গে মিশে একবার কেঁপে উঠল; তারপর বাকি ফিডব্যাক পাতলা হয়ে, আরও পাতলা হয়ে, একেবারে চুপসে গেল।