আসল কর্তাই ফিরল, পথ বন্ধ হল
“এই লেনটা না, আপা, বাইরে দাঁড়ান।” গেটের কাছে হলুদ ফিতে টানা পথের সামনে হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল নাইম ভাই। তার কণ্ঠটা এমন জোরে উঠল যে মেহরীনের পেছনে দাঁড়ানো খালা রওশন, দুই ফুফাতো বোন, এমনকি মেহেদির ট্রে হাতে কাজের মেয়েটাও ঘুরে তাকাল। “ভিআইপি গাড়ি ঢুকবে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লাগে এই লাইনে। আপনি ওদিকে, সাধারণ উঠানামার পাশে।”
মেহরীনের হাতে তখন অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদ, দুপুরে ফুলওয়ালাকে বাকি মিটিয়ে নেওয়ার পর থেকে মুঠোয় চেপে আছে। পাশের প্লাস্টিক টেবিলে এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে উপরটায় চামড়া ধরেছে, কাপের নিচে গোল দাগ পড়েছে। এ বিয়ের গায়ে-হলুদের গাড়ির তালিকা সে নিজেই গত তিন দিন ধরে বানিয়েছে; কোন খালা কখন নামবে, কোন জেলার মামারা রাতের বাস থেকে এসে কোন মাইক্রোতে উঠবে—সব। তবু নাইম ভাই কাঁধ কাত করে এমনভাবে বলল, যেন সে এই ভেন্যুর ভিড়ে এসে দাঁড়ানো বাড়তি কেউ।
খালা রওশন নিচু গলায় বললেন, “মেহরীন, থাক, এখন ঝামেলা করিস না। মেয়েপক্ষের মান-সম্মান আছে।” কথাটা সান্ত্বনা নয়, চেপে ধরার মতো শোনাল। সামনের লেনে কালো কাঁচের প্রিমিও ঢুকতেই নাইম ভাই হাত নেড়ে গার্ডকে ইশারা দিল, আর মেহরীনের দিকে না তাকিয়েই যোগ করল, “বরপক্ষের বড়রা আগে। যে যার জায়গা বুঝে দাঁড়ালে অনুষ্ঠান সুন্দর হয়।”
মেহরীন সরে গেল। মাথা নিচু করে নয়, শুধু এক পা, তারপর আরেক পা। সে যেদিকে পাঠানো হলো, সেদিকের করিডরে সাদা আলো গুনগুন করছিল, জেনারেটরের শ্বাসের মতো শব্দ। পার্কিং অফিসের টিনের দরজার পাশে গিয়ে থামল সে। ভেতরে ড্রাইভার সোহেল রেজিস্টার খুলে নম্বর লিখছে। মেহরীন দরজার ফাঁক দিয়ে বলল, “সোহেল ভাই, কৃষি সমবায়ের দাতাদের জন্য যে তিনটা গাড়ি রাখা হয়েছে, ছাড়পত্র কার হাতে?”
সোহেল মুখ তুলেই উঠে দাঁড়াল। “আপা, আপনার হাতে তো। আপনি না বললে গেট-পাস ছাড়ে না। বড় স্যারের কাগজ আপনার ব্যাগে দিছিলেন সেদিন।” সে নিচের তাক থেকে চাবির রিং তুলল। রিংয়ে নীল ট্যাগ, একটার কোণে পুরোনো কলমের কালির দাগ। “এই দুটো রিজার্ভ গাড়ির চাবিও আপনার কাছে দেওয়ার কথা ছিল। নাইম ভাই নিলেন না?”
মেহরীন কোনো বিস্ময় দেখাল না। শুধু বলল, “রবিনকে ডাকেন।” গেট-সুপারভাইজার রবিন এলে সে হাত বাড়িয়ে রেজিস্টার টানল। নামের পাশে লাল কালি দিয়ে লেখা—দাতা প্রতিনিধিদল, কৃষি সমবায়, ভেন্যু অবদানকারী। নিচে স্পষ্ট নির্দেশ: ছাড়পত্র অনুমোদন—মেহরীন আরা, সমন্বয়ক। সে নিজের ব্যাগ থেকে কার্ড-হোল্ডার বের করল। ভেতরে শক্ত প্লাস্টিকের গেট পাস, ভেন্যুর সীল, তার নাম। এতক্ষণ এই জিনিসটাই ব্যাগের সেলাইয়ের পাশে চুপচাপ ছিল।
“বাইরের সাইড লেন খুলে দিন,” মেহরীন বলল। “দাতাদের গাড়ি ওই দিক দিয়ে নামবে। এই সামনের লেন এখন থেকে শুধু নামানোর জন্য, উঠানো না।”
রবিন থমকাল। বাইরে তখন নাইম ভাইয়ের চিৎকার ভেসে আসছে—“এই সাদা নোয়াহটা ভিতরে আনো, এখানে থামাও!” মেহরীন পাসটা রেজিস্টারের ওপর রাখল। “নির্দেশ কাগজে আছে। আর আমি বলছি। এখন।”
রবিন পাসের সীল দেখে আর একবারও প্রশ্ন করল না। সে বাঁশের মোবাইল ব্যারিয়ার টেনে এক পাশে নিল, সোহেলকে বলল, “সাইড লেন খুলেন। সামনেরটা আটকে দেন। যে গাড়ি আসতেছে, ঘুরায় দেন।” পরের মুহূর্তেই শব্দ বদলে গেল। যে নোয়াহটা সামনে ঢুকছিল, গার্ড হাত তুলে থামাল। ড্রাইভার কাঁচ নামিয়ে মুখ বের করতেই রবিন আঙুল ঘুরিয়ে দেখাল, “পাশের পথ। এই লেন বন্ধ।”
নাইম ভাই যেন প্রথমে কথাটাই বুঝল না। সে দুই পা এগিয়ে এসে বলল, “কী বন্ধ? আমি তো বলছি এখানেই—” কিন্তু ওর বাক্য শেষ হওয়ার আগেই পিছনের আরেকটা গাড়ির হর্ন লম্বা টান দিল। শাড়ির কুচি সামলে দাঁড়ানো দুই খালা সরে গেলেন, মেকআপ করা এক কাজিন জুতোর হিল বাঁচাতে প্রায় দৌড়ে পাশ নিল। সামনে যেখানে একটু আগে নাইম ভাইয়ের ইশারায় পথ খুলছিল, সেখানে এখন গার্ড হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে; আর পাশের সরু লেন দিয়ে প্রথম গাড়িটা ঢুকে গেল।
খালা রওশন এই প্রথম জোরে বললেন, “কী হলো?” রবিন সবার সামনে উত্তর দিল, “মেহরীন আপার অনুমোদনে রুট বদলানো হইছে, খালা। দাতাদের গাড়ি আগে যাবে।”
শব্দটা—“মেহরীন আপা”—শুনে কয়েকটা মাথা একসঙ্গে ঘুরল। মেহরীন করিডরের ছায়া থেকে বেরিয়ে এল। সে কোথাও দৌড়ায়নি, গলা চড়ায়নি। শুধু রেজিস্টারটা ভাঁজ করে বগলে নিল। নাইম ভাইয়ের মুখের আত্মবিশ্বাসে প্রথম ফাটলটা তখনই দেখা গেল; সে হাসির মতো কিছু আনতে চাইল, পেল না।
“আরে, তুমি আগে বললা না কেন?” এবার তার গলায় নরম মসৃণ ভাব। “আমি তো বুঝি নাই। কিন্তু এখন এই সময় রুট পাল্টাইলে গোলমাল হবে। বড়রা দাঁড়ায়া আছে।”
মেহরীন তার দিকে তাকাল, আবার তাকাল না। “গোলমাল যাতে না হয়, তাই পাল্টালাম। দাতাদের গাড়ি আটকে গেলে অনুষ্ঠানই থামবে।”
নাইম ভাই এক লাফে অন্য ভাষা নিল—পরিবার, সম্মান, জরুরি অবস্থা। “খালাম্মা দেখতেছে, বরপক্ষের মানুষ আছে, তুমি এমন কড়াকড়ি করো না। আগে এই একটা গাড়ি ঢুকতে দাও। পরে তোমার যেটা দরকার—”
“আমার দরকার?” মেহরীন শান্ত স্বরে বলল।
কথাটা ছোট ছিল, কিন্তু তার পরেই সোহেল চাবির রিংটা সবার সামনে মেহরীনের হাতে দিল। ধাতব শব্দে কয়েকজন চমকে তাকাল। নীল ট্যাগগুলো দুলে উঠল। সোহেল যেন কার কাছে দিতে হবে এতক্ষণ বুঝে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন বুঝেছে। “আপা, রিজার্ভ দুইটা প্রস্তুত।”
নাইম ভাই সেটাই ধরতে গেল, “দাও, আমি পাঠাই—” মেহরীন হাত সরায়নি, শুধু চাবি নেয়নি তার দিকে। “না। গাড়ি ছাড়বে আমার কথায়।”
সামনের প্যান্ডেলের দিক থেকে ঢাকের তাল এল, সাথে হলুদের গন্ধ। ভেতরে অনুষ্ঠান জমছে, বাইরে লেন আটকে আছে। এই আটকে থাকা সময়টাই নাইম ভাইকে ছোট করে ফেলল। একটু আগে যে লোক লোকজন সরাচ্ছিল, এখন সে নিজেই গার্ড, ড্রাইভার, সুপারভাইজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কারো চোখ ঠিকমতো পাচ্ছে না।
“মেহরীন,” সে এবার নাম ধরে ডাকল, নিচু গলায়, “একটা কাজ করো। এই সিলভার কারটা বরপক্ষের সিনিয়রদের জন্য। ওদের নামিয়ে দিই আগে। তারপর তোমার দাতাদের নাও। প্লিজ। লোকজন দেখতেছে।”
লোকজন সত্যিই দেখছিল। তবে আগের মতো নিরাপদ দূরত্ব নিয়ে নয়; এখন সবাই অপেক্ষা করছে কার মুখের ওপর কার সিদ্ধান্ত বসে। খালা রওশন চুপ। এক ফুফাতো ভাই মোবাইল কানে নিয়েও কথা বলছে না। গেটের পাশে ঠান্ডা চায়ের কাপটা উল্টে পড়ে একটু চা গড়িয়ে কালো দাগ আরও বড় করেছে।
মেহরীন রবিনকে বলল, “সিলভার কারটা বাইরে ঘুরে পশ্চিম গেটের অপেক্ষায় রাখুন। ওখানে সাধারণ নামানোর জায়গা আছে। এই লেন থেকে যাবে না।”
নাইম ভাই ঝট করে বলল, “পশ্চিম গেট? ওটা তো স্টাফ আর সাপ্লাইয়ের—”
“আজ সেটা আপনার জন্য যথেষ্ট।” মেহরীন এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “একটু আগে আমাকেও তো ওদিকেই পাঠিয়েছিলেন।”
তারপর সে রেজিস্টার খুলে আঙুল রাখল নির্দিষ্ট লাইনে। “প্রথমে কৃষি সমবায়ের সভাপতি এবং তার সঙ্গে আসা দুইজন। সোহেল ভাই, সাদা হাইএসটা আনুন। দ্বিতীয় গাড়ি প্রস্তুত রাখুন। নাইম ভাইয়ের লাইনের কোনো গাড়ি এই লেন ব্যবহার করবে না, যতক্ষণ না দাতাদের নামানো শেষ।”
এবার আপত্তি শুধু মুখে আটকাল না, শরীরে লেগে গেল। সিলভার কারের ড্রাইভার সামনের চাকা ঘুরাতে গিয়ে পেছনের মোটরবাইকের খুব কাছে চলে এল; গার্ড চেঁচিয়ে থামাল। এক খালাতো বোনের স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেল, সে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। নাইম ভাই দুই হাত তুলে একসঙ্গে তিনজনকে নির্দেশ দিতে চাইছিল, কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত তার নির্দেশ ধরল না। রবিন মেহরীনের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হল, তারপর ওয়াকিটকিতে রুট বলল। সোহেল ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
নাইম ভাই শেষ চেষ্টা করল। “তুমি অত বাড়াবাড়ি করছ। বড়দের সামনে আমাকে অপদস্ত করতেছ।” মেহরীন বলল, “আপনি আমাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে বলেছিলেন। আমি এখন বলছি, কোন গাড়ি কোথায় দাঁড়াবে।”
তার ব্যাগ থেকে গেট পাসটা বের করল সে। শক্ত প্লাস্টিক কার্ড, সোনালি বর্ডার, নামের নিচে ভেন্যুর সীল। রবিন সঙ্গে সঙ্গে মূল ব্যারিয়ারের ম্যানুয়াল লক খুলতে গেল, কিন্তু নাইম ভাই হাত বাড়িয়ে দাঁড়াল ব্যারিয়ারের সামনে। “এক মিনিট। এই রুটটা আমার লোকদেরও লাগবে।”
এটাই ছিল তার ভাঙার শেষ ধাপ—যে পথ একটু আগে সে নিজের বলে চালাচ্ছিল, সেই পথের জন্য এখন তাকে চাইতে হচ্ছে। মেহরীন চাবির রিং থেকে কালো ফব-ওয়ালা চাবিটা আলাদা করে সোহেলের হাতে দিল। “সাদা হাইএস, গেট এক। এখনই।”
তারপর গেট পাসটা রবিনের দিকে তুলে ধরল। “খুলুন। এই ছাড়পত্রে।”
রবিন কার্ডটা স্ক্যানারের সামনে ধরল না; মেহরীন নিজেই এগিয়ে গিয়ে পাসটা রিডারের কাছে ছোঁয়াল। টিক শব্দ হলো। লাল বাতি সবুজ হলো। ব্যারিয়ারের ডাণ্ডা ধীরে উঠতে শুরু করল।
নাইম ভাই দ্রুত বলল, “তাহলে সিলভার কারটাও—” মেহরীন এক চুলও ঘুরল না। “ওটা পশ্চিম গেট।”
সাদা হাইএস সামনে এগিয়ে এল। ভিতরে কৃষি সমবায়ের তিনজন বৃদ্ধ লোক, পাঞ্জাবির ওপর ধুলো, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি। এতক্ষণ যাদের জন্য জায়গা রাখা হচ্ছিল অথচ কেউ ঠিক মানছিল না, এখন তাদের গাড়ির জন্য সামনের লেন ফাঁকা। মেহরীন এক হাতে গেট পাস ধরে, অন্য হাতে বাতাসে ছোট্ট ইশারা দিল। সোহেল গাড়ি চালিয়ে ব্যারিয়ারের নিচ দিয়ে বের করল।
পার্কিং পিকআপ লেনে মেহরীন গেট পাসটা একটু উঁচু করতেই ব্যারিয়ার পুরো উঠল, সাদা হাইএস তার দিকের খোলা রুটে বেরিয়ে গেল, আর সিলভার কারটা বাঁক খেয়ে পশ্চিম গেটের বন্ধ ঘুরপথে ঢুকে পড়ল।