সাজানো দৃশ্যটাই উল্টো গেল
মতিন হাত তুলে মেহরিনকে থামাল। ব্যাক গেটের সরু সার্ভিস লেনে ডেকোরেশনের ট্রাকের গা ঘেঁষে সে দাঁড়িয়ে, হাতে ফাইল, কাঁধে রাতভর দৌড়ঝাঁপের শক্ত হয়ে থাকা ক্লান্তি; তবু তাকে ঢুকতে দেওয়া হলো না। মতিন কাগজটা তুলে ধরল, সইটা সবার চোখে পড়ার মতো করে, “রাশেদা আপার লিখিত নির্দেশ—‘পরিবারবহির্ভূত সমন্বয়কারী ও অস্থায়ী কর্মী প্রধান মঞ্চ, ভিআইপি সিঁড়ি ও ভেতরের নথিকক্ষে প্রবেশ করতে পারবে না। পেছনের গেট দিয়ে শুধু মালামাল ছাড়বে।’”
পাশে রাখা রেজিস্টারের টেবিলে চা ঠান্ডা হয়ে গিয়ে কাপে হালকা আস্তর ধরেছে; তার তলায় গোল চিহ্ন পড়ে আছে। প্লাস্টিকের চেয়ারের কোণে বসে থাকা ফুলওয়ালা ছেলে ঘাড় তুলে তাকাল, যেন ভুল শুনেছে। দুইজন খালাতো ভাশুরবৌ, শাড়ির আঁচল সামলে ভেতরে ঢোকার আগে একবার মেহরিনের দিকে, একবার কাগজের দিকে তাকাল। মেহরিনকে সবাই চেনে—কনের বাবার কৃষি ব্যবসার ফাউন্ডেশনের হিসাব সে সামলায়, দাওয়াতের টেবিল থেকে অনুদানের তালিকা পর্যন্ত ওর হাতে গুছেছে; অথচ কাগজে তাকে “অস্থায়ী কর্মী” বানিয়ে সার্ভিস লেনে আটকে রাখা হয়েছে।
মেহরিন ফাইলটা বুকে চেপে শুধু বলল, “নথিকক্ষের চাবি আমার কাছে।”
“চাবি দিয়ে দিন,” মতিন কুণ্ঠিত গলায় বলল, “আমার ওপরও লেখা আছে। আপনাকে ভেতরে যেতে দিলে চাকরি যাবে।”
ওই সময়েই রাশেদা ভাবি হাই হিলের টোকা তুলে লেনের মোড় ঘুরে এল। কনের জ্যাঠতুতো ভাবি, বাড়ির বউ, মুখে মিষ্টি হাসি, চোখে ফলা। সঙ্গে দুই কাজের মেয়ে, পেছনে সালেহা খালা-শাশুড়ি পর্যন্ত। রাশেদা এসে কাগজের ওপর আঙুল ঠুকল, “ঠিকই করেছেন মতিন ভাই। আজকে বিয়েবাড়ি, অফিস না। যার যেখানে মানায়, সেখানে থাকলেই শোভা পায়।”
মেহরিন কিছু বলার আগেই সে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা লোকদের শোনার মতো স্বরে যোগ করল, “কেউ দুইটা ফাইল ধরলেই ঘরের মেয়ে হয়ে যায় না। রান্নাঘর-পেছনের চলাফেরা যাদের কাজ, তারা পেছন দিয়েই যাবে।”
সালেহা খালা অস্বস্তিতে কেশে উঠলেন। তবু কিছু বললেন না। রাশেদা সেখানেই থামল না; মেহরিনের হাতের ফাইল দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওটাও দিন। নথিকক্ষের হিসাব আমি নিজে দেখব। আর কনের মেহেদির গয়নার তালিকা আজ থেকে নাদিয়া সামলাবে। আপনি বরং প্লেট-গ্লাসের খরচ মিলিয়ে নিন।”
এই এক বাক্যে কাজের মর্যাদা আর ঘরের মুখ—দুটোই সে নামিয়ে দিল। মেহরিন বুঝল, শুধু পথ আটকানো নয়; আজকের ভিড়ের সামনে ওকে নিচু জায়গায় নামিয়ে রাখার হিসাব আগেই কষা হয়েছে। তিন মাস ধরে এই বিয়ের প্রতিটি সরবরাহ, অনুদানের চালান, মসজিদে দেওয়া খাদ্যসামগ্রীর তালিকা—সব তার হাত দিয়ে গেছে। কনের বাবা নিজে বলেছিলেন, “নথিকক্ষের হিসাব ভুল হলে আমার মান যাবে।” সেই নথিকক্ষেই ঢোকা আজ নিষিদ্ধ।
মেহরিন ধীরে ফাইলের ওপর হাত রাখল। “কনের বাবার সই করা দান-অনুদানের খাতা এতে আছে। রাতের আগে মিলাতে হবে।”
রাশেদা হাসল, “আহা, তোমার কথা শুনে তো মনে হয় তোমাকে ছাড়া বংশটা বসে যাবে। মতিন ভাই, এক কাজ করুন—ওকে মাল গুনে সই করান। ভেতরে নাম উঠবে না।”
প্রথম ফাঁকটা তখনই দেখা গেল। কাগজ নিতে গিয়ে মতিন থমকাল। তার চোখ কাগজের নিচের অংশে নামল, যেখানে ছোট হরফে আরেক লাইন। সে হয়তো আগে খেয়ালই করেনি। তার ভুরু কুঁচকে গেল। “আপা, এখানে তো আরেকটা ধারা আছে।”
“কি ধারা?” রাশেদা বিরক্ত।
মতিন কাগজটা একটু উঁচু করল। গলার স্বর এবার আর শুধু নিচু চাকরির ভয় নয়, নিজের বাঁচারও হিসাব। “লেখা আছে—‘নিরাপত্তাজনিত কারণে যে ব্যক্তি এই নির্দেশ জারি করবে, তার ক্ষেত্রেও একই ব্যাক-গেট ছাড়পত্র বিধি প্রযোজ্য থাকবে যতক্ষণ না গৃহকর্তা বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক লিখিতভাবে অব্যাহতি দেন।’”
প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা ছেলে এবার সোজা হয়ে বসল। সালেহা খালা চশমা নামিয়ে কাগজের দিকে তাকালেন। রাশেদার মুখের রঙ অল্প বদলাল, কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল, “ওটা তো সাধারণ ভাষা। আমার ওপর লাগবে কেন? আমি বাড়ির বউ।”
মেহরিন তখনও স্থির। শুধু বলল, “কাগজে ‘যে ব্যক্তি’ লেখা আছে। নাম আলাদা করা নেই।”
এমন সময় ভেতর দিক থেকে আসিফ এসে পড়ল। কনের চাচাতো ভাই, অনুষ্ঠান দেখভাল করছে, চোখের নিচে ঘুমহীন দাগ। সে হাপাতে হাপাতে বলল, “নথিকক্ষ খুলতে হবে এখনই। ইমামের অনুদানের রসিদ, কাবিনের সাপোর্ট পেপার—সব ভেতরে। মেহরিন, তুমি—”
রাশেদা তীক্ষ্ণ স্বরে কেটে দিল, “না। ও ঢুকবে না। আমার অর্ডার আছে।”
আসিফ তাকিয়ে রইল। সে মেহরিনের দিকে নয়, মতিনের হাতে ধরা কাগজের দিকে তাকাল। “কাগজটা দিন।” সে পড়ল, দ্বিতীয় লাইনটায় এসে থামল। তারপর ধীরে বলল, “এইটার মানে, যিনি জারি করেছেন, উনিও এই গেটের নিয়মের বাইরে না।”
রাশেদা ঠোঁট চেপে বলল, “তুমি আমাকে শেখাবে? আমি এই বাড়ির মান রক্ষা করছি।”
“মান?” মেহরিনের গলা এবারও উঁচু হলো না। “দানের খাতা বাইরে, চাবি আমার কাছে, আর নথিকক্ষ বন্ধ। এই মান?”
আসিফের চোখে এক ঝলক কড়া সিদ্ধান্ত এল। “প্রধান তত্ত্বাবধায়কের সই ছাড়া কেউ অব্যাহতি পাবে না। আব্বু এখন মসজিদের ইমামের সঙ্গে। লিখিত সই আনতে সময় লাগবে।”
রাশেদা যেন ধরে নিল, এ-ও তার পক্ষে যাবে। সে এগিয়ে এল, একেবারে গেটের বুম-বারের নিচে। “তাহলে আরো ভালো। মতিন ভাই, নিয়ম মানেন। মেহরিনকে এখানেই রাখুন। আর আমার সঙ্গে দু’জন গার্ড দিন, আমি ভেতরে যাচ্ছি। ওর কাছ থেকে চাবি নিয়ে নিন।”
এই বাড়তি ধাক্কাটাই সে দিল—যেটা না দিলেও পারত। কিন্তু লোকজন জমে গেছে, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা চোখগুলো তীক্ষ্ণ, আর নিজের কর্তৃত্ব দেখানোর নেশায় সে আরেক ধাপ বাড়াল। “চাবি না দিলে ওকে বাইরে বসিয়ে রাখুন। প্রয়োজনে ফাইলও জব্দ করুন। আজকে কে কোথায় দাঁড়াবে, সেটা আমি ঠিক করব।”
মতিন পিছিয়ে গেল না। সে এবার নিজের ইউনিফর্মের কলার টেনে সোজা করল, যেন ভেতরের ভয়টা গিলে ফেলছে। “আপা, আমি লিখিত নির্দেশ অমান্যও করতে পারি না, বাড়িয়েও চালাতে পারি না। আপনি যদি এখন ভেতরে যান, একই কাগজে আপনাকেও ছাড়পত্র দেখাতে হবে।”
রাশেদা থমকে গেল। “আমি বলছি যেতে।”
“তাই তো সমস্যা,” আসিফ বলল। “আপনি-ই লিখেছেন।”
সালেহা খালা এবার সত্যি এগিয়ে এলেন। তাঁর কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ধারালো। “রাশেদা, তুই কনের গয়না দেখবি, ঠিক আছে। কিন্তু কাগজে যা লিখেছিস, সেটা নিজের গলায় পরাবি না। চাবি নিয়ে টানাটানি করিস না।”
রাশেদা এতক্ষণে বুঝল, লেনটা আর তার একার মঞ্চ নেই। তবু পিছু হটার জায়গা সে নিজেই বন্ধ করে ফেলেছে। “মতিন ভাই,” সে প্রায় চিৎকারেই বলল, “আমি আদেশ দিচ্ছি—গেট খুলুন। আমি ভেতরে যাচ্ছি। আর ওকে আটকে রাখুন। আমার কথা না শুনলে এখনই বদলি করব।”
মতিনের চোয়াল শক্ত হলো। পাশে বুম-বার নামানো। সার্ভিস এন্ট্রির সরু জায়গায় দুইজন একসঙ্গে পেরোনোর উপায় নেই। সে কাগজটা সামনে মেলে ধরল, যেন ঢাল। “দুঃখিত আপা। এই কাগজে আপনার সই। অব্যাহতির আরেক সই ছাড়া আমি আপনাকেও যেতে দিতে পারি না। আর চাবি জব্দ করার কথা এখানে লেখা নেই। উল্টো নথিকক্ষের দায়ে যার নাম, চাবি তার কাছেই থাকবে।”
রাশেদা চোখ কপালে তুলে বলল, “তুমি আমাকে থামাবে?”
মেহরিন এবার ফাইল খুলে ভেতর থেকে ছোট ধাতব চাবির গোছা বের করল। সেটা কারও হাতে দিল না। শুধু আসিফের দিকে তাকিয়ে বলল, “গৃহকর্তার লিখিত অব্যাহতি আনুন। ততক্ষণ নথিকক্ষ খোলা হবে না, কারণ নিয়মে সেটাই নিরাপদ। আর দানের খাতা আমার জিম্মায় থাকবে।”
এতক্ষণে লেনের মুখে আরেক দল আত্মীয় এসে দাঁড়িয়েছে। কারও মুখে কথা নেই, কিন্তু দেখার ভঙ্গিই যথেষ্ট। রাশেদা গেট পেরোতে চাইলে তাকে বুম-বারের ধারে অস্বস্তিকরভাবে কাত হয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে; তার হাই হিল পিছলে যাচ্ছে ভেজা টাইলসে। কাজের মেয়ে একটা ট্রে হাতে নিয়ে পাশ কাটাতে গিয়ে থমকাল। ট্রের কাপে চা কাঁপল।
রাশেদা হাত বাড়িয়ে বুম-বার সরাতে গেল। মতিন তাড়াতাড়ি সামনে এসে দাঁড়াল। “না আপা, ছুঁবেন না। ক্যামেরা চলছে।” এই এক কথায় তার গলার সুর বদলে গেল—এবার আর অনুনয় নয়, দায়সারা কঠোরতা।
আসিফ পকেট থেকে ফোন বের করেছিল, স্ক্রিনের আলো হাতের তালুতে নিচু হয়ে জ্বলছিল। সে কনের বাবাকে কল দিয়ে ছোট করে বলল, “আব্বু, রাশেদা ভাবির কাগজে নিজেকেও ব্যাক গেট ছাড়পত্রে বেঁধে ফেলেছে। আপনার লিখিত অব্যাহতি লাগবে। না হলে কাউকে ভেতরে নেওয়া যাচ্ছে না… না, মেহরিন ঠিক আছে… চাবি ওর কাছেই আছে।”
ফোনের ওদিকের কথা কেউ শুনল না, কিন্তু আসিফের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “আব্বু বলেছেন, কাগজ যেমন আছে তেমনই মানতে। তিনি নামাজ থেকে উঠে আরেক কাগজ পাঠাবেন। তার আগে কেউ নয়।”
এইবার সত্যিকারের ভাঙনটা দেখা গেল। রাশেদা মুখ ঘুরিয়ে সালেহা খালার দিকে তাকাল, যেন অন্তত ওখান থেকে আশ্রয় পাবে। পেল না। খালা শুধু চোখ নামিয়ে নিলেন। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখগুলোতে সেই অসহায় ফিসফাস নেই; বরং প্রত্যেকে স্পষ্ট বুঝে ফেলেছে, যে কাগজে অন্যকে রান্নাঘরের পেছনে নামিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সেই কাগজই এখন তাকে গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
রাশেদা শেষ চেষ্টা করল। “মেহরিন, চাবিটা দাও। এত নাটক কোরো না।”
“নির্দেশ অনুযায়ী,” মেহরিন বলল, “দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি চাবি ছাড়বে না।”
শব্দগুলো ছিল একেবারে শুকনো। কোনো জয়োল্লাস নেই, কোনো বিদ্রুপ নেই। কিন্তু ওই শুকনো স্বরেই রাশেদার ধার ভেঙে গেল। সে এক পা এগোতে গিয়ে থামল, কারণ মতিন নড়েনি। আরেক পা পিছোতে গিয়ে হিল টাইলসের উঁচু ফেরত-বাঁকে গেঁথে গেল। ট্রে হাতে কাজের মেয়েটা চমকে সরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই একটা কাপ কাত হয়ে চা পড়ে গেল মেঝেতে।
মেহরিন কাগজটা মতিনের হাত থেকে নিয়ে একবার ভাঁজ খুলে সইয়ের জায়গাটা বাইরে রাখল, যেন যা আটকাল সেটাই দেখা যায়। তারপর চাবির গোছা, ফাইল, আর সই-করা নির্দেশ একসঙ্গে নিজের হাতে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। রাশেদাকে আর পথ দেওয়া হলো না; তাকে সার্ভিস লেনের মোড়ের দিকেই পিছিয়ে আসতে হলো, ঠিক যতটা জায়গা ছাড়া দরকার ছিল ট্রে, বক্স আর লোক চলাচলের জন্য।
ফেরত-বাঁকের সাদা টাইলের ওপর পড়ে থাকা চা সরু বাদামি রেখা হয়ে উল্টো দিকে বয়ে গেল, যেদিক দিয়ে রাশেদাকে সরে যেতে হয়েছে সেই লেনের দিকে; মেহরিনের হাতে সই-করা কাগজ স্থির রইল।