তার নামটাই সামনে উঠে গেল
“নীরা, ওই চেয়ারটা না—ওটা সামনের লাইনের জন্য,” মাহিরা ভাবি হাত বাড়িয়ে সাদা কার্ডওয়ালা চেয়ারটা সরিয়ে দিল, যেন নীরা বসতে নয়, ভুল করে দোকানের শাটার টেনে ধরতে এসেছে। কার্ডের ওপর নীল কালি দিয়ে লেখা ছিল: “নীরা হক।” সেটা উল্টে পাশের একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে রেখে দিল সে, ঠিক জুতার র্যাকের পাশে। তিনজন খালা, দুজন কাজিন, আর কনের বাবার কৃষি-ব্যবসার অংশীদাররা একসাথে তাকাল। অপমানটা পড়তে কারও কষ্ট হলো না।
নীরা হাতে ধরা আধভাঁজ করা বাজারের রসিদটা আরও ভাঁজ করল। এই বিয়ের ফুলের অগ্রিম, মিষ্টির হিসাব, গায়ের হলুদের হলুদ-সাবান—সব কেনাকাটায় সে দৌড়েছে তিনদিন। রাশেদের মা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে ঘরের ভেতর-বাইরের অর্ধেক কাজও তার কাঁধে। তবু মাহিরা ভাবি ঠোঁট টেনে বলল, “তুমি একটু পেছনে বসো। সামনের চেয়ারে এখন শায়লার নাম উঠবে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনারও তো একটা হিসাব আছে।”
নীরা বসেনি। সে এগিয়ে গিয়ে উল্টে রাখা নিজের কার্ডটা তুলে সোজা করল, একবার দেখল, তারপর সেটাকে প্লাস্টিকের চেয়ারের ওপরই রেখে দিল—তবে জুতার র্যাকের গা থেকে সরিয়ে মাঝখানে, এমন জায়গায় যেখানে যে-ই ঢুকবে, প্রথমে নামটা চোখে পড়বে। তারপর চাবির রিংটা, যা সে সকাল থেকে হলরুমের ছোট স্টোরঘর খোলা-বন্ধে ব্যবহার করেছে, মাহিরা ভাবির তালুর ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল, “যেহেতু আমি শুধু কাজের মানুষ, চাবিটাও আপনি রাখেন।” আশপাশে দাঁড়ানো কাজিনদের মুখ বদলে গেল। এটাই ছিল প্রথম ফাটল।
“নাটক কোরো না,” ভাবি ফিসফিস করে বললেও গলার ধারটা সবাই শুনল। সে চাবি মুঠোয় চেপে আবার মোলায়েম হলো, “শুনো, রাগারাগির কিছু না। বড়দের সামনে জায়গা বুঝে চলতে হয়।”
“বড়দের সামনে জায়গা আপনি বুঝিয়ে দিলেন,” নীরা বলল, “এবার কাজটাও আপনি বুঝে করেন।”
উপরের তলায় আংটি বদলের আয়োজন। নিচের ডাইনিং থেকে বিরিয়ানি আর গরুর রেজালার গন্ধ ভেসে আসছে, সিঁড়ির বাঁকে বাঁকে আত্মীয়দের শাড়ির কুচি, পাঞ্জাবির হাতা, ফিসফাস। লিফটের সামনে আয়নার ধোঁয়াটে স্টিল প্যানেলে আঙুলের দাগ, মুছেও না-যাওয়া পুরনো ছোপ। নীরা সেখানে নিজের মুখ এক ঝলক দেখে নিল—ক্লান্ত, ঠোঁট শক্ত, চোখ শুকনো। এ বাড়িতে তার জায়গা নিয়ে সবাই জানে, কেউ মুখে বলে না: রাশেদের সঙ্গে তার কাবিন হয়নি, কিন্তু দুই বছর ধরে দুই পরিবারের যাতায়াতে সে ছিল ঘরের মেয়ে বলেই। আজ শায়লা এসেছে—চট্টগ্রামের ধনী কৃষি-রপ্তানিকারকের মেয়ে—আর হঠাৎ সব হিসাব পাল্টে গেছে।
দোতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছাতেই দ্বিতীয় আঘাতটা এল। সামনের বারান্দা-ঘেঁষা অংশে কনের পক্ষ, পাত্রের পক্ষ, বয়োজ্যেষ্ঠ—সবাই বসবে। সেখানে গদিযুক্ত ছয়টা চেয়ার, প্রত্যেকটার পেছনে নামের কার্ড। মাহিরা ভাবি হাতে একটা পিতলের ট্রে ধরিয়ে দিল নীরার দিকে। “এই শরবতগুলো আগে নিয়ে যাও। সামনের সারি ফাঁকা রেখো। শায়লা আর রাশেদ একসাথে উঠবে।”
ট্রেটা ভারী ছিল না; অপমানটাই ভারী ছিল। শরবত হাতে সিঁড়ি পার হওয়া মানে কাজের লোকের পথ। সামনে বসার পথ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো, আবার সবাইকে দেখিয়েও দেওয়া হলো কেন সরানো হলো। এক খালা, যিনি সকালেও তাকে “মা” বলে ডেকেছিলেন, এবার চোখ নামিয়ে কাপের স্ট্র গুনতে লাগলেন।
নীরা ট্রে নিল, কিন্তু সোজা সামনের বারান্দায় গেল না। সিঁড়ির মাঝের সুইচব্যাক ল্যান্ডিংয়ে এসে দাঁড়াল। নিচ থেকে লোক উঠছে, ওপর থেকে নামছে; এই সরু বাঁকেই সবাইকে একজন আরেকজনকে পথ দিতে হয়। সে এক হাতে ট্রে ধরে, অন্য হাতে রেলিং ছুঁয়ে বলল, “যার জন্য সামনের সারি ফাঁকা, সে আগে উঠুক। আমি সরে যাচ্ছি।”
কথাটা শান্ত, কিন্তু জায়গাটা এমন যে না শুনে উপায় নেই। শায়লা তখন নিচ থেকে লেহেঙ্গার ঘের তুলে উঠছে, পাশে রাশেদের খালা। মাহিরা ভাবি পিছন থেকে তাড়া দিল, “পথ ছাড়ো, নীরা।”
নীরা সত্যিই এক পা সরে গেল—কিন্তু রেলিংয়ের ভেতরের দিক ধরে, যেটা দিয়ে ঘরের লোকেরা সাধারণত ওঠানামা করে। ট্রে-টা সে বারান্দার ছেলেটার হাতে দিয়ে দিল। ফলে বাইরের দিকের সরু অংশ, যেখান দিয়ে অতিথিদের উঠতে হয়, শায়লার লেহেঙ্গা আর সঙ্গে থাকা দুজনের ভিড়ে আটকে গেল। আর ভেতরের দিকের ফাঁকা রেখা সরাসরি গিয়ে মিশল সামনের সারির চেয়ারের ঠিক পাশে। নিচ থেকে কেউ হাসল না, কিন্তু হঠাৎ সবাই দাঁড়াবার ভঙ্গি বদলে নিল। পথটা বদলে গেছে।
এই সময় রাশেদ উঠল। সাদা পাঞ্জাবির বুকপকেটে পুরনো কালির দাগ—সম্ভবত সকালে কলম ফেটে গেছে—নীরার চোখে আটকাল। সে এক মুহূর্তে সব দেখল: উল্টে রাখা কার্ড, ট্রে, আটকে থাকা শায়লা, মাহিরা ভাবির কষে ধরা চাবি। রাশেদের মুখ শক্ত হলো। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই মাহিরা ভাবি এগিয়ে এল, যেন দৃশ্যটা এখনও সামলানো যায়।
“নীরা, এসো,” ভাবি এবার সবার সামনে অতিরিক্ত মিষ্টি গলায় ডাকল, “তোমার জন্য আলাদা চেয়ার রেখেছি। একেবারে আমাদের পাশে। তুমি তো ঘরের মেয়ে।” দেরিতে দেওয়া দয়া সবসময় বেশি জোরে বাজে। কয়েকজন আত্মীয় সঙ্গে সঙ্গে তাকাল—একই মুখ, একটু আগেও যে মুখ তাকে পেছনে ঠেলেছিল, এখন টেনে আনছে।
নীরা তাকিয়ে রইল। “যে চেয়ার থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়, সেখানে পরে বসা যায় না, ভাবি।”
ভাবির ঠোঁট কেঁপে উঠল। “নাম কে কাটল? ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।”
“তাহলে কার্ডটা কেন জুতার পাশে ছিল?”
কেউ এবার চোখ নামাতে পারল না। চাবির রিং এখনও ভাবির হাতে, কিন্তু সেটাই এখন উল্টো প্রমাণ। রাশেদের মামা গলা খাঁকারি দিলেন; তিনি মুখ বাঁচানোর পথ খুঁজছেন, কারণ অংশীদারদের সামনে এ দৃশ্য খারাপ। শায়লা অস্বস্তিতে লেহেঙ্গার দোপাট্টা টেনে নিল। মাহিরা ভাবি এক পা এগিয়ে নীরার কনুই ধরতে চাইল, “এসো, আমি বলছি না? এইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে মান-সম্মান নষ্ট কোরো না।”
নীরা কনুই সরিয়ে নিল। “আমার মান তো আপনি একটু আগেই কোথায় রেখে এসেছেন, মনে নেই?”
বারান্দার ভেতর তখন প্রধান চেয়ারের একটার কার্ড খুলে রাখা হয়েছে। কেউ শায়লার নাম লাগাতে পারেনি এখনো; কাগজটা মাহিরা ভাবির ব্যাগে। রাশেদ হঠাৎ সোজা গিয়ে সেই খালি চেয়ারটার পেছনে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর খুব উঁচু ছিল না, কিন্তু ল্যান্ডিংয়ের ভিড় চিরে স্পষ্ট বেরিয়ে এল। “চেয়ারটা খালি থাকবে না। নীরার নাম যেখানে ছিল, সেখানেই থাকবে।”
মাহিরা ভাবি ঘুরে দাঁড়াল, “রাশেদ, এখন এই কথা বলার সময়?”
“এখনই,” রাশেদ বলল। “কারণ আপনারা সবাই সময়মতো অন্য কাজটা করে ফেলেছেন।”
সে হাত বাড়িয়ে মাহিরা ভাবির মুঠো থেকে চাবির রিংটা নিল না; বরং নীরার প্লাস্টিকের চেয়ারে রাখা কার্ডটা নিজে তুলে আনল। সাদা মোটা কার্ড, নীল কালি। সবাই দেখতে পাচ্ছে। সে গিয়ে সেটা খালি প্রধান চেয়ারের পেছনে গুঁজে দিল। কার্ডটা দুলে থিতু হতে এক সেকেন্ড লাগল। সেই এক সেকেন্ডে মাহিরা ভাবির মুখের রঙ বদলে গেল।
“রাশেদ!” তার গলা এবার ধার হারাল। “শায়লার পরিবার দাঁড়িয়ে আছে।”
“দাঁড়িয়ে থাকুক,” রাশেদ বলল, চোখ সরাল না, “যে মেয়েটা এই বিয়েবাড়ির দৌড়াদৌড়ি করেছে, মা হাসপাতালে থাকা থেকে বাসার রান্নার তালিকা পর্যন্ত সামলেছে, যে চাবি নিয়ে ঘর খুলেছে, খরচের রসিদ ধরেছে—তার নাম জুতার পাশে যাবে না। আর আমি দেরি করে বুঝলেও, এখন সবার সামনে বলছি—নীরা আমার জায়গায় থাকবে। বদলি কেউ না।”
এইবার শব্দটা পড়ে রইল না; আঘাত করল। অংশীদারদের একজন, যিনি এতক্ষণ ফোন দেখছিলেন, সেটি নামিয়ে দিলেন। খালা যিনি চোখ নামিয়েছিলেন, এবার সোজা হয়ে বসলেন। শায়লার বাবার লোকজন একে অন্যের মুখ দেখল—এই জোটের হিসাব আর আগের মতো নেই। মাহিরা ভাবি তড়িঘড়ি বলল, “না, না, মেয়ে তো আমাদের কাছেরই—যাক, ওকেও সামনে বসাই—”
“আমাকে ‘ওকেও’ বলা বন্ধ করুন,” নীরা স্পষ্ট করে বলল।
সব চোখ এবার তার দিকে। এই মুহূর্তে পিছু হটলে কথাটা রাশেদের হয়ে যাবে, তার নয়। সে এগিয়ে গেল, খালি প্রধান চেয়ারের সামনে দাঁড়াল, নিজের রসিদভাঁজ করা হাতটা খুলে কার্ডের নিচের কোণা ঠিক করে দিল। তারপর মাহিরা ভাবির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সাহায্য করতে এসেছিলাম, বদলি হতে না। যেখানে আমার নাম রাখা হয়েছে, আমি সেখানেই বসব। আর যাদের জন্য আমাকে সরানো হয়েছিল, তারা আজ আমার পরে উঠবে।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সে বসে পড়ল না; আগে দাঁড়িয়ে থাকল, যেন বসার অধিকারটাও কারও কাছ থেকে নিয়ে নয়, নিজের জায়গা ধরে। তখনই ঘটল আসল কেটে যাওয়া। সামনে আসার জন্য যে সরু লেনটা খালি রাখা হয়েছিল, সেটায় আগে নীরাকে যেতে দিয়ে অন্যদের ঘুরে দাঁড়াতে হলো। শায়লা আর তার সঙ্গীরা বাইরের দিকের লেন ছেড়ে পিছিয়ে গেল, কারণ ভিতরের দিক এখন নীরার। মাহিরা ভাবি হাত তুলে কাউকে নির্দেশ দিতে গিয়ে থেমে গেল—কেউ আর তার নির্দেশের দিকে তাকাচ্ছে না। রাশেদের মামা নিজে পাশ কাটিয়ে দাঁড়ালেন। গদিযুক্ত চেয়ারগুলোর রেখা যেন চোখের সামনে নতুন করে আঁকা হলো।
নীরা তখন বসে, খুব সামান্য, কিন্তু দৃশ্যমানভাবে। রাশেদ তার ডানদিকে দাঁড়িয়ে বলল, “পরিচয় লাগলে আমি দিচ্ছি—এ নীরা। আমার ঘরের সিদ্ধান্ত বাইরে থেকে এনে পাল্টানো যাবে না।” এটা প্রেমের ঘোষণা নয়; মালিকানার লাইন টেনে দেওয়া। মাহিরা ভাবির মুখে একটা দেরিতে-ফোটা হাসি আসতে চাইল, কিন্তু দাঁতে আটকে গেল। “আমি তো শুধু—”
“আপনি শুধু নাম সরিয়েছেন,” নীরা বলল, “এখন থেকে আর সরাবেন না।”
ওপরে আংটি বদলের ডাকে সবাই নড়ল। প্রথমে নীরা উঠল। তার পর রাশেদ। তারপর বাকিরা। এতক্ষণ যে সিঁড়ির বাঁকে তাকে কাজের ট্রে হাতে দাঁড় করানো হয়েছিল, সেই বাঁক দিয়েই এখন উঠতে হলো নতুন ক্রমে। মাহিরা ভাবি একবার বলল, “নীরা, তুমি আগে যাও।” গলায় অনুনয়ের কাঁপন। ততক্ষণে সেটা দেরি হয়ে গেছে; অনুমতি নয়, স্বীকৃতি চেয়ে বেরিয়েছে।
সুইচব্যাক ল্যান্ডিংয়ে এসে নীরা রেলিংটা ধরল। লোহার ঠান্ডা গায়ে পুরনো রঙ উঠে খসখসে। নিচে, এক ধাপ কমে, শাড়ির ঘের আর পাঞ্জাবির ভাঁজ জমে আছে, কিন্তু কেউ তাকে ছুঁয়ে পাশ কাটিয়ে উঠল না। নীরা এক ধাপ ওপরে দাঁড়িয়ে হাতল চেপে সামান্য থামল, তারপর মাথা না ঘুরিয়েই সামনে উঠে গেল।