Fast Fiction

দৃশ্যটা এমন ঘুরল, অপমানটা ফিরল

ফর্কলিফটের চাকার সামনে দাঁড়িয়ে সাবেরা ভাবি হাত তুলে বললেন, “কোনো প্যালেট বের হবে না। আগে কাগজে সই কর, তারপর গেট খুলব।” তার আঙুলে ধরা সাদা দোষপত্রটা বাতাসে কাঁপছিল, আর বে-র মুখে সারি করে দাঁড়ানো তিনটা ঠেলাগাড়ি, দুইটা পিকআপ, একপাশে বরফ গলতে থাকা সবজির খাঁচা—সব থেমে ছিল মাহিনের গলায় ফাঁস হয়ে।

মাহিনের ল্যানইয়ার্ডের পুরনো ফিতে ঘামে ভিজে গলা ঘেঁষে ছিল। রাতের শিফট টেনে সকাল পেরিয়ে গেছে; কাঁধের শার্টে ভাঁজ জমে শক্ত। সে জানত, এই চালানটা আজ বের না হলে নরসিংদী আর মাদারীপুরের আড়তে দাম পড়ে যাবে, ক্ষতি চাপবে নিচের কারও ঘাড়ে। আর নিচে সবসময় তার নামই আগে ওঠে। কারণ সে খালাতো-ভাগ্নে না, জামাইবাবুর আপনজন না, এই গুদামে শুধু কাজ জানে।

সাবেরা ভাবি কাগজটা তার বুকে ঠেলে দিলেন। “লিখা আছে—গতরাতের কৃষি-পণ্য রওনা দেরি, বরফের খরচ, গাড়ি আটক—সব তোমার ভুল নির্দেশে। সই করো। না করলে এই বে-র ছাড়পত্র আমার হাতে।” পাশে দাঁড়ানো রুবেল, গেটের তালার চাবি আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে, চোখ নামিয়ে ফেলল। কে শিপমেন্ট আটকাচ্ছে, কে শরীর দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে—সবার সামনে খুব স্পষ্ট।

মাহিন কাগজে চোখ নামাল। ওপরের লাইনে তার নাম, নিচে খরচের অঙ্ক। কিন্তু মাঝখানে একটা খালি ঘর রাখা—“পুনঃস্বাক্ষর ও তাত্ক্ষণিক দায়গ্রহণ।” কাগজটা তাড়াহুড়ো করে বানানো, তবু ফাঁদটা যত্নে পাতা। সে মাথা তুলতেই সাবেরা ভাবি একটু জোরে বললেন, যেন শুনে রাখে সবাই, “বড়দের মুখ রাখতে শিখো। কাদের সাহেবের গুদাম, আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে তর্ক করবে?”

কাদের সাহেবের নামটা ইচ্ছে করেই উঁচু করে বলা হল। এই গুদামে হিসাবের খাতা যেমন চলে, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনাও তেমন চলে। সাবেরা ভাবি কাদের সাহেবের ছোট ভাইয়ের বউ; ঈদের দাওয়াতে একসাথে বসেন, বিয়ের কাবিনে সামনে থাকেন, কার ওপর কতটুকু ভরসা করা যাবে সেটা রান্নাঘরের ফিসফাসেই ঠিক হয়। মাহিনের মা কয়েকবার বলেছিল, “চাকরি কর, মুখ সামলে।” সে জানে, এখানে কোনো কথা শুধু কাজের কথা থাকে না।

পেছন থেকে নাফিসা খালা, যিনি অফিসের রেজিস্টার টেবিলে বসেন, গলা নামিয়ে বললেন, “মাহিন, সই করে দে। বেয়াদবি দেখাস না। তোর মা মসজিদপাড়ায় মুখ দেখাবে কী করে?” কথাটা তেমন জোরে নয়, কিন্তু বে-র ধাতব দেয়ালে ঠুকে আরও খারাপ শোনাল। সাবেরা ভাবি সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেললেন, “শুনলে? নিজের মুখ না হোক, মায়ের মুখ তো আছে।”

মাহিনের চোয়াল শক্ত হল। “আমি দেরির কাগজে সই করব, যদি দেরির হিসাব ঠিক থাকে। এই কাগজে ছাড়পত্র আর দায় একসাথে বাঁধা।”

“তাই তো চাই,” সাবেরা ভাবি হেসে উঠলেন, ঠোঁটের কোণ শুধু একপাশে উঠল। “আজকে এখানেই সামনে সামনে পুনঃসই হবে। কাদের সাহেব নামবেন একটু পরেই। উনার সামনে তোমার হাতেই হ্যান্ডওভার নেব। তখন আর পরে বলার সুযোগ পাবে না।”

এই ছিল প্রথম বাড়াবাড়ি। মাহিন সেটা শুনেই কাগজটা দুহাতে ধরে সোজা করল। “উনার সামনে?”

“হ্যাঁ, উনার সামনে। সাক্ষী লাগবে। তুমি তো পরে কথা ঘোরাও।” সাবেরা ভাবি রুবেলকে বললেন, “দরজা বন্ধ রাখো। আর অফিস থেকে ছাড়পত্র রেজিস্টার আনো।”

রুবেল ছুটে গেল। সেই ফাঁকে ঠেলাগাড়ির একজন মজুর বরফজল মাড়িয়ে পা সরাল, গাড়ির চালক সিটে বসে হাতঘড়ি দেখল। অপেক্ষা আর খরচ একসাথে জমতে লাগল। মাহিন দেখল পাশের ধাতব প্যানেলে পুরনো আঙুলের দাগ, মুছেও ওঠেনি—লিফটের আয়নার মতো কুয়াশা-লাগা একটা প্রতিবিম্বে সাবেরা ভাবির মুখ ধারালো লাগছে, নিজের মুখ অবাক রকম শান্ত।

রুবেল রেজিস্টার নিয়ে ফিরতেই সাইড গেট দিয়ে কাদের সাহেব ঢুকলেন। পাঞ্জাবির ওপর পাতলা কোট, চোখে তাড়াহুড়ো। তিনি আজ নিজে আসার কথা ছিল না; আজ পুরনো জেলা অফিসের পরিদর্শকও আসবেন বলে শোনা। তার পেছনে এক লোক—গাঢ় নীল ফাইল হাতে—মাহিন চিনল, কৃষি সরবরাহ তদারকি দপ্তরের সই-সাক্ষীর লোক। বে-তে বাতাস আরও পাতলা হয়ে গেল।

সাবেরা ভাবি মুহূর্ত নষ্ট করলেন না। “ভাইয়া, আপনার সামনেই মীমাংসা। ছেলেটা ভুল করেছে, এখন সই এড়াচ্ছে। আমি বলেছি, সামনে সামনে পুনঃস্বাক্ষর করাবে। তারপর আমি নিজে ছাড়ব।” তিনি কাগজটা এগিয়ে দিলেন, রেজিস্টার খুলে সেই পাতাতেই আঙুল রাখলেন যেখানে ‘বে-ছাড় অনুমোদনকারী’ ঘর আছে। “এখানে আমার নামে, আর নিচে ওর দায়।”

কাদের সাহেব কাগজের ওপর ঝুঁকলেন, কিন্তু পুরো পড়লেন না। তার চোখ আগে গিয়ে ঠেকল দেরি হওয়া গাড়িগুলোর দিকে। “তাড়াতাড়ি করেন। আড়তে ফোন আসছে।”

সাবেরা ভাবি মাহিনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। “এখনই সই করো। এখানেই। আর হ্যান্ডওভার দাও। সবাই দেখুক।”

মাহিন ধীরে বলল, “আপনি নিশ্চিত? সামনে সাক্ষী রেখে?”

“তুমি প্রশ্ন করবে?” তিনি কলমটা তার আঙুলে গুঁজে দিলেন। “লিখো—দায় স্বীকার। তারপর আমি ছাড়পত্রে পুনঃসই দেব।”

মাহিন কাগজের নিচে নিজের নাম লিখল না। সে আগে উপরের নির্দেশ-ঘরটা ঘুরিয়ে কাদের সাহেবের সামনে ধরল। “ছাড়পত্র স্থগিত ও পুনঃস্বাক্ষর—এটা বে-নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের তাত্ক্ষণিক দায়বহন সাপেক্ষে কার্যকর। সাক্ষীর সামনে যিনি পুনঃস্বাক্ষর দেবেন, ক্ষতি-খরচ প্রথমে তার নিয়ন্ত্রণ খাতায় যাবে। আমি রাতের চালান লিপিবদ্ধকারী, ছাড়দাতা নই।”

কথা শেষ না হতেই সাবেরা ভাবি ঝাঁপিয়ে পড়া তাড়ায় বললেন, “এই তো! তাই আমি সই দিচ্ছি। দেখেন।” তিনি কলম কেড়ে নিয়ে নিজের নাম লিখে দিলেন ‘পুনঃস্বাক্ষরকারী ও তাত্ক্ষণিক ছাড়দাতা’ ঘরে, যেন এই সই-ই মাহিনকে চেপে ধরার শেষ পেরেক। তারপর কাগজটা তদারকি দপ্তরের লোকের সামনে ঠেলে দিলেন। “সাক্ষী দিন।”

লোকটা অভ্যস্ত চোখে লাইন মিলিয়ে নিল। “নিয়ম অনুযায়ী পুনঃস্বাক্ষরকারী পক্ষই স্থগিত খরচের তাৎক্ষণিক দায়ে থাকবে, ছাড়ের সিদ্ধান্তও তার নিয়ন্ত্রণে ধরা হবে।” সে কথা বলতে বলতে সাক্ষীর সই বসিয়ে দিল। খুব ছোট্ট একটা শব্দ হল—কলমের নিব শুকনো কাগজে টেনে যাওয়ার শব্দ—কিন্তু বে-র মাঝখানে সেটা তালা পড়ার মতো শোনাল।

সাবেরা ভাবির মুখে হাসিটা তখনও ছিল। পরের মুহূর্তেই কাদের সাহেব কাগজ টেনে নিয়ে দ্বিতীয় লাইনটা পুরো পড়লেন। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। “এক মিনিট। এখানে তো স্পষ্ট লেখা—স্থগিতজনিত খরচ, পচনক্ষতি, অতিরিক্ত বরফ, গাড়ি আটকে থাকার ভাড়া—সব পুনঃস্বাক্ষরকারীর নিয়ন্ত্রণ খাতায় যাবে তদন্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত।”

ঠেলাগাড়ির চাকাগুলো স্থির। প্যালেটের প্লাস্টিক মোড়কে পানি জমে নিচে পড়ছে। রুবেলের আঙুলে চাবির গোছা থেমে গেছে। সাবেরা ভাবি কাগজটা ফেরত নিতে হাত বাড়ালেন, কিন্তু তদারকি দপ্তরের লোকটা সেটা নিজের ফাইলের ওপরে ঠেকিয়ে বলল, “সাক্ষী-সই হয়ে গেছে। এখন অপারেশনাল পড়া বদলাবে না। এই মুহূর্তে বে-ছাড় আপনার আদেশে, আর ক্ষতিও আপনার দায়ে।”

“অসম্ভব,” সাবেরা ভাবি ফিসফিস করে বললেন, তারপর আবার জোরে, “এটা তো ওর জন্য—”

মাহিন তখনই রেজিস্টারটা নিজের দিক থেকে খুলে কাদের সাহেবের সামনে সরিয়ে দিল। একটুও তাড়াহুড়ো নয়, একটুও রাগ নয়। শুধু পাতাটা ঘুরিয়ে সেই ঘরে আঙুল রাখল যেখানে সকালের অস্থায়ী ক্ষমতা লেখা হয়। “রাতের লিপি আমি তুলেছি। কিন্তু পুনঃস্বাক্ষরকারী যদি নিজে ছাড় আটকায়, তবে ছাড়ের সিদ্ধান্ত আর আমার হাতে থাকে না। আপনি চাইলে এখুনি বিকল্প ছাড়দাতা বসান। নইলে সব গাড়ি ওনার নামে আটকে থাকবে।”

কাদের সাহেব এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে থেকে একটা পিকআপের চালক মাথা বাড়িয়ে দেখল, আবার সরে গেল। বে-র লোহার দরজার ফাঁক দিয়ে দুপুরের আলো সাদা ছুরির মতো এসে পড়েছে। কাদের সাহেব বললেন, “রুবেল, চাবি দাও।”

রুবেল থতমত খেল। তার চাবির গোছা এখনো সাবেরা ভাবির দিকেই বাঁকানো। কাদের সাহেবের গলা এবার কড়া, “দাও। আর নাফিসা আপা, রেজিস্টারে লিখেন—এই চালানের অস্থায়ী ছাড়দাতা মাহিন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাবেরা কোনো বে-ছাড় অনুমোদন করবেন না।”

সাবেরা ভাবি এগিয়ে এলেন, “ভাইয়া, আপনি আমাকে সবার সামনে—”

কাদের সাহেব তাঁর দিকে না তাকিয়েই বললেন, “সবার সামনে আপনি নিজে সই দিয়েছেন।” তারপর তদারকি দপ্তরের লোককে উদ্দেশ করে, “নিয়মমতো নোট করেন।”

এটাই ছিল উল্টো ঘোরার মুহূর্ত, কিন্তু থামল না। কারণ চালান এখনো আটকে আছে, আর কাগজ এখনো খোলা। মাহিন রুবেলের হাত থেকে চাবি নিল না; সে আগে রেজিস্টারের নিচে আরেকটা পাতলা ছাড়-আদেশ বের করল—সকালের জরুরি পচনরোধী ছাড়পত্র। এতক্ষণ সেটা ভাঁজ করে রাখাই ছিল তার প্রথম ছোট্ট বাঁচা, কারণ সাবেরা ভাবি শুধু দোষপত্র নাড়ছিলেন, কাজের খাতাটা না। মাহিন সেটা কাদের সাহেবের সামনে রাখল।

“এই আদেশে শুধু মাল ছাড়বে,” মাহিন বলল। “দায়ের হিসাব আলাদা থাকবে। আপনি সই করলে গাড়ি বের হবে, কিন্তু ক্ষতির খাতা পুনঃস্বাক্ষরকারীর সঙ্গে বাঁধা থাকবে—যেমন সাক্ষী-সই হওয়া কাগজে আছে।”

কাদের সাহেব কোনো কথা না বলে সই করলেন। কলমের ডগা কাগজে ঠেকার সঙ্গে সঙ্গে মাহিন রেজিস্টার টেনে নিজের দিকে নিল, সকালের লাইনে অস্থায়ী ছাড়দাতা হিসেবে নিজের নাম লেখাল, তারপর দোষপত্রটা তুলে সাবেরা ভাবির সামনে এক সেকেন্ড ধরে রাখল—যেন তাকিয়ে পড়তে পারেন—তার নাম, তার স্বাক্ষর, তার দায়। এরপর সে কাগজটা নাফিসা খালার রেজিস্টার-টেবিলের বদলে সাইড এক্সিটের ধাতব ক্লিপবোর্ডে গুঁজে দিল, যেখানে বেরোনো-আসার লোকজন চোখ না তুলেও কাগজ দেখতে পায়।

“বে নম্বর তিন খুলুন,” মাহিন বলল। “প্যালেট আগে লাউ, তারপর বরবটি। বরফ নষ্ট করবেন না।”

রুবেল এবার চাবি ঘুরাল। লোহার দরজা কেঁপে খুলতেই জমে থাকা ভেতরের গরম আর পচা-সবজির মিঠে গন্ধ বাইরে ধাক্কা দিল। ঠেলাগাড়ি চলল, চাকা ঘষে জল ছিটল, প্লাস্টিক মোড়া প্যালেট একে একে বের হতে লাগল। মাহিন নিজে প্রথম গাড়ির সিল নম্বর মিলিয়ে দিল, তারপর দ্বিতীয়টার কাগজে সময় লিখল। সাবেরা ভাবি একবার রেজিস্টারের দিকে, একবার দোষপত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে থামলেন। তার গলায় আগের ধার নেই; শব্দগুলো বেরোতে গিয়ে কেটে যাচ্ছে।

তদারকি দপ্তরের লোক খাতায় নোট তুলছে, নাফিসা খালা চশমা নামিয়ে আবার পরছেন, যেন হঠাৎ লেখা ছোট হয়ে গেছে। কাদের সাহেব একপাশে দাঁড়িয়ে শুধু চলন্ত প্যালেট দেখছেন। বে-র নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেটা আর বলে বুঝাতে হচ্ছে না। মাহিন শেষ গাড়িটার ছাড়পত্রে সিল মেরে রেজিস্টার বন্ধ করল, তারপর সাবেরা ভাবির হাতে থাকা দেরিতে ফেরত না-দেওয়া ছোট চাবিটা দেখে বলল, “ওটা অফিসের কোল্ডরুমের। এখনই টেবিলে রেখে দিন। আপনার নামে আর কোনো ছাড় নেই।”

সে সাইড এক্সিটের দিকে হাঁটল। সেখানে ধাতব দরজার পাশে ক্লিপবোর্ডে দোষপত্রটা খোলা, বাতাসে একটু উঠছে-নামছে। ওপরের লাইনে স্থগিত ক্ষতির অঙ্ক, নিচে “পুনঃস্বাক্ষরকারী ও তাত্ক্ষণিক ছাড়দাতা”—সাবেরা ভাবির নাম, তার তাজা সই; আর তার ঠিক নিচে নতুন ছাড়-আদেশের নোটে মাহিনের হস্তান্তর-চিহ্ন। দরজার হাতলে হাত রেখে মাহিন কাগজের কোণটা আরেকবার সমান করে দিল, যেন লেখা ঢাকা না পড়ে, তারপর বেরিয়ে গেল।