আমার জন্য খোঁড়া গর্তে সে-ই পড়ল
“দাঁড়ান। এই গেট দিয়ে আপনি ঢুকবেন না।”
মেহরীনের হাতে ধরা স্টিলের খাবারের কৌটাটা কনুইয়ে ঠেকেই ঠান্ডা হয়ে ছিল; সে আরেক পা এগোতেই ব্যাক গেটের টার্নস্টাইলের সামনে দারোয়ান হাত বাড়িয়ে তাকে সরে দাঁড় করাল। কাঁচঘেরা ভেন্যুর পেছনের সরু সার্ভিস লেনে গায়ে গায়ে লোক, বাসন নামানো বয়েরা, কাজের মেয়েরা, আর একটু দূরে খালা-ফুফুর দল—সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। রাশেদা ভাবি রেজিস্টার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে গলার ওড়না টেনে ঠিক করে বলল, “লিস্টে তোমার নাম কাজের লোকের সাইডে আছে। ভেতরের পারিবারিক চলাচল নিষেধ। খাবার রেখে বের হয়ে যাও।”
ঢাকার এই বিয়েতে মেহরীন শুধু ডেকোরেশনের বিল ধরিয়ে দিতে আসেনি। তিন মাস ধরে রাত জেগে কৃষি-যন্ত্রপাতির আমদানিকারক যে প্রতিষ্ঠানের করপোরেট অনুদান সে জোগাড় করেছে, সেই টাকাতেই প্যান্ডেলের অর্ধেক আলো, কাচের মঞ্চ, অতিথিদের ঠান্ডা কক্ষ। কিন্তু এই মুহূর্তে তার চেয়ে বড় সত্য একটাই—তানভীরের ফুফুরা দেখছে, খালারা দেখছে, আর রাশেদা ভাবি তাকে সবার সামনে “কাজের লোক” বলে পাশে সরিয়ে দিচ্ছে।
মেহরীন শান্ত গলায় বলল, “আমি বুফে লাইনে যাচ্ছি না। নানুকে ওষুধ দিতে হবে। উনি ওপরতলায়।”
রাশেদা ভাবি রেজিস্টারের পাতায় আঙুল ঠুকল। পাতার কোণে নীল কালির পুরোনো দাগ, তার পাশে বড় অক্ষরে লেখা—ব্যাক গেট পারমিট: কেবল অনুমোদিত প্রবেশ। “ওপরে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মানুষজন আছে,” সে বলল, এমনভাবে যেন মেহরীন বাইরে থেকে কাজ সেরে চলে যাওয়া কোনো সরবরাহকারী। “যার যেখানে জায়গা, সে সেখানেই থাকবে। নাঈম, ওর হাতের কৌটাটা নিয়ে স্টাফ শেলফে রাখো।”
কৌটাটা নাঈম সত্যিই নিয়ে গিয়ে শেলফে ঠক করে রাখল। প্রথম অপমানের শব্দটা এমন ছোট ছিল যে আশপাশের গুঞ্জনের মধ্যে ডুবে যাওয়ার কথা, কিন্তু মেহরীনের কানে সেটাই স্পষ্ট লাগল। রাশেদা ভাবি তখন খালা জুবেদাকে উঁচু গলায় বলছে, “সবাই সুযোগ নিতে আসে। একবার ব্যাক গেট খুলে দিলে কে কাকে চিনবে?”
খালা জুবেদা সরাসরি কিছু বললেন না, কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলেন। ওই চোখ সরানোটা মেহরীন আগেও দেখেছে—প্রথম জীবনে, ঠিক এমনই এক বিয়ের রাতের পর, যখন তানভীর কিছু বলেনি, আর রাশেদা ভাবির বানানো গল্পটাই সত্যি হয়ে গিয়েছিল। তারপর দরজা বন্ধ হয়েছে একটার পর একটা; কাজ গেছে, সম্পর্ক গেছে, নানুর চিকিৎসার টাকা আটকে গেছে। দ্বিতীয়বার সময় তাকে ফিরিয়ে এনেছে এই বিকেলে, এই গেটে, এই একই গন্ধে—রোস্টের ধোঁয়া, কাঁচা ফুল, গরম জেনারেটরের তাপ। এবার সে তর্ক করতে আসেনি।
রাশেদা ভাবি এখানেই থামল না। “ওর জন্য ভেতরের লিফটও বন্ধ রাখো,” সে দারোয়ানকে বলল। “পেছনের সিঁড়ি দিয়ে কেউ ওপরে যাবে না, আমার সই ছাড়া। আর এক নম্বর ফ্যামিলি টেবিল থেকে একটা চেয়ার কমাও। বাড়তি লোক বসবে না।”
চেয়ার কমানোর কথা শুনে দুইজন কাজের ছেলে সামনে দিয়েই একটা মোটা কুশনের চেয়ার টেনে নিয়ে গেল। খালারা এবার তাকালেন; কেউ কিছু বললেন না। মেহরীন দেখল, রাশেদা ভাবি ইচ্ছে করেই এটা জোরে বলছে—প্রবেশ বন্ধ, চলাচল বন্ধ, বসার জায়গা বন্ধ। কেবল গেট না, মান-সম্মানের পথও বন্ধ। তানভীর একটু দূরে ফোন কানে ধরে দাঁড়িয়ে আছে; কথা শেষ করেও এগিয়ে এল না। শুধু একবার মেহরীনের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। এই মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াটাও মেহরীন চিনে রাখে।
সে বলল, “আপনি যে কাগজে সই করেছেন, সেটা একবার আমাকে দেখান।”
“তোমাকে?” রাশেদা ভাবি হেসে উঠল। “তুমি কে? অতিথি না, ঘরের মেয়ে না। স্পনসর অফিসে কাজ করো বলে ভাবছ সব দরজা তোমার?”
“দেখান,” মেহরীন আবার বলল।
রাশেদা ভাবি ইচ্ছে করেই সই-করা নির্দেশপত্রটা অর্ধেক তুলে ধরল, পুরো নয়। তাতে লেখা—ব্যাক গেট ক্লিয়ারেন্স, মালপত্র ও অনুমোদিত পারিবারিক সদস্য চলাচল; বিরোধ হলে ভেন্যু মালিকপক্ষের নথি কার্যকর। নিচে রাশেদা ভাবির সই, কারণ তানভীরের পরিবার আউটডোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাকে দিয়েছিল। সে যেন জয়ী ভঙ্গিতে কাগজটা নামিয়ে বলল, “এই নথি ছাড়া কেউ নড়বে না।”
মেহরীন আর কিছু বলল না। ওর ডানহাতে তখনও পুরোনো চাবির রিং, যেটা সে গতকাল রাত পর্যন্ত নিজের ব্যাগে রেখেছিল, ফেরত দেওয়ার কথা ছিল বিকেলে। ভেন্যুর পেছনের মালিকপক্ষের ছোট অফিসের রুম-কি। প্রথম জীবনে ঠিক এই চাবিটা সে রাগে ফেরত দিয়েছিল রাশেদা ভাবির হাতে; তারপর আর ভেতরে ঢোকার রাস্তা পায়নি। এবার চাবিটা সে মুঠোয় ঘোরাল, চোখ তুলল টার্নস্টাইলের মাথার ওপরে লাগানো ছোট কালো যন্ত্রটার দিকে—টাইমার প্যানেল। তখনই ভেতর থেকে এক ইভেন্ট-সুপারভাইজার দ্রুত হেঁটে এল।
“ম্যাডাম, মালিকপক্ষ থেকে কল,” লোকটা বলেই থমকে গেল। তার দৃষ্টি রাশেদা ভাবি থেকে মেহরীনের মুখে। “আপনারা কারা—একটু—”
রাশেদা ভাবি বাধা দিল, “আমার সই করা নির্দেশ আছে। এই মেয়ে ঢুকতে পারবে না।”
লোকটা ভ্রু কুঁচকে বলল, “নির্দেশে তো স্পষ্ট—বিরোধ হলে মালিকপক্ষের নথি কার্যকর। আর এই গেটের আজকের বিশেষ অনুমোদিত নাম...” সে ট্যাবলেটের পর্দা ঘুরিয়ে দারোয়ানকে দেখাল, তারপর একটু উঁচু গলায় পড়ল, যেন ভুল শোনার সুযোগ না থাকে, “মেহরীন আহসান। স্পনসর-লিয়াজোঁ না, সহ-মালিক প্রতিনিধি। ওনার প্রবেশ, চলাচল, ভিআইপি লিফট, জরুরি পারিবারিক সহায়তা—সবুজ অনুমতি।”
কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল না; সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ানের হাত নিচে নেমে গেল। রাশেদা ভাবির ঠোঁটের কোণা শক্ত হয়ে গেল। খালা জুবেদা এবার সত্যি করে তাকালেন। নাঈম শেলফে রাখা ঠান্ডা কৌটার দিকে এমনভাবে চাইল যেন হঠাৎ সেটা কারও ব্যক্তিগত জিনিস হয়ে গেছে।
রাশেদা ভাবি বলল, “অসম্ভব। সহ-মালিক প্রতিনিধি আবার ও কবে হলো?”
ইভেন্ট-সুপারভাইজার সংক্ষিপ্ত গলায় বলল, “আজ দুপুরে নথি আপডেট হয়েছে। জমির যে অংশে এই ব্যাক সার্ভিস ব্লক উঠেছে, তার অধিকারী হোসনে আরা বেগম। উনি চলাফেরায় অক্ষম, তাই প্রতিনিধি নাম দেওয়া হয়েছে মেহরীন আহসান।” সে একটু থামল। “হোসনে আরা বেগম—আপনাদের নানু।”
খবরটা নতুন নয়; শুধু এতদিন কেউ জোরে উচ্চারণ করেনি। নানু নিজের পুরোনো বাড়ির পেছনের জমিটা বেচেননি, লিজ দিয়েছিলেন, আর এই ভেন্যুর সার্ভিস ব্লকের কাগজে তার অংশ রয়ে গেছে। গতকাল হাসপাতালের কেবিনে বসে তিনি দ্বিতীয়বারের জীবনে মেহরীনের হাতে যে নথি দিয়েছিলেন, সেটাই এই এক টানেই গেটের ভাষা বদলে দিল। মেহরীন কেবল বলল, “নানুর ওষুধ।”
দারোয়ান তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়াল। সেটাই ছিল প্রথম ফাটল—উচ্চস্বরে নয়, কিন্তু সবার চোখের সামনে। নাঈম ছুটে গিয়ে শেলফ থেকে ঠান্ডা কৌটাটা এনে দুহাতে বাড়িয়ে দিল। রাশেদা ভাবির আঙুলে ধরা সই-করা কাগজটা হালকা কেঁপে উঠল।
কিন্তু সে পিছু হটার মানুষ নয়; বরং এখানেই বেশি ভয়ংকর। খালাদের সামনে মুখ হারিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ আরও শক্ত করল। “ঠিক আছে,” সে বলল, “প্রতিনিধি হলে নিয়ম আরও মানতে হবে। গেট-বিরোধ হলে পনেরো মিনিট নিরাপত্তা স্থগিত থাকে। এই সময় কেউ ক্রস করতে পারে না। নাঈম, টাইমার প্রস্তুত করো। ওকে বাইরে অপেক্ষা করাও। আমি নতুন করে যাচাই করব।”
ইভেন্ট-সুপারভাইজার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, রাশেদা ভাবি কাগজটা তার সামনে ঠেলে ধরল। “এই তো আপনার নথি। বিরোধ হলে স্থগিত। আমি এখনই স্থগিত দিচ্ছি। ওকে এক কদমও ভেতরে ঢুকতে দেবেন না।”
এইবার সে সরাসরি মেহরীনের কাঁধের সামনে হাত তুলে দাঁড়াল; ব্যাক গেটের সরু ফ্রেমে তাদের দুজনের দেহে পথ একেবারে আটকে গেল। দরজার চৌকাঠের ভেতর-বাইরের সেই অল্প জায়গায় এক সেকেন্ডের জন্য মেহরীন থামল। আগের জীবনে এ জায়গাতেই সে গলা চড়িয়েছিল, কেঁদেছিল, প্রমাণ দেখিয়েছিল। ফল হয়েছিল উল্টো। এবার সে শুধু রাশেদা ভাবির হাতটার দিকে তাকাল, তারপর টাইমার প্যানেলের নিচের ধাতব ঢাকনাটার দিকে।
ইভেন্ট-সুপারভাইজার নিচু গলায় বলল, “ম্যাডাম, মালিক-প্রতিনিধির ক্ষেত্রে স্থগিত শুরু করার অধিকার উনিই—”
রাশেদা ভাবি প্রায় চিৎকার করে উঠল, “আমি বলেছি টাইমার চালু হবে! আমার সই করা গেট-ইনস্ট্রাকশন আছে। ও বাইরে থাকবে।”
সেই শেষ অতিরিক্ত ঠেলাটাই দরকার ছিল।
মেহরীন কৌটাটা বাম হাতে নিল, ডান হাত থেকে পুরোনো চাবির রিং খুলে ছোট অফিসের তালায় এক মোচড় দিল। ধাতব শব্দে ঢাকনাটা খুলে গেল; ভেতরে লাল সুইচ, নিচে লেখা—মালিকপক্ষ/প্রতিনিধি। রাশেদা ভাবি এক পা এগিয়ে এসে বলল, “ওটা ছুঁবেন না—”
মেহরীন তার কথা শেষ হতে দিল না। খুব শান্ত স্বরে বলল, “আপনি নিজেই তো বললেন—বিরোধ হলে নিয়ম চলবে।”
তার আঙুল লাল সুইচে চাপল।
বিপ্।
টার্নস্টাইল সঙ্গে সঙ্গে জ্যাম হয়ে ঘুরে থেমে গেল, কিন্তু মেহরীনের সামনে নয়—রাশেদা ভাবি, নাঈম আর দারোয়ান যে দিকে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দিকের লক নেমে এল। ওপরের সবুজ আলো বদলে কমলা হলো, তারপর লাল। প্যানেলে সংখ্যা জ্বলে উঠল—১৫:০০।
ইভেন্ট-সুপারভাইজার দ্রুত একপা সরে মেহরীনের জন্য পাশের মালিক-অ্যাক্সেস দরজাটা খুলে দিল। “প্রতিনিধি পথ,” সে ছোট গলায় বলল।
রাশেদা ভাবি তখন বুঝল কী হয়েছে। সে টার্নস্টাইল ঠেলে ঢুকতে গেল, ধাতব বারে কনুই লেগে তীক্ষ্ণ শব্দ উঠল। “এটা ভুল! আমি ভেতরে যাব—ওকে থামান!” তার কণ্ঠে প্রথমবার ফাঁটল ধরা পড়ল। কাগজটা হাত থেকে আধাআধি নেমে গেল, খালাদের সামনে তার সেই নিশ্চিত ভঙ্গি আর রইল না।
মেহরীন ভেতরে পা বাড়াল, তারপর একবার পেছন ফিরে শুধু ইভেন্ট-সুপারভাইজারকে বলল, “গেট-বিরোধের নথি অনুসারে কাউন্টডাউন চলবে। কোনো ব্যতিক্রম নয়।”
লোকটা মাথা নাড়ল। রাশেদা ভাবি এবার সই-করা কাগজটাই সামনে ধরতে গেল, যেন কাগজ দিয়ে লক খুলে ফেলা যায়। কিন্তু নিয়ম এখন ওর মুখে নয়, যন্ত্রে। সে আরেকবার ধাক্কা দিল; টার্নস্টাইল ঠক করে ফিরে এসে তার কবজিতে লাগল। নাঈম পিছিয়ে গেল। দারোয়ান নিজের জায়গা হারিয়ে দেয়ালের সঙ্গে চেপে দাঁড়াল। খালা জুবেদা এপাশে আসতে গিয়ে থেমে গেলেন; মুখ খুললেন না।
মেহরীন দরজার ভেতরের সরু করিডর ধরে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। কাচের ওপাশে আলো, মাইক, বিয়ের গানের ঝিলিক; পেছনে আটকে থাকা লোহার শব্দ ক্রমে ছোট হতে থাকল। তার হাতে ঠান্ডা কৌটা, আঙুলে নানুর দেওয়া চাবির ধাতব গরম, আর সামনে খোলা পথ। লিফটের পাশে পৌঁছে সে একবার থামল, যেন কিছু মনে পড়েছে। তারপর ফিরে এসে টাইমার প্যানেলের পাশে বাইরের ছোট জানালায় হাত ঢুকিয়ে মালিকপক্ষের সেকেন্ডারি সুইচটাও নিচে নামিয়ে দিল—রিস্টার্ট নিষেধ।
দ্বিতীয় বিপ্ শব্দটার পর চারপাশের আওয়াজ যেন দূরে সরে গেল। প্যানেলে সংখ্যা নেমে এল—০০:০৩... ০০:০২... ০০:০১... টার্নস্টাইল শক্ত হয়ে রইল। ০০:০০।