সাজানো দৃশ্যটাই তার ঘাড়ে ফিরল
বেই-দরজার লোহার কপাটটা ধাক্কা মেরে খুলে দিয়ে রাশেদ ভাই বলল, “কার্ট ঠেলো, মৌরি। আজ একটা ভুল হলেই কাগজে উঠবে—তারপর আমার কিছু করার থাকবে না।” তার হাতে ছিল রিলিজ লেজার, আর মৌরির হাতে ঠেলে দেওয়া হল সারের স্প্রে-পাম্পের খালি কার্ট। বৃষ্টিভেজা ঢাকার সন্ধ্যায় লোডিং বেতে ডিজেলের গন্ধ, ভেজা বস্তার গন্ধ, আর চায়ের কাপে ঠান্ডা হয়ে বসে থাকা পাতলা চামড়ার গন্ধ একসাথে লেগে ছিল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জসিম সুপারভাইজার মুখ ঘুরিয়ে ছিল, যেন কিছুই দেখছে না; অথচ পাশের গলিতে নাবিল মাল তোলার ফাঁকে ফাঁকে তাকাচ্ছিল। নাবিলের খালাম্মা আর মৌরির মায়ের আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে—এই এক কারণেই আজকের অপমানটা শুধু চাকরির না, মুখেরও।
মৌরি কার্টের হাতল ধরল। বাসকার্ডের ক্ষয়ে যাওয়া ধারটা তার ওড়নার খুঁটিতে ঠেকল, সকালবেলার ছুটোছুটির দাগ যেন এখনো শরীরে আটকে আছে। এই বেই-লেনে সে একবার আগেও দাঁড়িয়েছিল—পাঁচ মাস আগে—যেদিন ভুল কাগজে সই না করেও দোষ তার ঘাড়ে গিয়েছিল, চাকরি গিয়েছিল, বাবার ওষুধ বন্ধ হয়েছিল, আর পাড়ায় গল্প উঠেছিল, মেয়েটা নাকি ঢাকায় গিয়ে কাজ সামলাতে পারে না। এবার সে ফিরে এসেছে অন্য শাখা থেকে অস্থায়ী বদলিতে, কাগজ পড়ে, সিল দেখে, কার হাতে চাবি থাকে তা মুখস্থ করে। কিন্তু রাশেদ ভাই শুরুতেই তাকে নিচের সারিতে আটকে দিল।
“চেকলিস্ট ধরো।” সে কার্টের ওপর ভেজা ক্লিপবোর্ড ফেলে দিল। কাগজে চারটা বক্স আগে থেকেই টিক মারা—‘প্যাক সিল ঠিক’, ‘সংখ্যা মিল’, ‘ডেলিভারি কোড মিল’, ‘রিলিজ অনুমোদিত’। নিচে খালি জায়গা শুধু ‘হ্যান্ডওভার যাচাই’ আর রাশেদ ভাইয়ের সই। মৌরি কাগজ তুলে একবারই দেখল। তার গলায় কোনো তর্ক উঠল না, শুধু বলল, “গুদামের বাম দিকের প্যালেট এখনও খোলা। সিল ঠিক লিখলেন কী দেখে?”
রাশেদ ভাই ঠোঁট বাঁকাল। “তুমি দেখবে? তুমি আজ শুধু কার্ট সরাবে। যাচাই আমি করেছি। তোমার কাজ শেষ লাইনে টিক দিয়ে কার্টটা গেটে ছাড়ো। বেশি বুদ্ধি দেখালে কাগজে লিখব, হস্তান্তর বিলম্ব—স্টক ক্ষতি।”
জসিম এবার কাশি চেপে বলল, “রাশেদ ভাই, মালিকপক্ষের অর্ডারটা—” “আমি জানি,” রাশেদ ভাই কেটে দিল। “আজ রাতেই শিবচরের চালান বের হবে। কে কোন কাজ করবে সেটা আমি ঠিক করব।”
মৌরি ক্লিপবোর্ডটা কার্টে রেখে প্যালেটের দিকে তাকাল। প্লাস্টিক মোড়কের ভেতর পাঁচটা স্প্রে-মেশিনের বদলে চারটা, আর এক পাশে বেঁকে থাকা কাঠের চেরা নতুন। সে হাত বাড়াল না। “চাবিটা দিন,” শান্ত গলায় বলল, “আমি সিল মিলিয়ে তারপর ‘হ্যান্ডওভার যাচাই’ দেব।”
রাশেদ ভাই যেন এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিল। কোমর থেকে গেটের দেরিতে-ফেরত দেওয়া চাবির গোছা খুলে ঝনঝন শব্দে তার সামনে নাড়ল, আবার নিজের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। “চাবি আমার কাছেই থাকবে। তুমি কাগজে টিক দাও। না দিলে এখানেই লিখে দেব, কাজ অমান্য। আর নাবিল—” সে কাঁধ ঘুরিয়ে জোরে বলল, “দেখছ তো? আত্মীয়ের পরিচয় থাকলে সবাই নিজেকে অফিসার ভাবে।”
নাবিলের হাতে থাকা দড়ি থেমে গেল। সে কিছু বলল না, শুধু চোখ নামিয়ে প্যালেটের ফাটলটার দিকে তাকাল। এটাই ছিল প্রথম ছোট ফাঁক—রাশেদ ভাই গল্পটা বলতে গিয়ে জিনিসটা বেশি জোরে দেখিয়ে ফেলেছে।
মৌরি টিক দিল না। সে কার্ট ঠেলে ঠিক receiving lane-এর ধার পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল, যেন কাজ মানছে, কিন্তু চূড়ান্ত লাইন খালি রাখল। “কার্ট লাইনে আছে,” সে বলল। “আপনি অনুমোদিত লিখেছেন, আপনি হ্যান্ডওভার নিন।”
রাশেদ ভাই এগিয়ে এসে ক্লিপবোর্ডটা তার হাত থেকে কেড়ে নিল। “এত নাটক লাগবে না।” তারপর সবার সামনে নিজেই ‘হ্যান্ডওভার যাচাই’-এর ঘরে টিক মেরে দিল। কালির দাগ একটু ছড়িয়ে গেল, বৃষ্টির ভেজা বাতাসে কাগজ নরম ছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের নামের নিচে সইও করে দিল—রাশেদুল করিম—জোরে, লম্বা টানে। “হয়ে গেছে। এবার গেট খুলো।”
মৌরি একটুও নড়ল না। ওই মুহূর্তেই ফাঁদটা বাঁক নিল। যে যাচাই সে তার ঘাড়ে চাপাতে চাইছিল, সেটাই রাশেদ ভাই নিজে করে ফেলেছে, আর কাগজে চারটা আগের টিকের সঙ্গে শেষ টিকও এখন এক লাইনে বাঁধা। জসিম সুপারভাইজার আরেকবার মাথা তুলল। নাবিল কার্টের চাকা পা দিয়ে আটকে দিল, অভ্যাসবশত, যেন মাল গড়িয়ে না যায়।
“গেট খুলো,” রাশেদ ভাই এবার চেঁচিয়ে উঠল। “অর্ডার আটকে রাখার অধিকার তোমার নেই।”
“আমার নেই,” মৌরি বলল। “যার আছে, তার সঙ্গে কথা বলি।”
সে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করল না; পাশের দেয়ালে টাঙানো অভ্যন্তরীণ লাইনের কালো রিসিভার তুলল। এই লেনে ক্যামেরা নেই, কিন্তু কল-লগ থাকে—এটাও সে এবার বদলি হয়ে এসে শিখেছে। “সৈয়দ স্যার? receiving bay থেকে মৌরি বলছি। শিবচর চালানের রিলিজ কাগজে পূর্ণ যাচাই ও অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে রাশেদ ভাইয়ের সইয়ে। প্যালেটের বাম দিক খোলা, সংখ্যা কম দেখছি। উনি এখনই গেট ছাড়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। আপনি কি তাৎক্ষণিক রিলিজ নিশ্চিত করছেন?”
ওপাশে এক সেকেন্ডের থেমে থাকা নিঃশ্বাস, তারপর খসখসে গলা, “কাগজ কে সই করেছে?” মৌরি ক্লিপবোর্ড তুলে চোখের সামনে ধরল। “রাশেদুল করিম। পূর্ণ যাচাই-টিকসহ।” “কেউ বের করবে না। আমি নিচে নামছি। জসিমকে লাইনে রাখো।”
রাশেদ ভাই হাত বাড়িয়ে রিসিভার কেড়ে নিতে গেল, কিন্তু মৌরি আগেই সেটি হুকে বসিয়ে দিয়েছে। তার গলায় রাগ ছিল না, শুধু পথ বন্ধ করা দৃঢ়তা। “আপনি এখনই গেট খুলতে বলছিলেন,” সে বলল, “স্যার নেমে আসা পর্যন্ত কার্ট এখানেই থাকবে।”
রাশেদ ভাই কার্টের সামনের চাকায় লাথি মারল। কার্ট কেঁপে উঠে লোহার রেলিংয়ে ঠুকল, প্লাস্টিক মোড়ক একটু ছিঁড়ে ভেতরের ফাঁকা জায়গাটা আরও চোখে পড়ে গেল। জসিম এবার এগিয়ে এল, খাতার ওপর হাত রাখল। “কার্ট নাড়াবেন না,” সে নিচু স্বরে বলল, কিন্তু তার নিচু স্বরেই কাজের ভয় ছিল। “এখন সব কিছু কাগজমতো চলবে।”
বাইরের গলি দিয়ে দুইজন ড্রাইভার মাথা বাড়িয়ে তাকাল, আবার নিজেদের ট্রলির পাশে দাঁড়িয়ে গেল। বৃষ্টির পানি নর্দমায় গড়িয়ে পড়ছিল, আর লোডিং বেতে সেই অদ্ভুত টান তৈরি হল—যেখানে কেউ উচ্চস্বরে কিছু বলে না, কিন্তু সবাই জানে, এখন যার সই আছে, ক্ষতিও তার ঘাড়ে উঠবে। রাশেদ ভাই হঠাৎ নাবিলের দিকে ফিরল। “তুমি গেট খোলো। আমি বলছি।”
নাবিল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। “চাবি তো আপনার কাছে।”
এই ছোট বাক্যটাই রাশেদ ভাইয়ের গলাকে অদ্ভুত শুকনো করে দিল। চাবি, সই, শেষ টিক—সবই এখন তার দিকেই ইশারা করছে। সে তাড়াতাড়ি পকেট থেকে চাবির গোছা বের করল, গেটের তালায় লাগাতে গেল, কিন্তু ঠিক তখনই সামনের সিঁড়ি বেয়ে সৈয়দ স্যার নেমে এলেন, সঙ্গে হিসাবের মানুষ আরেকজন। তিনি কোনো প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলেন না। সরাসরি ক্লিপবোর্ড চাইলেন।
মৌরি এগিয়ে দিল। কাগজের ভেজা কোণায় চায়ের কাপের পুরনো গোল দাগ লেগে ছিল; হয়তো বিকেলে অফিসরুমে পড়ে ছিল অনেকক্ষণ। সৈয়দ স্যার সেই দাগের পাশে আঙুল থামিয়ে টিকগুলোর ওপর চোখ বুলালেন, তারপর প্যালেটের ছেঁড়া মোড়ক এক টানে সরিয়ে দিলেন। চারটা মেশিন। অর্ডারে পাঁচ। কাঠের ফাঁকে খালি কুশন।
“পূর্ণ যাচাই?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
রাশেদ ভাই তাড়াতাড়ি বলল, “স্যার, ও-ই তো—” “কাগজে কার সই?” সৈয়দ স্যার তাকালেন না পর্যন্ত।
জসিম উত্তর দিল, “রাশেদ ভাইয়ের।”
এক মুহূর্তের জন্য রাশেদ ভাইয়ের পুরনো কর্তৃত্বটা যেন বাতাসে ঝুলে রইল, তারপর সৈয়দ স্যার হিসাবের লোকটাকে বললেন, “তাৎক্ষণিক আদেশ লিখুন। রাশেদুল করিমকে আজ থেকেই সব রিলিজ-ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুদামের ভেতর প্রবেশ নিষিদ্ধ। চাবি, সিল, লেন-রেজিস্টার বুঝে নিন। আর চালান বের হবে না।”
রাশেদ ভাই হকচকিয়ে উঠল। “স্যার, এটা আমার বিরুদ্ধে ফাঁদ—ও আমাকে—” “আপনি নিজে শেষ টিক দিয়েছেন,” সৈয়দ স্যার বললেন। “নিজে সই করেছেন। আর এখনই গেট ছাড়তে চাপ দিয়েছেন। এই মুহূর্ত থেকে আপনি লাইনের বাইরে দাঁড়ান।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই হিসাবের লোকটা রেজিস্টারের পাতায় নতুন আদেশ লিখে ফেলল। সৈয়দ স্যার সেটায় সই করলেন। তারপর কলম বাড়িয়ে দিলেন মৌরির দিকে। “receiving lane-এর অস্থায়ী দায়িত্ব নিন। এই রাতের জন্য। কার্ট, চাবি, রেজিস্টার—আপনার কাছে।”
মৌরি কলম ধরল। হাত কাঁপল না। সে নতুন আদেশে গ্রহণ-স্বাক্ষর করল, তারপর রাশেদ ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “চাবি।”
রাশেদ ভাই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, যেন না দিলে বাস্তবটাই বদলে যাবে। কিন্তু জসিম সামনে এসে শুধু বলল, “দেন।” গলার ভদ্রতা অটুট, তবু আর আগের মতো নিচু নয়। রাশেদ ভাই চাবির গোছাটা দিল। ধাতুর ঠান্ডা শব্দ মৌরির হাতে এসে থামল।
সৈয়দ স্যার পুরনো রিলিজ কাগজটা আবার তুললেন। “এই সই-করা আদেশে,” তিনি হিসাবের লোকটাকে বললেন, “ক্ষতির অস্থায়ী দায় রাশেদুল করিমের নামে নথিভুক্ত করুন। কারণ—অসম্পূর্ণ পণ্যকে পূর্ণ যাচাই দেখিয়ে তাৎক্ষণিক রিলিজের নির্দেশ।” কথাগুলো শুকনো ছিল, কিন্তু ধারালো। কোনো বক্তৃতা না, কোনো রাগও না; শুধু দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দের মতো।
রাশেদ ভাই এবার এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, “মৌরি, কাগজটা একটু—এই মুহূর্তে রেকর্ডে তুলবেন না। ভুল বোঝাবুঝি…” মৌরি তার দিকে তাকালই না। সে কার্টের মুখ ঘুরিয়ে receiving bay থেকে সরিয়ে ভিতরের কোণে নিল, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্যালেট আলাদা থাকে। তারপর নতুন দায়িত্বের রেজিস্টারটা নিজের পাশে টেনে নিল। ওই টানাটানির মধ্যেই standing change হয়ে গেল—যে মেয়েটাকে একটু আগে কার্ট-ঠেলানি বানিয়ে ফেলা হচ্ছিল, এখন লেন ছাড়ার শেষ সিদ্ধান্ত তার হাত দিয়ে যাবে।
সৈয়দ স্যার বললেন, “সাইড এক্সিট দিয়ে বের হন, রাশেদুল। সামনের গেট ব্যবহার করবেন না।”
কেউ কিছু যোগ করল না। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, প্লাস্টিক ছিঁড়ে থাকা প্যালেট, আর গেটের পাশে জমে থাকা চাকার কাদা—এইগুলোই বাকিটা বলল। মৌরি সাইড এক্সিটের কাছে গিয়ে নতুন স্বাক্ষরিত অব্যাহতির আদেশটা একবার চোখের সমান তুলে দেখল। পুরনো রিলিজ ফর্মের টিকগুলো এখনও স্পষ্ট, নিচে রাশেদ ভাইয়ের টানা সই। তার ওপর নতুন আদেশের কালি শুকায়নি, কিন্তু যথেষ্ট পড়া যায়: প্রবেশ নিষিদ্ধ, রিলিজ-ক্ষমতা রহিত। চৌকাঠের সরু থামায় এক দমক বাতাস লাগতেই কাগজটা হালকা কেঁপে উঠল; মৌরি দেরিতে-ফেরত-দেওয়া চাবির গোছা কোমরে গুঁজে সেই সই-করা আদেশটা সাইড এক্সিটের রেজিস্টার-ক্লিপে আটকে দিল।