আসল হাত উঠতেই সব বদলে গেল
“নীরা, ওদিক থেকে সরে দাঁড়াও—কনসোল আজ মাহির ভাই চালাবেন।”
কালো তারের গুচ্ছের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শাওন হাত বাড়িয়ে নীরার গলায় ঝুলে থাকা কুঁচকে যাওয়া পরিচয়-ফিতা আঙুলে ঠেলে দিল, যেন জিনিসটা আছে ঠিকই, কিন্তু কাজে লাগে না। রিহার্সালের সাইড উইং-এ আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে মঞ্চ দেখা যাচ্ছে; সামনে আলো বদলাচ্ছে, পেছনে কিউ-স্ক্রিনে পরের পর্বের নাম একবার জ্বলে, একবার নিভে উঠছে। নীরা হাতের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বাক্সটা কনসোলের নিচে রাখতে গিয়েও থামল। ওই কনসোলটা সে তিন রাত ধরে বানিয়েছে—লোকাল ব্যান্ড, আবৃত্তি, তারপর কৃষি-উদ্যোক্তা সম্মাননা, সব কিছুর আলাদা লেভেল, আলাদা রিটার্ন। তার নিজের হাতে লেখা অর্ধভাঁজ কাগজে কিউ তালিকা এখনও পকেটে।
মাহির ভাই তখনই সামনে এসে বসলেন, চকচকে ঘড়ি টেবিলে ঠুকিয়ে। “মেয়েটা কেবল তার গুছিয়েছে,” তিনি হেসে বললেন, এত জোরে যে পাশের স্বেচ্ছাসেবকেরাও শুনে ফেলে। “লাইভ শো আর ইউটিউব ভিডিও এক না।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই মঞ্চের বাঁ পাশে দাঁড়ানো গায়িকার মনিটর থেকে হঠাৎ খসখসে শোঁ শোঁ শব্দ উঠল। পরের সেকেন্ডে কিউ-স্ক্রিনে স্পনসরের নাম অর্ধেক উঠে থেমে গেল। নীরার চোখ এক ঝলকে পড়ল—মূল রিটার্ন বাস মিউট না, ভুল অক্স পাঠানো হয়েছে। সে এগিয়ে হাত বাড়াতেই মাহির কনুই দিয়ে পথ আটকালেন।
“স্পর্শ করবে না,” তিনি নিচু গলায় বললেন, কিন্তু নিচু গলাটাও এমন করে বলা যে সবাই শুনে। “ভুল করলে সামনে অতিথি আছে।”
এই ছিল প্রথম ফাটল—শোঁ শোঁ শব্দ, থেমে যাওয়া কিউ, আর নীরার হাত কনসোল থেকে সরিয়ে দেওয়া। দরজার মুখে দুজন সজ্জাকর্মী থামল। এক কাজের মেয়ে ট্রেতে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সামনে পর্দার আড়ালেই অনুষ্ঠান, আর এখানে, এক হাত দূরে, তাকে নিজের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রোকেয়া খালা এসে দাঁড়ালেন ঠিক ওই দরজার ফ্রেমে, যেখানে থামলেই ভেতরের সব দেখা যায়, কিন্তু ঢোকা যায় না। তার শাড়ির আঁচল হাতে গুঁজে রাখা, চোখে সেই আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার মাপঝোক। “নীরা, তুমি না হিসাবের মেয়ে?” তিনি বললেন। “এত বড় মেহমানের রাতে ঝুঁকি নেবার দরকার কী? মাহিরকে করতে দাও। ও অনেক জায়গায় করেছে।”
নীরা উত্তর দিল না। এই খালার বাসার ছাদের ঘরেই সে এক বছর ছিল; বিকেলে অনলাইন ক্লাস, রাতে সাউন্ড কোম্পানির কাজ। মাসের শেষে ভাড়ার খাম দিত। ঈদের আগে মায়ের ওষুধ কিনতে না পেরে যে অতিরিক্ত রাতের শিফট নিয়েছিল, তার টাকা এখনও পুরো মেলেনি। অথচ আজ খালার চোখে সে “হিসাবের মেয়ে”—তার মানে, মাইকের পেছনে থাকা হাত, সামনে নয়।
মাহির ভাই স্ক্রিনে আঙুল নাচিয়ে বললেন, “কিউ তো ঠিকই আছে।” তারপর ভুল কিউ চাপলেন। মঞ্চে আবৃত্তির পরিচিতির বদলে কৃষি পুরস্কারের সোনালি পটভূমি উঠে গেল, সঙ্গে গ্রামের ধানের ছবির উপর আধখানা লোগো। সামনে বসা অতিথিদের সারিতে একটা টান পড়ল। ডান পাশ থেকে আরমান দৌড়ে এসে থেমে গেল। তার গলায় ঝোলানো স্বেচ্ছাসেবক-কার্ডও নীরারটার মতো ঘষে পাতলা হয়ে গেছে, কিন্তু সে এই ঘরে ঢোকার সাহস পেল না।
“আপা,” সে দরজার ধারে দাঁড়িয়েই বলল, “মনিটর দুইয়ে ফিড যাচ্ছে না।”
“চুপ,” মাহির তেড়ে উঠলেন। “যতসব কাঁচা লোক। আমি আছি না?”
শাওন মুখ নামিয়ে ফেলল। রোকেয়া খালা এবার সবাইকে শোনানোর মতো গলায় বললেন, “একজনকে কাজ দিলে আরেকজনের সামনে কথা বলা ভালো না। মেয়েদেরও একটা সীমা মানতে হয়।”
সীমা। কথাটা নীরার কানে ধাতব ঠক্ ঠক্ করে বাজল, যেন ঢিলে জ্যাক প্লাগ। সে দেখল মাহির ভাই তার নিজের করা রঙচিহ্নগুলোও বুঝছেন না; লাল টেপ মানে ভোকাল গ্রুপ, হলুদ মানে ঘোষক, নীল মানে স্টেজ রিটার্ন—মাহির নীল নামিয়ে লাল তুলছেন। গায়িকার মুখ কুঁচকে যাচ্ছে, ঘোষকের হাতে মাইক্রোফোন থেকেও খালি হলের প্রতিধ্বনি। কিউ-পথ একটার পর একটা ভাঙছে।
“টেক-চেক আবার দাও,” সামনে থেকে কারও কণ্ঠ এল। সম্ভবত আয়োজক-চেয়ারম্যান, যিনি মাহিরকে নিজের ভাগ্নের শ্বশুরবাড়ির পরিচয়ে এনেছেন। “দুই মিনিটের মধ্যে ফাইনাল।”
মাহির ঠোঁট চেপে বললেন, “সব কন্ট্রোলে আছে।” কিন্তু তার ডান হাত ভুল ফেডারের উপর থেমে আছে—কোনো মানুষ যদি সত্যি বোর্ড চেনে, এভাবে থামে না। নীরা সেটা দেখেই বুঝল, সে মুখস্থ ভঙ্গি করছে।
আরমান হঠাৎ সাহস করে বলল, “আপা সেট করছিলেন—”
“তুমি চুপ।” রোকেয়া খালার কণ্ঠ এবার চাবুকের মতো। “বড়রা আছে।”
বড়রা থাকলে নাকি ভুলও বড়দেরই থাকে—কেউ ধরতে পারবে না। ঠিক তখনই মঞ্চের প্রধান গায়িকা, যার পর্ব দিয়ে লাইভ ফিড শুরু হবে, কানে হাত চেপে সাইড উইং-এর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলেন, “মনিটরে আমার সুরই নাই!”
সকলের চোখ একসঙ্গে ঘুরে এল। এইবার লুকোনোর জায়গা নেই। শাওন কাঁপা গলায় বলল, “দশ সেকেন্ডের টেস্ট, যার হাত ঠিক, সে বসুক।”
মাহির ভাই হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে দাঁত বেশি, জোর কম। “ঠিক আছে, দেখাও তোমার মেয়ের জাদু।”
কথাটা অপমানের জন্য বলা, অনুমতির জন্য নয়। তবু নীরা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে মাহিরের পাশে কাঁধ গলিয়ে ঢুকে বাম হাত দিয়ে নীল টেপ-চিহ্নিত অক্স সেন্ড নামাল, ডান হাতের দুই আঙুলে প্রধান ভোকাল চ্যানেলের প্রি-ফেড শুনল, তারপর মিউট গ্রুপ খুলে দিল। এক সেকেন্ড। দুই। মনিটরের শোঁ শোঁ কেটে গিয়ে গায়িকার কানে পরিষ্কার তান ফিরে এল। একই সঙ্গে কিউ-স্ক্রিনে আটকে থাকা সোনালি পটভূমি সরে সঠিক পরিচিতি উঠে গেল—কারণ নীরা কনসোলের পাশের ছোট মিডিয়া প্যাডে ভুল স্তর থেকে মূল স্তরে এক ঠেলা দিয়েছে।
গায়িকা মঞ্চ থেকেই বুড়ো আঙুল তুললেন। ঘোষক হালকা কাশি দিয়ে নিজের লাইন ধরলেন। শাওনের বুক থেকে জমে থাকা নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল শব্দ করে।
মাহির ভাই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন না। তার আঙুল এখনও সেই ভুল ফেডারের উপর, কিন্তু এখন ওটা ধরার অর্থই নেই। যে কনসোল তাকে একটু আগেও কর্তৃত্ব দিচ্ছিল, সেটাই তাকে ফাঁসিয়ে ফেলেছে। রোকেয়া খালার চোখ প্রথমবার নীরার হাতে গেল—দ্রুত, স্থির, কোথাও থেমে না থাকা হাত।
“একটা ঠিক করেছে বলে সব বোঝে না,” মাহির তাড়াতাড়ি বললেন। “লাইভ সেগমেন্ট আলাদা। আমি বসি। ও পাশে থাক।”
পুরনো দাপটটাকে টেনে বাঁচাতে চাইলেন তিনি। কিন্তু ঠিক সেই সময় কনসোলের পাশে রাখা কাজের খাতা শাওন নিজের হাত দিয়ে নীরার দিকে সরিয়ে দিল। ছোট্ট একটা কাজ, তবু সবার সামনে। নীরা খাতা নিল না; সে শুধু কনসোলের উপর নিজের অর্ধভাঁজ কিউ তালিকাটা মেলে রাখল। তাতে প্রতিটি পর্বের পাশে তার হাতের লেখা—ভোকাল, তবলা, ব্যাকিং, ভিডিও, স্পনসর, কৃষি-সম্মাননা, সমবেত সঙ্গীত। মাহির তালিকাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন আগে কখনও দেখেননি।
“আমি থাকব,” নীরা বলল, স্বর নিচু কিন্তু কাটা। “যেহেতু ভুল হলে সামনে থেকেই শোনা যাবে।”
এই কথায় অনুমতি চাওয়া ছিল না। ছিল অবস্থান নেওয়া। রোকেয়া খালা কিছু বলতে গিয়েও থামলেন; কারণ সামনে থেকে ‘পাঁচ, চার, তিন’ গোনা শুরু হয়ে গেছে, আর এখন যাকে সরানো হবে, তার দায়ও সবার কানে বাজবে।
লাইভ শুরু হতেই প্রথম তিরিশ সেকেন্ড ভালো গেল। ঘোষকের কণ্ঠ, তবলার আলতো ঠুকঠাক, তারপর গায়িকার প্রবেশ। নীরা সামনে ঝুঁকে শুনছিল। মাহির পাশে দাঁড়িয়ে, কিন্তু বসতে পারেননি—বসার জায়গাটা আর ফাঁকা ছিল না। দ্বিতীয় অন্তরায় ঢুকতেই বিপদটা এল পুরো শরীর নিয়ে। বাম দিকের টাওয়ার হঠাৎ গর্জে উঠল; নিচু গুঞ্জন ফুলে ফুলে কাঁপতে লাগল, তারপর প্রধান ভোকাল খেয়ে ফেলতে শুরু করল। একই সঙ্গে ব্যাকিং ট্র্যাক আধ সেকেন্ড পিছিয়ে গেল। দর্শকাসনের সামনের সারিতে দু-একজন মাথা তুলল; মঞ্চের শিল্পী সুর ধরে রেখেও চোখের কোণায় আতঙ্ক টের দিল।
মাহির সামনে ঝাঁপিয়ে গিয়ে মাস্টার ফেডার ধরতে চাইলেন। ওই এক টানেই পুরো হল ডুবে যেত। নীরা তার কবজির আগে কনসোলের ওপর হাত নামিয়ে দিল—কথা নয়, থামানো। সে ডানদিকে ঘুরে গ্রাফিক ইকিউ-এর নিচের তিনটি ফ্রিকোয়েন্সি একে একে কেটে দিল, তারপর মনিটর বাস থেকে গায়িকার সামনে থাকা ফ্লোর-ওয়েজ অল্প নামিয়ে প্রধান ভোকালকে মাঝখান থেকে তুলল। একই নিশ্বাসে মিডিয়া ট্র্যাকের ল্যাটেন্সি-ডিলে শূন্যে এনে ক্লিক-মুক্ত ক্রসফেড করল।
গর্জনটা গিলে গেল নিজেকেই। হলের কাঁপুনি কমে এলো, ভোকাল সামনের পর্দা ভেদ করে স্পষ্ট হয়ে উঠল। গায়িকা, মুহূর্তখানেক আগে যিনি সুর বাঁচাচ্ছিলেন, এবার বুক খুলে দীর্ঘ লাইন ধরলেন। তবলাও ঠিক জায়গায় পড়ল, ব্যাকিং আবার গানের সঙ্গে জুড়ে গেল। নীরা মাস্টার ছোঁয়নি—সে ভুল জায়গায় ঝাঁপায়নি। যে জায়গায় আগুন, সেখানেই পানি দিয়েছে।
মাহির এবারও থামেননি। মুখ শক্ত করে তিনি আরেক পাশে থাকা ভিডিও কিউ ধরতে গেলেন, যেন অন্তত ওটা দিয়ে নিজের দরকার প্রমাণ করা যায়। আঙুল পড়তেই পেছনের স্ক্রিনে পরের পর্বের শিরোনাম উঠতে শুরু করল—চলমান গানের ওপর। দৃশ্যদূষণ। নীরা তাকালও না; বাম হাতে সাউন্ড ধরে রেখে ডান কনুই দিয়ে ছোট মিডিয়া প্যাড ঠেলে আবার লাইভ-ফিড লেয়ার ফিরিয়ে আনল। স্ক্রিনে গায়িকার মুখই থেকে গেল, নাম নয়। মাহিরের হাত মাঝআকাশে ঝুলে রইল।
সামনের অতিথি সারিতে বসা চেয়ারম্যান এবার চেয়ার থেকে অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়েছিলেন; আবার বসলেন। শাওন আর কোনো নির্দেশ দিল না। আরমান দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা চায়ের ট্রে-ওয়ালা ছেলেটাকে সরিয়ে দিল, যেন এই পথ এখন এক জনের জন্য। রোকেয়া খালার মুখের চাপা বিরক্তি ধীরে ধীরে এমন কিছুর দিকে গেল যা তিনি প্রকাশ করতে পারেন না—কারণ যাকে একটু আগে “সীমা” মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সে এখন সামনে বসা মেহমানদের মুখরক্ষা করছে।
গান শেষ হয়নি, তবু ঘরের ক্ষমতা বদলে গেছে। সেটা কথায় নয়, দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিল। মাহির আর কনসোল ছুঁতে পারছেন না; ছুঁলেই আরেক বিপদ হবে, এটা সবাই দেখে ফেলেছে। তিনি পেছোতে চাইলেন, কিন্তু পেছনেও মানুষ। যে কাজের মেয়ে কিছু আগে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে এবার সরে গিয়ে নীরার কনুইয়ের পাশে এক গ্লাস পানি রাখল। কাউকে জিজ্ঞেস না করেই।
নীরা কিছুই নিল না। তার চোখ লেভেল মিটারে। গানের চূড়া উঠছে। প্রধান ভোকাল, ব্যাকিং, তবলা, হলের নিশ্বাস—সব একসঙ্গে ফুলে উঠছে। সে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে অল্প করে প্রধান স্লাইডার তুলল, বাম হাতে সাপোর্টিং রিটার্ন বাঁধল, তারপর শেষ তানের আগে নিখুঁত সময়ে নিচের গুঞ্জনের দম টেনে নামিয়ে দিল। মাহিরের ঝকঝকে ঘড়ির প্রতিবিম্ব কনসোলের কালো পৃষ্ঠে কাঁপছিল, কিন্তু বোর্ড এখন তার নয়।
শেষ লাইনটা মঞ্চে ভেসে উঠে স্থির হতেই নীরা সোজা হয়ে বসল না, কারও দিকে ফিরেও তাকাল না। সে শুধু কনসোলের ওপর নিজের হাত রাখল, স্লাইডারটা চূড়া ছুঁইয়ে ধীরে নামাল। স্ক্রিন জ্বলে রইল। লেভেলগুলো একবার সর্বোচ্চে উঠে নরম সবুজে নেমে এল, আর তার আঙুল ছেড়ে দেওয়ার পরও সেই গতির রেখা কনসোলের আলোয় এক নিঃশব্দ দাগ হয়ে রইল।