Fast Fiction

যাকে ছোট ভাবল ঘর, তারই নিচে দাঁড়াল সবাই

“ওই লাইনে না, পাশে দাঁড়ান,” গেটের হোস্ট সামিউল হাত তুলে দড়ির ফাঁক বন্ধ করে দিল, যেন মেহরীন কারও ভুলে ঢুকে পড়া সরবরাহের লোক। উঠানঘেরা প্রবেশচত্বরটা আলোয় ভাসছে, ফুলের গন্ধ আর কাচের গ্লাসের টুংটাং; তবু সেই এক মুহূর্তে সব চোখ এসে আটকাল তার গায়ে—হালকা নীল শাড়ি, কাঁধে দিনের শেষ ক্লান্তির ভাঁজ, আঙুলে ধরা ছোট খাবারের বক্সটা ঠান্ডা হয়ে শক্ত। ভেতরে তানভীরের আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মানুষজন জড়ো, আর বাইরে তাকে থামিয়ে রাখা হলো এমনভাবে, যেন তার নাম নেই, স্থান নেই, দাবি নেই।

মেহরীন এক পা সরল, কিন্তু সরে গিয়ে হারাল না। ব্যাগ থেকে কার্ড বের করতে গিয়ে পুরনো যাতায়াত কার্ডের ঘষা ধরা কোণাও বেরিয়ে এল, ঢাকা শহরের বাস-অফিস-দৌড়ের দাগ। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমাকে কে ডেকেছে, সেটা আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন। সরিয়ে দিতে পারেন না।” কথাটা উঁচু গলায় নয়, তবু কাছে দাঁড়ানো তিনজন খালা, এক চাচাতো ভাই, আর শেরওয়ানি পরা ছেলেটার কানে গিয়ে ঠেকল। কারণ তারা সবাই জানত—এই মেয়েটাই গত ছয় মাস তানভীরের মায়ের হাসপাতালে যাওয়া-আসা সামলেছে, কৃষি ব্যাংকের কাগজ নিয়ে দৌড়েছে, বাসার ওষুধ পৌঁছে দিয়েছে; কিন্তু আজ গেটের সামনে তাকে এমনভাবে ধরা হচ্ছে, যেন সে শুধু বাইরে রাখার মতো নাম।

দড়ির ভেতর থেকে সেলিনা খালা এগিয়ে এলেন। ভারী গয়নায় মোড়া গলা, ঠোঁটে সেই মাপা হাসি, যা সামনে মিষ্টি আর ধারটা থাকে অন্যদিকে। “ওকে এখানে রেখো। ভেতরের সারি এখন আত্মীয়দের জন্য। মেয়েপক্ষের পরিচিতদের পরে নেওয়া হবে।” তিনি সামিউলকে না, আসলে আশেপাশের সবাইকে শোনালেন। তারপর মেহরীনের দিকে ফিরে আরও নরম হয়ে বললেন, “তুমি কষ্ট করে এসেছ, ভালো কথা। কিন্তু রীতি মানতে হয়। সব জায়গার একটা মাত্রা আছে।”

“আমি মেয়েপক্ষের পরিচিত নই,” মেহরীন বলল।

সেলিনা খালা যেন শুনলেনই না। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আরেক মেয়েকে—রেশমি, ঢাকার এক বড় ব্যবসায়ী পরিবারের নাতনি, আজ সারাটা সন্ধ্যা যাকে নিয়ে ফিসফাস—হাতে ধরে ভেতরের দিকে টেনে নিলেন। “ওকে আগে নাও। ওকে ভেতরের বারান্দার ডান পাশের সারিতে বসাও। বড়রা নামবেন।” কথার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি দৃশ্যমান হয়ে উঠল। একদিকে রেশমির জন্য দড়ি উঠল, অন্যদিকে মেহরীনের সামনে ফাঁক বন্ধ। দুই বৃদ্ধা ফিসফিস বন্ধ করে ওদিকেই তাকালেন। এক ছোট ভাইপো হাতে নামের খাতা নিয়ে দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল, কার নাম কোথায় তুলবে বুঝতে না পেরে।

মেহরীন দরজার খুঁটির ধারে এক চিলতে জায়গায় থামল। অর্ধেক খোলা ফটকের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভেতরটা দেখা যায়—মঞ্চের আগে মাঝউঠানে গোল বৃত্ত, চারপাশে সাজানো চেয়ার, ওপরে যাওয়ার সিঁড়ি। সামাজিক দূরত্ব এখানে কাঠের চেয়ারের মতো দৃশ্যমান। তানভীর কোথাও নেই। না থাকা নিজেই একরকম পক্ষ নেওয়া। মেহরীন ঠান্ডা খাবারের বক্সটা পাশের টেবিলে রাখল, ঢাকনাটা সামান্য কেঁপে উঠে আবার স্তব্ধ। “আমার নাম খাতায় তুলবেন না,” সে সামিউলকে বলল, “যতক্ষণ না ঠিক জায়গা লেখা হচ্ছে।”

এই জেদটাই সেলিনা খালার ভালো লাগল না। তিনি এবার খোলাখুলি বিরক্ত হলেন। “নামেরও আবার জায়গা হয় নাকি? যাকে যেমন ধরা হয়, সে তেমনই বসে। এত প্রকাশ্যে তর্ক কোরো না। মেয়েমানুষের সম্মান নিজেরও রাখতে হয়।”

একজন ফুফাতো বোন তখনই সুযোগ বুঝে বলল, “খালা, ওকে নিচের ডানদিকে অপেক্ষার চেয়ারে বসিয়ে দিন না। ওখানে যারা... পরে দেখা যাবে।” কথার কাঁটা খুব সরু, কিন্তু সবাই বুঝল—ওটা ভেতরের সারি না, প্রান্তের রাখার জায়গা। সেখানে বসলে তাকে আর কেউ এগিয়ে নিয়ে যায় না; তাকে কেবল দেখা হয়।

মেহরীন এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। সারা দিন হাসপাতাল থেকে ফার্মেসি, সেখান থেকে বাসা, তারপর এই বিয়ের বাড়ি—পায়ের পাতায় শক্তি কম, কিন্তু কণ্ঠে না। “আমি দাঁড়িয়ে থাকব,” সে বলল, “কম জায়গায় বসার জন্য আসিনি।” বাক্যটা উঠানের মধ্যে গিয়ে পড়ল। কেউ হাসল না। কারণ অপমানটা এত নগ্ন হয়ে গেছে যে, হাসি দিলে পক্ষ নিতে হয়।

ঠিক তখনই ভেতরের দিকের সারি চিরে রাশেদ বেরিয়ে এল। তানভীরের বড় মামাতো ভাই, যার কথায় সাধারণত কর্মচারীরা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সে প্রথমে রেশমির দিকে যাচ্ছিল—এমনই বোঝা যাচ্ছিল, কারণ সামিউল ইতিমধ্যে পথ খুলে রেখেছিল—কিন্তু মেহরীনকে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চলার রেখা বদলে গেল। একবারও কারও অনুমতি না নিয়ে সে মাঝপথে ঘুরে সরাসরি মেহরীনের সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর এমন ভঙ্গিতে হাত বাড়াল যেন দেরিটা তার ঘরের দোষ। “এইদিকে আসুন,” সে বলল, আর নিজের শরীর দিয়ে দড়ির বাঁকটা খুলে দিল। সামিউল হতভম্ব হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। রেশমির দিকে খোলা পথ হঠাৎ ফাঁকা পড়ে রইল, আর আশেপাশের চোখগুলো একসাথে নতুন হিসাব কষতে লাগল—কাকে আগে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে?

সেলিনা খালা সঙ্গে সঙ্গে কেটে উঠলেন, “রাশেদ, তুমি বুঝে করো। বড়রা ঠিক করেছেন—”

রাশেদ তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “বড়রা কী ঠিক করেছেন, সেটা নথির টেবিলে স্পষ্ট হবে।” তারপর সামিউলকে বলল, “দড়ি তুলুন।” হোস্টের হাত কাঁপল। দড়ি উঠল। যে ফাঁক মিনিটখানেক আগেও মেহরীনের জন্য বন্ধ ছিল, সেটাই এখন তার জন্য খোলা লেন। রাশেদ পাশে নয়, সামান্য সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ঢাল দিল; যেন কেউ আবার মাঝপথে থামাতে এলে আগে তার গায়েই লাগবে।

এই পর্যন্ত এসে উঠানের গুঞ্জন বদলে গেল। কেউ চুপ করে গেল না; বরং ফিসফাসের ধরণ পাল্টাল। খাতাওয়ালা ছেলেটা খাতা বুকে চেপে রেজিস্টারের টেবিলের দিকে দৌড় দিল। ভেতর বারান্দা থেকে তানভীর নেমে এল—মুখে সেই দেরি-করা, মেপে রাখা অস্বস্তি, যেটা দেখে বোঝা যায় এতক্ষণ সে ছিল, শুধু সামনে আসেনি। সেলিনা খালার গলা এবার একটু চড়া, একটু টানটান। “এভাবে করলে লোকজন কী বলবে? যাকে সবাই—”

“সবাই যা বলবে, সেটা এখন আমি বলছি,” মেহরীন নিজেই থামালেন তাকে। সে রাশেদের পাশ কাটিয়ে রেজিস্টারের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঠের টেবিলের ওপরে নামের খাতা, টেবিল কার্ড, ভেতরের সারির চিহ্ন। সেখানে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় নয়, স্পষ্ট করে বলল, “আমার নাম নিচের অপেক্ষার তালিকায় তোলার চেষ্টা করবেন না। তানভীরের মায়ের চিকিৎসার সব রাত আমি ছিলাম, বাসার লোকের মতো ছিলাম, আর এই ঘর যদি আমাকে দরজায় আটকে রাখে, তাহলে নাম তুলুন সেভাবেই—তানভীরের প্রকাশ্য নির্বাচিত মানুষ হিসেবে। না হলে আমি এখনই চলে যাব, আর যারা দাঁড়িয়ে দেখছেন, তারা দেখেই রাখুন, আপনাদের ঘর কাকে বাইরে রাখল।”

আঘাতটা এবার শব্দে নয়, অবস্থানে লাগল। সে নিজেই দাবিটা রেজিস্টারের সামনে বসাল, যেখানে লুকিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তানভীরের মুখ কষে উঠল; এতখানি প্রকাশ সে চায়নি। সেলিনা খালার চোখে প্রথমবার হালকা ভাঙন দেখা গেল। কারণ এখন যদি অস্বীকার করে, অপমানটা রীতি নয়, পরিকল্পিত বহিষ্কার হয়ে যায়—সবাইয়ের সামনে।

তানভীর এক নিঃশ্বাস নিল, কিন্তু কথা বলার আগেই ওপরের সিঁড়ি থেকে তার মা নাসরিন বেগম নেমে এলেন। সাদা-সোনালি শাড়ি, রোগা মুখ, তবু চোখের রেখা সোজা। তিনি রেলিং ধরে শেষ ধাপটায় এসে দাঁড়ালেন। “খাতা দাও।” খাতাওয়ালা ছেলেটা দৌড়ে দিল। তিনি নিজের আঙুল দিয়ে ভেতরের সারির ওপরের নাম-কার্ড দুটো সরিয়ে একটি খালি কার্ড টেনে আনলেন। তারপর সবার সামনে লিখলেন—মেহরীন। লেখার খসখস শব্দটুকুও শোনা গেল। “এটা ভেতরের প্রথম সারিতে যাবে,” তিনি বললেন, “আর আমার পাশে একটি চেয়ার খালি থাকবে। মেহরীন আগে ঢুকবে। যে আপত্তি করবে, সে আজ আমার নামের বিরুদ্ধেই দাঁড়াবে।”

কথা শেষ হতেই দৃশ্যমান ক্ষতি তিন জায়গায় একসঙ্গে হলো। সেলিনা খালার হাতে ধরা রেশমির কনুই আলগা হয়ে গেল; মেয়ে নিজেই এক পা সরল, কারণ এখন তাকে ধরে রাখা মানেই ভুল জায়গা আঁকড়ে থাকা। সামিউল তড়িঘড়ি করে নিচের অপেক্ষার দিকের ছোট কার্ড সরিয়ে ফেলল, যেন আগে কিছু রাখেনি। আর তানভীর—যে এতক্ষণ নিজের সুবিধামতো মাঝখানে ছিল—সামনের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল। নাসরিন বেগম তার দিকে তাকিয়েও দেখলেন না। “রাশেদ,” তিনি বললেন, “ওকে নিয়ে যাও।”

সেটাই ছিল চূড়ান্ত ভাঙন। রাশেদ কার্ডটা হাতে নিল না; টেবিলে দৃশ্যমান রেখেই সামিউলকে বলল, “এটা আগে তুলে ধরো।” সামিউল বাধ্য ছেলের মতো কার্ডটা তুলে ধরল। সবার চোখে নামটা পড়ল। তারপর রাশেদ মেহরীনের দিকে ঘুরে সামান্য ঝুঁকল, “চলুন।” শব্দটা অনুরোধ না, স্বীকৃতি। সে হাঁটা শুরু করতেই সারিটা নিজে নিজে ফাঁক হলো না; ফাঁক করানো হলো। এক বৃদ্ধা খালা, যে একটু আগে পাশে সরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, নিজের লাঠি টেনে চেয়ার গুটিয়ে নিলেন। এক কাজের ছেলে ট্রের পথ বদলে পেছনে সরে গেল। রেশমিকে এবার বারান্দার ভেতরের বদলে বাইরে দিকের সারিতে বসানো হলো; তার কানে সেলিনা খালা কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু গলার জোর আর আগের মতো নেই।

মেহরীন হাঁটছিল ধীরে, মাথা উঁচু করে। এই ধীরতা তাড়াহুড়োর চেয়ে বেশি অপমানজনক হয়ে উঠল অন্যদের জন্য। কারণ তাকে কেউ টেনে নেয়নি; তাকে জায়গা ছাড়তে ছাড়তে পথ বানাতে হয়েছে। ভেতরের প্রথম সারির কাছে গিয়ে সে দেখল, নাসরিন বেগমের পাশের চেয়ার সত্যিই খালি। তাতে আগেই কারও ওড়না রাখা ছিল; রাশেদ সেটি তুলে পেছনের সারির এক কর্মীকে দিল। আবার দৃশ্যমান ক্ষতি। কারও জন্য ধরা জায়গা সরিয়ে তার জন্য করা হলো।

সেলিনা খালা শেষ চেষ্টা করলেন। “ভাবি, লোকজন তো—”

নাসরিন বেগম এবার সরাসরি তাকালেন। “লোকজন দেখুক। দরজায় যাকে আটকে রেখেছিলে, সে আমার ঘরের মানুষ। আর যাদের তুমি আমার ঘরের ওপরে ধরতে গেলে, তারা আজ নিজেদের জায়গাতেই বসবে।” এত মাপা স্বরে বলা কথা উঠানের বাতাসকে কাঁচের মতো ধারালো করে দিল। সেলিনা খালার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু বেরোল না কিছু। তাঁর আঙুলের আংটিগুলো কাঁপছিল।

তানভীর তখন এগিয়ে এল, যেন এখন পাশে দাঁড়ালে কিছু বাঁচানো যাবে। “মেহরীন, আমি—”

মেহরীন বসার আগে একবারই তার দিকে তাকাল। “আজ কথা না,” সে বলল, এমন স্বরে যাতে অনুরোধ নেই, রাগের প্রদর্শনও নেই—শুধু সীমারেখা। তারপর সে নাসরিন বেগমের পাশের চেয়ারে বসল। ভেতরের সারি তার চারপাশে গুছিয়ে গেল, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যারা একটু আগে তাকে নিচের অপেক্ষার চেয়ারে বসাতে চেয়েছিল, তারা এখন দাঁড়িয়েই রইল, কারণ কার কোথায় বসার অধিকার তা নতুন করে লেখা হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর ওপরে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের ডাকার পালা এলো। সিঁড়ির মুখে আবার লাইন তৈরি হল—কে আগে উঠবে, কাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এবার সামিউল নিজে এসে নিচু গলায় বলল, “আপনি আগে।” সে চোখ তুলতে পারছিল না। রাশেদ পাশে দাঁড়িয়ে পথ ধরে রাখল। নাসরিন বেগম এক ধাপ পেছন থেকে বললেন, “মেহরীন আমার সঙ্গে।” বাকিটা আর বলতে হলো না।

সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় কাঠের রেলিংয়ে আলোর ঝিলিক পড়ছিল। ওপরে ওঠার মোড়ে ছোট একটা ল্যান্ডিং, নিচের উঠান এখনও দেখা যায়। মেহরীন সেখানে পৌঁছে এক মুহূর্ত থামল। তার ডান হাত রেলিংয়ের কাছে গিয়ে স্থির হলো, ছোঁয়ার আগের দূরত্বে। সে ইতিমধ্যেই ওপরে, ভেতরের দিকে নেওয়া হয়েছে। পেছনে ধাপের ওপর সেলিনা খালা, তানভীর, আর অন্যরা এক ধাপ নিচে থেমে আছে—আরও ওপরে আসার আগে যাদের অপেক্ষা করতেই হচ্ছে, কারণ পথ এখন তার পরেই খুলবে। মেহরীন হাতটা রেলিংয়ের কাছে রেখেই বলল, “এবার ঠিক আছে,” তারপর সামনে ঘুরে ওপরে উঠে গেল।