Fast Fiction

স্পটলাইট হঠাৎ ওর দিকেই ঘুরল

দরজার মুখেই স্বেচ্ছাসেবক ছেলেটা মেহরিনের গলা থেকে ঝোলানো অংশগ্রহণকারীর কার্ড খুলে নিয়ে বলল, “এটা আরমান ভাইয়ের লাইনে যাবে, আপা। আপনি টেবিলের পাশে থাকেন, জিনিসপত্র ধরিয়ে দেবেন।” কথা শেষ হওয়ার আগেই সে কার্ডটা ঘুরিয়ে আরমানের ব্লেজারের বুকপকেটের কাছে ক্লিপ করে দিল। উঠানঘেরা প্রদর্শনীর প্রবেশরিংয়ে যে যার মতো থেমে দেখছিল, তাদের মধ্যে তানভীর খালা, দুই ফুফাতো ভাই, এমনকি পাশের বাসার কাকিমাও ছিলেন। কেউ চোখ নামাল না। মেহরিনের হাতে ধরা অর্ধেক ভাঁজ করা রশিদটা কচকচে শব্দ করল; গত রাতের শেষ মুহূর্তে কেনা সেন্সর আর তারের হিসাব সে সকালেও মিলিয়ে এসেছে।

ওর সামনে লম্বা টেবিল, তার ওপর ছোট সেচ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র—মাটির আর্দ্রতা মাপলে পাম্প নিজে থেকে চালু হবে, পানি নষ্ট কমবে। কৃষি-প্রযুক্তি যুব প্রদর্শনীতে এটাই ছিল তাদের দলের মূল প্রদর্শন। কিন্তু রাশেদ স্যার মাইকের দিকে তাকিয়েই বললেন, “মেহরিন, তুমি পাশে থাকো। আরমান উপস্থাপনা ভালো পারে। স্পন্সররা কথা শুনতে চায়।” যেন বানানো জিনিসের চেয়ে বলা কথাই বেশি দামি। আরমান তখন আয়েশ করে হাতা গুটিয়ে হেসে উঠল, “ও তো একটু লাজুক, স্যার। আমি সামলে নিচ্ছি।”

লাজুক। শব্দটা উঠানের ভেতর ছোট্ট পাথরের মতো ছুড়ে দেওয়া হলো, কিন্তু গিয়ে পড়ল অনেক দূর পর্যন্ত। তানভীর খালা পাশের মহিলাকে চাপা গলায় বললেন, “মেয়েটা মেধাবী ঠিকই, কিন্তু জনসমক্ষে দাঁড়াতে পারে না নাকি?” আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা এইসব জিজ্ঞাসা কাগজের আগুনের মতো; ধরে গেলে কাজ, মুখ, ভবিষ্যৎ—সব একসঙ্গে পোড়ে। মেহরিন কোনো জবাব দিল না। সে শুধু নিজের টুলবক্সটা তুলে টেবিলের নিচে রাখল। পুরোনো নীল বক্স, ঢাকনায় কালির দাগ, এক কোণে কলমের চাপ লেগে খোঁচা খাওয়া চামড়া উঠে গেছে। ওটা তার জায়গা। কার্ড নয়, মাইক নয়—ওটাই।

উঠানের মাঝখানের খোলা রিং পেরিয়ে অতিথিরা ভেতরে ঢুকছে, কেউ থামছে, কেউ পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। মঞ্চ বলতে সামান্য উঁচু কাঠের চৌকি, সামনে মনিটর স্পিকার কাত হয়ে রাখা। আরমান মাইকে বলল, “আমাদের উদ্ভাবন গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য। দেখুন, মাটি শুকালেই এই সিস্টেম পাম্প চালু করবে।” ‘আমাদের’ বলার সময়ও সে হাত রাখল এমনভাবে, যেন যন্ত্রটার ভিতর পর্যন্ত তারই। মেহরিনকে সে আঙুল তুলে ইশারা করল, “তারটা দিন।” তারপর আর তাকালই না।

মেহরিন তার এগিয়ে দিল। আরমান সংযোগের রং পর্যন্ত গুলিয়ে ফেলল, তবু আত্মবিশ্বাসী মুখে বলে গেল, “এখানে ডেটা যায়, ওখানে কমান্ড।” পাশে দাঁড়ানো এক বিচারক চশমা নামিয়ে তাকালেন। মেহরিন বুঝল, লোকটা বুঝছেন না, না বুঝেও মাথা নাড়ছেন। এই শহরে অনেক কিছুই মুখ দেখে বিশ্বাস করা হয়। আরমান সেই বিশ্বাসের পোশাক পরে এসেছে—ইংরেজি উচ্চারণ, ব্লেজার, স্পন্সরদের নাম মুখস্থ, আর রাশেদ স্যারের প্রিয় ছাত্র হওয়ার সুবিধা।

সাব্বির, যে তাদের সাথে প্রোটোটাইপের বাক্স বয়ে এনেছিল, একবার মেহরিনের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ও জানে কার হাতের সোল্ডার জোড়া কোথায়, কোন তার কেন ছোট, কোন পাম্পের ভেতর কটা বেয়ারিং বদলানো। তবু সে কিছু বলল না। কারণ বলা মানে রিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কারও মুখের দিকে না, পুরো বংশপরিচয়ের দিকে কথা ছোড়া। আর এখানে সবাই দেখে রাখে।

আরমান ডেমো শুরু করল। টবে গোঁজা সেন্সরটা সে শুকনো মাটির বদলে ভেজা নমুনায় ঢুকিয়ে দিল, তবু মুখে একই সুর, “এখন দেখুন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাড়া দেবে।” মেহরিন টেবিলের ধারে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে রাগ উঠল ঠিকই, কিন্তু রাগ দিয়ে যন্ত্র চলে না। যন্ত্র মিথ্যা মানে না। কয়েক সেকেন্ড কিছু হলো না। আরমান হাসি আটকিয়ে বলল, “একটু সময় নেয়।”

রাশেদ স্যার দূর থেকে হাত নেড়ে ইশারা করলেন, চালিয়ে যেতে। আরমান মাইকে কথা বাড়াল। “এটার সবচেয়ে বড় শক্তি—নির্ভুলতা।” একই সময় সে লুকিয়ে হাতে সুইচ টিপে পাম্প চালাতে গেল। চাপ পড়তেই ভোঁতা এক শব্দ হলো, তারপর সব থেমে গেল। মোটরের মাথায় কেবল কেঁপে উঠল। মেহরিনের বুকের ভেতর একবার টান খেল। সুইচের নিচের সরু তারটা সে সকালেই শক্ত করে বেঁধেছিল। এখন সেটা ঢিলে। কেউ টেনেছে।

আরমান দ্বিতীয়বার চাপ দিল। এবার পাম্পের পাইপ ফেটে একচিলতে পানি ছিটকে তার প্যান্টের হাঁটুর কাছে লাগল। প্রথম সারিতে দাঁড়ানো দুজন কলেজছাত্র একসঙ্গে দম আটকে ফেলল। তানভীর খালার হাতের চুড়ি টুং করে থেমে গেল। মাইকের গায়ে আরমানের শ্বাসের ঘষা শোনা গেল, কিন্তু মুখের বুলি এক মুহূর্তের জন্যও বেরোল না। সেই ক্ষুদ্র থেমে থাকা সময়েই রিংয়ের চারপাশের চোখগুলো একবারে মেহরিনের দিকে ফিরল—কেউ ডাকেনি, তবু ফিরল।

মেহরিন তাকিয়ে দেখল, আরমান তার দিকে না তাকিয়ে যন্ত্রটার ওপর ঝুঁকে আছে, যেন হাত দিলেই সব বুঝে যাবে। কিন্তু সে বুঝছে না কোথায় ভুল। পাম্পের পাশে ছোট সবুজ আলো জ্বলছে না; তার মানে বিদ্যুৎ আসছে না, অথবা গ্রাউন্ডিং খুলে গেছে। মেহরিনের আঙুল নিজের অজান্তে টুলবক্সের হাতলে গিয়ে থামল। রিংয়ের ওপাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ স্পন্সর বিচারকের কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। বিচারক এবার চশমা খুলে সরাসরি মেহরিনকে দেখলেন।

আরমান মাইকে হেসে উঠতে চাইল, কিন্তু হাসিটা শুকনো হয়ে গেল। “সামান্য লুজ কানেকশন,” সে বলল। “মেহরিন, একটু—” কথাটা শেষ করতে পারল না। কারণ এই প্রথম তার ডাকে আদেশের জোর ছিল না, ছিল হাতড়ানি। এবং সেটা সবাই শুনল।

রাশেদ স্যার তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন। “দাঁড়াও, দাঁড়াও, আরমান সামলে নেবে।” তিনি কথা বললেও চোখ যন্ত্রে নয়, স্পন্সরদের মুখে। তখনই বিচারকদের একজন, যিনি এতক্ষণ নোট নিচ্ছিলেন, টেবিলের কাছে এসে একপাশ সরলেন। “যে বানিয়েছে, সে আসুক,” তিনি মাইকের বাইরে, কিন্তু এত জোরে বললেন যে সামনের সারি শুনে ফেলল। আরেকজন স্বেচ্ছাসেবক আরমানের হাতের পাশ থেকে নিয়ন্ত্রণের ছোট বোর্ডটা তুলে নিয়ে টেবিলের ওপারে বাড়িয়ে ধরল। সরাসরি মেহরিনের দিকে।

এক মুহূর্তে উঠানের বাতাস বদলে গেল না; বরং বদলটা দেখা গেল দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে। আরমান যেখানে ছিল, তার সামনে আর জায়গা রাখা হলো না। রাশেদ স্যার বাধা দিতে গিয়ে কেবল বললেন, “সময় কম—” কিন্তু বিচারক হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। “চলবে না, যদি না ঠিকভাবে চলে। তাকে জায়গা দিন।”

মেহরিন এগোল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ফাঁকে ফাঁকে সে হেঁটে এলো, যেন অনেকদিন ধরে যে জায়গায় পৌঁছতে হচ্ছিল, আজ শুধু শেষ পাঁচ গজ বাকি। পাশ কাটাতে গিয়ে আরমানের হাত তার কনুই ছুঁয়ে গেল; উষ্ণ, অস্থির, অনুনয়ের মতো। সে হাত সরিয়ে নিল। কোনো কথা বলল না। টেবিলের কাছে এসে প্রথমে নিয়ন্ত্রণ বোর্ডটা নিল না; টুলবক্সটা টেনে ওপরে তুলল। ঢাকনা খোলার কাগজমোড়ার শুকনো শব্দ উঠল। নীল বক্সের ভেতর সুশৃঙ্খলভাবে রাখা ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার, কালো টেপ, অতিরিক্ত সংযোগ তার, আর একটি পাতলা কাপড়ে মোড়া সেন্সর।

সে মাইক্রোফোন নিল শুধু এতটুকু বলার জন্য, “পানি বন্ধ।” কারও দিকে তাকিয়ে নয়, কাজের দিকে তাকিয়েই। এক স্বেচ্ছাসেবক দৌড়ে ভাল্‌ভ ঘুরিয়ে দিল। মেহরিন যন্ত্রটার নিচে হাঁটু মুড়ে বসল। আলগা তারটা আঙুলে ধরতেই বোঝা গেল, ইচ্ছে করেই টেনে তুলে রাখা—স্রেফ ঢিলে নয়, গলার নিচ থেকে সরে দেওয়া হয়েছে। সে নতুন তার লাগাল না; পুরোনোটাই ফিরিয়ে নিল, কারণ প্রমাণের সবচেয়ে নির্মম রূপ হলো—জিনিসটা এমনিতেই ঠিক ছিল।

আরমান তখনও দাঁড়িয়ে। সে বলল, “আমি আসলে বুঝিয়েছিলাম—” তার গলা মাইকের বাইরে পড়ে গেল। কেউ তাকে মাইক ধরিয়ে দিল না। এটাই প্রথম ক্ষত। দ্বিতীয়টা হলো, রাশেদ স্যার তাকে সামনে টেনে আনতে গিয়ে থেমে গেলেন; মেহরিনের হাঁটুর পাশে বিচারক দাঁড়িয়ে আছেন, সরে যাওয়ার জায়গা নেই। তৃতীয়টা আরও খারাপ—তানভীর খালা, যিনি একটু আগে লাজুক বলছিলেন, এখন সামনে ঝুঁকে দেখছেন মেহরিনের আঙুল।

মেহরিন সেন্সর তুলে শুকনো মাটিতে বসাল, তারপর পাশের ভেজা নমুনার টবটাকে দূরে সরিয়ে দিল। “এটা এখানে ছিল না,” সে শুধু এতটুকু বলল। অভিযোগ নয়, অবস্থান। তারপর নিয়ন্ত্রণ বোর্ডটা হাতে নিল। পাতলা তারের মাথায় স্ক্রু কষে, কালো টেপের ছোট্ট টুকরো দিয়ে সংযোগের গোড়া বেঁধে দিল। তার হাত কাঁপছিল না। সে যেন উঠানের রিং, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ, ব্লেজার, স্পন্সর—সব কিছুর বাইরে এক সংকীর্ণ কাজে ঢুকে গেছে। এটাই তার জায়গা: কে কী ভাবল, তা নয়; কোন সংযোগ কোথায় বসবে, তা।

“এখন,” সে মাইকে বলল, এবং সুইচ টিপল।

প্রথমে ছোট সবুজ আলো জ্বলল। তারপর এক সেকেন্ডের নিখুঁত বিরতি। তারপর পাম্পের গলা পরিষ্কার করার মতো শব্দ, তারপর স্থির ঘূর্ণন। পাইপের মাথা থেকে পানি বেরিয়ে টবে পড়তে লাগল, কিন্তু আগের মতো উল্টোপাল্টা নয়—ছন্দময়, হিসেবমতো। মেহরিন আর কথা বাড়াল না। সে সেন্সর তুলে শুকনো মাটি থেকে ভেজা নমুনায় ছোঁয়াল। ঘূর্ণন থামল। আবার শুকনো টবে আনল। পাম্প চালু। সে একে একে তিনবার করল, একই গতিতে, একই নিশ্চিন্ততায়, যেন এ দৃশ্য দেখানোর জন্য নয়, কাজটি এমনিই করতে হয় বলে করছে।

রিংয়ের চারদিকে এখন লোকজনের মাথা শুধু সামনে নয়, ভেতরের দিকে ঝুঁকে আছে। দূরের গুঞ্জন কেটে গিয়ে আলাদা আলাদা শব্দ শোনা যাচ্ছে—কারও স্যান্ডেলের ঘষা, কারও গলার কফ আটকে থাকা, কারও চুড়ির ধাতব ঠোকাঠুকি। আরমান একবার এগিয়ে এসে মাইকের দিকে হাত বাড়াতে চাইল। বিচারকদের একজন সরে দাঁড়ালেন না। তাকে ঘুরে পাশ দিয়ে যেতে হলো, আর সেই ঘুরে যাওয়া দৃশ্যটা সবার সামনে তার মাপ ছোট করে দিল। মুখে এখনও সে হাসির ছায়া রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার ডান হাত পকেটের কাছে কুঁচকে আছে; ভেজা কাপড় শুকিয়ে গাঢ় দাগ ফেলেছে হাঁটুর কাছে।

মেহরিন এবার যন্ত্রটার পাশের ছোট ডিসপ্লে না দেখিয়ে টবের মাটি হাতে তুলে বিচারকদের দিকে এগিয়ে ধরল। “শুকনো। ভেজা। শুকনো।” প্রতিটা শব্দের সাথে কাজ মিলল। বক্তৃতা নয়, যাচাই। সে ভেজা মাটিতে আঙুল চেপে দেখাল, তারপর সেন্সরের মাথা পরিষ্কার করে নিল নিজের ওড়নার কিনারায়। ওড়নার এক কোণে পুরোনো কালির হালকা দাগ; আজ সকালেও স্কেচ কাগজে নম্বর লিখতে গিয়ে লেগেছিল। তার আঙুলের নখের পাশে কালো রেখা। এই সব ক্ষুদ্র দাগ এমনভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠল, যেন যন্ত্রের নকশার স্বাক্ষরও সেগুলোই।

রাশেদ স্যার এবার মাইকের দিকে ঝুঁকে বলতে চাইলেন, “আমাদের টিম—” কিন্তু পাম্প ঠিক সেই সময় নিজে থেকে থেমে আবার শর্ত অনুযায়ী চালু হলো, এবং সবাই আবার যন্ত্রের দিকে তাকাল। তার কথার জায়গা আর রইল না। যেটা তিনি এতক্ষণ মুখে ধরে রেখেছিলেন—কাকে সামনে রাখা হবে—সেটা এখন টেবিলের ওপর প্রকাশ্যে বদলে গেছে। কার্ড কে পরে আছে, তাতে আর কিছু যায় আসে না। টেবিলের মালিকানা হাতের গতিতে সরে গেছে।

সাব্বির পেছন দিক থেকে চুপচাপ এসে মেহরিনের পাশে অতিরিক্ত টবটা রাখল। কিছু বলল না, শুধু এমনভাবে রাখল যেন সহকারী কোথায় দাঁড়াবে সেটাও ঠিক হয়ে গেল। আরমান সেটা দেখে বলল, “আমি ব্যাখ্যা করি?” তার গলায় কাঁটা। মেহরিন তাকালও না। সে পাম্পের পাইপ সামান্য ঘুরিয়ে পানির রেখা সোজা করল। সেই সামান্য ঘোরানোতেই শেষ অবশিষ্ট দুলুনিটাও থেমে গেল।

একজন বৃদ্ধ বিচারক সামনে এসে মেহরিনের নাম জানতে চাইলেন না; সরাসরি তার দিকে থাকা খালি ক্লিপবোর্ড এগিয়ে দিলেন। “পরের প্রদর্শনও তুমি দেখাবে।” কথাটা ঘোষণা ছিল না, অনুমতিও নয়—কাজ বদলের প্রকাশ্য চিহ্ন। স্বেচ্ছাসেবক ছেলেটা, যে শুরুতে কার্ড খুলে নিয়েছিল, ভিড় ঠেলে এসে আরমানের বুক থেকে সেই কার্ড খুলে নিল। হাত কাঁপছিল তার। সে নতুন করে কার্ডটা মেহরিনের টেবিলের দিকে রাখতে গিয়েও থমকাল; মেহরিন হাত বাড়াল না। কার্ডটা তাই টেবিলের কাঠের ওপরই রাখা রইল, তার টুলবক্সের পাশে।

আরমান এবার সরাসরি বলল, “মেহরিন, এক মিনিট। এটা ভুল বোঝাবুঝি।” তার গলায় সেই পুরোনো কর্তৃত্ব নেই; নিচু, শুকনো, মানুষের ভিড়ে নিজের জায়গা হারানো কারও গলা। মেহরিন প্রথমবার তার দিকে তাকাল। শুধু একবার। তারপর নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে আঙুল রেখে বলল, “পাশে দাঁড়ান। তারে পা লাগবে।” তাকে সরে দাঁড়াতেই হলো। সামনে নয়, পাশে। মঞ্চের মাঝখান থেকে সরানো মানুষের জন্য এর চেয়ে নগ্ন শাস্তি কমই আছে।

সে শেষবার সেন্সর তুলল, ধুলো ঝেড়ে সোজা বসাল, পাম্পের শব্দ শুনে একচুল ঘুরিয়ে দিল ভাল্‌ভ। সুর ঠিক হলো। আর কিছু বলার দরকার রইল না। উঠানের রিং জুড়ে যে সব চোখ এতক্ষণ নিরাপদ দিক খুঁজছিল, তারা এখন থিতু। মেহরিন কোনো মুখ খুঁজল না, কোনো স্বীকৃতি নিল না। কাজ শেষ করে শুধু মাইক্রোফোনটা স্ট্যান্ডে গুঁজে দিল, যেন এটা তার হাতের জিনিস নয়, কেবল পথের বাধা ছিল।

মঞ্চের ধারঘেঁষা মনিটর স্পিকারের কৌণিক ধারে এসে সে থামল। বুকের উঠানামা ধীরে নামছে। তারের ভেতর দিয়ে যাওয়া শেষ কাঁপুনির মতো এক চিকন ফিডব্যাক উঠে এসে লম্বা না হয়ে ঝুলে রইল, তারপর চ্যাপটা হয়ে নিভে গেল। monitor wedge-এর ধার ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে মেহরিন আরেকটা স্থির শ্বাস নিল। সামনের গলিটা নিস্তব্ধ হয়ে থাকল।