শেষে আমার হাতই লাগল
রাশেদ ভাই ফাইলের মোটা গুচ্ছটা মাহিরার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কাউন্টারের ভেতরের ঘূর্ণি-চেয়ারটায় নিজের শরীর নামিয়ে বলল, “তুমি বাইরে দাঁড়াও। নাম ডাকব, তখন কাগজ ধরাবে।” তার কনুইয়ের ধাক্কায় চেয়ারের পাশে রাখা নীল প্লাস্টিকের টোকেন-স্ট্যান্ডটাও সরে গেল, যেন ওই দিকটায় মাহিরার বসার অধিকার কোনোদিন ছিলই না। সামনে লাইন ইতিমধ্যে কাঁচের দরজা পেরিয়ে সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে; অর্ধেক ভাঁজ করা রসিদ হাতে লোকেরা গজগজ করছে, আর কাগজের মোড়ক খোলার শুকনো শব্দে সকালটা কেমন খসখসে হয়ে উঠছে।
মাহিরা এক সেকেন্ডও তর্ক করল না। শুধু নিজের ড্রয়ার থেকে ফেরত না-পাওয়া ছোট পিতলের চাবিটা চাইল। রাশেদ ভাই তাকালও না। “ওটা এখন আমার কাছে থাক।” তারপর গলা উঁচু করে লাইনের দিকে, “আজ কৃষি চালান অনেক। ভুল হলে কিন্তু আমি ধরব না।” যেন ভুলের মালিক আগেই ঠিক করে রেখেছে।
এটা শুধু কাজের অপমান ছিল না। এই অফিসে ওকে ঢুকিয়েছিল শিউলি আপা—মায়ের মামাতো বোনের মেয়ে—আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে বলে। সেই কারণেই কাউন্টারের সামনে ওকে সরিয়ে দেওয়া মানে কেবল একজন জুনিয়রকে ছোট করা নয়; সন্ধ্যায় বাসায় গেলে কার কপালে কী কথা উঠবে, তাও ঠিক হয়ে যাওয়া। ঢাকা শহরে মানুষ ভাড়াবাসায় গা ঘেঁষে থাকে, কিন্তু খবর ছড়ায় উঠোনওয়ালা বাড়ির মতো।
মাহিরা কাউন্টারের বাইরে এসে দাঁড়াল বটে, তবে একেবারে সরে গেল না। রসিদের কাঠের ট্রেটা নিজের দিকে একটু টেনে নিল, যেন অন্তত নামের ক্রমটা চোখে রাখতে পারে। এইটুকুই রাশেদ ভাই আশা করেনি। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওটা রাখেন, আমি পারব।” মাহিরা শান্ত গলায় উত্তর দিল, “নাম উল্টাপাল্টা গেলে গুদাম থেকে মাল বের হবে না।” কথা শেষ করেই সে লাইনের প্রথম বৃদ্ধ কৃষককে জিজ্ঞেস করল, “আপনার উপজেলা?” বৃদ্ধ হতচকিত হয়ে রসিদ বাড়িয়ে দিলেন। রাশেদ ভাইয়ের মুখ শক্ত হল।
দশ মিনিটের ভেতর জটটা চোখে পড়ার মতো হয়ে উঠল। সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর—বস্তাভরা বীজ, সারের মিশ্র চালান, দুপুরের ট্রাকে ওঠার কথা। রাশেদ ভাই নাম ডাকে একভাবে, রসিদ রাখে আরেকভাবে, আর অনুমোদনের লাল সিল দেওয়ার আগে গুদাম-পাস গুঁজে ফেলে ভুল ফাইলে। দুজন ডেলিভারি-হেলপার বারবার কাউন্টারে এসে একই প্রশ্ন করছে, “কোনটা আগে নামাব?” সে প্রত্যেকবার মাহিরার দিকেই থুতনি তোলে—“ও ঠিকমতো সাজায়নি।”
মাহিরা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। চুপ থাকলেই ওকে অনেকে ভীরু ভাবে; আজ সেই ভুলটাই সবার হচ্ছে। তার চোখ কেবল রসিদের ভাঁজে, নামের বানানে, ট্রের ডানদিকের জমে ওঠা নীল কপি আর বামদিকে আটকে থাকা সাদা কপিতে। একটা আধভাঁজ করা রসিদের কোণে সে চিনে ফেলল খুরশীদ এগ্রোর পাঁচ টন বীজের অর্ডার; এটা আটকে গেলে পেছনের তিনটা উপজেলায় মাল ছাড়বে না। সে বলল, “ওটার সঙ্গে চালান নম্বর লাগেনি।” রাশেদ ভাই তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “তুমি বাইরে থাকো। বেশি বোঝো না।”
লাইন থেকে সঙ্গে সঙ্গে এক লোক গলা তুলল, “ভাই, আমার ট্রাক দাঁড় করায়ে রাখছি। নাম যদি আজ না যায়, ঘাটে নাইট চার্জ লাগবে।” আরেকজন পকেট থেকে ফোন বের করে কারও সঙ্গে অস্থির গলায় কথা বলতে লাগল। কাউন্টারের ওপরে রসিদ জমে ছোট ঢিবি, নিচে প্লাস্টিকের বাক্সে ডেলিভারি স্লিপ গুঁজে গুঁজে ফুলে উঠছে। শিউলি আপা ভেতর দিকের দরজায় এসে থামলেন, কপালে ঘাম। তিনি রাশেদ ভাইকে আস্তে বললেন, “দুপুরের আগে কৃষি চালান ছাড়তে না পারলে বড় ঝামেলা হবে।” রাশেদ ভাই সেই কথাটাও মাহিরার দিকে ছুড়ে দিল, “এই জন্যই বলি, অদক্ষ লোক সামনে থাকলে চাপ বাড়ে।”
তারপরই জ্যামটা সত্যি এসে গেল। গুদামের ভেতর থেকে এক হেলপার ছুটে এসে বলল, “৩২৭ নম্বর চালান ছাড়া কিছু নামছে না। স্লিপে লাল সিল নাই, আবার খাতায় নাম কাটা।” রাশেদ ভাই থমকে গেল। তার হাতের ফাইলে ঠিক সেই নম্বরের নীল কপি নেই। নেই, কারণ সেটা সে একটু আগে অন্য গুচ্ছে গুঁজে দিয়েছে। সে তড়িঘড়ি কাগজ উল্টাতে লাগল; শুকনো কাগজের শব্দ তীব্র হয়ে উঠল, কিন্তু কাজের কিছু হল না। লাইনে সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো মাথা বাড়িয়ে দেখতে লাগল। পিছন থেকে কেউ বলল, “এইভাবে চললে মাগরিবেও মাল পাব না।”
রাশেদ ভাই এবার চাপা গলায় মাহিরাকে বলল, “ওই সাদা ফাইলটা দাও।” মাহিরা নড়ল না। “কোনটা?” “যেটা… যেটা তোমার ড্রয়ারে ছিল।” সে কথাটা গিলতে গিলতে বলল। মাহিরা হাত বাড়িয়ে ট্রের নিচে চাপা পড়া কাগজের গুচ্ছ থেকে খুরশীদ এগ্রোর আধভাঁজ রসিদটা টেনে বের করল। রসিদের নম্বর দেখে সে এক ঝটকায় বুঝল কোথায় আটকে আছে। কিন্তু রাশেদ ভাই এখনো চেয়ার ছাড়েনি, ফাইলও নয়। কেবল ঘেমে ওঠা আঙুলে কাগজ ওলটাচ্ছে।
মাহিরা কাউন্টারের পাশের সরু ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রাশেদ ভাই তৎক্ষণাৎ বলল, “এই, কে বলছে ঢুকতে?” কিন্তু সে থামল না। তার হাত সরাসরি ভুল গুচ্ছের তলায় গেল; তিন নম্বর ফাইলে গুঁজে রাখা ৩২৭-এর নীল কপি বেরিয়ে এল। আরেক হাতে সে লাল সিলটা তুলে টুপ করে বসিয়ে দিল খুরশীদ এগ্রোর স্লিপে। “হেলপার, এটা আগে। গুদাম লেন খুলুন,” সে এত শান্ত স্বরে বলল যে কাঁচের ওপারেও স্পষ্ট শোনা গেল।
এক মুহূর্ত যেন সবাই কেবল সিলের শব্দটাই শুনল। তারপর ভেতরের লোহার রোলার-শাটারের দিকে দৌড়ে গেল ছেলেটা। বাইরে দাঁড়ানো ট্রাকচালক ফোনে চেঁচিয়ে বলল, “চলছে, এখন চলছে!” রাশেদ ভাই মাহিরার কবজি ধরতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ ঠিক তখনই গুদামের ভেতর থেকে বস্তা টানার ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে। জ্যামটা কথায় নয়, হাতের ভিতরেই খুলে গেছে।
শিউলি আপা এবার আর আস্তে কথা বললেন না। “চেয়ারটা ছাড়েন।” তার স্বর পাতলা ছিল না। সামনে লাইন, পেছনে কর্মচারী, দরজায় দাঁড়ানো একজন বয়স্ক লোক—মামার বন্ধু, মাঝেমধ্যে অফিসে আসে—সবাই দেখছে। রাশেদ ভাই হেসে বিষয়টা হালকা করতে চাইল, “আমি তো সামলাচ্ছিলাম—” কিন্তু আরেকটা নাম ডাকার আগেই পেছন থেকে গুদামকর্মী চেঁচিয়ে উঠল, “আপা, পরের তিনটা চালানও একই গুচ্ছে আটকা!” এবার রাশেদ ভাইয়ের মুখে সেই হাসি ঝুলে রইল, পুরো নামল না।
মাহিরা হাত বাড়িয়ে নীল টোকেন-স্ট্যান্ডটা নিজের দিকে টেনে নিল। এটাই ছিল আসল চিহ্ন—যার পাশে টোকেন, তার দিকেই রসিদ জমা পড়ে, তার মুখের দিকেই লাইন ঘোরে। রাশেদ ভাই এক সেকেন্ড থামল, তারপর সবার সামনে টেবিলের ওপরের মাস্টার ফাইলটা ঠেলে দিল মাহিরার দিকে। ঠেলাটা খুব ছোট, কিন্তু শব্দটা শুষ্ক আর অপমানজনক—কাগজ কাঠে ঘষে যাওয়ার মতো। সে নিজে চেয়ারের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইল, যেন নামতে গিয়েও বিশ্বাস করতে পারছে না।
মাহিরা বসেনি। সে বলল, “চাবি।” রাশেদ ভাই পকেট থেকে পিতলের ছোট চাবিটা বের করতে দুবার হাতড়াল। তার আঙুল কাঁপছে—এতটা শুধু মাহিরা নয়, সামনের লোকেরাও দেখল। চাবিটা টেবিলে পড়তেই মাহিরা সেটা তুলে ড্রয়ার খুলল, স্ট্যাম্প প্যাড, সাদা-নীল-হলুদ তিন রঙের কপি, আর দিনের প্রথম তালিকাটা জায়গামতো বসাল। তারপর ঘূর্ণি-চেয়ারটায় গিয়ে নিঃশব্দে বসল। চেয়ারটা যেন ঠিক সেই ওজনটাই অপেক্ষা করছিল।
“খুরশীদ এগ্রো গেছে,” সে না তাকিয়েই বলল। “এরপর মাদারীপুরের দুই চালান একসঙ্গে। রসিদ হাতে রাখেন, নাম ডাকার আগে কেউ কাউন্টার ঠেকাবেন না।” কথাগুলো আদেশের মতো শোনাল না; তবু লাইন এক ইঞ্চি করে সোজা হয়ে গেল। যে বৃদ্ধটা প্রথমে উপজেলারের নাম বলেছিলেন, তিনি নিজের আধভাঁজ রসিদটা বুকে চেপে আরেক ধাপ সামনে এলেন।
রাশেদ ভাই পাশে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু বলতে গেল। মাহিরা মাস্টার ফাইল খুলে চোখ না তুলেই বলল, “আপনি সাদা কপি গুনে গুদামে দিন। সামনে কথা আমি বলব।” এইটুকুতে যা হওয়ার হল। লাইন শুনল, ভেতরের লোক শুনল, আর সবচেয়ে বেশি শুনল রাশেদ ভাই নিজে। সে প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলে আবার বন্ধ করল; হাতে ধরে থাকা সাদা কপির গুচ্ছ একটু কেঁপে কয়েকটা নিচে পড়ে গেল। কাগজ কুড়োতে তার ঝুঁকে পড়া পিঠটাই যথেষ্ট ছিল।
তারপর গতি বদলে গেল। মাহিরা একের পর এক নাম তুলতে লাগল—“মোবারক ট্রেডার্স… স্লিপ দিন… ঠিক আছে, হলুদ কপি রাখেন।” “আলমগীর সিডস, ট্রাক কোথায়?” “পেছনেরটা আগে আনবেন না, সিরিয়াল ভাঙবে।” কাউন্টারের ওপর জমে থাকা ঢিবি কমতে শুরু করল। যে ভুলগুলো একটু আগে পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছিল, তার হাতের নিচে সেগুলো আলাদা আলাদা হয়ে পড়ে। এক চালানের সিল, এক চালানের খাতা, এক চালানের গুদাম-পাস। লোকেরা আর চিৎকার করছে না; তাড়াহুড়ো আছে, কিন্তু এখন সেটা চলমান।
মাঝে একবার রাশেদ ভাই আবার সামনে ঢুকে বলল, “এইটা আগে দিন, আমার লোক।” মাহিরা চোখ তুলে তাকাল। তাকানোটা খুব বড় কিছু ছিল না; শুধু এত ঠান্ডা যে সে বাকিটা বলতে পারল না। মাহিরা পরের নামটাই ডাকল, “আবদুল হাই, শেরপুর।” লাইন থেকে লোকটা দৌড়ে এল। রাশেদ ভাইয়ের হাত মাঝআকাশে থেকে ধীরে ধীরে নেমে গেল। তার “আমার লোক” আর কাউকে নড়াতে পারল না।
শিউলি আপা নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে হিসাব মিলাচ্ছিলেন। একসময় দরজার দিক থেকে সেই বয়স্ক লোক—মামার বন্ধু—মৃদু গলায় বলল, “মেয়েটারে আগে বসাইলে এত দেরি হইত না।” বাকিটা আর কেউ টেনে বাড়াল না। কারণ বাড়ানোর দরকার পড়েনি। মাহিরার সামনে মাস্টার ফাইল, ড্রয়ারে তার চাবি, লাইনের চোখ তার হাতে। কাউন্টারের এই ছোট্ট দুনিয়ায় এতেই রায় হয়ে গেছে।
দুপুরের আগেই সিদ্ধান্তমূলক ভিড়টা কেটে গেল। শেষ কয়েকটা কৃষি চালানের কাগজ গুছিয়ে মাহিরা হলুদ কপি আলাদা করল, ভেতরের দিকে তাকিয়ে বলল, “মেরামতির লেনে আটকে থাকা ট্রলিটা ছাড়ুন। ডান চাকায় চাপ পড়ছে।” আগে কখনো রাশেদ ভাইকে এ কথা বলা হতো; আজ সে নিজেই সরে দাঁড়াল। মাহিরা চেয়ার ছেড়ে উঠল, মাস্টার ফাইল বন্ধ করে নিজের বাহুর নিচে নিল, আর কাউন্টারের পেছনের সরু পথ দিয়ে ভেতরে চলে গেল।
মেরামতির লেনে ধাতুর গন্ধ, গুদামের ধুলো, আর সদ্য টানা বস্তার ঘর্ষণের শব্দ। ট্রলির পাশে পড়ে থাকা সরঞ্জামের রোলটা সে এক টানে তুলে নিল, বাঁকা হয়ে থাকা হাতল সোজা করল, তারপর ঠেলে দিল সামনে। বোঝাই অবস্থায়ও রোলটার চাকা এবার কাঁপতে কাঁপতে সরে গেল না; সোজা রেখায় ঘুরে উঠল, মসৃণ, ঠিক পথে।