সবার সামনে একমাত্র ও-ই
ট্রে-টা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সাবিহা খালা সবার সামনে বললেন, “ওটা পেছনে নে, রিমি। সামনের ফটকে দাঁড়ানোর লোক তুই না।”
সামনের উঠানটা তখন আলো, ফুল, গাড়ির হর্ন আর আত্মীয়স্বজনের জানাশোনায় গমগম করছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের পুরোনো বাড়িটাকে আজ যেন চেনাই যাচ্ছে না—গেটের মাথায় আলো ঝুলছে, দোতলার বারান্দা থেকে মেয়েরা ফোন উঁচু করে ভিডিও করছে, আর নিচে যাদের নাম ধরে ডাকা হচ্ছে তারা সোজা লাল কার্পেট মাড়িয়ে ভিতরে ঢুকছে। রিমির হাতে তখনও গরম চায়ের বদলে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এক কাপ পড়ে আছে; কাপে চামচ ঠুকে ক্ষীণ শব্দ উঠল। দুপুরে নিজের জন্য আনা ছোট খাবারের বাক্সটা সিঁড়ির ধারে ঠান্ডা হয়ে আছে, খোলারও সময় পায়নি সে। তিন সপ্তাহ ধরে এই বিয়ের গাড়ি, কেটারিং, বসার তালিকা, বরপক্ষের অভ্যর্থনা—সব সে সামলেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, সবার চোখের সামনে, তাকে এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া হল যেন সে ভাড়ার বাড়তি মেয়ে।
রিমি ট্রেটা ছাড়ল, কিন্তু জায়গা ছাড়ল না। গেটের পাশে যে মোটা খাতা, গাড়ির নম্বর আর আগমনের নোট লেখা, সেটা সে নিজের কনুই দিয়ে সামলে রাখল। খাতার কোণায় পুরোনো কলমের নীল দাগ, সেই দাগ ওর নিজেরই—গতকাল রাত দুইটায় বসে নাম মিলিয়েছে। সাবিহা খালা সেটা দেখে ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, “খাতা ধরলেই কি ঘরের মেয়ে হওয়া যায়? পেছনে যা। মিতা, তুই এখানে দাঁড়া।”
এটাই প্রথম ফাটল। মিতা আপা এসে দাঁড়ালেন ঠিকই, কিন্তু প্রথম গাড়িটা ঢুকতেই তিনি থেমে গেলেন। বরপক্ষের একজন জিজ্ঞেস করল, “ছেলেপক্ষের বড় চাচা কোনদিকে?” মিতা উত্তর জানে না। আরেকজন বলল, “ইমামের লোকজন কই বসবে?” তিনি পাশ ফিরে তাকালেন। রিমি এক পা না বাড়িয়ে, গলা না তুলেই বলল, “ডান পাশের ছাউনির নিচে, সাদা কাভারওয়ালা সারি। চাচা সাহেবদের জন্য সামনের দিকের চারটা চেয়ার খালি।” কথাগুলো এত দ্রুত আর ঠিকঠাক এল যে পাশে দাঁড়ানো দুজন আত্মীয় অনিচ্ছায় রিমির দিকেই তাকাল। সাবিহা খালার চোখের পাতা কেঁপে উঠল, কিন্তু মুখে হাসি টেনে তিনি বলে দিলেন, “মুখস্থ করেছে, এই আর কী।”
তারপর চাপটা আরও কষে ধরলেন তিনি। একটার পর একটা গাড়ি ঢুকছে, গেটের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মুখে সেই চিরচেনা বিচার—কে সামনে, কে পেছনে, কাকে নাম ধরে ডাকা হয়, কাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সাবিহা খালা নিজের শাড়ির আঁচল টেনে কাঁধে তুললেন, যেন পুরো উঠানটার শাসন তাঁর হাতেই। “এই লাইনে শুধু ঘনিষ্ঠরা,” তিনি উঁচু গলায় বললেন, “অন্যরা পাশ দিয়ে যাক। রিমি, তুই রান্নাঘরের গলিটা ধরে পেছনে থাক। মেয়েদের দিকের পানির জগ কমে গেছে।”
রিমি জানত, এটা শুধু কাজ সরানো না। রান্নাঘরের গলিতে পাঠানো মানে দৃশ্যের বাইরে ঠেলে দেওয়া। যে উঠানে গত তিন দিন ধরে সব সরবরাহ এসেছে তার ফোনে, যেসব দোকানদারকে সে আগাম টাকা পাঠিয়েছে, যাদের সঙ্গে রাত জেগে কেটারিংয়ের হিসাব মিলিয়েছে—সেই সব কাজ থাকতেও তাকে এখন এমন ভঙ্গিতে হুকুম দেওয়া হচ্ছে যেন সে মুখ দেখানোরও যোগ্য নয়।
সে গেটের লোহার ফ্রেমের কাছে এক নিঃশ্বাস থামল। দরজার কপাট অর্ধেক খোলা, সেই ছোট থেমে থাকা ফাঁকে ভেতর-বাহিরের শব্দ কেটে কেটে আসছে। রিমি শান্ত গলায় বলল, “পানির জগ আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু গাড়ির লাইন যদি আটকে যায়, দায় নেবেন আপনি?”
কথাটা খুব জোরে বলা হল না। তবু ফটকের ধারে যারা ছিল, তারা শুনল। কারণ প্রশ্নটা সরাসরি। কারণ এতক্ষণ পর্যন্ত সবাই ধরে নিয়েছিল, বলার অধিকার এক দিকেই।
সাবিহা খালা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে কড়কড়ে কাগজ ভাঁজ করার মতো শুকনো শব্দ। “আমি দায় নেব কি নেব না, তোর জানার দরকার কী? তোর কাজ বলেছি, কর।”
ঠিক তখনই বাইরে তিনটা গাড়ি একসাথে এসে দাঁড়াল। একটায় কনের ফুফাতো ভাইরা, আরেকটায় গ্রামের দিক থেকে আসা বয়স্ক আত্মীয়, শেষেরটায় আরমানের অফিসের দুজন সিনিয়র—যাদের নিয়ে সকাল থেকে সাবিহা খালা গর্ব করে বেড়াচ্ছেন। চালকেরা হর্ন দিচ্ছে, ভেতরে দাঁড়ানো ছেলেরা কাকে আগে নামাবে বুঝছে না, আর মিতা আপা আবার খাতার দিকে তাকিয়ে ফাঁকা হয়ে আছেন।
রিমি খাতা বন্ধ করল না। সে কেবল সাবিহা খালার দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা কথা সবার সামনে বলেন খালা—এই তিন সপ্তাহ কার ফোনে গাড়ির সময় নেওয়া হয়েছে? কার হাতে বরপক্ষের বসার তালিকা? আর আজকে এই গেট আটকে গেলে কার নাম ধরা হবে?”
উঠানের আওয়াজে হালকা টান পড়ল। দোতলার বারান্দা থেকে ঝুঁকে থাকা এক কাজিন ফোনটা একটু নামিয়ে দিল। পাশের ফুফু, যিনি এতক্ষণ ধরে কার গয়না কেমন তা দেখছিলেন, তিনি মুখ ঘুরিয়ে সাবিহা খালার দিকে তাকালেন। প্রশ্নটা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমনভাবে যে উত্তর না দিয়ে থাকা মানে নিজেই স্বীকার করা।
সাবিহা খালার মুখ এক ঝটকায় শক্ত হয়ে গেল। “তাই বলে—”
“নামটা বলেন,” রিমি এবার থামাল। “কে করছে?”
এইবার উত্তর দিতে হল। মিথ্যে বলার জায়গা নেই; কারণ চালকেরা রিমিকে চেনে, কেটারিংয়ের ছেলেরা ওর দিকে তাকিয়ে আছে, এমনকি গেটের বাইরে ফুলওয়ালা বালকটাও জানে শেষ মুহূর্তে টাকা কে পাঠিয়েছে। সাবিহা খালা গলাটা পরিষ্কার করে বললেন, “ব্যবস্থা তো... রিমিই করেছে। কিন্তু—”
“কিন্তু?” আরেকটা কণ্ঠ এসে পড়ল উঠানের মাঝখানে।
আরমান। সাদা পাঞ্জাবির ওপর গাঢ় ওড়না, কপালে ঘাম, তবু হাঁটার মধ্যে দ্বিধা নেই। সে সোজা সামনের ভিড় কেটে গেটের দিকে এলো। কে কাকে এড়িয়ে যাবে সেই খেলার সব হিসাব যেন একসাথে বদলে গেল; লোকজন সরে দাঁড়াতে বাধ্য হল। আরমান এসে থামল রিমির থেকে এক হাত দূরে, সাবিহা খালার সামনে নয়। এইটুকুতেই কয়েকটা মুখের রং পাল্টে গেল।
“খালা,” সে স্পষ্ট গলায় বলল, “যাকে আপনি পেছনে পাঠাচ্ছেন, ওর নিশ্চিত কথা ছাড়া আজ একটাও গাড়ি ঠিক জায়গায় নামবে না। আমার আব্বুও বলেছেন, আগমনের দিকটা রিমির হাতেই রাখতে।”
সাবিহা খালা তাড়াতাড়ি বললেন, “ছেলের বিয়ে, সবাই দেখছে। কিছু শোভনতার কথা আছে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে। সামনের লাইনে কারা দাঁড়াবে তারও তো নিয়ম—”
“তাহলে নিয়মটাই পরিষ্কার করি,” আরমান বলল। কিন্তু সে শেষ কথা বলল না। সে মুখ ঘুরিয়ে রিমির দিকে তাকাল। সবাই শুনতে পাবে এমন গলায় জিজ্ঞেস করল, “রিমি, তুমি বলো—কাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে?”
এই এক মুহূর্তেই উঠানটা নতুন করে পড়া শুরু হল। প্রশ্ন যার দিকে যায়, নিয়ন্ত্রণ তার দিকেই সরে। সাবিহা খালার আঙুলে ধরা মোবাইলটা নেমে এলো, মিতা আপা অকারণে খাতার পাতা ওলটাতে লাগলেন, আর গেটের বাইরে দাঁড়ানো চালকেরা গলা বাড়িয়ে শুনছে। রিমি বুঝল—আর borrowed জায়গা না। এখন যদি সে চুপ করে, তবে আবার তাকে অন্যের ছায়ায় ঠেলে দেওয়া হবে।
সে ধীরে ধীরে খাতাটা তুলল। কনুইয়ের কাছে পুরোনো নীল দাগ, পাতার কোণ ভাঁজ হয়ে আছে। গলায় কোনো কাঁপন নেই। “শুনুন,” সে বলল, “এই গেট দিয়ে কে ঢুকবে, কোন গাড়ি আগে থামবে, বরপক্ষের বয়োজ্যেষ্ঠরা কোন দিকে যাবেন—এখন থেকে আমি বলব। কারণ এই আয়োজনের আগমনের দিক আমার হাতে। আর আমি পেছনের গলিতে যাচ্ছি না।”
কথাগুলো পড়ে পড়ে নয়, মুখস্থও নয়। সরাসরি। নিজের জায়গা নিজে নাম দিয়ে নিল সে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভাষায় প্রথম বদলটা হল। গেটের কাছে দাঁড়ানো দুইজন কাজের ছেলে নিজেরাই রাস্তা ফাঁকা করে দিল। একজন চালক জানালার কাচ নামিয়ে বলল, “আপা, আগে কোনটা?” সেই ‘আপা’ শব্দটা সবার সামনে পড়ল।
সাবিহা খালা এবার বাধা দিলেন, আর সেটাই তাঁকে আরও নামিয়ে দিল। “এই সাহস তোর—”
রিমি তাঁর দিকে না তাকিয়েই বলল, “খালা, আপনি ভেতরে কনের ফুফুদের নেন। মুখের মান রাখতে হলে সেটাই করুন। গেট আমি সামলাচ্ছি।” তারপর ডান হাত তুলে দেখাল, “প্রথমে সিলেট থেকে আসা চাচারা নামবেন। নীল মাইক্রোটা বামে। অফিসের অতিথিরা দুই মিনিট অপেক্ষা করবেন। মিতা আপা, খালামণিদের সরাসরি বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে তুলুন। কেউ এখানে ভিড় করবেন না।”
আদেশ দেওয়ার আর আদেশ মানার মাঝে কখনো কখনো এক সেকেন্ডও লাগে না। নীল মাইক্রো সত্যিই বামে সরে গেল। কাজের ছেলেরা গেটের ভিড় কাটাল। পাশের আত্মীয়, যিনি এতক্ষণ সাবিহা খালার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এবার রিমির নির্দেশ শুনে দুই বুড়ো মানুষকে ধরে নিয়ে গেলেন ছাউনির দিকে। মিতা আপা প্রতিবাদ না করে ঘুরে দাঁড়ালেন। আরমান এক পা সরে রিমির পাশে জায়গা ছেড়ে দিল—সামনে নয়, পাশে।
সাবিহা খালার মুখের মেকআপের নিচে লালচে দাগ উঠল। তিনি ফিসফিসিয়ে নয়, তবু আগের চেয়ে নিচু গলায় বললেন, “তুই সীমা ছাড়াচ্ছিস।”
রিমি এবার তাকাল। খুব সামান্য। “সীমা আপনি টেনেছিলেন,” সে বলল, “আমি শুধু কোথায় দাঁড়াব, সেটা নিজে বললাম।”
এতক্ষণ যারা দেখছিল, তারা এখন কাজের অজুহাতে দিক বদলাচ্ছে। এক খালাতো বোন এসে রিমির হাতে ফোন ধরিয়ে দিল, “আপা, ফুলওয়ালা টাকা চাইছে।” একজন বয়স্ক চাচা ভেতরে যাওয়ার আগে বললেন, “মা, আমার জুতোটা কোথায় রাখব?” প্রশ্নগুলো আর সাবিহা খালার দিকে যাচ্ছে না। এটাই সবচেয়ে বড় আঘাত—কথা কেড়ে নেওয়া না, দরকার কেড়ে নেওয়া।
আরমানের আব্বা, যিনি ভিতরের বারান্দায় বসে ছিলেন, সেই সময় উঠে দাঁড়ালেন। লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরে গেলে তিনি গেট পর্যন্ত এলেন না, তবু তাঁর গলা পৌঁছে গেল, “রিমি, বরের কাকারা এলে আগে ভেতরে বসিয়ো। আর আরমান, তুমি ওর কথা শুনো।”
এইবার সাবিহা খালার চোখেমুখে আসল ভাঙন ফুটে উঠল। তিনি কিছু বলতে গিয়ে থামলেন; কারণ তাঁর ওপর দিয়েই কথা চলে গেছে। কারণ প্রকাশ্যে আপত্তি করলে সেটাই হবে আত্মঘাতী। কারণ যাঁদের সামনে তিনি এতক্ষণ মান-ইজ্জতের যুক্তি তুলছিলেন, তাঁদের একজনও এখন তাঁর পক্ষে গেট থামাতে এগিয়ে আসছে না।
রিমি খাতা বন্ধ করল না; বরং বুকের কাছে এনে পাতাটা উল্টে নিল। “চাচাদের পথ ফাঁকা,” সে বলল। “ফুলের ঝুড়ি ডানদিকে রাখুন। আর কেউ বরপক্ষের বয়োজ্যেষ্ঠদের মাঝখানে দাঁড়াবেন না।”
গেটের সামনে হঠাৎ করে একটা পরিষ্কার রেখা তৈরি হল—মানুষের শরীরে, চলাফেরায়, কণ্ঠের দিক বদলে। কে সামনে, কে সরে থাকবে, কে শুনবে—সব নতুন। আরমান নিচু স্বরে, কিন্তু শুনে ফেলবার মতো করে বলল, “রিমি, তুমি এখানেই থাকবে।” কথাটা অনুমতি ছিল না; ছিল প্রকাশ্য সায়। রিমি উত্তর দিল না। দেওয়ার দরকারও ছিল না। সে ইতিমধ্যে নিজের জায়গা নিয়ে নিয়েছে।
পরের কয়েক মিনিটে যা ঘটল তা কোনো বক্তৃতা না, কাজের নিষ্ঠুর স্বচ্ছতা। বরপক্ষের বড়রা ঠিকমতো নামল, বাচ্চাদের ভিড় সরল, দুটো ভুল গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হল, এবং সবাই দেখতে পেল—যাকে পেছনের গলিতে পাঠানো হচ্ছিল, সেই মেয়ের ডাক ছাড়া গেট নড়ছে না। সাবিহা খালা একবার এগিয়ে এসে এক আত্মীয়কে নিজে নিয়ে যেতে চাইলেন; লোকটা বিনীত মুখে বলল, “একটু দাঁড়ান, রিমি কী বলছে দেখি।” এতটুকুতেই তাঁর হাত মাঝআকাশে থেমে গেল।
তারপর, যেন সব হিসাবের শেষ দাগ টানতে, রিমি ট্রের দিকে হাত বাড়াল। যে ট্রেটা শুরুতে তার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটাই পাশের টেবিলে পড়ে ছিল, কাপের ধারে শুকিয়ে যাওয়া চায়ের রেখা। সে ট্রেটা তুলে নিল, যেন নিজের জিনিস ফেরত নিচ্ছে। সাবিহা খালার পাশ কাটিয়ে বলল, “এই ঘরের উঠানে আমি কাজের মেয়ে সেজে দাঁড়াব না। আমি আরমানের বাড়ির আগমনের দিক সামলাচ্ছি, আর এখান থেকে কে আসবে, কে সরবে—আমার ডাকেই হবে।”
কথাটা উঠানের মাঝখানে গিয়ে পড়ল। কনের দিকের একদল মেয়ে একসাথে সরে দাঁড়াল। কাজের ছেলেরা ট্রে নিয়ে নিতে এগোয়নি; কেউ সাহসও করল না। আরমান সামনে না এসে পাশে দাঁড়িয়ে রইল—যেন এই ঘোষণার মালিক সে না, মালিক রিমি নিজে। সাবিহা খালার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। তাঁর শাসনের জায়গায় এখন শুধু দেরি হয়ে যাওয়া মুখরক্ষা, আর সেটা কেউ কিনল না।
গেট থেকে রান্নাঘরের গলির দিকে যাওয়া সরু পথটায় আজ প্রথমবার সত্যি ফাঁকা জায়গা তৈরি হল। রিমি ট্রে হাতে সেই দিকেই মোড় নিল, কিন্তু পেছনের জন্য নয়—নিজের তালেই। সিঁড়ির গোড়ায় তার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বাক্সটা এখনও পড়ে। পাশ কাটাতে কাটাতে সে পায়ের আঙুল দিয়ে বাক্সটা দেয়ালের দিকে ঠেলে রাখল, যাতে কেউ লাথি না মারে।
গলির বাঁকে ঢোকার সময় ট্রের কাপগুলো একবার টুংটাং করে উঠল। রিমি দুই হাত শক্ত করে সমান রাখল। সামনে যারা ছিল, তারা আগেই সরে গিয়েছে। বাঁক ঘুরে সে ট্রেটা বুকসমান তুলে স্থির রাখল; কাপগুলো আর একবার কেঁপে উঠে থেমে গেল।