Fast Fiction

শেষে গেট পাস চাইল তারাই

“ওটা এখন ছাড়বেন না,” কাচের কাউন্টারের ওপাশ থেকে সাবিহা ভাবি হাত তুলে থামিয়ে দিল, আর মেহরিনের বাড়ানো রসিদটা আঙুলের ডগায় ঠেলে পাশে সরিয়ে দিল। “আগে উনাদের চারটা সিট দিন। নরসিংদীর মালও আগে উঠবে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে।”

পেছনের লাইন থেকে গরম নিঃশ্বাস এসে মেহরিনের ঘাড়ে লাগছিল। গাবতলীর দূরপাল্লার টিকিটঘরের বাতাসে ডিজেল, ঘাম, কাগজের কালি, আর বাসের হর্ণ একসঙ্গে ঝাঁপাচ্ছিল। তার গলায় ঝোলা পুরোনো পরিচয়ফিতেটা কুঁচকে গেছে, সকাল থেকে এজেন্সির গুদাম, কৃষি-পণ্যের চালান, তারপর এই কাউন্টার—শিফটের শেষে কাঁধ শক্ত হয়ে আছে। তবু সে রসিদটা আবার সোজা করে বলল, “দুইটা সিট আর তিনটা ক্রেট। খুলনার গাড়ি। আমার নাম আগেই তোলা আছে।”

“নাম থাকলেই হয় না,” সাবিহা ভাবি গলাটা নিচু করল না, বরং লাইন শুনুক বলেই উঁচু করল। “অনুমতি লাগে। আর আজ অনুমতি আমি দেখছি। কামাল ভাই, ওকে একটু দাঁড় করান।”

কাউন্টার-সুপারভাইজার কামাল চোখ নামিয়ে খাতার পাতা ওল্টাতে লাগল। তার পাশ দিয়ে সাবিহা ভাবি এক লোকের টাকার বান্ডিল টেনে নিল, টোকা মেরে গুনল, আর বলল, “এই চারটা সিট কনফার্ম। গেট পাসও করে দিন।” রাবারের সিলের শব্দ পড়ল। মেহরিনের সামনে থাকা ছোট্ট ফাঁকটা যেন চোখের সামনে বন্ধ হয়ে গেল।

মেহরিন জানত, এই দুইটা সিট না গেলে শুধু আজকের হিসাব ভাঙবে না। কুমিল্লা থেকে তার খালা-শাশুড়ি আসছেন পাত্রপক্ষের বড়দের সঙ্গে দেখা করতে—যে বিয়ের কথাটা মাসখানেক ধরে ঘুরছে, সে কথায় আজ প্রথম বার আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা বসবে। তার ছোট ভাই রাফি ওই বাসেই তিন ক্রেট টমেটো আর বরবটি পাঠাবে—ভোরের বাজারে না পৌঁছালে অর্ধেক পচে যাবে। কাজের মান-সম্মান, ঘরের মুখ, একই সুতোয় বাঁধা। আর সেই সুতোটা সাবিহা ভাবি সবার সামনে আঙুলে পেঁচিয়ে ধরেছে।

রাফি কাঁধে দড়ি কাটা দাগ নিয়ে ক্রেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এগিয়ে এসে বলল, “ভাবি, এগুলো রাত পার করলে শেষ। কৃষির মাল—”

“আমাকে শেখাতে আসবেন না,” সাবিহা ভাবি চোখও তুলল না। “আপনারা শেষ মুহূর্তে আসেন, তারপর কান্নাকাটি করেন। লাইন আছে, নিয়ম আছে।”

লাইনটা শুনল। সামনে দাঁড়ানো এক বয়স্ক লোক গামছা দিয়ে ঘাড় মুছতে মুছতে তাকাল; দুজন কলেজপড়ুয়া মেয়ে তাদের ট্রলিব্যাগ টেনে পাশে দাঁড়াল; কামাল খাতায় কলম ঠুকল, কিন্তু সাবিহার কথার বাইরে গেল না। মেহরিনের তালুতে ফোনের স্ক্রিন চাপা ছিল, নিচে ধরে রাখা আলোয় একাধিক অপঠিত বার্তা জ্বলছিল। সে একবারও সেটা তুলে ধরল না। শুধু বলল, “আমার জমার কোডটা খুলুন। আটকে রাখার কথা না।”

সাবিহা ভাবি ঠোঁট বাঁকিয়ে তার দিকে তাকাল এবার। “কোড, জমা—এসব বড় কথা বাদ দেন। যার মাধ্যমে আপনার বুকিং আসে, সেই চ্যানেল আজ আমার টেবিলে। বুঝছেন? আপনাকে সিট দেব কি দেব না, সেটা আমি ঠিক করব। আর, শোনেন, আজ রাতে গেটে আপনাদের কাউকে দাঁড় করিয়েন না। লজ্জা বেশি লাগবে।”

ওই এক লাইনে পেছনের দুই মহিলার চোখে চিনে ফেলা আলো জ্বলে উঠল। তারা মেহরিনকে চিনেছে—এই লাইনের কাজের মেয়ে, তবু তার বিয়ের কথা, বাড়ির কথা এখন অপরিচিত লোকের কানে চলে গেল। গালে রক্ত উঠল, কিন্তু গলায় নয়। সে কাউন্টারের কাচে রাখা রসিদে আঙুল চেপে ধরে বলল, “কামাল ভাই, কাগজটা ফেরত দিন।”

কামাল কাগজ তুলতে গিয়েও থামল। ঠিক তখন মেহরিনের হাতে ধরা ফোন কেঁপে উঠল। নিচু স্ক্রিনে বিকাশের মতো সাধারণ নোটিফিকেশন নয়—এজেন্সির লেনদেন-অ্যাপে সবুজ রেখা উঠে এল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে কামালের ডেস্কের ছোট মেশিনটা টিট্ করে বেজে উঠল। সে চমকে স্ক্রিনে চোখ নামাল। সাবিহা ভাবি ঝুঁকে দেখে বলল, “কি?”

কামালের গলায় প্রথমবার দ্বিধা পড়ল। “মাস্টার ভাউচার... রিরাউট হয়েছে।”

মেহরিন ধীরে ফোনটা কাউন্টারের সমান উচ্চতায় তুলল। উজ্জ্বল করে নয়, হাতের তালুর আড়ালে। স্ক্রিনে এজেন্সির কেন্দ্রীয় হিসাব থেকে নতুন অনুমোদন নামছে—“রিলিজ অথরিটি: মেহরিন আখতার।” একই সঙ্গে পাশের প্রিন্টার খটখট করে তিনটি গেট পাস আর দুইটি সিট-স্লিপ উগরে দিল। কামালের টেবিলে সাবিহা ভাবির দিকে মুখ করা সিলের পাশে এখন নতুন নির্দেশ ঝলসে উঠছে: বকেয়া পরিশোধিত, রুট মুক্ত, চালান ছাড়।

সাবিহা ভাবি হাত বাড়িয়ে কাগজ ধরতে গেল। কামাল এবার তার হাত এড়িয়ে পাসগুলো তুলে মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিল। খুব জোরে না, কিন্তু সবার সামনে যথেষ্ট স্পষ্ট করে বলল, “আপার কোডেই আসল মুক্তি। আগে এটা ছাড়া কিছু বের হবে না।”

পেছনের লাইনে দাঁড়ানো লোকগুলো আর কথাবার্তা বাড়াল না; বরং শরীরের ভঙ্গি বদলে গেল। যে বয়স্ক লোকটা এতক্ষণ সাবিহার দিকে তাকাচ্ছিল, সে এবার নিজের ব্যাগটা সরিয়ে মেহরিনের জন্য একটু জায়গা করল। রাফির মুখের পেশি কেঁপে উঠল, তবু সে শব্দ করল না; শুধু ক্রেটের দড়ি শক্ত করে ধরল। সাবিহা ভাবির গলার জোরে হালকা ফাটল পড়ল, “এটা ভুল হয়েছে। চ্যানেল তো আমার—”

“ধার করা ছিল,” মেহরিন বলল। “মেয়াদ শেষ।”

কামাল তাড়াতাড়ি মোটা খাতাটা টেনে নিল, তারপর এমনভাবে মেহরিনের দিকে ঘুরিয়ে দিল যেন এই কাজ সে বহুদিন ধরেই করতে চেয়েছে। “আপা, কারা আগে যাবে লিখে দেন। খুলনার মাল, দুইটা সিট, তারপর ফরিদপুরের বুকিং।”

মেহরিন কলম নিল। তার কব্জির হাড়ে দিনভর কাজের টান। খাতার পৃষ্ঠায় নাম বসতে লাগল—রাফি, চালান তিন ক্রেট; খালা-শাশুড়ির জন্য দুই সিট; তারপর লাইনে আগে আসা বাকি যাত্রীরা। সাবিহা ভাবির চার সিটও সেখানে আছে, কিন্তু পাশে মোটা অক্ষরে লেখা: অর্থ-অনুমোদন স্থগিত। সাবিহা ভাবি বলল, “আমাদেরটা আগে ছাড়েন। লোকজন ভেতরে বসে আছে। আপনি জানেন না কারা—”

“লাইন জানে,” মেহরিন বলল। “আজ সেটা যথেষ্ট।”

কামাল একের পর এক সিল মারতে লাগল, কিন্তু আর সাবিহার দিকে তাকাল না। টিকিটের টুকরো, গেট পাস, চালানের ছাড়পত্র—সব মেহরিনের হাত ঘুরে বেরোতে লাগল। কে কখন যাবে, কোন বাসের লাগেজ-তলায় কার ক্রেট উঠবে, কোন সিট জোড়া করে রাখা হবে—সিদ্ধান্ত এখন কাচের ওই ছোট মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার কাছে এসে থামছে। সাবিহা ভাবি পাশে দাঁড়িয়ে থেকে একবার ফোনে কারও সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলল, একবার কামালকে নাম ধরে ডাকল, একবার বলল, “আমার শ্বশুরের নাম শুনেননি নাকি?” কোনোটাতেই খাতা তার দিকে ফিরল না।

গেটমুখে ভিড় আরও জমেছে। টিকিটঘর থেকে সোজা লোহার ব্যারিয়ারের সামনে সরু লেন, যেখানে কন্ডাক্টররা গলা ফাটিয়ে রুট ডাকছে, বাচ্চারা কান্না করছে, আর বস্তা-ক্রেট-ব্যাগে মানুষের হাঁটু আটকে যাচ্ছে। মেহরিন হাঁটতে হাঁটতে পাসগুলো গুনল। তার কুঁচকানো পরিচয়ফিতেটা বুকের ওপর দুলছে; ঘামে ভেজা তালুতে নতুন ছাপা গেট পাসের কাগজ শক্ত। রাফি ক্রেটগুলো ঠেলে পেছনে, আর দুজন যাত্রী—যাদের বুকিং আগে আটকে ছিল—মেহরিনের ডান-বাঁয়ে এসে দাঁড়াল, যেন এই লেনে এখন তার কাঁধের পাশে থাকাই নিরাপদ।

প্রথম ব্যারিয়ারে দাঁড়ানো প্রহরী হাত বাড়াল। মেহরিন একে একে পাস দিল। “খুলনা—দুই যাত্রী, তিন ক্রেট। তারপর ফরিদপুরের তিনজন।” প্রহরী পাস দেখে লোহার দণ্ড সরিয়ে দিল। ব্যারিয়ার একবার কেঁপে খুলে গেল; রাফির ক্রেট চাকার ঘর্ষণে এগোল; খালা-শাশুড়ির জন্য তোলা সিটের নম্বর মিলিয়ে কন্ডাক্টর মাথা নাড়ল। যাদের নাম সে বলছে, তারা ঢুকছে।

সাবিহা ভাবি তখনই এসে লেন কেটে সামনে দাঁড়াল। মুখের সাজ একটু নেমে গেছে, ওড়নার পাড় বারবার কাঁধ থেকে পিছলে পড়ছে। পেছনে দুইজন মোটা চেহারার লোক, নিশ্চয় তার আত্মীয়পক্ষ, অস্থির চোখে বাসের দিকে তাকাচ্ছে। “মেহরিন,” সে প্রথমবার নাম ধরে ডাকল, গলায় কড়াকড়ি নেই, “আমাদের চারজনকে আগে ছেড়ে দাও। ভেতরে জরুরি কাজ আছে। বাস মিস হলে সর্বনাশ।”

মেহরিন আরেক যাত্রীর পাসে সিলের দাগ মিলিয়ে নিল। “আপনাদের কাগজ?”

সাবিহা ভাবি কুঁচকে যাওয়া বুকিং-স্লিপ বাড়িয়ে দিল। তাতে নিচে লাল অক্ষর: অর্থ-অনুমোদন স্থগিত। সে দ্রুত বলল, “এটা এখন ঠিক করে দেন। আপনি পারছেন, আমি জানি। পরে হিসাব হয়ে যাবে।”

ব্যারিয়ারের লোহার ফাঁকে তখন বাতাসে বাসের ধোঁয়া এসে লাগছে। লাইন এগোচ্ছে, কারণ মেহরিন যাদের নাম ডাকছে, তারা ঢুকছে। আটকে আছে শুধু সাবিহার দল। আশপাশের লোকেরা ঘাড় ফেরাচ্ছে বটে, কিন্তু মেহরিন তাদের দিকে তাকাল না। সে সেই একই স্বরে বলল, যে স্বরে কিছু আগে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, “লাইন ভেঙে জরুরি ছাড় নেই। অনুমোদন ছাড়া গেট খুলবে না।”

“আমি তো স্রেফ—” সাবিহা ভাবি কথাটা গিলে ফেলল। “শোনো, দুপুরের কথায় মন কোরো না। তোমার খালার সিটও হয়ে গেছে, না? এখন আমাদেরটাও—”

মেহরিন প্রহরীর দিকে আরেকটা পাস বাড়াল। “এটা ছাড়ুন।”

ব্যারিয়ার আবার সরে গেল। এক মা তার বাচ্চাকে বুকে টেনে নিয়ে ভেতরে ঢুকল, পিছনে বস্তা হাতে এক বৃদ্ধ। সাবিহা ভাবির লোকগুলো তাদের গা ঘেঁষে ঢুকতে চাইতেই প্রহরী হাত ছড়িয়ে পথ আটকাল। “পাস।”

সাবিহা ভাবি এবার একেবারে মেহরিনের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। এত কাছে যে তার আতরের গন্ধেও উদ্বেগ মেশা ঘাম টের পাওয়া যায়। “একটা ব্যতিক্রম করো। শেষবারের মতো। আমি গেটে বলছি, তুমি শুধু—”

“আজ ব্যতিক্রম তালিকায় যারা ছিল,” মেহরিন শান্ত গলায় বলল, “তাদের নাম আমি আগেই লিখে দিয়েছি। আপনাদের নাম সেখানে নেই।”

সে আরেকটি পাস তুলল, নাম মিলিয়ে ডেকে দিল। “ফরিদপুর—তিনজন।”

প্রহরী পাস কেটে নিল। ব্যারিয়ার ঘুরে খুলে গেল। মেহরিনের হাতে শেষ অবশিষ্ট গেট পাসের গোছা চেপে রইল; সাবিহা ভাবির বাড়ানো বুকিং-স্লিপ বাতাসে ঝুলে থাকল; লোহার দণ্ড অন্যদের জন্য সরে গেল, আর তার সামনে বন্ধই রইল।