নিজের স্টেজেই সে ধরা খেল
আরমান মেহরিনের হাত থেকে সাদা সেন্সর-প্রোবটা টেনে নিয়ে বলল, “এটা আমি নেব। তুমি স্যাম্পল ট্রে ঠিক করো।” তার কবজির ওপর পুরনো কলমের কালির দাগ ছিল; প্রোব ছাড়তে গিয়ে দাগটার ওপর মেহরিনের নখ সরে গেল, কিন্তু চারপাশের কেউ সেটা দেখল না—সবাই দেখল শুধু কে মঞ্চের সামনে দাঁড়াল।
ঢাকার মিরপুরের ওই কৃষি-প্রযুক্তি ক্লিনিকের করিডর আজ অস্বাভাবিক ভিড়। কাচঘেরা ডায়াগনসিস বে-র সামনে দুই সারি প্লাস্টিক চেয়ার, মাঝখানে সরু আইল, আইলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে ডিলার, খামারের মালিক, আর আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখগুলো। ডা. সাবিহা আপা স্পনসরদের দিকে হাসি ধরে রেখেছেন, যেন সব কিছু আগেই ঠিক করা ছিল। মেহরিনের হাতে আধাভাঁজ করা রশিদ—গত রাতের রিএজেন্ট কেনার—সে অজান্তে সেটা খুলছে, ভাঁজ করছে, আবার খুলছে। ওই রিএজেন্ট তার নিজের টাকায় আনা। আজকের ডেমোতে যদি ফল ভুল যায়, শুধু ক্লিনিকের অর্ডার নয়, তার নিজের পরের মাসের বাসাভাড়াও ঝুলে যাবে।
আরমান ইতিমধ্যে ডেমো টেবিলের মাথায় জায়গা নিয়ে ফেলেছে। কালো শার্ট, গলায় আইডি কার্ড, কণ্ঠে এমন নিশ্চিন্ত দাপট যেন এই মেশিনের জন্মের সময়ও সে উপস্থিত ছিল। অথচ গত ছয় মাসে মাঠের স্যাম্পলের গন্ধ, ভেজা মাটির লবণ-দাগ, পাতার পুড়ে যাওয়া কিনারা—সব আগে চিনেছে মেহরিন। রিপোর্টে নাম গেছে “টিম”। ছবিতে দাঁড়িয়েছে আরমান।
“বাইরে থেকে যারা এসেছেন, তারা কিন্তু মুখ দেখে বিশ্বাস করবেন,” হাশেম সাহেব সামনের সারি থেকে বললেন। আরমানের মামা, স্পনসর বোর্ডের অর্ধেক দরজার চাবি যার হাতে। “ভুল করার সুযোগ নাই। কে সামলাতে পারে, আজ দেখা যাবে।”
একজন বড় ক্লায়েন্ট, গাজীপুরের বীজ ব্যবসায়ী, চেয়ার সরিয়ে উঠে আইলের ধারে এলেন। “আমরা তো স্থায়ী চুক্তি দেব যাকে ভরসা করা যায় তাকে। প্রদর্শনী যদি পরিষ্কার না হয়, পরে মাঠে কী হবে?” কথাটা তিনি আরমানের দিকেই বলে গেলেন, কিন্তু চোখ ফিরিয়ে মেহরিনকে মাপলেন একবার—যেন সে স্টাফ, আর স্টাফের সীমা থাকা উচিত।
মেহরিন কিছু বলল না। দরজার ফ্রেমে এক মুহূর্ত থেমে সে শুধু দেখল, আরমান তার নোটপ্যাডটাও টেনে নিয়েছে। পাতার কোণায় মেহরিনের হাতের ছোট ছোট তীরচিহ্ন, লবণাক্ততার পুরনো তুলনামূলক মান, আর তিনবার ঘষে লেখা একটা শব্দ—“অসামঞ্জস্য”—সব এখন আরমানের কনুইয়ের নিচে। প্রথম ছোট্ট ফাটলটা তখনই দেখা গেল: প্রোব সংযোগের আগে সে সেন্সর-হেডের সুরক্ষা-ক্যাপ খোলেনি। ডা. সাবিহা আপা নিচু গলায় স্মরণ করিয়ে দিতেই সে হেসে বলল, “ওহ, হ্যাঁ, ছোট জিনিস।” সামনে বসা দু-একজন মুচকি হাসল। মেহরিন রশিদের কাগজটা আরেকবার ভাঁজ করল। ফাটল খুব ছোট, কিন্তু ফাটলই।
ডেমো শুরু হতেই চাপ ঘন হয়ে উঠল। স্ক্রিনে স্যাম্পল আইডি উঠছে, আরমান গলা পরিষ্কার করে বলছে, “এখানে আমরা মূলত পুষ্টির ঘাটতি আর রোগের প্যাটার্ন আলাদা করি।” তার ভাষা মসৃণ, হাতের ভঙ্গি বড়; কিন্তু মেশিনের ট্রেতে মাটি-পাতার মিশ্র স্যাম্পলটা বসানোর সময় সে অল্প কাত করে ফেলল। মেহরিন এগিয়ে ধরতে গিয়েও থেমে গেল। আইলের ধারে রিফাত—তার খালাতো ভাই—বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে। আজ সকালে খালার বাসার টেবিলে সবাই বলেছিল, “তুই যদি খুব সামনে যাস, লোকে কী ভাববে? মেয়েমানুষ এত ঠেলাঠেলি করে উঠে পড়ে?” এখন সেই একই আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছে আরমানকে। জিতলে সে “উঠতি ছেলে”; মেহরিন জিতলেও হবে “ঝগড়াটে মেয়ে”।
হাশেম সাহেব এবার আরেক ধাপ এগোলেন। “আমরা চাই ভবিষ্যতে যে মাঠে যাবে, যে প্রশিক্ষণ দেবে, সে-ই আজ সামনে থাকুক। সম্পর্কও তো দেখতে হয়।” শেষ কথাটা বলেই তিনি পাশের এক খালাম্মার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন। ইশারাটা সবার বোধগম্য। আরমানের সঙ্গে মেহরিনের নাম একসময় একসঙ্গে ঘুরেছে—বিয়ের কথা না, তার আগের নরম কথাবার্তা, যেটাকে বয়স্করা মুখ টিপে মাপতে পছন্দ করে। আজকের ডেমো শুধু কাজের নয়; কে কার চেয়ে উপযুক্ত, সেটারও বিচার।
আরমান স্ক্রিনে প্রথম রিডিং তুলে ঘোষণা করল, “পটাশের ঘাটতি।” সঙ্গে সঙ্গে বীজ ব্যবসায়ী লোকটা মাথা নাড়লেন, যেন জ্ঞানের সঙ্গে জ্ঞান মিলল। কিন্তু মেহরিনের চোখ পড়ে রঙের ম্যাপে। বাম কোণে পাতলা বেগুনি ছোপ, তারপর হঠাৎ সিগন্যাল-স্পাইক—এটা সরল ঘাটতির ছবি না। স্যাম্পলের নিচে জমে থাকা আর্দ্রতা সে সকালে নিজে শুকিয়ে নিয়েছিল; তবু এই স্পাইক মানে সেন্সর পাতার পোড়া টিস্যুর লবণ-ঘনত্বকে রোগের চিহ্নের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলছে। এটার জন্য একটা নির্দিষ্ট সমন্বয় লাগে—লাইভ ডিফারেন্সিয়াল ক্যালিব্রেশন। বইয়ে আছে, কিন্তু হাতে না করলে ধরা যায় না।
“দাও,” মেহরিন হঠাৎ বলল, খুব জোরে না, কিন্তু এতটাই সোজা স্বরে যে সামনে থাকা দুজন নিজে থেকেই একটু সরে গেল। আরমান তাকাল না। “পরে,” সে বলল, “প্রবাহ নষ্ট করো না।”
মেহরিন এগিয়ে গেল। আরমানের কবজির কাছ থেকে প্রোব ধরেনি; সে সরাসরি কনসোলের নিচের স্লাইডার-চেম্বার খুলে পাতলা ক্যালিব্রেশন ডিস্কটা বের করল। এই অংশটা আরমান ছোঁয়ই না সাধারণত। তার আঙুল থামল তিন নম্বর খাঁজে, তারপর একবার ডানদিকে, আধা দাগেরও কম। আরেক হাতে সে স্যাম্পল ট্রের ডান কোণ দুই মিলিমিটার তুলে আবার বসাল। কাজটা এত ছোট যে যারা পেছনে ছিল তারা প্রথমে বোঝেনি কিছু। কিন্তু স্ক্রিনের রঙ এক ঝটকায় বদলে গেল। বেগুনি ছোপ আলাদা হয়ে উঠে এল পাতার শিরা-নকশা ধরে, আর আগে যে স্পাইকটা পটাশের ঘাটতি বলে দেখাচ্ছিল, সেটা ভেঙে দুটো সরু বার হয়ে গেল—একটা লবণদগ্ধ, আরেকটা ছত্রাকজনিত দাগ।
আরমানের মুখ তখনও ঘোষণার ভঙ্গিতে খোলা। শব্দ বেরোল না।
মেহরিন প্রোবটা এবার তার হাত থেকেই নিল, যেন আসলে ওটা সবসময়ই তার ছিল। “এটা সরল পুষ্টির ঘাটতি না,” সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বলল। “সেচের পানিতে লবণ বেড়েছে। তার ওপর পাতায় প্রাথমিক ব্লাইটের চিহ্ন। তাই সিগন্যাল জোড়া লাগছিল।” সে কনসোলে আরেকটা কমান্ড দিল। মাল্টি-লেয়ার রিড খোলা মাত্র স্ক্রিনে দুই রঙের মানচিত্র আলাদা আলাদা বসে গেল, একটার নিচে ‘লবণচাপ’, আরেকটার নিচে ‘ফাঙ্গাল রিস্ক’। বাংলা লেখা স্পষ্ট, পড়তে কারও কষ্ট হলো না।
আইলের ধারে দাঁড়ানো লোকজনের শরীরী ভঙ্গি আগে বদলাল। যে ব্যবসায়ী একটু আগে আরমানের কথায় মাথা নেড়েছিলেন, তিনি এখন চেয়ারের পিঠে হাত রেখে সামনের দিকে ঝুঁকলেন। ডা. সাবিহা আপা মুখের হাসি গুছিয়ে নিয়ে আরমানের পাশ কাটিয়ে মেহরিনের দিকে এলেন, কিন্তু কিছু বললেন না; তার এই না-বলা এগিয়ে আসাটাই যথেষ্ট। রিফাত সামনের সারির এক খালি চেয়ার টেনে আইলের পাশে রাখল। মেহরিন বসল না। বসার সময় এখন নয়।
আরমান কাশি দিয়ে বলল, “এটা তো... ডেমো মোডে মাঝে মাঝে লেয়ার বিভ্রাট—”
মেহরিন তার কথা কেটে দিল না; সে শুধু আরেকটা স্যাম্পল চাইল। ট্রের পাশে থাকা প্যাকেটের কাগজ শুকনো শব্দ করে উঠল। “প্লট সেভেনের পাতাটা দিন।” সকালে যে কৃষক স্যাম্পল জমা দিয়েছিল, সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে দিল। আরমান হাত বাড়াল, কিন্তু কৃষক তার হাতে না দিয়ে সরাসরি মেহরিনের ট্রেতে রাখল। এইটুকুতেই ঘরের মালিকানা সামান্য সরে গেল।
দ্বিতীয় স্যাম্পল ঢুকতেই আরমান বলল, “আমিও তো একইটা বলতে চাচ্ছিলাম।” তার গলা পাতলা হয়ে গেছে। হাশেম সাহেব বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকালেন, সেই প্রথমবার। সামনে মানুষ থাকলে তিনি ভরসার দিকে থাকেন, ব্যর্থতার দিকে না।
মেহরিন কোনো জবাব দিল না। স্যাম্পল-চেম্বার লক, আর্দ্রতা সমতা, দ্রুত স্ক্যান, তারপর আগের মতোই তিন নম্বর খাঁজে ক্যালিব্রেশন। এবার সে স্ক্রিন সবার দেখার মতো করে কাত করল না; বরং owner-side মনিটরটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে রাখল, যেন সিদ্ধান্তের জায়গা ফেরত নিচ্ছে। তারপর একটানা কাজ করল—ক্রস-রিড, তুলনা, চিহ্ন। স্ক্রিনে মান উঠছে, নেমে স্থির হচ্ছে। আইলের ধারে কেউ কাশি দিল না, ফোন তুলল না। চেয়ারের পা ঘষার শব্দও থেমে গেছে।
“কী দেখাচ্ছে?” বীজ ব্যবসায়ী লোকটা জিজ্ঞেস করলেন। এবার প্রশ্নটা আরমানকে নয়।
মেহরিন চোখ না তুলেই বলল, “আগের প্লটের একই জায়গার পাশের জমি। এখানে ছত্রাক নাই। শুধু লবণচাপ। তাই পাতার কিনারা শুকিয়েছে, কিন্তু দাগ ছড়ায়নি।” সে দুটো স্ক্রিন পাশাপাশি রাখল—আগের স্যাম্পলের ব্লাইট লেয়ার আর এটার ফাঁকা লেয়ার। “একই ঘাটতি হলে দুইটার ছবি এক হতো।”
আরমান তবু মরিয়া হয়ে এগিয়ে এল। “আমি owner-side-এ বসি। আমি ফাইনাল ইনপুট দেব।” কথাটা বলেই সে কনসোলের চেয়ার ধরল। সেই চেয়ারটা সকাল থেকে তারই বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
ডা. সাবিহা আপা ঠান্ডা গলায় বললেন, “চেয়ার ছাড়ো।” শুধু দুই শব্দ। কিন্তু শব্দের ওজন এমন, যেন ঘরের সব কাচে একসঙ্গে টোকা পড়ল। আরমান হাত সরাতে দেরি করল। মেহরিন সেই দেরির ফাঁকেই owner-side কনসোলে বসে গেল। চেয়ারটা আরমানের হাঁটু ছুঁয়ে সামান্য ধাক্কা দিল। এই প্রথম সে সরে দাঁড়াল।
হাশেম সাহেব তাড়াতাড়ি বললেন, “একটা ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। শেষটা আরমান—”
বীজ ব্যবসায়ী তার কথার ওপরই বলে উঠলেন, “না, শেষটা যিনি পড়তে পারছেন তিনিই দেবেন। আমাদের চুক্তি খেলনা না।” লোকটা এবার নিজের সহকারীকে ডাকল, “নোট করো।” তার কলম বেরোনোর শব্দ আইলের নীরবতায় কড়া শোনাল। ক্ষমতা যেদিকে ঘোরে, শব্দও সেদিকে ভারী হয়ে ওঠে।
আরমান এখন সত্যি বিচলিত। সে স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কী দেখছে বোঝা যাচ্ছে না। owner-side মনিটরে মেহরিন নতুন স্যাম্পলের যাচাইকরণ ট্যাব খুলেছে—যেটা কেবল ফাইনাল রিডের আগে খোলা হয়। তিনটে ঘর: মাটির পরিবাহিতা, পাতার টিস্যু-ক্ষয়, সংক্রমণ সম্ভাবনা। আরমান হঠাৎ বলল, “সংক্রমণ ‘হাই’ দাও।” যেন আন্দাজে ছুড়ে দিল।
মেহরিন তার দিকে তাকাল না। “হাই হলে স্পোর প্যাটার্ন থাকত।” তারপর সে কার্সর নামিয়ে মাঝের ঘরে মান বসাল, প্রথম ঘরে উচ্চ, শেষ ঘরে নিম্ন। স্ক্রিন তখন নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত-সারাংশ তুলল: ‘প্রধান সমস্যা: সেচজলজনিত লবণচাপ। সহগামী ঝুঁকি: পৃথক প্লটে প্রাথমিক ছত্রাক সংক্রমণ। সুপারিশ: পানি উৎস পরীক্ষা, আক্রান্ত অংশে বিচ্ছিন্ন চিকিৎসা।’
আরমান এক পা এগিয়ে owner-side স্ক্রিনে হাত দিতে গেল। দেরিতে। খুব দেরিতে।
মেহরিন তার হাতের আগেই ‘নিশ্চিত’ চাপল।
টিকচিহ্ন জ্বলে উঠতেই পুরো রিডিং owner-side স্ক্রিনে স্থির হয়ে গেল। নিচে ইনপুট ট্রেসে তার শেষ চিহ্ন—ছোট, তির্যক, অচেনা কারও নয়—থেকে গেল। ডা. সাবিহা আপা সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্টার টেনে owner-side-এ সরিয়ে দিলেন। বীজ ব্যবসায়ী বললেন, “পরের মাসের মাঠ-ডেমো এই মেয়েটা করবে।” হাশেম সাহেব কিছু বলতে গিয়ে গলা ভিজিয়ে নিলেন, কিন্তু শব্দ বেরোল না। আরমানের আইডি-কার্ড বুকের ওপর উল্টে গেছে; সে সেটা সোজা করারও ফুরসত পেল না।
মেহরিন উঠে দাঁড়াল। আইলের ধারের মানুষগুলো এবার নিজে থেকে সরে পথ করে দিল। রিফাত দরজার ফ্রেমে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছিল, যেন কিছু বলতে চায়; মেহরিন তার পাশ দিয়েই বেরিয়ে গেল। পেছনে আরমানের শুকনো গলায় শোনা গেল, “মেহরিন, এক মিনিট—”
সে ফিরল না। ডায়াগনসিস বে-র কাচে owner-side স্ক্রিন জ্বলছে—প্রধান সমস্যা, সহগামী ঝুঁকি, সুপারিশ—সব স্পষ্ট। নিচে তার শেষ ইনপুট-চিহ্ন রয়ে গেছে। কার্সরটা একবার টিমটিম করে থেমে গেল।