Fast Fiction

কন্ট্রোল আবার আমার হাতে

ট্রলির চাকায় বাঁধা বাঁধাকপির বস্তা কাত হয়ে লেনে ছড়িয়ে পড়তেই শিউলি ডিসপ্যাচ ঘরের দরজায় হাত রাখল, আর ভেতর থেকে কামরুল ভাই চেঁচিয়ে উঠল, “ওখানে না। সিটে কেউ বসবে না। তুই বাইরে দাঁড়া।”

ভোরের ঢাকা তখন পুরো জেগে ওঠেনি, কিন্তু ইয়ার্ড জেগে গেছে অনেক আগেই। ডিসপ্যাচ ঘরের সামনের সরু কাউন্টারের কিনারা ভরে আছে খুচরা কাগজ, একখানা ক্যালকুলেটর, আধখাওয়া সিগারেটের প্যাকেট আর ঠান্ডা হয়ে চামড়া ধরা চায়ের কাপের বাদামি দাগে। বাইরে তিনটা পিকআপ, দুটো মিনি ট্রাক, একটা কৃষি খামারের মালভর্তি ভ্যান একে অন্যের গায়ে নিশ্বাস ফেলছে। গেটের কাছে রফিক চেঁচাচ্ছে, “আগে কোনটা নামবে বলেন! পেছনেরটা আটকে গেছে!” শিউলির গলায় ঝোলা আইডি-ফিতেটা এত ঘষে পাতলা হয়ে গেছে যে মাঝখানে কাপড় উঁচু হয়ে সাদা সুতো বেরিয়ে আছে। সেই ফিতেটা কামরুল ভাই চোখের সামনে ঝুলতে দেখেও এমন ভঙ্গি করল যেন ওর এখানে দাঁড়ানোই বাড়াবাড়ি।

শিউলি সোজা লেনের দিকে তাকিয়েই বলল, “সবজি ভ্যানটা দুই নম্বর বে-তে দেন। পেছনের ডিমের পিকআপ আগে না ছাড়লে ফেটে যাবে।”

“তুই বলবি?” কামরুল ভাই রেডিও সেটটা তুলে নিজের বুকে চাপাল। “আজ থেকে টার্ন আমি দেখব। মৌসুমি আপা বলেছেন, বাইরে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে, ভুলচুক হলে মানসম্মান থাকবে না। মেয়েমানুষ বেশি সামনে এলে লোকজন কথা তোলে। তুই নামের খাতায় থাক, সিটে না।”

কথাটা এমন জোরে বলল যে ড্রাইভারদের গলা থেমে গেল একমুহূর্ত। শিউলির চোয়াল শক্ত হল। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা—এই ইয়ার্ডে ওই কথার মানে সবাই বোঝে। মৌসুমি আপা মালিকের খালাতো বোন, কামরুল ভাই তার আপন ভাশুরের ছেলে। গত ঈদে বাড়ির দাওয়াতে শিউলি একবার গিয়েছিল হিসাবের ফাইল দিতে; তারপর থেকেই ওদের চোখে সে “বাইরের মেয়ে” নয়, কিন্তু “ভেতরের লোক”ও নয়—যাকে দরকারে টেনে আনা যায়, সামনে বসানো যায় না।

শিউলি দরজা ছেড়ে সরে গেল ঠিকই, কিন্তু যাওয়ার বদলে লেনের সাদা দাগের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। “রফিক, ডিমওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে রাখিস না,” সে ঠান্ডা গলায় বলল। “বাঁদিকের র‍্যাম্প ফাঁকা কর।”

কামরুল ভাই যেন এইটুকুই চেয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল, “আমার কথা ছাড়া কেউ নড়বি না!” তারপর রেডিওতে ভুল দমকে বলল, “বেগুনের ট্রাক আগে ভেতরে। হ্যাঁ, বড়টা। এক নম্বর খালি কর।”

এক নম্বর কখনোই খালি ছিল না। সেখানে আগের রাতের লাউয়ের গাঁট এখনও অর্ধেক নামানো। বড় ট্রাক ঢুকতেই তার পেছনের চাকা কাঁদা-ধরা ঢালুতে কাত হল, সামনে থাকা পিকআপ পিছু নিতে না পেরে হর্ন বাজিয়ে উঠল। জসিম দৌড়ে এসে চেঁচাল, “পিছনে ডিম! ভাই, পেছনে ডিম!” ততক্ষণে তিন সারির লাইন এক সরু গলায় গিঁট মেরে গেছে। কাঁচা মরিচের ঝুড়ি উলটে রাস্তার পানি সবুজ হয়ে গেল।

কামরুল ভাই তবু থামল না। মুখে যত বেশি লোক, তত বেশি গলা। “ওই পিকআপ উল্টা ঘুরাও! গেটে রাখো!” সে এমন নির্দেশ দিল যেটা মানলে পুরো বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ড্রাইভার হতভম্ব হয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাতেই পেছনের খামারভ্যানের চালক জানালা দিয়ে মাথা বের করে গালমন্দ শুরু করল। “আমার মাল সাভার যাবে! ফজরের পর থেকে দাঁড়ায়া আছি!”

মৌসুমি আপা তখন এসে দাঁড়িয়েছেন অফিসঘরের বারান্দায়, শাড়ির আঁচল কাঁধে চেপে। তার সঙ্গে ফোনে কারও কথা—শিউলি শুনতে পেল, “হ্যাঁ খালা, আজ একটু ঝামেলা… না না, আমি আছি।” সেই “আমি আছি”টুকু কামরুল ভাইকে আরও ফুলিয়ে দিল। সে ঘাড় উঁচু করে বলল, “সবাই চুপ। যেটা বলছি, সেটাই হবে।”

শিউলি আরেকবার এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়াল রেডিওর দিকে। “এটা দিন।”

কামরুল ভাই হাত সরিয়ে নিল, ঠোঁট বাঁকিয়ে। “তোকে দিলে আমি দাঁড়াইব কোথায়? দুই দিন হিসাব মেলাতে পারছিস বলে টার্নও তুই চালাবি? বাইরে দাঁড়া। দেখ।”

দেখার ফল পাঁচ মিনিটেই দেখা গেল। এক নম্বর বে আটকে, দুই নম্বরের সামনে উল্টো করে দাঁড়ানো পিকআপ, গেটে ফেঁসে থাকা খামারভ্যান, আর রফিকের কপালে ঘাম জমে সাদা লবণ। জসিম বাঁধাকপির বস্তা টেনে তুলতে গিয়ে পিছলে হাঁটু কেটে ফেলল। গেটের বাইরে নতুন করে ঢুকে পড়ল আরও চারটা পিকআপ—মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজারে যাবার মাল। লেনের ওপর হর্ন, গালি আর পচা পাতার গন্ধ ঘন হয়ে উঠল।

শিউলি এবার আর কারও দিকে তাকাল না। এক লাফে কাউন্টারের ভেতর ঢুকে গেল। কামরুল ভাই “এই!” বলে উঠতেই সে তার বুকের সঙ্গে চেপে ধরা রেডিওটা মুচড়ে টেনে নিল, একসঙ্গে ডিসপ্যাচ খাতাটাও নিজের দিকে সরিয়ে আনল। কাঁপা খাতার পাতা টুপ করে ঠান্ডা চায়ের দাগের ওপর লেগে গেল। শিউলি সিটে বসে মাইকের বোতাম চাপল, গলা ধারালো, সোজা, অনুশীলিত।

“রফিক, গেট লক করিস না—শুধু নতুন ঢোকা আটকাস। জসিম, ডিমের পিকআপ এখনই বাঁদিকের সরু র‍্যাম্প দিয়ে বের কর। বেগুনের ট্রাক দাঁড়াবে, এক ইঞ্চিও আর ভেতরে না। খামারভ্যান দুই নম্বর বে-তে। লাউ নামানো শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ এক নম্বরে ঢুকবে না। যার মাল সাভার, সে ডান লেন ধরে পিছনের ঘুরপথ নেবে।”

কোনও তর্ক হল না। হল শুধু নড়াচড়া। রফিক দৌড়ে গেটের মাঝখান ফাঁকা করল। জসিম রক্তমাখা হাঁটু নিয়েই ডিমের পিকআপের পাশে গিয়ে হাত নাড়ল। যে ড্রাইভার একটু আগে গালি দিচ্ছিল, সে এখন জানালা থেকে শরীর বের করে বলল, “আপা, তারপর আমি?”

“তুমি দাঁড়াও না,” শিউলি মাথা না তুলেই বলল, “তোমার ভ্যান আগে ঢুকছে। সোজা, সোজা, এখন কাট।”

গাড়িগুলো যেন একসঙ্গে বুঝে গেল কার গলা অনুসরণ করতে হয়। আটকে থাকা কাত ট্রাক থামল, পিকআপ নড়ল, গেটের জমাট গিঁট ঢিলে হল। কামরুল ভাই শিউলির কাঁধের ওপর ঝুঁকে বলল, “আমি বলছিলাম সেটাই—”

শিউলি তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “পিছনে দাঁড়ান। আমার মুখের ওপর আরেকটা গলা উঠলে আবার লক লাগবে।”

কথাটা এত ঠান্ডা ছিল যে কামরুল ভাই একপা পেছাল। সেই একপা সবাই দেখল। মৌসুমি আপার ফোনের কথা থেমে গেল। বারান্দা থেকে তিনি শুধু বললেন, “শিউলি, তাড়াতাড়ি ক্লিয়ার করো।”

এবার সবাই তাকে দিয়েই চাইতে লাগল। “আপা, এই চালানটা?” “শিউলি আপা, গেটের বাইরে আরও দুইটা!” “খালাসি কম, কোনটা আগে?” রফিক এমনকি কামরুল ভাইয়ের দিকে ফিরেও না দেখে প্রশ্ন করল, “আপা, সিলেটের গাড়িটা ঢুকাব?”

শিউলি খাতায় আঙুল চালিয়ে বলল, “সিলেটেরটা না, আগে কাওরানবাজার। পেঁপের গাড়ি রোদে থাকবে না। রফিক, লোক লাগা। জসিম, হাঁটু বেঁধে নে, তারপর বস্তা ধর। আর কেউ ড্রাইভারকে উল্টো ঘুরতে বলবে না।”

কামরুল ভাই এবার জোর দেখাতে গিয়ে আরও ছোট হয়ে গেল। সে নিজেই গেটের দিকে হাত তুলে চেঁচাল, “আমি বলছি, সিলেটেরটা—”

ড্রাইভার জানালা দিয়ে সোজা শিউলিকে জিজ্ঞেস করল, “আপা, আমি কই যামু?”

“দুই মিনিট অপেক্ষা। তারপর সোজা দুই নম্বর।”

ড্রাইভার মাথা নেড়ে রইল। কামরুল ভাইয়ের হাত বাতাসে ঝুলে থাকল, কারও দরকারে লাগল না।

কিন্তু লেন পুরোপুরি ছাড়ার আগেই বিপদ দ্বিতীয় দফায় এল। বাইরের রাস্তা থেকে একসঙ্গে তিনটা বড় ট্রাক ঢুকে পড়ল—চট্টগ্রাম থেকে রাতভর আসা আলু, কুমিল্লার ফুলকপি, আর মাদারীপুরের পেঁয়াজ। গেটের বাইরে তখন নামাজ শেষে বাজারমুখী ছোট ভ্যানও জমছে। এত চাপ একসঙ্গে এলে এক গলা, এক খাতা, এক রেডিও ছাড়া বে বাঁচে না। কামরুল ভাই ততক্ষণে আবার সাহস পেয়েছে; সে সিটের পেছনে এসে বলল, “আমি পাশে বসে বলি, তুই কর। পুরো দেওয়া লাগবে না।”

শিউলি এবার প্রথমবারের মতো তার দিকে তাকাল। “পাশে বসে দুটো গলা চলবে না। পুরো দিন।”

“চাবি তো আমার কাছে,” কামরুল ভাই দাঁত চেপে বলল। কোমরের লুপে ঝোলা গোছা চাবি সে হাতে নিল। “বে-র মাস্টার চাবি, স্লাইডিং গেট, ডিজেল স্টোর—সব। তুই শুধু মাইক ধরলি বলে মালিক হইস না।”

ঠিক তখনই গেটের বাইরে হঠাৎ হইচই। এক ট্রাক ঢালু মুখে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, আর তার পেছনে ফুলকপির ট্রাক পুরো রাস্তা আটকে দিয়েছে। যদি প্রথমটা ভুল বে-তে ঢোকে, পেছনের তিন লেন থেমে যাবে। রফিক প্রাণপণে চেঁচাচ্ছে, “এখন বলেন! এখন বলেন!”

শিউলি সিট থেকে উঠল না। মাইকের বোতাম টিপে বলল, “সবাই শোনেন—একটা গলা। কামরুল ভাই, চাবি টেবিলে রাখেন। না রাখলে আমি মাইক নামাচ্ছি, আপনারা সবাই দাঁড়িয়ে থাকেন।”

ওটা হুমকি ছিল না; খাঁটি হিসাব। শিউলি আঙুল বোতাম থেকে সরিয়ে নিতেই লেনের নড়াচড়া থমকাল। ড্রাইভাররা সামনে ঝুঁকে রইল, জসিম বস্তা কাঁধে নিয়ে স্থির, রফিক গেটের অর্ধেক খুলে অর্ধেক বন্ধ রেখে তাকিয়ে আছে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড—এই থামাটাই কামরুল ভাইকে উল্টো কেটে দিল। কারণ সবাই বুঝে গেল, এখন যদি শিউলি চুপ করে, আটকে যাবে সব।

মৌসুমি আপা বারান্দা থেকে নামলেন না, শুধু নিচু গলায় বললেন, “কামরুল, দাও।”

কামরুল ভাই নড়ল না। তার মুখের ভাব এমন, যেন চাবি ছাড়লে শুধু লোহা নয়, নিজের কণ্ঠও খুলে যাবে। গেটের বাইরে তখন পেঁয়াজের ট্রাক হর্ন মেরে উঠল, ভেতরে কাত আলুর ট্রাক থেকে বস্তা সরে ধপধপ শব্দ। রফিক প্রায় কেঁদে ফেলল, “ভাই, এখন না দিলে উল্টে যাবে!”

এইবার কামরুল ভাই চাবির গোছা খুলতে গিয়ে একবারে খুলতে পারল না। আঙুলে আটকে গেল লুপ। টান দিতে দিতে তার কণ্ঠ ভেঙে গেল, “নাও… কিন্তু—”

শিউলি হাত বাড়িয়ে চাবি নিল না, যতক্ষণ না সে সেগুলো কাউন্টারের ওপর রাখল। ধাতব শব্দে গোছাটা পড়ে কাঁপল। শিউলি তখনই নিজের হাত দিয়ে সেগুলো টেনে নিল, গলার ফিতা সরিয়ে সিটে গা সোজা করল। “রফিক, কাত ট্রাকের পেছনে ইট দাও। ফুলকপি তিন নম্বরে যাবে না—পেছনের খোলা শেডে নামবে। আলু সোজা দুই নম্বর, কিন্তু অর্ধেক নামিয়ে বের করে দেবে। পেঁয়াজের ট্রাক বাইরে হেড ঘুরিয়ে রাখো, একবারে ঢুকবে। জসিম, চারজন মানুষ তুল।”

কথাগুলো ছুরি চালানোর মতো বেরোল। সঙ্গে সঙ্গে কাজও। রফিক দৌড়ে ইট গুঁজল চাকার নিচে। জসিম চেঁচিয়ে লোক জড়ো করল। ফুলকপির ট্রাকচালক আগের অর্ডার ভুলে গিয়ে শিউলির হাতের ইশারায় ট্রাক পেছাল। আলুর ট্রাকের হেলপাররা বস্তা নামাতে নামাতে গালি দিচ্ছিল, কিন্তু থামছিল না। ভুল বে-র মুখ বন্ধ, খোলা শেড সক্রিয়, গেটে ঢোকা-বেরোনোর পথ আলাদা। পাঁচ মিনিটে জটের মুখ খুলে গেল; দশ মিনিটে ভেতরের চাকা ঘুরতে শুরু করল। কামরুল ভাই পাশে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু আর কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করল না।

সে শেষ চেষ্টা করল যখন সাভারের খামারভ্যানটা পেছন থেকে সোজা শিউলির নির্দেশে বেরিয়ে গেল। “ওটা আগে ছাড়লে হিসাব গড়বড় হবে,” সে বলল।

শিউলি খাতা খুলে পাতায় টোকা দিল। “এন্ট্রি হয়েছে পাঁচটা তেইশে। আপনারটা হয়নি। এখন চুপ।”

এই “আপনারটা হয়নি” কথাটাই ওকে সবার সামনে খালি করে দিল। মৌসুমি আপার চোখ একবার খাতায়, একবার কামরুল ভাইয়ের মুখে। আশেপাশের ড্রাইভাররা আর কৌতূহলী না, নিশ্চিত। কে চালাচ্ছে, কে আটকে দিচ্ছিল—এখন সেটা কাজের মাঝেই লেখা হয়ে গেছে।

শেষ ঢেউটা কেটে গেলে শিউলি সিট থেকে উঠল। রেডিওটা টেবিলে রাখল না; কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে বে-র দরজায় গিয়ে স্লাইডিং গেটের তালা নিজে খুলে আবার নিজে বন্ধ করল, যাতে পরের লোডের জন্য পথ আলাদা থাকে। তারপর ফিরে এসে ডিসপ্যাচ ঘরের পাশের দেয়ালে লাগানো সরু লোহার চাবির আলমারির সামনে দাঁড়াল। কাচের ভেতর আগের দেরিতে ফেরত আসা দুটো চাবি ঝুলছে, একটা খালি হুক দুলছে। শিউলি মাস্টার চাবির গোছা তুলে হুকে ঝুলিয়ে দরজা টেনে দিল। ধাতব গোছাটা একবার, দুবার কেঁপে উঠে থেমে গেল।