যে মঞ্চটা ওর ছিল, সেটাই ওকে মারল
“মেহরিন, তুমি সাইডে দাঁড়াও—এই রাউন্ডটা তানভীর করবে,” ঘোষক স্যার মাইকের তার এক হাতে চেপে ধরে বললেন, আর আরেক হাতে ডেমো টেবিলের সামনে রাখা নামফলকটা তুলে তানভীরের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। প্লাস্টিকের কার্ডে কালো মোটা অক্ষরে লেখা ছিল: মেহরিন আক্তার। তানভীর কার্ডটা এমনভাবে নিল, যেন জিনিসটা তারই ছিল সব সময়। সামনের সারির ডান পাশের আইল লেনে রাশেদা খালা দাঁড়িয়ে, শাড়ির আঁচল টেনে কানে কানে পাশের এক খালাম্মাকে বললেন, “ছেলেটা কথা বলতে পারে, মেয়েটা মাঠের কাজ পারে—কিন্তু মঞ্চে তো মুখও লাগে।”
মেহরিনের টোট ব্যাগের ভেতর আধভাঁজ করা বাসভাড়ার রসিদটা আঙুলে কেটে গেল। ভোরে গাবতলী থেকে এসে সে নিজেই ডেমো কিট নামিয়েছে, নিজেই সেন্সর ক্যালিব্রেট করেছে, নিজেই ট্রায়াল রান শেষ করেছে। এই স্লটটা তার ছিল। বিচারক টেবিলের সামনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষক, এক স্পন্সর কোম্পানির প্রতিনিধি, আর তিন সারি ভরা আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ। কারও চোখে অবাক হওয়া নেই; সবাই যেন আগেই মেনে রেখেছিল, মেয়েটা প্রস্তুত করবে, ছেলেটা দেখাবে।
তানভীর জ্যাকেটের হাতা টেনে সোজা করে হাসল। “আসলে উপস্থাপনাও একটা দক্ষতা, স্যার। ও সেটআপ করেছে, আমি ফল দেখাই।” কথাটা সে মাইকে বলেনি, কিন্তু সামনের সারি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তার মা মাথা নেড়ে সন্তুষ্ট মুখে বসলেন। আরিব, যে পাশের কলেজ দল থেকে এসেছে, আইলের ধারে দাঁড়িয়ে মেহরিনের দিকে একবার তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। এই হলে নীরবতাও পক্ষ নেয়।
মেহরিন ডেমো টেবিলের কিনারায় দাঁড়াল। কাচের বক্সে ধানগাছের শিকড়ের মডেল, আর্দ্রতা সেন্সর, ক্ষুদ্র পাম্প, আর উপরে লাগানো লাইভ মনিটর—মাটির আর্দ্রতা বদলালে পুষ্টি-দ্রবণ কীভাবে নামবে, সেটার রিয়েল-টাইম সাড়া দেখানোর কথা। তানভীর হাত বাড়িয়ে প্রধান সুইচ তুলতেই মেহরিন দেখল, ডান পাশের ফিড টিউবটা সে উল্টো জয়েন্টে ঠেসে বসিয়েছে। পাম্প টান নিলেই বাতাস ঢুকবে, চাপ উঠবে না।
সে এক পা এগিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “টিউবটা উল্টো। কালো ক্ল্যাম্পের নিচের লাইনে দাও। না হলে প্রাইম নেবে না।”
তানভীর তাকালই না। “ধন্যবাদ। তুমি প্লিজ পেছনে যাও।”
“এখনই ঠিক করো,” মেহরিন আরেকবার বলল। এইবার বিচারক টেবিলের সবচেয়ে বয়স্ক স্যার চোখ তুলে দেখলেন। এক সেকেন্ড। তারপর আবার স্কোর শিটে চোখ নামালেন।
তানভীর ইচ্ছে করেই মনিটরের দিকে হাত নাড়ল, দর্শকদের বোঝাতে লাগল কীভাবে “স্মার্ট কৃষি” ছোট চাষির ভবিষ্যৎ বদলে দেবে। শব্দগুলো মসৃণ, গলাটা অভ্যস্ত। মেহরিন স্থির দাঁড়িয়ে থাকল। তার বুড়ো আঙুলে পুরোনো কালির দাগ; গত তিন রাত নকশা বদলাতে বদলাতে কলম ভেঙেছে। সে আর কিছু বলল না।
পাম্প চালু হতেই প্রথমে একটা শুকনো টু শব্দ, তারপর কাঁপুনি। টিউবের ভেতর পানি ওঠার বদলে ফেনা উঠল। মনিটরের নীল রেখা সোজা না গিয়ে ঝাঁকুনি খেয়ে নামতে লাগল। তানভীর দ্রুত বোতাম চাপল, যেন যন্ত্রটাই দোষী। সামনের সারি থেকে তার মা বললেন, “আস্তে করো, তারে।” ঘোষক স্যার মাইকের কাছে ঝুঁকে হেসে বললেন, “ছোটখাটো ব্যাপার, লাইভ ডেমোতে হতেই পারে।”
মেহরিন দেখল, পাম্পের মাথার কাছে স্বচ্ছ চেম্বারে বুদবুদ জমে চওড়া হয়েছে। এক মুহূর্ত পর চাপ উল্টো খেয়ে ফিড টিউব ছিটকে বেরোল, পাতলা পুষ্টি-দ্রবণ তানভীরের সাদা পাঞ্জাবির বুক বেয়ে নিচে পড়ল। হলঘরের মেঝেতে ছপাৎ করে ছড়িয়ে গেল তরল। তানভীর দুই হাতে টিউব ধরতে গিয়ে উল্টো সেন্সর তার খুলে ফেলল। মনিটর কালো। তার গলাটা প্রথমবার আটকাল।
আইল লেনের পাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা আগে সরে গেল। কারও স্যান্ডেলের নিচে ভেজা শব্দ হল। ঘোষক স্যার তাড়াহুড়ো করে বললেন, “ঠিক আছে, এই রাউন্ডটা বাদ—পরের টিম—”
“না,” মেহরিন বলল।
একটা শব্দ। মাইক ছাড়া। তবু হলের মাঝখান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল। তানভীর এখনও টিউব হাতে, কিন্তু আর কমান্ডে নেই। সে মেহরিনের দিকে ফিরল, মুখে রাগের চেয়ে বেশি অবিশ্বাস। “এখন? সিস্টেম তো নষ্ট।”
মেহরিন ইতিমধ্যে টেবিলের কাছে। “নষ্ট না। ভুল লাইনে ছিল।” সে তানভীরের হাত থেকে ভেজা টিউবটা নিল, সোজা ক্ল্যাম্প খুলল, আঙুলের এক মোচড়ে জয়েন্ট বদলাল। পাম্পের স্বচ্ছ মাথা তুলে দুইবার হাতে প্রাইম করল। তার ভেজা কনুইয়ে আলো পড়ছে। বিচারকদের একজন উঠে দাঁড়ালেন, যেন কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। ঘোষক স্যার বললেন, “রিসেটের সময়—”
“রিসেট লাগবে না,” মেহরিন তাকালও না। “সিস্টেম লাইভ আছে।”
তানভীর কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল, কারণ মেহরিন এক ঝটকায় আলগা সেন্সর তার ফিরিয়ে বসিয়ে দিল। মনিটরে কালো পর্দা কেঁপে উঠে আবার সংখ্যা দেখাল। সে বাম হাতে শিকড়-মডেলের মাটিতে আঙুল ঢুকিয়ে আর্দ্রতার রিডিং নামাল, ডান হাতে কন্ট্রোল নব ধীরে ঘুরিয়ে দিল। পাম্প এবার গুড়গুড় না করে সমান গলায় চলল। স্বচ্ছ টিউব বেয়ে তরল উঠে কালো ক্ল্যাম্প পেরিয়ে ঠিক লাইনে নামল। মনিটরের নীল রেখা কাঁপতে কাঁপতে স্থির হল, তারপর মসৃণ বক্ররেখায় উঠল।
আইলের ধারে দাঁড়ানো লোকেরা আগে চুপ করল। রাশেদা খালার মুখ খোলা, কিন্তু কথা নেই। পাশের খালাম্মা যে একটু আগেও ফিসফিস করছিলেন, তিনি শাড়ির ভাঁজে আঙুল গুঁজে দাঁড়িয়ে আছেন। আরিব এক পা এগিয়ে এসে ভেজা মেঝের উপর তার জুতো থামাল, যেন সীমা পার হতে সাহস লাগছে। মেহরিন কারও দিকে তাকাল না; সে এবার স্যালিনিটি মডিউলের ছোট ঢাকনাটা খুলে একফোঁটা দ্রবণ ফেলল, স্ক্রিনে দ্বিতীয় রেখা ওঠার আগেই বলল, “এখন যদি শিকড়ে লবণচাপ বাড়ে, পাম্প গতি কমাবে। কারণ কম আর্দ্রতায় বেশি পুষ্টি দিলে পোড়া ধরে।”
এটা বক্তব্য নয়, কাজের মধ্যে কথা। কথা শেষ হওয়ার আগেই মনিটরে কমলা সতর্কচিহ্ন জ্বলে উঠল, তারপর নিয়ন্ত্রণ গ্রাফ নিজে থেকে নিচে নামল। বিচারক টেবিলের স্পন্সর প্রতিনিধি নিজের স্কোর শিট টেনে সামনে নিলেন। বয়স্ক স্যার এবার কলমের ডগা চেপে লিখতে শুরু করলেন। তানভীর ভিজে পাঞ্জাবি টেনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু কেউ আর তাকে কিছু জিজ্ঞেস করছে না।
ঘোষক স্যার মরিয়া হয়ে বললেন, “প্রেজেন্টেশন টাইম—সংক্ষেপে বলো।”
মেহরিন তবু চোখ না তুলেই পরের ধাপ করল। “মডেল ছোট, কাজ মাঠের জন্য।” সে টেবিলের ডান দিকের ক্ষুদ্র পানির ট্যাংক আলগা করে উঁচুতে ধরল, যাতে সবাই দেখতে পায় পানির স্তর নামছে আর পাম্পের চাপ স্থির। “যদি বিদ্যুৎ ওঠানামা করে, ব্যাটারি ব্যাকআপে পাঁচ মিনিট চালাবে। পাঁচ মিনিটে সেচ বন্ধ হবে, শিকড় ডুববে না।” সে ব্যাটারি সুইচ অফ-অন করল। মনিটরের আলো একবার ম্লান হয়ে আবার উঠে দাঁড়াল; গ্রাফ ভাঙল না।
এইবার মাঝখানের সারিগুলোও নড়ল। মানুষ কাঁধ ঘুরিয়ে দেখছে না; সোজা সামনে তাকিয়ে আছে। যে আত্মীয়স্বজনেরা একটু আগেও তানভীরের গলায় মুগ্ধ ছিল, তারা এখন মেহরিনের হাতে তাকিয়ে। তানভীর টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও টেবিলের বাইরে চলে গেছে। তার মা দু’বার পানির বোতল এগিয়ে দিতে গিয়ে হাত নামিয়ে নিলেন। কমান্ড হারালে লোকজন কত দ্রুত দূরত্ব মেপে ফেলে, সেটা হলঘরের বাতাসেই বোঝা যায়।
মেহরিন শেষ পরীক্ষাটা দিল সবচেয়ে ঝুঁকির। সে সেন্সর রডটা পুরো খুলে নিয়ে বাতাসে ধরল। রিডিং মুহূর্তে নেমে গেল। তারপর শিকড়-মডেলের ঠিক গায়ে রড বসিয়ে বলল, “এখন লাইভ রিপন্স।” মনিটরের সংখ্যা পাল্টাল—১৮, ২২, ৩১—তারপর সবুজ ব্যান্ডে এসে থামল। পাম্পের শব্দ নিজে থেকে কমে এল। সঙ্গে সঙ্গে বিচারক টেবিলের পাশে লাগানো প্রিন্ট ইউনিট ঘড়ঘড় করে উঠল।
ঘোষক স্যার এবার আর কিছু বললেন না। কাগজ বেরোনোর শুকনো শব্দটা পরিষ্কার শোনা গেল। এক টুকরো ফলাফল কার্ড বেরিয়ে এল, সাদা কাগজে নীল শিরোনাম: লাইভ স্কোর। নিচে বিভাগগুলো—সেটআপ স্থিরতা, ত্রুটি-উদ্ধার, লাইভ সাড়া, মাঠ-প্রযোজ্যতা। একে একে সংখ্যা ছাপা হচ্ছে। ৯.৪। ৯.৮। ৯.৬। ৯.৭। গড় স্কোর সবার সামনে উঠতেই বয়স্ক স্যার নিজে উঠে কার্ডটা নিলেন, চোখ বুলিয়ে থামলেন, তারপর হাত বাড়ালেন মেহরিনের দিকে, তানভীরের দিকে নয়।
তানভীর সেই মুহূর্তে শেষ চেষ্টা করল। “স্যার, এটা তো আমার স্লট—ও শুধু—”
বাকিটা বেরোল না। কারণ বয়স্ক স্যার কার্ডটা ধরে স্পষ্ট গলায় বললেন, “যিনি ব্যর্থ লাইভ ডেমো উদ্ধার করে সম্পূর্ণ রান শেষ করেছেন, ফল তাঁর।” তারপর তিনি কার্ডের নিচের নামঘরে কলম ছুঁইয়ে পুরোনো মুদ্রিত নামের উপর নয়, খালি লাইনে লিখলেন: মেহরিন আক্তার।
মেহরিন কার্ডটা হাতে নিল। কাগজের কিনারায় প্রিন্টারের তাপ এখনও গরম। তার টোট ব্যাগের ভেতর আধভাঁজ করা রসিদটা আবার কচকচ শব্দ করল, যেন ভেতরে আটকে থাকা সব হিসাব একবার নড়ে উঠেছে। আইল লেনের ধারে আরিব সরে দাঁড়াল, পথ খুলে দিল। কেউ তাকে ডাকল না, থামাল না।
ফলাফল দেয়ালের পাশে পৌঁছে সে নিজের কার্ডটা খালি স্লটে গুঁজে দিল। কার্ডের নিচে ছোট ক্লিপে আটকে গেল কাগজ। ওপরে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে তার নম্বরগুলো উজ্জ্বল হয়ে স্থির রইল—৯.৪, ৯.৮, ৯.৬, ৯.৭—আর মেহরিন দুই আঙুলে কার্ডের কোণটা একবার সোজা করে দিল।