যে মঞ্চ সাজাল, সেই মঞ্চেই ডুবল
“ওইখানে না,” ডা. রায়হান হাত বাড়িয়ে মেহরীনের বুকে ধাক্কা না দিয়েও ধাক্কার মতো থামিয়ে দিল, “কিটটা টেবিলে রাখো, তারপর সাইডে দাঁড়াও। লাইভ স্লটে জটলা চাই না।”
মেহরীনের হাতের কালো যন্ত্রবাক্সের ধাতব কোণটা তার কবজিতে ঠেকছিল। পাতলা হয়ে যাওয়া ল্যানিয়ার্ডে ঝোলানো পরিচয়পত্র বুকে উলটে ছিল; বারবার পরার ঘষায় নীল ফিতা সাদা হয়ে এসেছে। যন্ত্রবাক্সের ওপর আঙুলের চাপে চিটচিটে হয়ে থাকা আধভাঁজ রসিদ—সকালের সেন্সর বদলের টাকা—এখনও আটকে। সে বাক্সটা নামাতে গিয়েও পুরো নামাল না। কারণ এই বাক্সটা সে রাত তিনটা পর্যন্ত খুলে বন্ধ করেছে, ক্যালিব্রেশন করেছে, আর এখন স্টেজের ধারঘেঁষা ডায়াগনসিস বেতে দাঁড়িয়েও তাকে এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে যেন সে কেবল বহনকারী।
পর্দার ওপাশে আলো জ্বলে উঠছে, ঘোষকের গলা ভেসে আসছে। এই মেলার কৃষি-স্বাস্থ্য প্রযুক্তি অংশে আজকের প্রধান আকর্ষণ এই ডেমো—লাইভ ডায়াগনস্টিক ইউনিট, স্পনসর, প্যানেল, সাংবাদিক, আর ভিআইপি সারিতে আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা মুখ। রায়হান সাদা কোটের কলার টেনে সোজা করল, তারপর মেহরীনের হাত থেকে যন্ত্রবাক্সের হাতলটা নিজে নিয়ে নিল—যেন মালিকানা এক হাতল সরানোর মধ্যেই বদলে যায়।
“সংযোগ লাইন আগে আমি দেখি,” মেহরীন নিচু গলায় বলল।
“তুমি দেখেছ তো,” রায়হান ঠাণ্ডা হাসল, “এবার আমি দেখাব।”
প্রথম চিড়টা তখনই দেখা গেল। যন্ত্রবাক্স তুলতে গিয়ে সে হাতল উলটো দিক থেকে ধরল, লুকানো পাশের লকটায় নখ ঠুকে থামল এক সেকেন্ড। মেহরীন কিছু বলল না। তার চুপ করে থাকা দেখল পাশের ইভেন্ট সমন্বয়ক নাবিল; তার ভুরু কুঁচকে আবার সোজা হল। এতেই লাভ—কেউ একজন অন্তত বুঝল, বাক্সটা যে যার হাতে মানায়, তা সব হাতে একরকম বসে না।
ব্যাকস্টেজ ঢোকার সরু পথের মুখে খালাম্মা দাঁড়িয়ে। আজ তিনি স্পনসর বোর্ডের পক্ষের অতিথি, গলায় সুগন্ধি, চোখে সেই অবধারিত পরখ করা দৃষ্টি। গত ঈদের দিন যে ডাইনিং টেবিলে বসে মেহরীনকে বলেছিলেন, “টেকনিক্যাল মেয়ে ভালো, কিন্তু মুখ দেখানোর জায়গা আলাদা,” সেই সুরটাই আজও আছে। তিনি রায়হানকে দেখে হাসলেন, “বাবা, সামনের সারিতে তোমার জন্য সিট রাখা। মেহরীন, তুমি তো ওর টিমেরই—পেছনে থাকো, ক্যামেরায় বেশি ভিড় কোরো না।”
একটা চেয়ারের ট্যাগ খুলে সামনের দিক থেকে সরিয়ে নেওয়া হল। সেটা মেহরীনের জন্য ছিল না, কিন্তু ছিল তার কাজের জায়গার চিহ্ন। নাবিল কাকে যেন ইশারা করতেই একজন স্বেচ্ছাসেবক এসে ডায়াগনসিস বেতের পাশ থেকে দ্বিতীয় স্টুলটা সরিয়ে নিল। ছোট্ট, খালি জায়গাটা যেন গিলে ফেলল তার নাম। শাওন, যন্ত্র কোম্পানির জুনিয়র প্রতিনিধি, দরজার ফ্রেমে থেমে তাকিয়ে রইল; হাতে তার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের বাক্স।
মেহরীনের গলা শক্ত হয়ে গেল। “স্টেজের আগে বেসলাইন রান না দিলে—”
“তুমি উত্তেজিত হচ্ছ,” রায়হান এবার এমন স্বরে বলল, যাতে আশেপাশের সবাই শুনতে পায়। “সাপোর্টে থাকলে সাপোর্টের মতো থাকো। সামনে বড়রা আছেন।”
“বড়রা” শব্দটা ছুরি হয়ে এসে গায়ে লাগল। খালাম্মা মুখ ঘুরিয়ে অন্য অতিথির সঙ্গে হাসতে শুরু করেছেন, কিন্তু কান এখানেই। কাছের দুজন সিনিয়র চিকিৎসক, প্যানেলের বিচারক, ইতিমধ্যে এই দৃশ্য দেখেছেন—মেয়েটি বাক্স বয়ে দিল, ডাক্তার মঞ্চ নিলেন। এতটুকুই তাদের পড়ার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা।
ঘোষক নাম ডাকল। রায়হান স্টেজের ধার দিয়ে ডায়াগনসিস বেতে ঢুকল, কোটের পকেট থেকে গ্লাভস বের করল। মেহরীনকে সে চোখের কোণেও রাখল না। কাচঘেরা অর্ধেক খোলা বে-টার ভেতরে ডেমো টেবিল, সেন্সর আর্ম, রোগী-সিমুলেশন মডিউল, আর সামনে বড় স্ক্রিনে ডেটা উঠবে। লাইভ ক্যামেরা ইতিমধ্যে ঘুরে গেছে সেখানে।
মেহরীন বেয়াড়ার মতো ঢুকে যায়নি। সে পাশের দরজার চৌকাঠে থেমে, তার নিজের তালুতে ঘাম চেপে, কেবল সংযোগ পোর্টের নীল আলোটা দেখছিল। রায়হান যেভাবে সেন্সর লাইন বসাল, তাতেই বোঝা গেল সে মুখস্থ ভঙ্গি জানে, ভেতরের অভ্যাস জানে না। তবু সে শুরু করে দিল। স্ক্রিনে রোগী-প্রোফাইল উঠল, তারপর কাঁচা রিডিং।
প্রথম বিশ সেকেন্ড সব ঠিকঠাক দেখাল। রায়হান কথা বলছে—“এই ইউনিট তাৎক্ষণিক বিপদচিহ্ন শনাক্ত করে”—আর সেই সময়ই স্ক্রিনের ডান পাশে সতর্কবার্তা উঠল: সিগন্যাল ড্রিফট। সে একবার তাকাল, তারপর আঙুল তুলে অন্য গ্রাফ দেখাতে শুরু করল, যেন লাল চিহ্নটা নেই। কিন্তু ড্রিফট বাড়ল। সংখ্যাগুলো ভাঙা দাঁতের মতো কাঁপতে লাগল।
প্যানেলের একজন সামনে ঝুঁকলেন। নাবিলের মুখ সাদা। খালাম্মা এবার হাসছেন না।
রায়হান সেটিংস মেনু খুলল। ভুল জায়গায়। সে ফিল্টার বদলাতে গিয়ে কাঁচা ইনপুট চ্যানেল বন্ধ করে দিল। স্ক্রিনে এক মুহূর্তে ফ্ল্যাট লাইন। তার ডান হাতটা বাতাসে থেমে রইল—ঠিক ওই এক সেকেন্ডে পুরো ঘর তাকে আর “দাপুটে” হিসেবে পড়তে পারল না। হাত চেনে না, তবু হাত দেখাতে এসেছে—এটাই প্রকাশ পেল।
মেহরীন আর কাউকে দেখে না। সে এগিয়ে গিয়ে যন্ত্রবাক্সের লুকানো পাশের ক্লিপ খুলল, ভেতর থেকে সরু ক্যালিব্রেশন কার্ড আর রিজার্ভ সেন্সর হেড বের করল। রায়হানের কনুই পাশ কাটিয়ে, কোনো ঘোষণা না দিয়ে, সে সোজা সেন্সর আর্মের গোড়ায় আঙুল ঢুকিয়ে মাইক্রো-লক টিপল। ক্ষীণ টিক শব্দ হল। তারপর সে ফ্ল্যাট হয়ে যাওয়া চ্যানেল আবার চালু না করে আগে রেফারেন্স পোর্টে কার্ড বসাল। স্ক্রিনে একবার কালো ঝিলিক, তারপর উপরে লেখা ভেসে উঠল: মালিক-স্তরের যাচাই প্রয়োজন।
রায়হান থমকে গেল। সে স্ক্রিন পড়তে পেরেছে, কিন্তু করতে পারেনি। কারণ এই ধাপে শুধু যে মানুষ কোর সেটআপে মালিক-নিবন্ধিত, তার ইনপুট ছাড়া সিস্টেম আগাবে না। এতদিন অন্যের তৈরি প্রিসেট চালিয়ে যে অভিনয় করা গেছে, এখানকার লাইভ ত্রুটি তা মানল না।
“পাসকোড?” প্যানেল থেকে একজন জিজ্ঞেস করলেন।
রায়হান ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “একটু—একটু রিস্টার্ট দিলে—”
মেহরীন তখনই যন্ত্রবাক্সটা নিজের দিকে টেনে আনল। এ টানা কারও অনুমতি চেয়ে নয়; যেভাবে কেউ নিজের হিসাবখাতা নিজের সামনে নেয়। বাক্সের ভেতর থেকে মালিক-ডঙ্গল তুলে সে কনসোলের বাম পোর্টে বসাল। নাবিল হাঁ করে তাকিয়ে আছে। শাওন দরজার গা থেকে সরে এসে এক পা ভেতরে, কিন্তু এখনও কথা বলে না।
রায়হান হাত বাড়াল, খুব নিচু গলায়, “আমাকে দাও। আমি চালাই।”
মেহরীন তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “আপনি সরুন।”
এই দুটো শব্দের পরেই বদলটা চোখে দেখা গেল। রায়হানের কাঁধ আগে যেখান থেকে পুরো বে-টা দখল করেছিল, সেখান থেকে সে অর্ধেক পা পিছিয়ে গেল—ইচ্ছে করে নয়, জায়গা ছাড়তে বাধ্য হয়ে। নাবিল তৎক্ষণাৎ সামনে থাকা নামফলক ঘুরিয়ে দিল; “ডা. রায়হান — লাইভ অপারেটর” লেখা অংশটা ঘুরে পেছনে গেল, খালি সাদা পিঠ দেখা রইল। কেউ ঘোষণা দিল না, কিন্তু কর্তৃত্বের চেয়ার বদলানোর কাজটা হয়ে গেল।
টাইমার চলছে। ঘোষকের কণ্ঠ আটকে গেছে। মেহরীন গ্লাভস পরল না; গ্লাভস পরার সময় নেই, আর তার আঙুলের স্মৃতি মোটা ল্যাটেক্সের চেয়ে দ্রুত। সে কনসোলে মালিক-স্তরের প্রবেশ খুলে বেসলাইন রিডিং রিলোড করল, রিজার্ভ সেন্সর হেড বসাল, ড্রিফট ম্যাপ খুলে কাঁচা সিগন্যালের ওপর পাতলা সবুজ ট্রেস বসাল। তার চোখ স্ক্রিনে, হাত যন্ত্রে; ব্যাখ্যার জন্য এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না।
স্ক্রিনে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কোথায় সমস্যা ছিল—প্রধান বায়োসেন্সর হেড বসানো হয়েছিল আধা মিলিমিটার উঁচুতে, ফলে চাপ-পড়ার মান বিকৃত হচ্ছিল। সে আর্ম নিচে নামিয়ে লক করল। ডানদিকের গ্রাফ স্থির হল, তারপর কাঁচা তরঙ্গরেখা নিয়মিত উঠানামা করতে লাগল। নিচে অ্যালগরিদম আবার বিশ্লেষণ শুরু করল।
একজন বিচারক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ডেমো চলুক। যিনি সিস্টেমের মালিক-অপারেটর, তিনিই চালান।”
শব্দটা—মালিক—বে-র কাচে ফিরে এসে লাগল। খালাম্মার মুখে এবার কোনো সামাজিক হাসি নেই; তিনি সামনের সারি থেকে গলা লম্বা করে তাকিয়ে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা কয়েকজন একে অন্যের দিকে না তাকিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে—যেন ভুল মানুষকে এতক্ষণ মঞ্চে দেখে ফেলেছে।
রায়হান শেষ চেষ্টা করল। “এই ইউনিটের ক্লিনিক্যাল ব্যাখ্যা আমার—”
কিন্তু তার কণ্ঠ স্ক্রিনের নতুন সতর্কবার্তায় ডুবে গেল। মেহরীন সিমুলেশন মডিউলের দ্বিতীয় ধাপ চালু করেছে। রোগীর কৃত্রিম তথ্যপ্রবাহে এখন দুটো কাছাকাছি রোগচিহ্নের মধ্যে পার্থক্য বের করতে হবে; এখানেই গত মাসে এক পুরোনো ত্রুটির মামলা উঠেছিল, যেটা নিয়ে পুরো কোম্পানির সুনাম টালমাটাল। রায়হান এই অংশ নিয়ে বহু সেমিনারে কথা বলেছে। আজ সে কনসোলের সামনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু কোন উইন্ডো খুলতে হবে জানে না।
মেহরীন জানে। কারণ সেই পুরোনো কেস সে-ই রাত জেগে খুলেছিল, লগ পড়ে, ভুল সেন্সর-ওজন ঠিক করে। তখন তার নাম রিপোর্টে যায়নি। আজ স্ক্রিন তাকে চুরি করতে দিল না।
সে পুরোনো কেস ফাইলের লুকানো রেফারেন্স টেনে এনে লাইভ ডেটার পাশে বসাল। দুটো রেখা প্রথমে প্রায় এক। তারপর সে একমাত্র প্রয়োজনীয় কাজটা করল—সেকেন্ডারি রেসপন্স টেস্ট চালু করতে মালিক-স্তরের অনুমোদন দিল, যা প্রিসেট মোডে থাকে না। স্ক্রিনে নতুন রিডিং উঠল, আর সঙ্গে সঙ্গে বামদিকের সম্ভাব্য রোগনামটি ধূসর হয়ে গেল। ডানদিকে লাল বর্ডারে চূড়ান্ত ফল স্থির হলো: ভুল পাঠ নয়, সেন্সর-ওজনজনিত ভ্রান্ত শ্রেণিবিন্যাস; সংশোধিত নির্ণয় সম্পন্ন।
এটা কেবল ফল না। এটা রায়হানের গলায় বাঁধা বহুদিনের জবরদস্তি সুনাম কেটে ফেলার মতো দৃশ্যমান আঘাত। সে কিছু বলতে গিয়ে থামল, কারণ যা বলবে, স্ক্রিন তার বিপরীতে লেখা। প্যানেলের একজন তার দিকে হাত তুলে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিলেন—প্রথমবার। আরেকজন নাবিলকে বললেন, “অপারেটর লগে নাম সংশোধন করুন। এখনই।”
নাবিল ট্যাবলেটে নাম বদলাতে লাগল। শাওন দরজার পাশে ঠান্ডা খাবারের বাক্সটা নামিয়ে, ভাঁজ পড়া রসিদটা তুলে মেহরীনের যন্ত্রবাক্সের ওপর চেপে রাখল যাতে উড়ে না যায়। কেউ আর তাকে সাপোর্ট-কর্মী বলে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারল না; বে-র ভেতরে একমাত্র স্থির মানুষটি সে, আর বাকি সবাই তার স্ক্রিন পড়ছে।
রায়হান এবার গলা নামিয়ে বলল, “মেহরীন, লাইভটা তুমি ঠিক করে দিয়েছ, এখন আমাকে—”
সে শেষ করতে পারল না। মেহরীন ইতিমধ্যে চূড়ান্ত ধাপ খুলেছে—রোগী সিমুলেশন সমাপ্তি, নির্ণয় নথিভুক্তি, সংশোধিত প্রোফাইল সেভ। এই ধাপ না হলে ডেমো অসম্পূর্ণ, আর এই ধাপে মালিক-পক্ষের স্বাক্ষর-ইনপুট দরকার। পুরো হল, কাচের বাইরে ভিড়, সামনের সারির খালাম্মা, বিচারক, কোম্পানির লোক, সবাই দেখছে। ফিরিয়ে দিলে রায়হান আবার দখল নিত, মুখ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা পেত। মেহরীন তা দিল না।
সে কনসোল নিজের দিকে আরেক ইঞ্চি টেনে আনল। বাঁহাত দিয়ে স্ক্রিনের নিচের সাইন-ফিল্ড খুলল, ডান হাতের তর্জনী সেন্সর-প্যাডে রাখল। তার নাম বাংলা অক্ষরে উঠে এল: মেহরীন আখতার। নিচে মালিক-অপারেটর অনুমোদন সক্রিয়।
ডায়াগনসিস বেতে বড় স্ক্রিনে সংশোধিত নির্ণয়ের লাইন স্থির হয়ে গেল। তার হাতের নিচে শেষ ঘরটায় সে লিখল—“স্বীকৃত”—তারপর এন্টার ছুঁল। স্ক্রিনের ডান কোণে কার্সর একবার টিমটিম করে থেমে রইল।