যাকে সরাবে ভেবেছিল, নাম উঠল তার
“ওই বেঞ্চে বসে থাকো, সামনে যেও না,” ফারিহা ভাবি হাত বাড়িয়ে মৌর কাঁধের সামনে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল, “রোগীর আপনজন আগে দাঁড়াবে। সঙ্গে আসা মানুষ সবাই জানে নিজের জায়গা।”
ঢাকার বেসরকারি ক্লিনিকটার সরু করিডরে সাদা আলো ঝাঁ ঝাঁ করছিল, পাখার ঘূর্ণি আর যন্ত্রের ক্ষীণ গুঞ্জন মিলে একধরনের ধাতব গরম তৈরি করেছে। বেঞ্চের পাশে কাগজের কাপের চা ঠান্ডা হয়ে ওপরটায় আস্তর ধরেছে; নিচে গোল দাগ পড়ে আছে মোজাইকে। মৌ উঠে দাঁড়াল না। সে শুধু নিজের শাড়ির আঁচল হাঁটুর ওপর টেনে গুছিয়ে নিল। ফারিহা ভাবি তখনই পাশের খালাকে জোরে বলল, যেন মৌকে নয়, ঘরকেই শোনাচ্ছে, “আজকাল একটু ফোন ধরাধরি করলেই কেউ কেউ ভাবে, ঘরের বউ হয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা আছে মানেই অধিকার না।”
শেষ কথাটায় কয়েকটা চোখ একসাথে ফিরল। রাশেদের খালা ঠোঁট চেপে বসলেন, আরেকজন রোগীর স্বামী কাগজ ভাঁজ করতে করতে আড়চোখে তাকাল। মৌর হাতে নিচু করে ধরা ফোনের পর্দা একবার জ্বলে নিভে গেল; সে দেখল, নামটা আবারও আসেনি। তিন রাত ধরে এই মানুষটার জন্য হাসপাতাল, টেস্ট, রক্তের ব্যবস্থা, ডাক্তারের পেছনে দৌড়—সব করেছে সে। তবু বেঞ্চে তার জন্য আলাদা পরিচয় রাখা হয়েছে: সঙ্গে আসা মানুষ।
রেজিস্টার-টেবিলের জানালার ওপাশ থেকে কর্মী ছেলেটা মাথা তুলে বলল, “রাশেদ সাহেবের সঙ্গে যে—” তার চোখ মৌর দিকে পড়েছিল, এক মুহূর্তেই চিনতে পেরে। পরের মুহূর্তে ফারিহা ভাবি ঝট করে কাউন্টারের সামনে গিয়ে কাগজ বাড়িয়ে দিল, “আমি ভাবি। যা লাগবে আমাকে বলেন। ও বসে আছে।”
ছেলেটা থেমে গেল। তারপর গলাটা ছোট করে বলল, “জি, আপনি এই ফর্মটা পূরণ করেন।” কিন্তু থেমে যাওয়ার সেই আধসেকেন্ডটা করিডরের ভেতর ঝুলে রইল। পাশের বেঞ্চে বসা বয়স্ক লোকটা মৌর দিকে আরেকবার তাকাল; তার মেয়েটা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “আপুই কি কাল রাতেও ছিলেন?” ফারিহা ভাবি এমনভাবে ঘুরে দাঁড়াল যেন প্রশ্নটা বাতাসে কেটে ফেলবে। মৌ শুধু বলল, “ছিলাম।”
ফারিহা ভাবি খচখচে গলায় বলল, “থাকলেই তো আর সিদ্ধান্ত নেয় না সবাই। ক্লিনিকের নিয়ম আছে।” সে ফর্মে নাম লেখার সময় ইচ্ছে করেই জোরে জোরে পড়ছিল—রোগীর নাম, পিতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, পেশা। “কৃষি,” লিখে সে খালার দিকে তাকাল, “গ্রাম থেকে উঠে এসে মানুষটা কোথায় দাঁড়িয়েছে, তা সবাই জানে। এখন কেউ এসে পাশে দাঁড়ালেই কি হবে?”
মৌ এবার প্রথমবার মাথা তুলল। “আপনি পেশাটা ঠিকই লিখেছেন,” সে শান্ত স্বরে বলল, “কিন্তু যিনি ভর্তি করিয়েছেন, তাঁর নাম লেখেননি।”
কাউন্টারের ছেলেটা কালি-লেগে থাকা আঙুল থামিয়ে ফেলল। ফারিহা ভাবি হেসে উঠল, তির্যক, “ওমা! ভর্তি করিয়েছে মানে? টাকা জমা দিলেই কি অভিভাবক হয়ে যায়? এসব কাগজে রক্তের সম্পর্ক লাগে।”
এইবার আশেপাশের মানুষজন খোলাখুলি শুনছিল। মৌ চুপ করে বসে থাকল, যেন লড়াইটা কথার না। সে ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা ছোট খাম বের করল, আবার ঢুকিয়ে রাখল। খালার চোখ সেটা টের পেল। তিনি কেঁপে ওঠা গলায় বললেন, “ফারিহা, এত জোরে বলিস না। হাসপাতাল।”
“হাসপাতাল বলেই বলছি,” ফারিহা ভাবি থামল না, “এখানে কে ঢুকবে, কে কেবিনে থাকবে, কে সই করবে—এসব নিয়মমতো হবে। বাইরে থেকে এসে কেউ মাথায় উঠবে না।”
“কেবিনে এখন কারা ঢুকতে পারবে?” পাশের বেঞ্চ থেকে এক নারী জিজ্ঞেস করল। সে নিজের রোগীর রিপোর্ট বুকে চেপে ধরেছিল, চোখ কিন্তু ফারিহা ভাবির ওপর নয়, মৌর ওপর। প্রশ্নটা হাওয়ায় বাঁক নিয়ে গেল। কাউন্টারের ছেলেটা কাগজ উল্টে বলল, “একজন প্রধান যোগাযোগ ব্যক্তি লাগবে। যাঁর নম্বর ফাইলে আছে, তাঁর সইও লাগবে।”
“আমার নম্বর আছে,” ফারিহা ভাবি তাড়াতাড়ি বলল।
ছেলেটা অনিচ্ছায় বলল, “জি… আছে। তবে—” সে আবার মৌর দিকে তাকাল, এবার পুরো করিডর দেখল সেই তাকানো। “ভর্তির সময় যে নম্বর থেকে অগ্রিমের রশিদ আর অস্ত্রোপচারের সম্মতির স্ক্যান পাঠানো হয়েছিল, সেটা—”
ফারিহা ভাবি হঠাৎ গলা নামিয়ে ফেলল, “ওটা সাময়িক ছিল। গ্রামের বাড়ি থেকে সবাই তখন রওনা দিয়েছিল। এখন আমি আছি।”
“কিন্তু সই মেলাতে হবে,” ছেলেটা বলেই থেমে গেল, যেন বেশি বলে ফেলছে।
ঘরটার পড়া সেখানেই সামান্য নড়ল। যে নারী একটু আগে প্রশ্ন করেছিল, সে এবার সরাসরি মৌকে বলল, “আপা, স্ক্যানটা আপনার কাছে আছে?” আরেকজন পুরুষ নিজের ফাইল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেও সরল না; সে অপেক্ষা করছিল মৌ কী বলে। ফারিহা ভাবির সামনে থাকা জায়গাটা একই রইল, কিন্তু মুখগুলো আর তার দিকে ঝুঁকে নেই।
মৌ ফোনটা তুলে নিল। নিচু পর্দার আলো তার আঙুলের ভেতর লেগে ছিল এতক্ষণ। সে কাউকে দেখানোর জন্য না, শুধু নিজের চোখে দেখে বলল, “আছে।” তারপর কাউন্টারের দিকে না গিয়ে সেই প্রশ্ন করা নারীকে বলল, “আপনার যদি তাড়া থাকে, আপনি আগে যান।” নারী মাথা নাড়ল, “না, আপনি বলেন।”
ফারিহা ভাবি বুঝল, তার কণ্ঠের দাপট ফাঁক পাচ্ছে। সে খালার দিকে ঘুরে উঠল, “দেখছেন? প্রকাশ্যে নাটক করছে। ছেলে অসুস্থ, আর এখন কে কী পাঠিয়েছে সেটা নিয়ে মান-অভিমান!”
খালা এবার বেঞ্চ থেকে উঠে এলেন। তাঁর ওড়নার কোণা বারবার কাঁধ থেকে পিছলে যাচ্ছিল। “মৌ মা,” তিনি চাপা গলায় বললেন, কিন্তু এত কাছে এসে বললেন যে সবাই শুনতে পেল, “তুই রাগ করিস না। কাগজে ফারিহার নাম থাক, তুই ভিতরে থাকিস। মানুষ কী বলবে? বিয়ে হয়নি, আবার নাম-টাম নিয়ে দাঁড়াবি? বাইরে যা লাগে আমরা বলে নেব।”
এটাই ছিল অর্ধেক দরজা খোলা, অর্ধেক বন্ধ। ভিতরে থাকার অনুমতি, বাইরে অস্বীকার। ফারিহা ভাবি সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ নিল, “হ্যাঁ, এই তো ঠিক কথা। ওকে কেবিনে থাকতে দিচ্ছি, তাতেই অনেক। নামের জায়গা আত্মীয়ের। বাহিরে সম্মান বলতে একটা কথা আছে।”
মৌ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণ বসে থাকার কারণে শাড়ির ভাঁজে দাগ পড়ে গেছে। সে খালার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি আমাকে ভিতরে থাকতে দিচ্ছেন না, খালা। আপনি আমাকে লুকিয়ে রাখতে বলছেন।”
খালার মুখ শুকিয়ে গেল। ফারিহা ভাবি দাঁত চেপে বলল, “শব্দ বাছো। সবাই আছে।”
“সবাই আছে বলেই বলছি।” মৌর গলা উঁচু নয়, কিন্তু করিডরের গুঞ্জনের ভেতর সোজা কেটে গেল। “তিন রাত আমি ছিলাম। প্রথম রক্তের টাকা আমি দিয়েছি। ভর্তি ফর্মে প্রথম সই আমার। কেবিনের বাড়তি চাবিটা”—সে ব্যাগ থেকে ছোট পিতলের চাবি বের করল—“আপনারা দুপুরে নিতে বলেছিলেন, ফেরত দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। এখন চাইলে এটা নিয়ে কেবিন চালান। কিন্তু আমার নাম মুছে দিয়ে না।”
চাবিটা তার তালুতে চকচক করল। ফারিহা ভাবি এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করতে চাইল, “এখানে দাঁড়িয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না। পরে কথা হবে। তোমার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করব।”
মৌ চাবিটা খালার হাতে দিল, ফারিহার নয়। “আলাদা ব্যবস্থা লাগবে না।”
কাউন্টারের ছেলেটা এবার নিজে থেকে ডাকল, “যাঁর সই আছে, তিনি আসেন।” শব্দটা শেষ হতেই ফারিহা ভাবি ঘুরে দাঁড়াল, “আমি—”
“সই মিলবে না,” ছেলেটা কাগজ তুলে দেখাল। “ভর্তির কাগজে ‘প্রধান যোগাযোগ’ হিসেবে মৌ সুলতানা। পরবর্তী নোটেও একই নাম। কেবিন শিফট হলে নতুন নাম বোর্ড লাগাতে হবে।”
“নাম বোর্ড?” ফারিহা ভাবির গলা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পেরেছে, বিষয়টা এখন আর শুধু ভিজিটর তালিকার না; দেয়ালে যা উঠবে, সেটাই সবাই পড়বে। “ওটা পরে হবে। আপাতত পুরোনোটা থাক।”
“পুরোনোটা থাকলে ভুল তথ্য থাকবে,” ছেলেটা বলল, এবার আর গলা নামায়নি। পেছনে সিস্টারের ট্রলি থেমে গেছে। দুইজন অপেক্ষমান লোক নিজেরা কথা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। “ওয়ার্ডে পাঠানোর আগে বোর্ড বদলাতে হবে।”
ফারিহা ভাবি তেড়ে উঠে বলল, “আমাদের পরিবারের ব্যাপার। আপনি বুঝবেন না। আমি বলছি, বোর্ডে আমার নাম দিন। ভাবি হিসেবে।”
মৌ এক পা এগিয়ে কাউন্টারের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণ সে বেঞ্চের মানুষ ছিল; এখন জানালার ধারে, আলোয়। “বোর্ডে সম্পর্কের অলংকার লিখবেন না,” সে স্পষ্ট করে বলল, “যে নাম ফাইলে প্রধান যোগাযোগ হিসেবে আছে, সেই নাম উঠবে। মৌ সুলতানা।”
খালার ঠোঁট কেঁপে উঠল, “মা, একটু থাম—”
মৌ থামল না। “আর রোগীর পাশে কেবিনে থাকার অনুমতি একই নামের অধীনে লিখবেন। কাগজটা দিন।”
কর্মী ছেলেটা তাড়াতাড়ি রেজিস্টার এগিয়ে দিল। ফারিহা ভাবি হাত বাড়িয়ে সেটা আটকে ধরতে চাইল, “এক মিনিট। এভাবে হবে না। রাশেদকে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
মৌ তার হাতের ওপর চোখ রেখে বলল, “রাশেদকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে কে সম্মতির সই করেছে, সেটা ফাইলে আছে। আপনি যদি এখনো মনে করেন আমি সঙ্গে আসা মানুষ, তাহলে ফাইল মিথ্যে। আর যদি ফাইল সত্যি হয়, সরে দাঁড়ান।”
এই প্রথম ফারিহা ভাবি কথার বদলে চারপাশে তাকাল সাহায্যের জন্য। কেউ এগিয়ে এল না। তার দামী স্যান্ডেলের ধাতব ফিতে কাঁপছিল; নখের রং-লাগা আঙুলে রেজিস্টারের কিনারা ধরে রেখেও জোর রাখতে পারছিল না। সেই নারী, যে আগে প্রশ্ন করেছিল, ধীরে সরে দাঁড়িয়ে মৌর জন্য জায়গা করে দিল। খালা চোখ নামিয়ে নিলেন। করিডরের সারি এখন জানালার দিকে নয়, মৌর কলম ধরার হাতের দিকে অপেক্ষা করছে।
মৌ কলম তুলল। “নতুন বোর্ডে লিখুন,” সে কর্মীকে বলল, “রোগী: রাশেদ করিম। প্রধান যোগাযোগ: মৌ সুলতানা।” তারপর নিজের নামের নিচে সই করল, টানটা একবারও কাঁপল না।
কর্মী ছেলেটা পুরোনো প্লাস্টিক-ঢাকা নামফলক খুলে আনতে গেল। ফারিহা ভাবি যেন শেষ সম্বল জড়ো করে বলল, “তুমি যা করছ, বাইরে মুখ দেখানো কঠিন হবে।”
মৌ রেজিস্টার বন্ধ করে তার দিকে তাকাল। “যে মুখ লুকিয়ে রাখতে হয়, সেটা আমার না।”
ছেলেটা ফিরে এল সাদা পাটাতন আর কালো অক্ষরের স্লট নিয়ে। কাউন্টারের পাশের নোটিশ দেওয়ালে সে নতুন কাগজ ঢোকাতে গিয়ে থেমে গেল, “বানান দেখে নেন।”
মৌ নিজে হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নিল। কাগজের কোণা শক্ত, নতুন। সে পুরোনো নাম-ঢাকা স্লট সরিয়ে নিজের কার্ডটা ঢুকিয়ে দিল। নোটিশ দেওয়ালের টিউবলাইটের নিচে অক্ষরগুলো সোজা হয়ে উঠল— রোগী: রাশেদ করিম প্রধান যোগাযোগ: মৌ সুলতানা
পেছনের লাইনটা পড়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। মৌ কার্ডের নিচের কোণটা একবার চাপ দিয়ে ঠিকঠাক বসিয়ে দিল, তারপর হাত সরিয়ে নিল।