Fast Fiction

গেট পাসটা হাতে যেতেই খেলা ঘুরল

কেবিনেটের তালায় চাবি ঢোকাতে গিয়েই মেহরীনের হাত থামিয়ে দিল রাশেদা ভাবি। “ওইটা নামাও। আজ লেন-তিনের ছাড় আমি দেব।”

ডিসপ্যাচ বেয়ের টিনের চালের নিচে তখন ভোরের গরমও দাঁত বের করে আছে। আলুর বস্তা, বেগুনের খাঁচা, ধনেপাতার ভেজা গন্ধ, ট্রলির চাকা, ট্রাকের রিভার্স হর্ন—সব একসঙ্গে চাপ দিচ্ছে। মেহরীনের গলায় পুরোনো পাসের ফিতে মচমচে হয়ে গেছে, ঘামে ভিজে বুকে লেগে আছে। রাতের শিফট শেষে হাতার কাছে কুঁচকে থাকা জামা দেখেই বোঝা যায়, সে বাসায় যায়নি। তবু কেবিনেটের সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, আর ভেতর থেকে প্যাকেট তুলে নিয়ে যাচ্ছে সোহেল। কারণ চাবিটা রাশেদা ভাবির মুঠোয়।

“গাড়ি আটকে আছে,” কামাল সুপারভাইজার গলা উঁচু করল, কিন্তু চোখ রাখল রাশেদার মুখে। “বীজ, কীটনাশক, ফিতাকাগজ—যা লাগে দেন। কৃষি লাইনের মাল দেরি হলে মিরপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ—সব উল্টে যাবে।”

রাশেদা ভাবি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, “উল্টে গেলে উল্টাক। যার ঘরের ভাত খাই, তার কথাই আগে শুনব। এই মেয়েটা আজ দৌড়াবে, হিসাব টেবিলে বসবে না।”

মেহরীন চাবির দিকে তাকাল না; তাকাল বোর্ডটার দিকে। রুট বরাদ্দের সাদা বোর্ড, যেখানে প্রতিদিন ভোরে কার কোন লেনে দাঁড়ানো, কোন ট্রাক আগে যাবে, কোন গুদাম থেকে কত স্টক ছাড়বে—সব লেখা হয়। গত ছয় মাস সে লিখেছে। আজ বোর্ডের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসানো হয়েছে রাশেদার ভাগ্নে আরমানকে। ছেলেটার হাতে এখনো কালি শুকায়নি, অথচ সে এমন ভঙ্গিতে মার্কার নাড়ছে, যেন জন্ম থেকেই ডিসপ্যাচ তার বাপের সম্পত্তি।

সোহেল নিচু গলায় বলল, “আপা, আপনি আগে খালাসিদের স্লিপ পৌঁছে দেন। বোর্ড আমরা দেখি।”

এই “আমরা” শব্দটাই আজকের আঘাত। মেহরীন স্লিপের গুচ্ছ নিল, কিন্তু একটাও পা বাড়াল না। খোলা হাতে ফোনটা নিচে ধরে রাখল; তালুর ভেতর স্ক্রিনের ফ্যাকাশে আলো জ্বলল, আবার নিবে গেল। ওদিকে রাশেদা ভাবি যেন সেটাই অপেক্ষা করছিল। “কারে দেখাইতেছ? আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা দিয়ে এখানে কাজ হয় না। ঘরের বড়দের অনুমতি লাগে।”

কয়েকজন খালাসি কান ঘুরিয়ে তাকাল। তারা জানে, রাশেদা ভাবি এই হাবের মালিক হাশেম সাহেবের বড় ছেলের বউ। আরও জানে, মেহরীন এই বাড়ির বাইরের মেয়ে—জানাশোনা আছে, কিন্তু নামের জোর নেই। এতদিন সে কাজ চালিয়েছে কারণ পুরোনো কাগজপত্র, কৃষি লাইনের পুরনো দেনা-পাওনা, গুদামের স্টক-মেল—সব তার মুখস্থ। আজ তাকে সবার সামনে দৌড়ের কাজ ধরিয়ে দেওয়া মানে শুধু অপমান নয়; রুট থেকে সরিয়ে দেওয়া।

আরমান চেয়ারে বসে বোর্ডে লিখল, “লেন-তিন: ফুলকপি, টমেটো, চালান আগে।” সঙ্গে সঙ্গে লেন-তিনের কৃষি ইনপুটের গাড়ি আটকে গেল, কারণ সেই লাইনের স্টক অন্য কেবিনেট থেকে নয়, এই লোহার আলমারি থেকেই ছাড়তে হয়। দুই ড্রাইভার একসঙ্গে চেঁচাল, “আমাদের পারমিট কোথায়?” কেউ জবাব দিল না। রাশেদা ভাবি ঠান্ডা গলায় বলল, “যেটা আগে টাকা আনে, সেটাই আগে যাবে। গ্রাম থেকে আসা ছোট চালান পরে।”

মেহরীনের বুকের ভেতর একবার শক্ত হয়ে উঠল। এই লাইনটাই তার ছিল—ছোট চালান, দ্রুত ছাড়, জেলার ডিলারদের রাত-সকালের ওঠানামা। এগুলো দেরি হলে বিকেলে ফোন পড়ে, রাতে গালি পড়ে, আর মাস শেষে কাটতি বসে তার নামেই। সে স্লিপের গুচ্ছ কামালের টেবিলে রেখে বলল, “আমি দৌড়াব না। কৃষি লাইনের স্টক মিলানো আমার সই ছাড়া গত মাসেও বন্ধ ছিল।”

রাশেদা ভাবি এবার সোজা সামনে এসে দাঁড়াল। “তোর সই? তুই কে? বউ হয়ে ঘরের ভেতর বসতে পারিস নাই, এখন লেনের মাথা হতে আসছিস?”

কথাটা ইচ্ছে করেই উঁচু স্বরে। পাশের লিফটের স্টিলের দরজায় পুরোনো মুছার দাগ, আঙুলের ছাপ। সেখানে ভাঙা প্রতিফলনে মেহরীন এক মুহূর্ত নিজের মুখ দেখল—চোখের নিচে কালচে ছাপ, চোয়াল শক্ত। ভেঙে পড়ার মুখ নয়।

সে ফোনে মাত্র একবার কল দিল। “হালিমা খালা, নিচে নামেন। পুরোনো রেজিস্টারসহ। এখনই।”

রাশেদা ভাবি হেসে উঠল। “খালা-শাশুড়ি নামলে কী হবে? ঘরের ভাতের বিচার রান্নাঘরে হয়, ডিসপ্যাচ বেয়েতে না।”

এই হাসির মধ্যে সামান্য ফাটল ছিল, কারণ হালিমা খালা শুধু আত্মীয়া নন; মালিক হাশেম সাহেবের বড় বোন, আর পুরোনো রেজিস্টার রুমের চাবি তার কাছে। মেহরীন সেটা ধরল। সে আর এক পা-ও নড়ল না। এদিকে ক্ষতি বাড়তে লাগল। লেন-তিনে তিনটা ট্রলি দাঁড়িয়ে, এক ড্রাইভার রশি খুলে রেখে সিগারেট ধরিয়েছে, আরমান বোর্ডে বারবার লিখে কাটছে, তবু কিছু বের হচ্ছে না। দুটো খালাসি এসে মেহরীনের দিকেই ফিসফিস করল, “আপা, কোন গুদামের বস্তা আগে?” তাদের চোখে যে ভরসা, সেটাই ছোট্ট প্রথম ফাঁক। রাশেদা ভাবি উত্তর দিতে গিয়ে থমকাল, কারণ সে জানে না গতকালের রাত্রি-গণনায় কোন ঘরে বস্তা সরানো হয়েছে।

হালিমা খালা নেমে এলেন ধীর পায়ে, সাদা ওড়না গলা জড়ানো, হাতে মোটা নীল রেজিস্টার। তার পেছনে আরও একজন—হাশেম সাহেবের আইন উপদেষ্টা নয়, হিসাবরক্ষক নঈম। সবাই একটু সরে দাঁড়াল। রাশেদা ভাবি তখনও হুকুমের স্বরে বলল, “খালা, এত ভোরে নামার কী দরকার ছিল? আমরা দেখে নিচ্ছি।”

হালিমা খালা তার দিকে তাকালেন না। নীল রেজিস্টার খুলে একেবারে মাঝখানের পাতায় আঙুল রাখলেন। “গত বছরে পুনর্বিন্যাসের কাগজ। হাবের কৃষি ইনপুট লাইনের মুক্তি-সই, রুট বোর্ড, আর সরবরাহ কেবিনেটের চাবি—সব যাবে হাশেমের ছোট ভাই নাসিরের শেয়ারের প্রতিনিধির অধীনে। নাসির দেশের বাইরে। কাকে লিখে দিয়েছিল, পড়ে শোনাও নঈম।”

নঈম পড়ল, স্পষ্ট গলায়, “মেহরীন আক্তার। স্থায়ী কার্য-অধিকার, যতদিন হিসাব বন্ধ না হয়।”

বাতাসটা হঠাৎ থেমে গেল না; বরং আরও জোরে চলতে লাগল। এই পার্থক্যটাই আসল। ট্রলি, ড্রাইভার, খালাসি—সব আগের মতোই নড়ছে, শুধু তাদের চোখের লক্ষ্য বদলে গেল। আরমানের হাতে মার্কার কেঁপে দাগ কেটে গেল বোর্ডে। কামাল সুপারভাইজার এক পা এগিয়ে এসে বলল, “তাহলে লেন-তিনের নির্দেশ কার?”

মেহরীন বলল, “আমার। কামাল ভাই, টমেটোর চালান লেন-এক থেকে সরাও। লেন-তিন শুধু কৃষি ইনপুট। সোহেল, সাভারের দুটো পিকআপ থামাও, আগে মিরপুরের ছোট ভ্যান ঢোকাও। নারায়ণগঞ্জের ড্রাইভারকে বলো, কাগজ আমার টেবিলে।”

কেউ হাততালি দিল না। তার চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ কিছু হলো। সোহেল ঘুরে চেঁচিয়ে উঠল, “লেন-এক দাঁড়াও! লেন-তিন খালি করো! ওই পিকআপ পিছাও!” খালাসিরা কাঁধে মাল নিয়ে দৌড়ের দিক বদলাল। এক ট্রাকের নাক ঘুরল, অন্যটা র‌্যাম্পে উঠে থেমে গেল। আরমান চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল; চেয়ারটা ঠক করে উল্টে গেল। বোর্ডের সামনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হতেই কামাল নিজে সেটা টেনে মেহরীনের দিকে আনল।

রাশেদা ভাবি এতক্ষণে শব্দ খুঁজে পেল। “এই কাগজ পুরোনো। ঘরের বৈঠকে এটা বদলেছে।”

হালিমা খালার গলায় রান্নাঘরের নরম ভাব ছিল না। “ঘরের বৈঠকে কেউ হিসাবের দলিল বদলাতে পারে না। আর বউয়ের মুখের কথায় কেবিনেটের চাবি আটকায় না।”

মেহরীন বসে পড়ল না। সে দাঁড়িয়েই বোর্ডে মোটা অক্ষরে লিখল: “লেন-তিন—কৃষি ইনপুট, ছাড় অনুমোদন: মেহরীন।” তারপর নিচে তিনটা রুট লিখে তীর টানল। প্রথম ভ্যান গেট ঘুরতেই সে হাত তুলে দেখাল, “ওটা ডানে। ওইটা নয়—ওই সাদা কাভার ভ্যান আগে।” খালাসিরা তার কথাই ধরল।

রাশেদা ভাবি এবার সরাসরি আঘাতে গেল। সে কেবিনেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, চাবিটা মুঠোয় চেপে। “চাবি আমি দেব না। দেখি কে নেয়। মাল কেউ ছাড়বে না।”

এটাই শেষ আঁকড়ে ধরা। সবাই দেখল। কামাল এক মুহূর্ত থেমে গেল; সোহেলও। কর্মক্ষেত্রের যত ক্ষমতা, শেষ পর্যন্ত চাবির ধাতব দাঁতের মধ্যে এসে আটকাল। মেহরীন সামনে এগোল। তার কণ্ঠ উঁচু হলো না, কিন্তু চারপাশের চাকার শব্দের ফাঁক দিয়ে সোজা গিয়ে লাগল।

“কামাল ভাই, বরাদ্দ বোর্ডটা এই কেবিনেটের পাশে আনেন। এখনই।”

কামাল বোর্ডের স্ট্যান্ড তুলে আনল। ধাতব পা মেঝেতে ঘষে শব্দ করল।

“নঈম ভাই, নথিতে লিখেন—আজ থেকে কৃষি লাইনের সব ছাড় আমার সই আর আমার চাবি ছাড়া হবে না। যেই নামেই দাবি করুক, স্টক বন্ধ।”

নঈম কলম খুলে দাঁড়াল।

রাশেদা ভাবি হাত সরাল না। “তুই আমাকে থামাবি?”

মেহরীন এবার তার মুঠোর দিকে তাকাল। “আপনি নিজে চাবি দিন। না দিলে, নথিতে লিখে রাখেন—আপনি বৈধ ছাড় বন্ধ করে ক্ষতি করছেন। তারপর ড্রাইভারদের ক্ষতিপূরণও আপনার নামে উঠবে। ঢাকা শহরে দুপুরের আগে খবর উঠে যায়, ভাবি। কার নামে যাবে, সেটা আপনার সামনে লেখা হবে।”

কথাগুলো হুমকি নয়; হিসাব। আর সেটাই বেশি ধারালো। রাশেদা ভাবির মুখের রং বদলে গেল। কারণ এখানে শুধু কাজ নয়, মুখও জড়িত—হাশেম সাহেবের বাড়ির নাম, আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা, শুক্রবারের দাওয়াতের টেবিল, ঈদের কেনাকাটায় কার মুখ নিচু হবে। সে চারদিকে তাকাল, কাউকে পেল না যার কাঁধে দোষ ঠেলে দেবে। আরমান চোখ নামিয়ে নিয়েছে। সোহেল দূরে সরে গেছে। হালিমা খালা স্থির।

মেহরীন হাত বাড়িয়ে রইল। “চাবি।”

দুই সেকেন্ড। তিন। তারপর রাশেদা ভাবি চাবিটা তার হাতে না দিয়ে কামালের দিকে ছুড়ে দিতে চাইল। মেহরীন মাঝপথে ধরে ফেলল। ক্ষুদ্র ধাতব শব্দ। এত ছোট শব্দে এত বড় সরে যাওয়া কমই হয়।

সে চাবি নিজের মুঠোয় বন্ধ করেই বলল, “লাইন শুনেন। লেন-তিনে এখন থেকে কাগজ আমার কাছে আসবে। যার পারমিটে আমার সই নাই, সে গেট ছাড়বে না। আরমান, আপনি বোর্ড থেকে সরে দাঁড়ান। আপনার নাম আজ কোনো রুটে নেই। সোহেল, ওনাদের জন্য অপেক্ষার বেঞ্চ রাখো—লাইন বাইরের পাশে।”

এবার দৃশ্যটা কেটে গেল ছুরির মতো। এক ড্রাইভার কাগজ বাড়িয়ে দিল মেহরীনের দিকে, রাশেদা ভাবির দিকে নয়। দুই খালাসি বোর্ডের নিচে নতুন চক বক্স রাখল। কামাল পুরোনো তালিকা ছিঁড়ে ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। আরমান বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর নিজেই সরে গেল; সরে না গেলে কারও কাঁধে ধাক্কা খেত। রাশেদা ভাবি বলল, “এইভাবে হবে না—” বাকিটা শেষ করতে পারল না, কারণ মেহরীন ততক্ষণে প্রথম তিনটা কাগজে সই করে দিয়েছে, আর সোহেল চেঁচিয়ে উঠেছে, “মিরপুর ভ্যান ছাড়ো! সাভার অপেক্ষা! নারায়ণগঞ্জ কাগজ আনো!”

দুটি গাড়ি এগোল, একটি থেমে গেল। থেমে যাওয়াটাই সবচেয়ে বেশি চোখে লাগল। যাদের এতক্ষণ “আগে” বলা হচ্ছিল, তারা এখন লাইন থেকে কেটে বাইরে। রাশেদা ভাবি সেখানেই দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার দাঁড়ানো আর পথ আটকে রাখা এক নয়। পথ তার পাশ দিয়ে ঘুরে গেছে।

মেহরীন বোর্ডের পাশে রাখা কেবিনেটের সামনে দাঁড়াল। নতুন লেখা রুটগুলো সাদা পৃষ্ঠে ভেজা কালি হয়ে ঝকঝক করছে। গলায় ঝোলা পুরোনো পাসের ফিতে বুকের কাছে চেপে আছে, ঘামে আরও গাঢ়। সে চাবিটা তুলল, তালায় ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল। কড়া একটা ক্লিক করে খুলে গেল।