Fast Fiction

শেষে ওরাই ঢোকার ভিক্ষা চাইল

“ওকে না, পাশের লেনে দাঁড় করান। এই পাসে ভেতরের পিকআপ হবে না।”

সার্ভিস গেটের সামনে হলুদ জ্যাকেট পরা লোকটা হাত তুলে মেহজাবিনকে থামিয়ে দিল। ঠিক তখনই রাশেদা ভাবি নিজের কবজি থেকে ঝুলতে থাকা সবুজ গেট-পাসটা তুলে নীল শেরওয়ানি পরা এক ছেলেকে এগিয়ে দিলেন—“ওরা আমাদের। ভেতরে নিন।” ছেলেটা হাসতে হাসতে ঢুকে গেল, আর মেহজাবিনকে সরে দাঁড়াতে হল ধাতব শাটারের বাইরে, যেখানে পার্কিং-পিকআপ লেনের ধুলো, গরম বাতাস আর ইঞ্জিনের ধোঁয়া একসঙ্গে ঘুরছিল।

তার ডান হাতে এখনও নিচু করে ধরা ফোনের স্ক্রিনের আলো জ্বলছিল। বাম হাতে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের ছোট বাক্স। বিকেল থেকে একটার পর একটা দৌড়ে শার্টের কনুইয়ে ভাঁজ পড়ে গেছে, কাঁধ শক্ত। তবু সে গলা চড়াল না। শুধু বলল, “আমাদের চালানটা এই গেট দিয়েই নামার কথা।”

রাশেদা ভাবি মুখ ঘুরিয়ে এমনভাবে তাকালেন, যেন কথাটা শুনে অবাক হওয়ারও দরকার নেই। “তোমাদের না, মেহজাবিন। বরের বাড়ির জিনিস আগে। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা থাকলেই যে সব জায়গায় সামনে দাঁড়াতে হবে, এমন না। বাইরে অপেক্ষা করো।”

এই কথাটা শোনার মতো মানুষ কম ছিল না। ফারহানের খালাম্মা ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে, সোনার চুড়ি ঠকঠক করে বাজছে। দুইজন ভেন্যু-কর্মী থেমে গেছে। ছোট ট্রাকটার ড্রাইভার মামুন জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। ঢাকার এই ভেন্যুতে আজ বিয়ে, কিন্তু এই সার্ভিস গেট দিয়েই রাতের শেষে বরের বাড়ির উপহারের সঙ্গে মেহজাবিনদের কৃষি যন্ত্রপাতির ডেমো সেট নামবে—কাল ভোরে গাজীপুরের ডিলারদের হাতে দেওয়ার কথা। ভেতরের ঠান্ডা স্টোরে না ঢুকলে বাক্সগুলো রাত কাটবে না।

মামুন ড্রাইভার কাগজ উঁচিয়ে বলল, “আপা, লোডিং স্লিপে তো নাম আছে। সাতটা ক্রেট, দুটো পাওয়ার টিলার পার্টস।”

গেটওয়ালা কাগজটা না নিয়েই মাথা নাড়ল। “রাশেদা ম্যাডাম বলেছেন, এই লেন এখন বন্ধ। আগে বিয়ের গিফট ভ্যান, তারপর অন্য কিছু।”

রাশেদা ভাবি এবার সরাসরি মেহজাবিনের দিকে এগিয়ে এলেন। মিষ্টি গলায়, কিন্তু যথেষ্ট জোরে—যেন আশপাশের সবাই শুনে রাখে—বললেন, “তুমি অফিসে ভালো কাজ করো, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে কে কোন লাইনে যাবে, সেটা বাড়ির বড়রা ঠিক করেন। ফারহানের নাম ধরে সুবিধা নেবে না।”

ফারহানের নামটা শুনেই খালাম্মার মুখ কষে গেল। সম্পর্কটা লুকোনো নয়, আবার ঘোষণাও নয়; এই মধ্যবর্তী অবস্থাই সবচেয়ে অপমানজনক। যেন মেহজাবিন কাছেও না, দূরেও না—সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরের লাইনের মানুষ নয়।

মেহজাবিন খাবারের বাক্সটা ট্রাকের বনেটে রেখে কাগজ নিল। কাগজে ভেন্যুর সিল, সময়, স্টোর নম্বর সব আছে। তবু রাশেদা ভাবি নিজের সবুজ পাসটা আঙুলে ঘুরিয়ে গেটওয়ালাকে বললেন, “শাটার নামিয়ে অর্ধেক রাখেন। ওদের ট্রাক বাইরে থাকবে।” ধাতব চাকার ঘর্ষণে শাটার নিচে নামল, মাঝপথে থামল। ভেতরের আলো রেখা হয়ে পড়ল মেঝেতে। তাদের জন্য জায়গা নেই—এ কথাটা কাগজে নয়, লোহার শব্দেই স্পষ্ট হল।

মেহজাবিন একবারই ফারহানকে ফোন করল। ধরল না। দ্বিতীয়বার করল না। ফোনটা হাতের তালুতে উল্টো করে রেখে সে মামুনকে বলল, “ইঞ্জিন বন্ধ করো না।”

রাশেদা ভাবি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন। “ওমা, এখন আবার নাটক করবে নাকি? ভেন্যুর বুকিং, গেট-পাস, ভেতরের স্টোর—সব আমার হাতে। ব্যবসা করতে শিখো, আগে জায়গা চিনো।”

মেহজাবিন মাথা তুলল। তার গলায় কোন কাঁপন নেই। “বুকিং আপনার হতে পারে। চালান আমার লাইনের।”

সে নিচু গলায় আরেকটা নম্বরে কল দিল। ওপাশে ধরা মাত্র বলল, “শওকত ভাই, উত্তর শাটারের পিকআপ রুট বদলান। আমার চালান পশ্চিম লেন থেকে ছাড়বেন না। এখনই দক্ষিণ সার্ভিস গেট খুলে নিন। আমি অনুমতি দিচ্ছি—রিসিভিং রাইটস ‘মেহজাবিন ট্রেড’ থেকে ‘মামুন—ডাইরেক্ট হ্যান্ডওভার’। সবুজ পাস বাতিল। নীল স্ট্রিপ পাঠান।”

রাশেদা ভাবির চোখে প্রথমবারের মতো থেমে যাওয়া দেখা গেল। “কি বললে?”

মেহজাবিন তার দিকে তাকালই না। ফোন কেটে গেটওয়ালাকে বলল, “দুই মিনিট দাঁড়ান। ভেতর থেকে নতুন পাস আসবে।”

“এখানে আপনার কথা চলবে?” রাশেদা ভাবির কণ্ঠ এবার মিষ্টি থাকল না। “এই ভেন্যু আমরা নিয়েছি।”

“ভেন্যু নিয়েছেন,” মেহজাবিন বলল, “কোল্ড-স্টোরের রাতের স্লট নেননি। কৃষি ডেমো চালানটা আজকে এই হলের সঙ্গে জোড়া হয়েছে স্পনসরশিপে। নাম ছিল কোম্পানির, অনুমতি ছিল আমার।”

দরজার ফাঁকের ভেতর থেকে দৌড়ে এল এক তরুণ সুপারভাইজার। তার হাতে নীল স্ট্রিপ বাঁধা নতুন গেট-পাস। সে সোজা মেহজাবিনের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আপা, শওকত স্যার পাঠাইছে। দক্ষিণ লেন ক্লিয়ার। এইটা মামুন ভাইয়ের ট্রাকে লাগবে।”

কথাটা শেষ না হতেই মেহজাবিন পাসটা নিয়ে নিজে ট্রাকের উইন্ডশিল্ডে আটকে দিল। তারপর পুরোনো কাগজের ওপর কলম টেনে লিখল—“ডাইরেক্ট হ্যান্ডওভার, দক্ষিণ লেন”—এবং সেটা মামুনের হাতে গুঁজে দিল। রাশেদা ভাবি হাত বাড়িয়ে বলতে গেলেন, “এক মিনিট—”

“গাড়ি ঘোরাও,” মেহজাবিন বলল।

মামুন যেন এতক্ষণ এই কথাটার অপেক্ষাতেই ছিল। ট্রাক ব্যাক নিয়ে মোড় ঘোরাতেই পার্কিং লেনের দুইজন কর্মী নিজে থেকে সামনে এসে পথ ছাড়ল। একজন শাটারের সামনে রাখা গিফট-ট্রলি সরিয়ে দিল। আরেকজন রেজিস্টারের পাতা তুলে মেহজাবিনের কাগজের ওপর নতুন লাইন খুলে লিখতে শুরু করল। সবুজ পাসটা রাশেদা ভাবির হাতে ঝুলে রইল, কিন্তু আর কেউ সেটা দেখে নড়ল না।

এই বদলটা এত দ্রুত হল যে খালাম্মা প্রথমে বুঝতেই পারলেন না। তারপর দেখলেন, যে ছেলেটাকে একটু আগে রাশেদা ভাবি ভেতরে ঢুকিয়েছিলেন সে গিফট ভ্যান নিয়ে এখন বাইরে আটকে আছে; দক্ষিণ লেন খুলে দেওয়া হয়েছে শুধু মেহজাবিনের ট্রাকের জন্য। ভেতরের স্টোরের কুলি দুজন ধাক্কা খেতে খেতে সেই দিকেই চলে গেল।

রাশেদা ভাবি এবার সামনে এসে মেহজাবিনের পথ আটকালেন। “তুমি লেন বদলাতে পারো না। বিয়ের জিনিস আগে উঠবে।”

মেহজাবিন থামল। দরজার ফ্রেমের নিচে এক চিলতে জায়গায় দুজনের ছায়া পড়েছে—একজন ভেতরে ঢোকার ভঙ্গিতে, অন্যজন ঠিক থামিয়ে রাখা। সে বলল, “আমার স্লট আটটা পনেরোতে। আপনি সাতটা পঞ্চান্ন থেকে শাটার ধরে রেখেছিলেন। এখন ওভাররাইড হয়েছে।”

“কার মাধ্যমে?” রাশেদা ভাবির গলায় এখন চাপা তাড়া। “ফারহানকে বলেছ?”

“না। যাকে বললে গেট খোলে, তাকে বলেছি।”

সেই সময় দক্ষিণ দিকের শাটার ঘরঘর শব্দে উঠল। ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস এল। মামুন ট্রাক নিয়ে ঢুকে গেল অর্ধেক গাড়ি পর্যন্ত। নীল পাস ঝুলছে, কুলি বাক্স নামাতে শুরু করেছে। প্রথম ক্রেট নামার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের ধাক্কায় যে শব্দ হল, তা আশপাশের সবাইকে সিদ্ধান্তটা শুনিয়ে দিল।

ফারহান তখনই দৌড়ে এল, কপালে ঘাম, পাঞ্জাবির বোতাম আধখোলা। “কি হচ্ছে?”

রাশেদা ভাবি যেন তাকে পেয়ে বাঁচলেন। “দেখো না, ও—”

“সরে দাঁড়াও,” ফারহান কাকে বলল তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু সে মেহজাবিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, সামনে নয়। ভুলটা সে অন্তত বুঝেছে—এতটুকুই। মেহজাবিন তার দিকে তাকাল না। তার চোখ ট্রাক, পাস, শাটার, লোকজনের গতিবিধিতে।

দ্বিতীয় ক্রেট নামতেই উত্তর লেনের গিফট ভ্যান হর্ন দিল। গেটওয়ালা দ্বিধায় পড়ে রাশেদা ভাবির দিকে তাকাল। রাশেদা ভাবি তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “আমার পাস আছে। ওই ভ্যানটা এখন ঢোকান।”

গেটওয়ালা এক পা বাড়িয়ে আবার থেমে গেল। ভেতর থেকে সুপারভাইজার বলে উঠল, “না, উত্তর লেন হোল্ড। নির্দেশ আছে।”

সবুজ পাসটা যেন হঠাৎই কাগজের টুকরো হয়ে গেল। রাশেদা ভাবি সেটি উঁচু করে ধরলেন, কিন্তু কাউকে আর নড়াতে পারলেন না। খালাম্মার চুড়ির শব্দ বন্ধ। কর্মীরা চোখ নামিয়ে কাজে ব্যস্ত, কিন্তু কাজের মুখ ঘুরেছে একদিকে।

তৃতীয় ক্রেট নামার পর রাশেদা ভাবির কণ্ঠ ভেঙে গেল। “মেহজাবিন, একটা ভ্যান আগে ছাড়ো। গিফটগুলো বাইরে থাকলে লোকজন দেখবে।”

মেহজাবিন এবার তার দিকে তাকাল। প্রথমবার। শান্ত, সরাসরি, কোন বাড়তি রাগ ছাড়া। “যখন আমাকে বাইরে দাঁড় করালেন, তখনও লোকজন দেখছিল।”

রাশেদা ভাবি দাঁত চেপে বললেন, “আমি ওইভাবে বলিনি।”

“শাটার নামিয়ে বলেছিলেন।”

আরেকটা ভ্যান এসে পিছনে থামল। জ্যাম জমছে। বিয়ের বাড়ির দুইজন আত্মীয় দূর থেকে তাকিয়ে, কিন্তু এগিয়ে আসছে না। এই মুহূর্তে কেউ ভুল পাশে দাঁড়াতে চায় না। রাশেদা ভাবি সবুজ পাসটা মুঠোয় মুচড়ে মেহজাবিনের কাছে আরও একধাপ এলেন। গলায় অনুরোধ ঢুকে গেছে, তবু মান বাঁচানোর চেষ্টায় শব্দ কড়া রাখলেন। “ঠিক আছে, তোমার চালান উঠুক। এখন আমার ভ্যানটার রিলিজ দাও।”

মেহজাবিন কুলি-সর্দারকে বলল, “গুনে নিন—সাতটা ক্রেট, দুইটা লম্বা বাক্স। সব শেষ হলে ভেতরের ঠান্ডা ঘরে সিল দেবেন।”

রাশেদা ভাবি এবার প্রায় ফিসফিস করে, কিন্তু শুনে ফেলার মতো জোরে বললেন, “শাটারের কাছে দাঁড় করিয়ে রাখবেন নাকি? রিলিজ দিন।”

এটাই ছিল সেই চাওয়া—যেটা তিনি একটু আগে দিচ্ছিলেন না। এখন চাইছেন। প্রকাশ্যে। শাটারের কিনারায় দাঁড়িয়ে।

মেহজাবিন হাত বাড়িয়ে গেটওয়ালার কাছ থেকে রুট-স্লিপ নিল। পুরোনো লাইনের ওপর আঙুল চাপা দিয়ে নতুন লাইনে টোকা দিল। “এই লেন,” সে বলল, “আজ শুধু ‘মেহজাবিন ট্রেড’-এর ডাইরেক্ট হ্যান্ডওভারের জন্য খোলা থাকবে। বরের বাড়ির গিফট ভ্যান উত্তর লাইনে অপেক্ষা করবে। আমার ছাড়পত্র ছাড়া এই শাটার দিয়ে কিছু বের হবে না।”

সে নীল পাসের নিচে নিজের স্বাক্ষর টেনে কাগজটা কুলি-সর্দারের হাতে দিল, তারপর শাটারের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মামুনকে বলল, “শেষ বাক্সটা তুলেই ভেতরের দিকটা ধরে রাখো। বাইরে আর কাউকে নেবে না।”

ধাতব শাটারটা অর্ধেক উঠেই রইল, ভেতরের ঠান্ডা আলো মেহজাবিনের দিকের পরিষ্কার লেনে লম্বা হয়ে পড়ে আছে। বাইরে আটকে থাকা ভ্যানগুলোর নাক অন্ধকারে, আর সেই অর্ধেক-খোলা মুখ কেবল তার দিকেই খোলা।