Fast Fiction

নিজের মঞ্চেই সে শেষ হয়ে গেল

“মাহিরা, আপনি ওখানেই বসুন—বেঞ্চে। আগে নওশীন যাবে।”

কাচঘেরা ডেমো রুমের সামনে নীল প্লাস্টিকের বেঞ্চে বসে থাকা মাহিরার হাত থেমে গেল। ক্ষয়ে যাওয়া অ্যাক্সেস কার্ডের ধারটা সে বুড়ো আঙুলে ঘষছিল; এতদিন ইন্টার্নশিপে যাতায়াতে কার্ডের কোণ মসৃণ হয়ে গেছে। সামনে রেজিস্টার টেবিলে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে পাতলা চামড়া পড়ে আছে, কাপের নীচে গোল দাগ। ডা. সাদমান নাম ডাকার তালিকায় কলম ঠুকলেন, তারপর একেবারে স্বাভাবিক গলায় বললেন, “নওশীন তো আমাদের পরিচিত হাত। প্যানেলও কমফর্ট ফিল করবে।”

“কিন্তু লিস্টে আমার নাম আগে,” মাহিরা শুধু এতটুকুই বলল।

ডা. সাদমান মাথা না তুলেই কাগজ উল্টে দিলেন। “ক্রম বদলালে সমস্যা নেই। আপনি দেখুন, শিখুন। এই ফেলোশিপে শুধু ডিগ্রি না, উপস্থাপনাও লাগে।”

করিডরের দুই পাশে বসা অপেক্ষমান প্রার্থীদের চোখ একসাথে তার দিকে উঠল, আবার সরে গেল। আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে রাফির খালাম্মা—যিনি গত শুক্রবার মাহিরার মাকে বলেছিলেন, “মেয়ে ভালো, কিন্তু বড় জায়গায় মানাবে তো?”—আজ সোনালি ওড়না গুছিয়ে নওশীনের দিকে হাসলেন। রাফি নিজে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে, ফোন হাতে, যেন কারও পক্ষই নিচ্ছে না। এই ক্লিনিকের ফেলোশিপটাই মাহিরার দরকার ছিল; বাসাভাড়া, মায়ের ওষুধ, আর নিজের নামটাকে “কাউকে চেনা মেয়ে” থেকে সরিয়ে কাজের জায়গায় বসানোর জন্য।

নওশীন আপা ঢোকার আগে হালকা হেসে বলল, “বেঞ্চে বসে অবজার্ভ করো। সবার সামনে নার্ভ সামলানোও একটা দক্ষতা।”

মাহিরা কোনো জবাব দিল না। লিফটের স্টিলের দরজায় পুরনো মুছার দাগে নিজের চোয়ালটা শক্ত হয়ে থাকতে দেখল। ভেতরে ডেমো টেবিলে মাইক্রোপিপেট, কালার-ডাই, স্লাইড, টাইমার, স্কোরশিট—সব সাজানো। বাইরে বসা সবার সামনে কাজ হবে, যেন চিকিৎসার দক্ষতা আর লোক দেখানো ভদ্রতা একসাথেই মাপা হচ্ছে।

ডেমো শুরু হওয়ার ঠিক আগে ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট তাড়াহুড়োয় ডাই-ভায়ালটা উল্টো স্ট্যান্ডে বসিয়ে দিল। নওশীন গ্লাভস টেনে হাত তুলছে, প্যানেল তাকিয়ে, আর সেই সময় মাহিরার চোখ এক ঝলকে ভুলটা ধরল। ভায়ালের ঢাকনা ঠিকমতো লক না হলে প্রেসার নিলে ছিটে যাবে, স্লাইড নষ্ট হবে। সে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল।

“একটু—ওটা উল্টো বসানো,” মাহিরা বলল, আঙুল তুলে। “প্রেশার নিলে লিক করবে।”

অ্যাসিস্ট্যান্ট বিরক্ত হয়ে ফিরে তাকাল। “না, ঠিক আছে।”

পরের সেকেন্ডেই মাহিরা এগিয়ে গিয়ে স্ট্যান্ডটা একচুল ঘুরিয়ে দিল, ঢাকনার ক্লিক শব্দটা করিডরেও শোনা গেল। ভায়াল থিতু হয়ে দাঁড়াল। নওশীনের মুখে এক মুহূর্তের জন্য বিরক্তি ফুটে উঠল, তারপর সে হাসি ফিরিয়ে আনল। ডা. সাদমান ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, “রুটিন ব্যাপার। সবাই জানে। আপনি বসুন, মাহিরা। অত আগ বাড়িয়ে লাগবে না।”

কিন্তু যারা দেখেছে তারা দেখেছে—একটা ছোট ভুল, আর সেটা বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটাই ধরেছে। রাফি ফোন নামিয়ে এবার প্রথমবার সরাসরি মাহিরার দিকে তাকাল। খালাম্মার হাসি অর্ধেক গিয়ে থেমে রইল।

নওশীন টাইমার শুরু করল। কাজ ছিল নির্দিষ্ট রঙের মিশ্রণে তিনটি স্লাইড তৈরি করা, প্রতিটায় সমান ঘনত্ব, সমান প্রান্ত, দূষণ ছাড়া। সাধারণ মানুষও বুঝতে পারবে—রং কেমন বসছে, ফোঁটা কাঁপছে কি না, স্লাইডে দাগ হচ্ছে কি না। নওশীন প্রথম টানেই পিপেট বেশি ভরে ফেলল। স্লাইডের মাঝখানে ফোঁটা পড়ে ফুলে উঠল। সে তাড়াতাড়ি টিপে ছড়াতে গিয়ে কোণ ছুঁয়ে দিল, রঙের সরু রেখা কেটে গেল একপাশে। দ্বিতীয় স্লাইডে হাত কাঁপল; গ্লাভসের আঙুলে ডাই লেগে প্রান্তে লালচে স্মিয়ার। তৃতীয়টায় সে গতি বাড়াতে গেল, আর তখুনি পিপেটের টিপ স্টেরাইল জোনের বাইরে ঘষে ফেলল।

কেউ কিছু বলল না, কিন্তু এবার না বলাটাই শোনা গেল। বিচারকদের টেবিলে বসা এক সিনিয়র কনসালট্যান্ট চশমা নামিয়ে স্লাইডের ওপর ঝুঁকলেন। ডা. সাদমান সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “লাইভ ডেমোতে নার্ভ আসে। ওর বেসিক শক্ত।”

“স্কোর তো ডেমোরই হবে,” অন্য বিচারক শুকনো গলায় বললেন।

নওশীন দ্বিতীয়বার ঠিক করার সুযোগ চাইল। “একটা রিপিট হলে—”

“সবাই কি রিপিট পাবে?” পিছন থেকে কেউ ফিসফিস করল। কে বলল বোঝা গেল না। করিডরের বাতাস বদলে গেল। নওশীন এবার প্রথমবার চোখ তুলে বেঞ্চের দিকে তাকাল—যেন ওখানেই দোষ বসে আছে।

ডা. সাদমান দ্রুত কাগজ টানলেন। “তা হলে পরের প্রার্থী—”

“না,” সিনিয়র কনসালট্যান্ট কলম তুলে থামালেন। “যেহেতু এখানে একটা ‘রুটিন’ ভুল আগে বেঞ্চ থেকে ধরা পড়েছে, একই সেটআপে ওই প্রার্থীকেও দিন। তুলনা স্পষ্ট হবে।”

করিডরে একটা ছোট, কড়া নড়াচড়া হলো। মাহিরা নিজের নাম শুনল, কিন্তু ডাকটা কারও মায়া নয়, ফাঁদের ধারও আছে—এখন উঠে গিয়ে হোঁচট খেলেই শেষ। সে ধীরে দাঁড়াল। পুরনো কলমের কালি-দাগ লাগা নিজের ফাইলটা বেঞ্চে রেখে গ্লাভস নিল। ডেমো টেবিলে যেতে তাকে বিচারকদের সামনে দিয়ে যেতে হলো; খালাম্মার চোখের সামনে দিয়েও। সামাজিক খরচটুকু সবাইকে দেখিয়ে।

নওশীন সরে দাঁড়াল, তবে পুরোটা না। টেবিলের কিনারায় তার কনুই এখনও। ডা. সাদমান বললেন, “সময় একই। কোনো বিশেষ সুবিধা না।”

মাহিরা কিছু বলল না। স্ট্যান্ড, টিপ বক্স, ভায়াল, স্লাইড—একবার চোখ বুলিয়ে নিল। প্রথমেই সে টেবিলের বাঁ পাশে রাখা বাতিটা অল্প ঘুরিয়ে নিল, যেন প্রতিফলনে তরলরেখা পরিষ্কার দেখা যায়। তারপর নতুন টিপ লাগাল, ভায়াল হাতে তুলে একবার নিচে আলো ধরল। “এটা বদলানো হবে,” সে শুধু বলল। “ঢাকনা আগেই লুজ হয়েছে।” বিচারকদের একজন মাথা নাড়তেই অ্যাসিস্ট্যান্ট নতুন ভায়াল দিল।

এই একটুখানি বদলে করিডরের পড়া বদলাতে শুরু করল। সে শুরু করল ফোঁটা নেওয়া থেকে নয়, বাতাস ছেড়ে। পিপেটের চাপ অর্ধেক নামিয়ে, টিপ ডুবিয়ে, ধীরে টানল—ফোঁটার রেখা সমান। প্রথম স্লাইডে তরল রাখল মাঝ বরাবর, তারপর স্লাইডের কোণ কাত করে একবারেই পাতলা পরত নামিয়ে দিল। কোনো ছিটে নেই, কোনো কাঁপুনি নেই। পাশে দাঁড়ানো ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট অজান্তেই গলা বাড়িয়ে দেখল।

দ্বিতীয় স্লাইডে সে থামল এক সেকেন্ড। “টেবিলটা কাঁপছে।” হাত বাড়িয়ে ডেমো টেবিলের নিচে ভাঁজ করা কাগজের টুকরো বের করল—অসমান পায়া ঠেকাতে রাখা ছিল। কাগজ সরিয়ে পা ঠিক করে দাঁড় করাল। টেবিলের কাঁপুনি থামতেই কাচের ওপর আলোও স্থির হলো। এবার দ্বিতীয় স্লাইড নামল প্রথমটার মতোই সমান। যারা প্রযুক্তি বোঝে না তারাও বুঝল—একজন শুধু হাত চালাচ্ছে, আরেকজন আগে সমস্যা খুঁজে নিচ্ছে।

ডা. সাদমানের গলায় অস্থিরতা এল। “এগুলো ওভারকশাস। রিয়েল সেটআপে এত সময়—”

“টাইমার চলছে,” মাহিরা তাকাল না। তৃতীয় স্লাইডে সে পিপেট নামানোর আগে টিপের মাথা একফোঁটা ঝরিয়ে নিল, যেন অতিরিক্ত চাপ না থাকে। তারপর শেষ পরতটা টানল। তিনটি স্লাইড পাশাপাশি রাখা হলো—একদিকে দাগ, স্মিয়ার, অসম রেখা; আরেকদিকে তিনটি পরিষ্কার, সমান, আলোর নিচে প্রায় একই ঘনত্বে বসে থাকা রঙ।

এবার সাধারণ সাক্ষীরাও আর ভদ্র বিভ্রান্তিতে থাকতে পারল না। রাফির খালাম্মা মুখের ওড়না টানতে গিয়ে থেমে গেলেন। রাফি দেয়াল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ডা. সাদমান স্কোরশিট নিজের দিকে টানতে গেলেন, কিন্তু সিনিয়র কনসালট্যান্ট তার হাতের ওপর হাত রেখে কাগজটা মাঝখানে ফিরিয়ে দিলেন। “সবাই দেখেই নম্বর দেবেন।”

নওশীন বলল, “সে তো আগে থেকেই এখানে কাজ করেছে, সেটআপ চেনে—”

“আপনিও পরিচিত হাত,” শুকনো উত্তর এল। “এই কথাটাই তো একটু আগে বলা হলো।”

এইবার আঘাতটা শব্দে নয়, ফেরত আসা কথার ওজনে লাগল। নওশীনের থুতনির রেখা নড়ে উঠল। সে প্রথমবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না; কনুই টেবিল ছেড়ে দিল। ডা. সাদমান দ্রুত বলতে গেলেন, “ফেলোশিপে প্যানেলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও—”

“সেটাও দেখেছি,” আরেক বিচারক বললেন। “চাপে কে কাকে বসিয়ে রাখতে চায়, তাও।”

স্কোর লেখা শুরু হলো। কলমের খসখস শব্দ করিডরে আলাদা করে শোনা যাচ্ছিল। মাহিরা গ্লাভস খুলে ভাঁজ করল, টেবিলের কোণায় রাখল। তার হাত কাঁপছিল না। কাচের রুমের বাইরে বসা দুই প্রার্থী নিজেদের ফাইল আরও শক্ত করে ধরল; কেউ আর ফোন দেখছিল না। এই কয়েক মিনিটেই কে দাঁড়াবে, কে বসে থাকবে, সেটা কাগজে নেমে যাচ্ছে।

ডা. সাদমান শেষ চেষ্টা করলেন। “ফাইনাল সিলেকশনে তো সামগ্রিক ইমপ্রেশন—”

সিনিয়র কনসালট্যান্ট স্কোরশিট উল্টে সবার সামনে নাম পড়লেন। “প্রথম—মাহিরা রহমান।” তিনি কাগজটা বিচারকদের টেবিলের ওপর সমান করে চাপা দিলেন, যেন ভাঁজ না পড়ে। “ফেলোশিপ স্লট ওকেই।”

নওশীন বলল, “স্যার, একটা আলোচনা—”

“সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে,” এবার কণ্ঠটা আর উঁচু নয়, কিন্তু দরজার মতো বন্ধ।

ঠিক তখনই রাফির খালাম্মা, এতক্ষণ যিনি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এগিয়ে এলেন এক পা। গলাটা নরম, কিন্তু সবাই শুনতে পেল, “মাহিরা, তোমার মা যদি চান, আজ সন্ধ্যায় আমাদের বাসায়—”

মাহিরা তাকাল। শুধু একবার। তারপর বিচারকদের টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের ফাইলের ভেতর থেকে কলম বের করল। যোগদানের কাগজ তার সামনে ধরা হলো। সে সই করল, তারিখ লিখল, তারপর ক্লিনিকের অস্থায়ী অ্যাক্সেস কার্ডটা—যেটা সে এতদিন ইন্টার্ন পরিচয়ে বয়ে এনেছে—টেবিলে রেখে নতুন কার্ডটা তুলে নিল। পুরনোটা রেখে দেওয়ার শব্দটা ছোট, শুকনো, কিন্তু সবার কানে গেল।

“সন্ধ্যায় আমার ডিউটি,” মাহিরা বলল। “মাকে আমি নিজেই বলব।”

সে ঘুরে বেরিয়ে গেল। নীল বেঞ্চটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে আর একবারও তাকাল না।

বিচারকদের টেবিলে করিডরের আলো তির্যক হয়ে পড়েছে। তার নিচে স্কোরশিটটা খোলা, ওপরের লাইনে মাহিরার নাম, নিচের অঙ্কগুলো আর নামগুলো একসাথে চেপে বসে আছে। পাশে নীল প্লাস্টিকের বেঞ্চ খালি। কাগজটা নড়ছে না।