শেষে ব্যতিক্রম হল সেই মেয়েটাই
দড়ির খুঁটির মাথায় বাঁধা লাল ফিতা টেনে রুখসানা খালা মেহরিনের বুকের সামনে আড়াআড়ি নামিয়ে দিলেন। “এই পর্যন্ত। উপরের ল্যান্ডিংয়ে কনের ঘরের লোক, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, আর যাদের নাম আছে—শুধু তারা।” সিঁড়ির বাঁকে ওঠানামার ভিড় এক মুহূর্তে আটকে গেল; কেউ পাশ কাটিয়ে উঠতে পারল না, কেউ নামতেও পারল না। মেহরিনের কাঁধে দিনের ক্লান্তি জমে ছিল, কুর্তির হাতায় ভাঁজ পড়ে শক্ত হয়ে আছে, গলায় ঝুলতে থাকা তার অফিসের পুরোনো পরিচয়পত্রের ফিতা ঘামে নরম হয়ে বুকের সঙ্গে লেগে আছে। ডান হাতের মুঠোয় বাসের যাতায়াত কার্ডের ক্ষয়ধরা ধার। এতদিন পরও এই বাড়িতে তাকে ওই জিনিসগুলোর সঙ্গেই পড়তে হয়—দাওয়াতের মানুষ না, কাজ সেরে চলে যাওয়া মানুষ।
তার নিচে, সিঁড়ির আরেক ধাপে দাঁড়িয়ে তন্ময়ী হালকা গলায় বলল, “খালা, ও তো সকাল থেকে দৌড়াচ্ছে। হলুদের ট্রে, ফুল, কেক—সব ও-ই তো তুলেছে।”
রুখসানা খালা চোখ না নামিয়েই বললেন, “কাজ করেছে মানেই কি ঘরের মেয়ে হয়ে যায়? নিচতলায় রান্নাঘর আছে, বসার ঘর আছে। সবার জায়গা সবার মতো বুঝে চললে মান-সম্মান থাকে।”
ওপরের ল্যান্ডিংয়ে ঝাড়বাতির হলুদ আলো পড়ছে। কাঁচের দরজার পাশে আয়নার ধাতব ফ্রেমে পুরোনো মুছেমুছে যাওয়া দাগ, আঙুলের ছাপ। সেই ঝাপসা প্রতিফলনে মেহরিন নিজেকে দেখল—ঢাকার ধুলোবালিতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া নীল শাড়ি, কাঁধে ব্যাগ, গলায় অফিসের ফিতা। আজকে সে অফিস থেকে সোজা এসেছে; কৃষি-ঋণ প্রকল্পের ফিল্ড রিপোর্ট জমা দিয়ে, হেড অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছিল। এই বাড়ির এনগেজমেন্টে আসার আগে সে ভেবেছিল অন্তত উপরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে একবার সব দেখবে। কারণ এই আয়োজনের অর্ধেক খরচের পথ যে তার হাত দিয়েই খুলেছিল, সেটা কেউ জোরে বলে না—রায়হানের বাবার জমি বন্ধকের কাগজে হিসাব মিলিয়ে দিয়েছিল সে, ব্যাংকের লোকের সামনে বসে রুখসানা খালার কাঁপা হাত ধরে সই করিয়েছিল সে। তখন মেহরিনকে “আপনারা” বলা হয়েছিল। আজ “এই পর্যন্ত।”
সে ফিতেটা স্পর্শ করল না। শুধু মাথা তুলে বলল, “আমার নাম কে কেটেছে?”
প্রশ্নটা এত সোজা ছিল যে দুই ধাপ ওপরে দাঁড়ানো চাচাতো ভাইটা গলা পরিষ্কার করে অন্যদিকে তাকাল। রুখসানা খালা একটু থামলেন, তারপর তালিকার কাগজটা উঁচু করে ধরলেন। “তোমার নাম ছিলই না। এত ভিড়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি করো না।”
মেহরিন এবার হাত বাড়িয়ে কাগজ নিল না, ফিতার ওপারে দাঁড়িয়েই বলল, “তাহলে আমার হাতে কার চাবি ছিল গত তিন দিন? কার গয়না আমি নিয়ে জুয়েলার্স থেকে উঠিয়েছি? কার শাড়ি প্রেসওয়ালার কাছ থেকে এনেছি? আর আমাকে থামানোর অধিকার আপনাকে কে দিল?”
নিচের ধাপগুলোতে চাপা নড়াচড়া পড়ে গেল। কেউ ফিসফিস থামিয়ে দিল, কেউ ফোন নামিয়ে তাকাল। প্রশ্নটা রুখসানা খালার দিকে সোজা গিয়ে ঠেকল—এই সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে তিনি কীসের জোরে মানুষ আটকে দিচ্ছেন? তালিকার? নাকি এমন এক মান-সম্মানের নামে, যেটা দরকারমতো ব্যবহার হয়?
রুখসানা খালার চোখ কড়া হয়ে উঠল। “আমাকে অধিকার কে দিল মানে? এই বাড়ির বড়দের একজন আমি। সবকিছুর একটা সীমা আছে, মেহরিন। আত্মীয়স্বজনের জানাশোনা বলে একটা কথা আছে। কে কোথায় দাঁড়াবে, সেটা সবাই নিজের থেকে বুঝে। জোর করে উঠে গেলে মেয়েদেরই নাম লাগে।”
বুকের ভেতর টন করে উঠল, কিন্তু মেহরিনের গলায় কোনো কাঁপন এল না। “মেয়েদের নাম লাগে, তাই তো? সকালবেলা আপনারা যখন আমাকে নিচে বসিয়ে বলছিলেন, ‘রায়হান এলেই কফিটা তুলে দিও’, তখন নাম লাগেনি। ব্যাংকে নিয়ে গিয়ে বলছিলেন, ‘এ মেয়েটা না থাকলে কৃষির ঋণটাই আটকে যেত’, তখনও লাগেনি। এখন ওপরে দাঁড়ালে লাগবে?”
তন্ময়ী হাঁ করে রুখসানা খালার দিকে তাকিয়ে আছে। একপাশে কনের ফুফাতো ভাই, হাতে ভিডিও তোলার মোবাইল, চুপ করে গেল। এইটাই ছিল প্রথম চিড়—যেটা এতক্ষণ পাকা দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে ফাটল দেখা গেল। কারণ কেউই পরিষ্কার করে বলতে পারল না মেহরিনকে কাজের সময় দরকার, কিন্তু দৃশ্যমান জায়গায় কেন না।
রুখসানা খালা হঠাৎ ফিতেটা আরও টেনে ধরলেন, যেন দড়ির শক্তিতেই তাঁর কথা শক্ত হবে। “তুমি কথার কথা বাড়িয়ো না। যে সম্পর্কের নাম নেই, সে সম্পর্ক দেখিয়ে উপরের ভেতর যাওয়া যায় না। আজকে বড়লোক অতিথিরা আছে, শহরের পরিচিত লোক আছে। রায়হানের অফিসের লোক আছে। পরে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দেবে কে?”
এবার আঘাতটা খোলাখুলি এল। নাম নেই। সম্পর্ক নেই। কাজ আছে, উপকার আছে, দৌড়ঝাঁপ আছে—কিন্তু নাম নেই। সিঁড়ির মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে এই বিচার শুনতে শুনতে মেহরিনের আঙুলে বাসকার্ডের ক্ষয়ধরা ধার কেটে উঠল। সে নিচে নামল না। সরে দাঁড়ালও না। বরং ধাতব রেলিংয়ের পাশে একচুল সরে এমনভাবে দাঁড়াল, যাতে ভিড়কে তাকে ঘুরে পাশ কাটাতে হয়। তাকে সরিয়ে ফেলা আর সহজ রইল না।
ওই সময়েই ওপরে কাঁচের দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে শব্দ বেরোল—হাসি, প্লেটের ঠোকাঠুকি, কোরআন তেলাওয়াত শেষ হওয়ার গুঞ্জন, আর পুরুষ কণ্ঠের তাড়াহুড়ো। তারপর রায়হান নামল। সে দুই ধাপ একসঙ্গে নেমে এলো, গাঢ় পাঞ্জাবির বোতাম গলায় আটকে, মুখে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। তার পেছনে দুজন মামা, একজন কাজিন, আর কনের বাড়ির একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। ল্যান্ডিংয়ের এই জটটা দেখেই সে থামল না—চোখ সোজা এসে পড়ল ফিতার ওপারে দাঁড়ানো মেহরিনের ওপর।
রুখসানা খালা তখনও জনতার সামনে স্বাভাবিক মুখ রাখার চেষ্টা করছেন। “রায়হান, তুমি ভেতরে যাও। আমি সামলে নিচ্ছি। ভিড় হয়ে গেছে।”
রায়হান নিচে নামতে নামতে বলল, “কাকে সামলাচ্ছেন?”
“ওকে। ও নিচে যাবে।”
“কেন?”
রুখসানা খালা প্রথমবারের মতো খানিক আটকালেন। তারপর বললেন, “এখানে যার যার জায়গা আছে, সে সে থাকবে। এখন প্রকাশ্যে সব কথা—”
রায়হান আর নামল। তার স্যান্ডেলের ধাপের শব্দ শুকনো, দ্রুত। সে এসে একেবারে ফিতার সামনে দাঁড়াল। রুখসানা খালা ভাবলেন, এবার নিশ্চয়ই সে ভদ্রতার সঙ্গে মেহরিনকে সরিয়ে দেবে; ভিড়ও সেই নিরাপদ দৃশ্যটাই চাইল। কিন্তু রায়হান ফিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই দড়ি কার জন্য?”
রুখসানা খালা বললেন, “শৃঙ্খলার জন্য।”
“শৃঙ্খলা?” রায়হান মাথা তুলল। নিচের ধাপ থেকে ওপরে পর্যন্ত যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সবার সামনেই তার গলাটা পরিষ্কার বেজে উঠল। “যে মেয়েটা তিন দিন ধরে এই আয়োজন টেনেছে, বাবার হিসাব মিলিয়েছে, আমার মায়ের ওষুধ কিনে এনেছে, অতিথির জন্য ঘর ঠিক করেছে, তাকে দরজায় আটকে রেখে কাদের মান রক্ষা করছেন?”
রুখসানা খালা এবার গলা নামালেন, “রায়হান, এত মানুষের সামনে—”
“এত মানুষের সামনেই তো করছেন।” সে থামল না। “আর একটা কথা, কারও যদি জানার থাকে, মেহরিন কে—আজকে আমি নিজের মুখে বলছি।”
ল্যান্ডিংয়ে কেউ আর নড়ল না। এমনকি ওপর থেকে নামতে থাকা কনের খালাও মাঝধাপে থেমে গেলেন। মেহরিন অনুভব করল, বাতাস বদলে গেছে; কিন্তু এই বদল এখনও পুরোপুরি তার নয়। কারণ নাম বলার অধিকার এখনও রায়হানের মুখে। সে তাকিয়ে রইল—কোন নাম বলে সে? সুবিধার? কৃতজ্ঞতার? নাকি এমন কিছু, যেটা শুনে পরে আবার তাকে একা দাঁড়াতে হবে?
রায়হান ফিতার নিচ দিয়ে হাত বাড়িয়ে মেহরিনের কব্জি ধরল না; বরং ফিতাটাই খুলে নিজের দিকে টানল। “ও আমার সঙ্গে ঢুকবে,” সে বলল। “শুধু সঙ্গে না—আমি যাকে বিয়ে করতে চাই, সে মেহরিন। এই আয়োজন শেষ হলে ঘরেও এটাকেই বলব। এখন পথ ছাড়ুন।”
শব্দটা সিঁড়িতে পড়ে ঠক করে উঠল—বিয়ে। কোনো গোপন আড়াল নয়, কোনো পাশের ঘরে ফিসফিস নয়, সোজা আত্মীয়স্বজনের জানাশোনার সামনে। রুখসানা খালার হাতে থাকা তালিকার কাগজ কাঁপতে কাঁপতে নিচে নেমে এল। ওটাই প্রথম দৃশ্যমান ভাঙন। দ্বিতীয়টা হল আরও কষ্টের—ওপরে দাঁড়ানো বয়স্ক ভদ্রলোক, যিনি একটু আগে পর্যন্ত হাসিমুখে আয়োজনে মুগ্ধ ছিলেন, তিনি ভুরু কুঁচকে রুখসানা খালার দিকে তাকালেন, যেন এতক্ষণ যাকে কর্তৃত্ব ভেবেছিলেন সেটা আসলে ধার করা ছিল। তৃতীয়টা সবচেয়ে কঠিন—পাশের ধাপে দাঁড়ানো কাজিন নিজে থেকেই একধাপ সরে গেল, জায়গা করে দিল।
রুখসানা খালা শুকনো গলায় বললেন, “এভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা যায়? বড়রা বেঁচে আছে। সম্পর্কেরও তো নিয়ম—”
মেহরিন তখনই বুঝল, এই মুহূর্ত যদি শুধু রায়হানের মুখে থেকে যায়, পরে কেউ এটাকে “ছেলের আবেগ” বলে ছোট করবে। সিঁড়ির রেলিং ছেড়ে সে সোজা দাঁড়াল। তার গলার পুরোনো পরিচয়পত্রের ফিতা খুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল—একটা ছোট, দৃশ্যমান কাজ। তারপর রুখসানা খালার চোখে চোখ রেখে বলল, “নিয়মের কথা এখন আমিও বলি। আমাকে দিয়ে কাজ করাবেন, ঘরের হিসাব ধরাবেন, অতিথির সামনে কাজে লাগাবেন—আর দরজায় এসে বলবেন আমার নাম নেই, সেটা আর হবে না। উনি আমাকে যার পরিচয়ে ডাকছেন, আমি সেই পরিচয়েই উঠছি। কেউ আপত্তি থাকলে নিচে বলুন, দরজায় দাঁড়িয়ে নয়।”
ওপরে কেউ শ্বাস টেনে নিল। নিচে তন্ময়ী দুহাতে থালাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। রুখসানা খালার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু গলায় সেই আগের ধার ফিরল না। তিনি শেষ চেষ্টা করলেন, ফিতার খোলা মাথাটা আবার ধরতে গিয়ে। “মেহরিন, তুমি বুঝে—”
মেহরিন হাত বাড়িয়ে ফিতার মাথাটা তাঁর হাত থেকে নিল। খুব আস্তে, কিন্তু এমনভাবে যেন আর ফেরত দেওয়া হবে না। “না, খালা,” সে বলল, কণ্ঠ একদম সমান। “আজ বুঝে উঠছি। আমাকে থামানোর অধিকার আপনার ছিল না।”
রায়হান এক ধাপ সরে তার জন্য জায়গা করল। সেটুকুই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু মেহরিন আর তার পাশে লুকিয়ে দাঁড়াল না। সে আগে পা তুলল। সিঁড়ির সেই বোতল-গলার ল্যান্ডিং, যেখানে একটু আগে সবাই তাকে আটকে দেখছিল, এখন উল্টো তাকে দেখে পথ মাপছে। ওপরে উঠতে গিয়ে তার শাড়ির আঁচল রুখসানা খালার কবজিতে ছুঁয়ে গেল; খালা হাত সরিয়ে নিলেন যেন ওই স্পর্শও এখন সাক্ষী হয়ে যাবে।
কাঁচের দরজার পাশে ধাতব ফ্রেমের আয়নায় এবার দৃশ্যটা পরিষ্কার পড়ল—রায়হান পেছনে, মেহরিন সামনে। ভেতরের আলো তাদের গায়ে পড়ছে। বয়স্ক ভদ্রলোক নিজে থেকে দরজার হাতল ছেড়ে দিলেন। দুই মামা একপাশে সরে গেলেন। কেউ আর তালিকার কথা তুলল না। কেউ আর “পরে কথা হবে” বলেও ঢাকতে পারল না। কারণ কথাটা হয়ে গেছে, নামটা শোনা গেছে, আর পথটা বদলে গেছে।
ল্যান্ডিংয়ের মুখে পৌঁছে মেহরিন থামল এক শ্বাসের জন্য। তারপর পেছন ফিরে নিচের দিকে, ঠিক রুখসানা খালার দিকে তাকিয়ে বলল, “নিচতলায় আমার কাজ শেষ। উপরের পথে আমি নিজের নামে যাচ্ছি।”
দড়ির খুঁটির মাথায় বাঁধা লাল ফিতাটা তখন আগেই তার দিকেই ঘুরে গেছে। সে হাত বাড়িয়ে ফিতেটা প্রবেশপথের বাঁক থেকে সরিয়ে দিল, খুঁটির মাথায় একবার দুলে উঠে দড়ি একপাশে সরে গেল, আর মেহরিন সবার আগে ভেতরে পা রাখল।